আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যসাহিত্য
বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪—১৮৭৩) বাংলা কাব্য ও নাট্যসাহিত্যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনে বাংলা সাহিত্যের গতিপথ নির্দেশ করে দিয়েছিলেন। মহাকবি মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাগ্রগণ্য কবিদের অন্যতম। ১৮৩৭ সাল থেকে ছয় বছর হিন্দু কলেজে বিদেশি শিক্ষকদের কাছে শিক্ষালাভ করার পর তাঁর মনে এক বিদ্রোহী সত্তা জেগে ওঠে। ১৮৪৩ সালে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাই পিতা রাজনারায়ণ বসুর স্নেহ ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে মধুসূদনকে আজীবন দুর্ভাগ্য ও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়। তাঁর জীবন উপন্যাসের মতোই রোমাঞ্চকর। তিনি বিদেশিনী স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন, ইউরোপে গিয়েছিলেন, ব্যারিস্টার হয়েছিলেন, অর্থ উপার্জনের নানা চেষ্টা করে কখনও সফল, কখনও বা বিফল হয়েছিলেন। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই নিজের অন্তরের জ্ঞানপিপাসার অগ্নিকে নির্বাপিত হতে দেননি। বিভিন্ন ভাষা আয়ত্ত করে তিনি জগতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তিগুলি নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যয়ন করেন এবং আপন কল্পনাশক্তির প্রদীপটি সযত্নে জ্বালিয়ে রাখেন। “দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন” মাতৃভাষাকে বিশ্ববরেণ্য করার উদ্দেশ্যে অশেষ শারীরিক ও জাগতিক ক্লেশ স্বীকার করে নিজের প্রতিভাকে উৎসর্গ করেছিলেন সাহিত্যের সেবায়।
কাব্যসাহিত্য
[সম্পাদনা]মধুসূদনের কবিকৃতি বিচিত্রমুখী হলেও প্রধানত তিনি মহাকবি রূপেই প্রসিদ্ধ। বাংলা কাব্যে তাঁর ভাবগত, বিষয়গত ও আঙ্গিকগত অবদান অপরিমেয়। ১৮৪৯ সালে তিনি দ্য ক্যাপটিভ লেডি ও দ্য ভিশনস অফ দ্য পাস্ট নামে দুটি ইংরেজি কাব্য রচনা করেন। কিন্তু তারপর ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা পরিত্যাগ করে তিনি বাংলা কাব্য ও নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ করলে বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গন অপূর্ব আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মধুসূদন একটি যুগের বাণীকে নতুন ভাবে হিল্লোলিত করে তুলেছিলেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের উদ্ভাবন ও প্রয়োগে পাশ্চাত্য সাহিত্যিক মহাকাব্যের আদর্শে মহাকাব্য রচনায়, নতুন আঙ্গিকে অভিনব পত্রকাব্য রচনার প্রয়াসে, সংগীতমুখর বিচিত্র ছন্দে ব্রজাঙ্গনা রাধার মর্মকথা প্রকাশে, সংহত ছন্দসুষমায় সনেট রচনার মাধ্যমে আপন হৃদয়ের কথা বিজ্ঞাপিত করায় মধুসূদনের কবিকৃতি অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ করে। আঙ্গিকের বৈচিত্র্যে, ছন্দ-অলংকারের অভিনবত্বে এবং ভাবকল্পনার নবীনতায় প্রতিভার বিদ্যুতদীপ্তি স্ফূরিত করে তিনি বাংলা কাব্যধারায় ভাবগঙ্গার তরঙ্গবেগ সঞ্চারিত করেছিলেন।
তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য
