আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/বিহারীলাল চক্রবর্তী
উনিশ শতকের শেষভাগে কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্যের দুন্দুভি-নিনাদের মধ্যে অকস্মাৎ সানাইয়ের করুণ-মধুর রাগিণী সঞ্চার করে বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে পালাবদলের সূচনা করেছিলেন। ১৮৩৫ সালে কলকাতার নিমতলা অঞ্চলের বিহারীলালের জন্ম। সংস্কৃত কলেজে কাব্য ও অলংকার শাস্ত্রের কৃতী ছাত্র বিহারীলাল এক ইংরেজি-শিক্ষিত বন্ধুর কাছে শেকসপিয়র, স্কট, বায়রন, মুর প্রমুখ ইংরেজি সাহিত্যিকবর্গের শ্রেষ্ঠ রচনাবলির পাঠ নিয়েছিলেন। সম্ভবত রোম্যান্টিক কবি শেলি ও কিটসের কাব্যের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল। অল্প বয়স থেকেই তিনি গীতিকাব্য রচনায় উৎসাহী ছিলেন; কিন্তু তাঁর পাঠকসংখ্যা বেশি ছিল না। কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু ও অনুরাগী পাঠক ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী কবিকে খুব উৎসাহ দিতেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমার বড়াল বিহারীলালের অনুগত ভক্ত রূপে কাব্যদীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮৯৪ সালে বিহারীলালের মৃত্যু হয়। তখন রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের কাব্যের মর্মসত্য ব্যাখ্যা করে দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করায় এবং অক্ষয়কুমার প্রশস্তি কাব্যে তাঁকে ‘ভোরের পাখী’ সম্বোধিত করায় শিক্ষিত পাঠকমহলে বিহারীলালের কাব্যের সমাদর হতে থাকে।
রচনাবলি
[সম্পাদনা]বিহারীলাল পূর্ণিমা পত্রিকায় রচনা প্রকাশ করতেন। পরে তাঁর অধিকাংশ রচনাই প্রকাশিত হয় অবোধবন্ধু পত্রিকায়। তাঁর প্রথম গ্রন্থটি ছিল স্বপ্নদর্শন (১৮৫৮) নামে একটি গদ্য-নিবন্ধ। পরবর্তী গ্রন্থ সঙ্গীতশতক (১৮৬২) প্রাচীন কাব্যধারা অনুসারে রচিত। ১৮৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ: বন্ধুবিয়োগ, নিসর্গ-সন্দর্শন, প্রেম-প্রবাহিনী ও বঙ্গসুন্দরী। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ সারদামঙ্গল প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালে। ১৮৮২ সালে তাঁর ক্ষুদ্র কাব্য ‘মায়াদেবী’ ছাপা হয়েছিল ভারতী পত্রিকায়। এই সময় তাঁর ‘ধূমকেতু’ ও ‘দেবীরাণী’ কবিতাও প্রকাশিত হয়। ১৮৯২ সালে ‘শরৎকাল’, ‘নিশীথসঙ্গীত’ প্রভৃতি খণ্ডকবিতা প্রকাশিত হয় প্রয়াস পত্রিকায়। কবিতা ও সঙ্গীত নামে কয়েকটি গানের সংকলন এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্দেশ্যে লেখা একটি পত্রকাব্য প্রকাশিত হয়েছিল পুণ্য পত্রিকায়। ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বাউল গানের সংকলন বাউল-বিংশতি। বিহারীলালের সর্বশেষ কাব্য সাধের আসন। দশটি সর্গ ও উপসংহারে বিভক্ত এই কাব্যটি তিনি কাদম্বরী দেবীর অনুরোধে রচনা করতে শুরু করেছিলেন। ১৮৮৩ সালে কাদম্বরীর মৃত্যুর পর কাব্যরচনা সম্পূর্ণ হয়। প্রথম তিনটি সর্গ ১৮৮৮ সালে মালঞ্চ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কবির মৃত্যুর পর।
