আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য উনিশ শতকের সৃষ্টি। পূর্বে প্রকৃষ্ট বন্ধনযুক্ত যে-কোনও রচনাকে প্রবন্ধ বলা হত। গদ্য-প্রবন্ধ, পদ্য-প্রবন্ধ, নাট্য-প্রবন্ধ ইত্যাদি নাম সেই সূত্রেই প্রচলিত হয়। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে পয়ার প্রবন্ধ, লাচারী প্রবন্ধ প্রভৃতি প্রয়োগ দেখা যায়। কিন্তু উনিশ শতকে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের পর প্রবন্ধ শব্দটির বিশেষ অর্থে প্রযুক্ত হতে থাকে। ইংরেজি discourse, treaties ও essay জাতীয় গদ্যরচনাকে আধুনিক যুগে বাংলায় প্রবন্ধ বলা হয়। তত্ত্ব ও তথ্যমূলক আবেগহীন রচনাগুলিই প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সন্দর্ভ, প্রস্তাব ইত্যাদি নামে অভিহিত হয়।
সাময়িকপত্রে ধর্মীয় বিবাদকে কেন্দ্র করে বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের প্রথম সূচনা। খ্রিস্টধর্ম প্রচার, হিন্দুধর্মের আত্মপক্ষ সমর্থন, সতীদাহ প্রথা-সম্পর্কিত আলোচনা, বিধবাবিবাহ-বিষয়ক প্রস্তাব ইত্যাদি যে-কোনও সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য গদ্যভাষায় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির কাছে আবেদন রাখা হত। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকবৃন্দ, রাজা রামমোহন রায়, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন প্রমুখ এর সূত্রপাত করেন। তাঁদের পথ ধরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ মনস্বী লেখকবৃন্দ প্রবন্ধসাহিত্যের পুষ্টিসাধন করতে থাকেন। জ্ঞানানুশীলন, তত্ত্বব্যাখ্যা ও তথ্য পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যরসের জোগান দিয়ে তাঁরা প্রবন্ধকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছিলেন। জ্ঞানচর্চাকে রসের পর্যায়ে উন্নীত করা, বুদ্ধিগ্রাহ্য বিষয়বস্তুকে হৃদয়ধর্মের অনুকূল করে তোলা বিশেষ প্রতিভা ছাড়া অসম্ভব। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে প্রতিভার সেই দীপ্তির ছিল। প্রবন্ধসাহিত্যের দুই দিকপাল ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধসাহিত্যে গদ্যশৈলীর সৌকর্য ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য লক্ষণীয়; অন্যদিকে ভূদেবের প্রবন্ধে বিশুদ্ধ প্রবন্ধগুণের সমাবেশ এবং যুক্তিবাদ ও বিষয়নিষ্ঠা অধিক।
হিন্দু কলেজের কৃতি ছাত্র ভূদেব মুখোপাধ্যায় ছাত্রাবস্থা থেকেই হাতে লিখে প্রবন্ধ-পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। পরিণত বয়সে যুক্তি ও তথ্যের প্রচুর উপকরণ নিয়ে ব্যক্তিত্বস্পর্শবর্জিত আবেগহীন প্রবন্ধ রচনায় নিষ্ঠার ও কৃতিত্বের পরিচয় দেন। সামাজিক প্রবন্ধ, পারিবারিক প্রবন্ধ, আচার প্রবন্ধ, বিবিধ প্রবন্ধ প্রভৃতি গ্রন্থে তিনি বহু পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন। এগুলির রচনাশৈলীর পরিকল্পনা এবং ভাষারীতিতে তিনি অক্ষয়কুমারের মননশীল আদর্শ অনুসরণ করেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মতবাদ যুক্তি দ্বারা সমর্থন বা খণ্ডন করে, ইতিহাস থেকে প্রচুর দৃষ্টান্ত আহরণ করে, তর্কশাস্ত্রের আরোহ ও অবরোহ প্রণালী অবলম্বন করে ভূদেব তাঁর প্রবন্ধগুলিতে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রবন্ধে হৃদয়াবেগ অপেক্ষা বুদ্ধির দীপ্তির ও বিচারপ্রবণতা খুব বেশি। তাই তাঁর প্রবন্ধের ভাষায় কোনও তির্যক ভঙ্গি নেই, পরিহাসরসিকতা ও শ্রুতিমাধুর্যের অভাবও লক্ষণীয়। সামঞ্জস্য ও সমতা দ্বারা ভাষাকে যথাসম্ভব গুরুগম্ভীর অথচ প্রাঞ্জল রেখেছেন তিনি। পাশ্চাত্য আদর্শে যাকে intellectual essay বলে ভূদেবের প্রবন্ধ তারই প্রতিফলন।
বঙ্কিমচন্দ্র ভূদেবের প্রায় সমসাময়িক প্রাবন্ধিক। বঙ্কিমচন্দ্রের বিশুদ্ধ প্রবন্ধগুলি ভূদেবের গ্রন্থ প্রকাশের পর প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৭২ সালের আগেই প্রবন্ধ রচনায় হাত দিয়েছিলেন। বঙ্গদর্শন প্রতিষ্ঠার পর সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র মাসিকপত্রের প্রয়োজনে পাঠকের জ্ঞানপিপাসা ও রসপিপাসা নিবৃত্তির জন্য প্রবন্ধ রচনার অভিনব উপায় উদ্ভাবন করেন। ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞান, জীবনদর্শন ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর প্রবন্ধগুলি মননশীলতা, বিচার-প্রবণতা ও পাণ্ডিত্যের জ্যোতিতে এবং সেই সঙ্গে স্নিগ্ধ কৌতুকের প্রলেপে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। বিজ্ঞানরহস্য ও লোকরহস্য অভিনব প্রবন্ধসাহিত্য রূপে বাঙালি পাঠককে চমৎকৃত করে। কমলাকান্তের দপ্তর-এ বিষয়-উপস্থাপনার কৌশল ও ভাষা-প্রয়োগে ব্যঙ্গকৌতুকের তির্যকতাও অপূর্ব। প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র শুষ্ক তত্ত্বকে গল্পরসের আর্দ্রতায় সুস্নিগ্ধ করে তুলেছেন। ভূদেবের রচনায় এই কৌশলের চিহ্নমাত্র নেই। জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ রচনাতেও বঙ্কিমচন্দ্র সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর বিবিধ প্রবন্ধ-এ ঐতিহাসিক গবেষণামূলক আলোচনা, সমাজতত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, ধর্মনীতির নিগূঢ় বিচার অসাধারণ দীপ্তিতে উজ্জ্বল। এগুলিতে পাণ্ডিত্যের গুরুভার নেই, বরং মানবপ্রেমিক ঐতিহ্যপ্রিয় বঙ্কিমচন্দ্রের বিরাট ব্যক্তিত্বের স্পর্শ প্রতিটি প্রবন্ধকে রসসিক্ত করে রেখেছে। বস্তুত বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরেই বিষয়নিষ্ঠ প্রবন্ধ রচনার রীতি এবং সাহিত্য সমালোচনার পদ্ধতি স্বতন্ত্র পথ অবলম্বন করে। গদ্যপ্রবন্ধে ব্যক্তিত্বের চিহ্ন পরিস্ফুট হওয়ায় জ্ঞানচর্চামূলক শুষ্ক প্রবন্ধগুলি রসসাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হয়।
ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুজনেই স্বতন্ত্র পথের পথিক। ভূদেব বিষয়ের মধ্যে নিজেকে নিবিষ্ট রেখে দার্শনিক ও পণ্ডিতের কাজ করেছেন, এবং বঙ্কিমচন্দ্র আপন ব্যক্তিত্বে বিষয়কে অতিক্রম করে সাহিত্যিক ও রসিকের কাজ করেছেন। এখানেই উভয়ের কৃতিত্বের মৌলিক পার্থক্য।