আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/মদনমোহন তর্কালঙ্কার
মদনমোহন তর্কালঙ্কার (১৮১৭—১৮৫৮) উনিশ শতকের প্রথম ভাগে প্রাচীন কাব্যধারার সর্বশেষ প্রতিভূ। নদীয়া জেলার বিল্বগ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম রামধন চট্টোপাধ্যায়। মদনমোহন অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন। সংস্কৃত কলেজের কৃতী ছাত্র এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রিয় বন্ধু রূপে তিনি পরিচিত। সংস্কৃত কলেজে তিনি সাহিত্যের অধ্যাপনা করতেন। কিছুদিন মুর্শিদাবাদে ‘জজ পণ্ডিত’ পদে ছিলেন। পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন। ব্যক্তিচরিত্রে মদনমোহন ছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রগতিবাদী। দেবভক্তি ও অন্ধ সংস্কারকে সোৎসাহে বর্জন করে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে একযোগে তিনি স্ত্রীশিক্ষা প্রবর্তন এবং বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ রদ প্রভৃতি সামাজিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সর্বশুকরী নামে সভা স্থাপন এবং একই নামে ১৮৫০ সালের অগস্ট মাসে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে মদনমোহন কৌলীন্যপ্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেন। অকালমৃত্যু না হলে হয়তো এই প্রতিভাবান ব্যক্তির হাতে বাঙালি জাতি অনেক কিছু লাভ করতে পারত।
সামাজিক আচার-আচরণে তিনি ছিলেন বিপ্লববাদী; চিন্তার স্বাধীনতা ও যুক্তিনিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিপন্থী। অথচ সাহিত্য রচনায় তাঁর এই জাতীয় মানসিকতার প্রতিফলন হয়নি। তাঁর লেখা দু-একটি প্রবন্ধেই তাঁর প্রগতিশীল মনোভাবের স্বরূপটি উদ্ঘাটিত হয়েছে।
প্রথম যৌবনে তিনি রসতরঙ্গিনী ও বাসবদত্তা নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন এবং পরে তিন খণ্ডে শিশুশিক্ষা নামে একটি পাঠ্যপুস্তক লেখেন। সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নকালে সতেরো বছর বয়সে তিনি ভারতচন্দ্রের আদর্শে রচনা করেন রসতরঙ্গিনী (১৮৩৪) নামক আদিরসাত্মক কাব্যটি। কবিত্বে ও কাব্যকলায় ভারতচন্দ্রকে অতিক্রম করার স্পর্ধিত সংকল্প নিয়েই তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন। ভারতচন্দ্রের রসমঞ্জরী কাব্যের অনুকরণে এটি রচিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ বাসবদত্তা (১৮৩৬) ছিল অনুরূপ আদিরসাত্মক। এটি সুবন্ধু রচিত বিখ্যাত সংস্কৃত গদ্যকাব্যটির কাব্যানুবাদ। কাহিনি-বিন্যাস, ভাষা, চরিত্রচিত্রণ সমস্তই ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্যের অনুকরণ। তিনি ব্যক্তিচরিত্রে দেববিশ্বাসী না হলেও এটিতে ভণিতা দিয়েছেন ভারতচন্দ্রের ভঙ্গিতে:
- কাব্যরসরত্নাকরে করিয়া মজ্জন
- কালীর আভাসে ভাষে মদনমোহন।।
অথবা অন্যত্র বলেছেন,
- কালীর আদেশে মদন ভাষে।
- সুরসিক জন শুনিয়া হাসে।।
মদনমোহন ছন্দ, অলংকার ও রসচেতনায় প্রথম শ্রেণির কবিত্বের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু আদিরসের পথ ধরে এবং প্রাচীন প্রকাশরীতি অবলম্বন করে প্রথম যৌবনে অবিমৃষ্যকারিতার পরিচয় দেন। পরিণত বয়সে তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দেন এবং পূর্বে লেখা বইগুলির প্রকাশ বন্ধ করে দেন।