কবিপ্রতিভার বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]আধুনিক রোম্যান্টিক গীতিকাব্যের প্রবর্তক রূপে কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী সাহিত্যক্ষেত্রে স্থায়ী আসনের অধিকারী। তাঁর কাব্যের মধ্যে তাঁর প্রতিভার এক অভিনব প্রকাশ ঘটেছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মনিষ্ঠার দ্বারা জীবন ও জগতের প্রকাশকে এমন বিস্ময়কর মাধুর্যে ভরিয়ে তোলার দৃষ্টান্ত বাংলা সাহিত্যে বিহারীলালের আগে দেখা যায়নি। নিসর্গ-সন্দর্শন কাব্যে প্রকৃতি কবির কাছে জড়বস্তু নয়; কবির আত্মার সঙ্গে স্থাপিত হয়েছে তার অবিচ্ছেদ্য অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। আবার বঙ্গসুন্দরী কাব্যের নারী মাতা, কন্যা, বধূ সবাই—অথচ সব কিছুর অতিরিক্ত এক শাশ্বতী নারী। বিশেষকে অবলম্বন করে সামান্য বা নির্বিশেষে চিত্তের এই বিচিত্র প্রসারই বিহারীলালের কবিপ্রতিভার অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য। কাব্যে মন্ময়তা ও আত্মগত ভাবোচ্ছাস প্রকাশ করে পাশ্চাত্য লিরিকের আদর্শে গীতিকাব্যের সূচনা করেছিলেন বলেই রবীন্দ্রনাথ ও অক্ষয়কুমার তাঁকে ‘ভোরের পাখী’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
বিহারীলালের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, তিনি কাব্যের কথাবস্তুকে অতিক্রম করে আপন মনের নিগূঢ় অনুভূতিকে আবেগময় ভাষায় রূপায়িত করতেন। প্রেম-প্রবাহিনী ও বন্ধুবিয়োগ কাব্যের বিষয়বস্তু নিতান্ত ব্যক্তিগত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত। এমন বস্তুনিষ্ঠ বিষয়কেও কবি অমার্জিত সারল্যে, সহজ সৌন্দর্যের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত কথায় অর্থাৎ আত্মনিষ্ঠ রচনায় পরিণত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “আমি সেই প্রথম বাংলা কবিতায় কবির নিজের সুর শুনিলাম।” বাস্তবিকই বিহারীলাল ‘নিজের সুর’ ফোটাতে জানতেন।
বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ রচনা সারদামঙ্গল ও সাধের আসন। এই দুই কাব্যে কোনও কাহিনি নেই, যুক্তির শৃঙ্গলা নেই, তত্ত্বপ্রচারের উদ্দেশ্যপ্রবণতাও নেই। কবি যেন অভিভূত অবস্থায় নিজের অন্তঃপ্রকৃতির কথা, নিজের ভালো লাগা-মন্দ লাগার কথা আবেগচঞ্চল অনর্থক প্রলাপের মতো উচ্চারণ করে গিয়েছেন। প্রেম ও সৌন্দর্য সম্পর্কে কবির মনে যে সহজ অনুভূতি, কাব্যের কাহিনি ও প্রকাশশিল্পকে অতিক্রম করে সেই অনুভূতি পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়ে যায়। এভাবেই বিহারীলালের কবিত্ব তাঁর কাব্য ও কাব্যশিল্পকে অতিক্রম করে গিয়েছে। তিনি যে পরিমাণে কবি, সেই পরিমাণে শিল্পী হলে তাঁর হাতেই বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ গীতিসাহিত্য রচিত হতে পারত।
শৈল্পিক ত্রুটি
[সম্পাদনা]বিহারীলালের কাব্যে কিছু শিল্পগত ত্রুটি ছিল। রোম্যান্টিকতার আতিশায্যে কবি যুক্তি ও বুদ্ধির সীমা অতিক্রম করে গিয়ে বক্তব্যকে সুসংহত করতে পারতেন না। ঝড়ের বর্ণনার মধ্যে ছেলের কথা, সমুদ্রের বর্ণনার মধ্যে দ্বীপের প্রসঙ্গে ইংল্যান্ড এবং সেই উপলক্ষ্যে ভারতের পরাধীনতার কথা, সারদার সন্ধান প্রসঙ্গে হিমালয়ের সুদীর্ঘ বর্ণনা—ভাবতন্ময়তার ফলে সৃষ্ট এই সব প্রসঙ্গান্তর তাঁর কাব্যের একটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি।
ছন্দ ব্যবহারে কবির একটি সহজাত দক্ষতার ছিল। কিন্তু সচেতন শিল্পী ছিলেন না বলেই বহু ছন্দগত ত্রুটি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কাব্যে। তিনি আবেগের বশে যা খুশি বলে যেতেন, রূপনির্মিতির প্রশ্নও জাগত না তাঁর মনে। তাই শব্দ ব্যবহারে অমার্জিত ও অবাঞ্ছিত প্রয়োগ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যগুরু সম্পর্কে বলেছেন, “বিহারীলালের ছন্দে মিলের এবং ভাষার দৈন্য নাই। কিন্তু ভাষা স্থানে স্থানে সাধুতা পরিত্যাগ করিয়া অকস্মাৎ অশিষ্ট ও কর্ণপীড়ক হইয়াছে, ছন্দ অকারণে আপন বাঁধ ভাঙ্গিয়া স্বেচ্ছাচারী হইয়া উঠিয়াছে।” এর একমাত্র কারণ এই যে, আত্মভোলা এই কবি মনের আনন্দের নিজেকে প্রকাশ করে গিয়েছেন, প্রকাশের শৈল্পিক সৌষ্ঠবের দিকে বিন্দুমাত্র নজর রাখেননি।
বিশুদ্ধ গীতিকবিতার জনক বিহারীলাল
[সম্পাদনা]বিহারীলালের কবিকৃতিকে সমালোচনার কষ্টিপাথরে যাচাই করলে হয়তো কাব্যরূপের খাঁটি সোনার পরিচয় পাওয়া যাবে না, তবু উনিশ শতকের বিশুদ্ধ গীতিকবিতার জনক রূপে তাঁর নাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্যের গম্ভীর কোলাহলে বিহারীলালের নিভৃত সংগীত হয়তো সেকালে অনেকেরই কর্ণগোচর হয়নি। কিন্তু আত্মনিমগ্ন কবির আনন্দবেদনার গান ক্রমে বাংলা সাহিত্যের আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল। কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার লিখেছেন, “তাঁর কাব্যের প্রধান লক্ষণ ভাব-বিভোরতা। তাঁহার কল্পনা অতিমাত্রায় subjective; তিনি যখন গান করেন, তখন সম্মুখে শ্রোতা আছে এমন কথাও ভাবেন না।”
বিহারীলাল আত্মনিষ্ঠ মন্ময় কবিতা রচনা করেই বাংলা কাব্যে নতুন গতিপথের সন্ধান দেন। অন্তর্মুখী কল্পনার নিগূঢ় ভাবাবেগ প্রকাশের প্রধান উপায় রূপে গীতিকবিতার ব্যবহারে সমসাময়িক কবিরা বিহারীলালের রচনা দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আত্মনিষ্ঠ স্বগতভাষণের যে স্বর্ণসূত্রের সন্ধান তিনি দিলেন তাতে ভাবের মালা গাঁথার উৎসাহে নবীন কবিরা উদ্যোগী হলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই শিষ্যসম্প্রদায়ের শিরোমণি। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের রচনা, বিশেষত বাল্মীকিপ্রতিভা স্পষ্টতই বিহারীলালের প্রভাবের ফল। উনিশ শতকের গীতিকাব্যের মধ্যে কবিদের আত্মানুভূতির প্রতিফলন দ্বারা যে উৎকৃষ্ট গীতিকবিতা রচনা সম্ভব, তা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বিহারীলালের কাছে বাংলা সাহিত্য চিরঋণী হয়ে থাকবে।