[সম্পাদনা]১৮৬০-এর দশকে বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের আত্মপ্রকাশ। নাটকে ও কাব্যে তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রতিভা এই সময়েই প্রকাশ পায়। ১৮৬০ সালে তিনি তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য নামে একটি মহাকাব্য রচনা করেন। তিনি নিজে এটিকে ‘epic’ না বলে বলেছিলেন ‘epicling’. মিলটনের অনুসরণে পাশ্চাত্য সাহিত্যিক মহাকাব্যের আদর্শে ভারতীয় পুরাণ অবলম্বনে কাব্যটি রচিত হয়। সুন্দ ও উপসুন্দ অভিন্নহৃদয় ভ্রাতা ও অমিত শৌর্যের অধিকারী দুই দানব। তাদের বুদ্ধিতে শঙ্কিত দেবতারা বিশ্বকর্মাকে দিয়ে তিলোত্তমা নামে এক অপূর্ব নারীমূর্তি সৃজন করান। এই নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে দুই ভাই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে নিহত হয়। এই কাহিনি মধুসূদন অমিত্রক্ষর ছন্দ ব্যবহার করে অপূর্ব রোম্যান্টিক আখ্যানে পরিণত করেছেন। এই কাব্যে তাঁর প্রতিভার পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ পায়নি, তবে শ্রেষ্ঠ কাব্যের সম্ভাবনার বীজ এতেই উপ্ত হয়েছিল।
মেঘনাদবধ কাব্য
[সম্পাদনা]মেঘনাদবধ কাব্য মধুসূদনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর শিক্ষিত বাঙালি সমাজে এই কাব্য অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। কাহিনি পরিকল্পনায়, চরিত্র সৃষ্টিতে ও ছন্দনৈপুণ্যে মধুসূদন অদ্ভুত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এতে। বাল্মীকি রামায়ণ থেকে আখ্যান গ্রহণ করে গেঁথেছেন ‘নূতন মালা’। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিকুলের ‘চিত্তফুলবনমধু’ সংগ্রহ করে তিনি ‘গৌড়জন’-এর জন্য রচনা করেছেন ‘মধুচক্র’। এই কাব্যের সবচেয়ে বড়ো অভিনবত্ব হল কবির মানবতাবোধ। রাবণের প্রতি সহানুভূতিশীল কবি তাঁকে ভূষিত করেছেন ট্র্যাজিক নায়কের গুণাবলিতে। তিন দিন ও দুই রাতের ঘটনাকে নয়টি সর্গে বিন্যস্ত করে তিনি চরিত্রসৃষ্টি ও আখ্যানের নব-রূপায়ণ ঘটিয়েছেন। কাহিনি-গঠনের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কল্পনাশক্তির সমুন্নতি। পাশ্চাত্য কবিদের অনুসরণের বহু চিহ্ন থাকলেও এই কাব্যে মধুসূদনের মৌলিকতার অভাব নেই। কাব্যটি করুণরসাত্মক ট্র্যাজেডির উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
ব্রজাঙ্গনা কাব্য
[সম্পাদনা]মেঘনাদবধ কাব্য রচনার সমকালেই মধুসূদন ১৮৬১ সালের শেষ দিকে রাধার বিরহবেদনা অবলম্বনে ব্রজাঙ্গনা কাব্য নামে একটি গীতিকাব্য রচনা করেন। ইতালীয় Ottava Rima ছন্দের অনুসরণে মিশ্রছন্দের ব্যবহার এই কাব্যের অন্যতম বিশেষত্ব। কাব্যটি বৈষ্ণবীয় ভক্তিমূলক কাব্য নয়; মধুসূদনের মতে পাশ্চাত্য Ode-জাতীয় কাব্যের মতোই রোম্যান্টিক প্রেমের কাব্য। কোনও ধর্মীয় সংস্কার দ্বারা চালিত না হয়ে কবি এটিতে রাধার মধ্যে এক মানবী সত্তার বিকাশ দেখিয়েছেন। এটিরও প্রেরণা ছিল উনিশ শতকের মানবতাবোধ। কাব্যটির বহিরঙ্গে বৈষ্ণব কাব্যের প্রভাব ছিল; এমনকি ভণিতাও বৈষ্ণব কবিদের অনুকরণেই করা হয়েছে। কিন্তু কবির দৃষ্টিতে রাধা ‘মহাভাবস্বরূপিণী’ নন, বরং “the poor lady of Braja” মাত্র। বন্ধুকে লিখেছিলেন, “After all, Mrs. Radha was not a bad woman.” সম্ভবত এই কাব্যই মধুসূদনের গীতিকাব্য প্রতিভার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
