বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/ভূদেব মুখোপাধ্যায়

উইকিবই থেকে

হিন্দু কলেজের মেধাবী ছাত্র ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮২৭—১৮৯৪) ইউরোপীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক বিস্ময়কর দান। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সহপাঠী হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় ধর্ম ও সামাজিক আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। দুই বিপরীতমুখী আদর্শকে ব্যক্তিচরিত্রের মধ্যে সংহত করে ভূদেব তাঁর রচনার মধ্যে জাতীয় জীবনের উন্নতির পথ নির্দেশ করে গিয়েছেন। সেকালে একদিকে বিজাতীয় আদর্শ ও অন্যদিকে আর্যত্বের অহমিকার দুই প্রান্তসীমায় শিক্ষিত বাঙালির মনে প্রবল ভাবদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। স্থিতধী ভূদেব জাতীয় জীবনের এক সংকটকালে দৃঢ় হস্তে লেখনী ধারণ করে জাতিকে আত্মস্থ হওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। জনপ্রিয় নকশা-জাতীয় রচনায় আত্মনিয়োগ না করে জাতির মানসলোকে বুদ্ধির বিচার ও মননের গভীরতা প্রবন্ধসাহিত্যের মাধ্যমে সঞ্চারিত করে একদিকে যেমন তিনি সমাজকল্যাণের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, তেমনই বাংলার জাতীয় সাহিত্যের গৌরবও বৃদ্ধি করেছিলেন। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ভূদেব পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রণালীতে কৃতবিদ্য হয়ে সংযম ও যুক্তিনিষ্ঠার পরিচয় যেমন দিয়েছেন ব্যক্তিচরিত্রে, তেমনই দিয়েছেন তাঁর গদ্যরীতিতে। আবেগহীন যুক্তি ও নির্ভুল তথ্যের পরিবেশনের মাধ্যমে প্রবন্ধ রচনার প্রবর্তক রূপে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বাংলা ভাষা ও বাংলার সংস্কৃতির প্রতি ভূদেবের অনুরাগ ছিল গভীর। তিনি মনে করতেন যে, ব্যক্তিচরিত্রের উন্নতি ও সামাজিক জীবনে কল্যাণবোধ মনুষ্যত্বের প্রথম ধাপ। জাতীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সমাজ ও পরিবার গঠন করা আবশ্যক। ইউরোপীয় পদ্ধতিতে যুক্তিসম্মত উপায়ে তিনি তাঁর বক্তব্য প্রবন্ধের আকারে প্রকাশ করেছেন। বাংলা গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমে তিনি পাঠ্যপুস্তক রচনায় হাত দিয়েছিলেন। দীর্ঘকাল শিক্ষাবিভাগে কর্মরত থাকায় দেশের শিক্ষাগত ত্রুটির দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছিল। তাঁর শিক্ষাবিষয়ক প্রস্তাব, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পুরাবৃত্তসার ইংলণ্ডের ইতিহাস, রোমের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস, ক্ষেত্রতত্ত্ব প্রভৃতি গ্রন্থগুলির মৌলিক বা স্বাধীন রচনা নয়, বরং ছাত্রদের জ্ঞানবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রচিত। এগুলির মধ্যে ভূদেবের সাহিত্যিক কৃতিত্বের কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না।

মনস্বী ভূদেবের চিন্তার গভীরতা, ভাষাশিল্পের কারুকার্য এবং প্রকাশভঙ্গির ঋজুতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রবন্ধগুলিতে। ১৮৮২ সালে তাঁর পারিবারিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধগুলিতে সাহিত্যরসের পরিচয় পাওয়া যায় না, হৃদয়ের দ্বারে এগুলি কোনও আবেদনই রাখে না। বুদ্ধিমান মানুষের চিন্তাশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে দিয়ে মানুষকে ঐহিক কর্তব্যের পথে অনুপ্রেরিত করাই এগুলির উদ্দেশ্য। প্রবন্ধগুলির নাম থেকেই বোঝা যায় রস পরিবেশন করতে বসেননি ভূদেব। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্ক নির্দেশ করে আচার-আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেই বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন তিনি এগুলিতে।

সমাজ ও ধর্মনীতি অবলম্বনে উপদেশাত্মক প্রবন্ধ রচনা করলেও ভূদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন সাহিত্যরসিক ও তত্ত্বজ্ঞ সমালোচক। সংস্কৃত সাহিত্যের তিনি ছিলেন এক রসজ্ঞ বিশ্লেষক। তাঁর বিবিধ প্রবন্ধ গ্রন্থের দু খণ্ডে সংস্কৃত সাহিত্য-বিষয়ক সমালোচনাগুলি সংকলিত হয়েছে। বইটি প্রকাশিত হয় ভূদেবের মৃত্যুর পর ১৯০৫ সালে। বিখ্যাত সংস্কৃত কাব্য, নাটক ইত্যাদির তিনি যে নিপুণ সমালোচনা করেছেন, তাতে তাঁর রসজ্ঞান ও বিশ্লেষণবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। আবার পুষ্পাঞ্জলি নামে তিনি যে গল্পগ্রন্থটি রচনা করেছিলেন সেখানেও হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য প্রদর্শন করতে গিয়ে প্রবন্ধসুলভ তত্ত্বকথার ভারে গল্পরস জমতে পারেনি। আসল কথা ভূদেব কল্পনাপ্রবণ রোম্যান্টিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন কাজের মানুষ, ‘বাজে কথা’র চাষ তিনি জানতেন না। যা কিছু মানুষের হিতকর, যা নিতান্তই প্রয়োজন, তিনি তা নিয়েই লেখালিখি করে গিয়েছেন। ব্যক্তিচরিত্রে তিনি যেমন ছিলেন নিষ্ঠাবান, সরল ও বাহুল্যবর্জিত সাহিত্য রচনাতেও সেইরকম আবেগের বাহুল্য সর্বথা বর্জন করে সুসংহত, যুক্তিপূর্ণ ও মননশীল সাহিত্য রচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের পুষ্টিসাধন করে গিয়েছেন সারা জীবন।