বীরাঙ্গনা কাব্য
[সম্পাদনা]আঙ্গিক পরিকল্পনায়, বিষয় নির্বাচনে ও শৈল্পিক সমৃদ্ধিতে মধুসূদনের বীরাঙ্গনা কাব্য অতুলনীয়। রচনার কারুশিল্পে সার্থক এই-জাতীয় পত্রকাব্য বাংলায় আর লেখা হয়নি। ১৮৬২ সালে কাব্যটি প্রকাশিত হয়। ইতালীয় কবি ওভিড (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩-১৭) রচিত হেরোইদাস কাব্যের অনুসরণে বীরাঙ্গনা কাব্য রচিত। ওভিডের কাব্যে একুশ নায়িকার প্রেমপত্র ছিল। মধুসূদন তা-ই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এগারোটি পত্রকাব্য রচনার পরই তিনি সেগুলিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটির দ্বারা তিনি বীর-রমণী না বুঝিয়ে বীরপত্নী বা বীরের প্রেমিকা বুঝিয়েছেন। ওভিড যেমন ধ্রুপদি সাহিত্যের যোদ্ধাচরিত্রদের উদ্দেশ্যে তাঁদের প্রেয়সীর পত্র রচনা করেন, তেমনই মধুসূদনের কাব্যে আছে ‘দুষ্যন্তের প্রতি শকুন্তলা’, ‘সোমের প্রতি তারা’, ‘লক্ষ্মণের প্রতি শূর্পনখা’, ‘দ্বারকানাথের প্রতি রুক্মিণী’ প্রভৃতি পত্র। কবিতাগুলির বাণীশিল্প ও কাব্যভঙ্গি অপূর্ব। আধুনিক নারীর জীবনজিজ্ঞাসা ও অধিকারের দাবি মধুসূদন ‘ভাণিকা’ বা একক ভাষণের নাটকীয়তায় অপরূপ করে তুলেছেন।
চতুর্দশপদী কবিতাবলী
[সম্পাদনা]মধুসূদনের কবিপ্রতিভার বিস্ময়কর দীপ্তির ছিল ক্ষণস্থায়ী। ১৮৬২ সালে তিনি ইউরোপে গেলে তাঁর কাব্যরচনার প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু ইউরোপে থাকার সময় কিছুদিনের জন্য তাঁর কবিত্বের শেষ আলোকরশ্মি প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর সনেটগুলিতে। ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে বসে তিনি শতাধিক সনেট রচনা করেন এবং ১৮৬৬ সালে চতুর্দশপদী কবিতাবলী নামে সেগুলি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে অবশ্য ৯৪টি সনেট ছিল। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি কবির শ্রদ্ধাবোধ থেকে শুরু করে নানা বিষয়ের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় এগুলিতে, যা ব্যক্তি মধুসূদনকে চিনতে সাহায্য করে। ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুসরণে তিনি সনেট কাব্যশৈলীটি বাংলা কাব্যে প্রবর্তন করেন এবং সার্থক সনেট রচনায় সমর্থ হন। পরবর্তীকালে এই ধারাটির বিশেষ উন্নতি ঘটান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রমথ চৌধুরী।
মূল্যায়ন
[সম্পাদনা]বাংলা কাব্যসাহিত্য মধুসূদনের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞা। কাব্যের ভাব-পরিকল্পনা ও আঙ্গিক নির্মাণ উভয় দিকেই তিনি অভিনবত্ব এনেছিলেন। সাহিত্যিক মহাকাব্যের আদর্শে ওজস্বিনী ভাষায় মহাকাব্য রচনা, মিশ্রছন্দে গীতিকাব্য এবং পত্রকাব্য ও সনেট রচনার প্রবর্তন বাংলা সাহিত্যে ছিল একেবারেই নতুন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টি এবং ভাষা, ছন্দ ও অলংকার ব্যবহারে বাণীশিল্পের নতুন আদর্শ স্থাপন মধুসূদনের বিস্ময়কর কৃতিত্ব। বাংলা কাব্যের প্রাচীন প্রবাহের গতানুগতিকতার মধ্যে তিনি যে বিস্ময়কর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অভিমুখ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছিল।