বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/বিশ শতকের বাংলা নাটক

উইকিবই থেকে

নাট্যকার হিসেবে গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪—১৯১২) উৎকৃষ্ট শ্রেণির প্রতিভার নিদর্শন রেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি প্রায় একশোটি নাটক লিখেছিলেন। সেগুলি কেবল বাংলা রঙ্গমঞ্চকেই বাঁচিয়ে রাখেনি, বরং বহু নাট্যকারকে নাটক রচনার প্রেরণাও জুগিয়েছিল। গিরিশচন্দ্রের এই গৌরব কোনওদিন ম্লান হওয়ার নয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩—১৯১৩) ও ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (১৮৬৩—১৯২৭) যে আন্তরিক প্রেরণা থেকে নাট্যরচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, তা নয়। রঙ্গমঞ্চে অভিনীত নাটকও তার উৎসমূলে কাজ করেছিল। এই তিন নাট্যকারের নাটক রঙ্গমঞ্চে যে আলোড়ন তুলেছিল, তারই প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়ে বহু পরবর্তীকালেও অব্যাহত থাকে। তাঁদের প্রভাবে বহু নাট্যকার নাটক রচনায় অগ্রসর হন। তাঁদের সংখ্যাও খুব কম নয়।

অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

[সম্পাদনা]

গিরিশচন্দ্রের শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (১৮৭৫—১৯৩৪)। ১৯০৪ সাল থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পেশাদারি রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। সুদামা (১৯২২), কর্ণার্জ্জুন (১৯২৩), শ্রীকৃষ্ণ (১৯২৬), চণ্ডীদাস (১৯২৬), শ্রীরামচন্দ্র (১৯২৭), ফুল্লরা (১৯২৮), শ্রীগৌরাঙ্গ (১৯৩১) প্রভৃতি তাঁর পৌরাণিক ও ভক্তিরসাত্মক নাটক; অযোধ্যার বেগম (১৯২১), মগের মুলুক (১৯২৭) প্রভৃতি তাঁর ঐতিহাসিক নাটক; আহুতি (১৯১৪), রাখীবন্ধন (১৯২০), ইরাণের রাণী (১৯২৪) প্রভৃতি তাঁর কাল্পনিক নাটক; শুভদৃষ্টি (১৯১৫), ছিন্নহার (১৯২০) প্রভৃতি তাঁর পারিবারিক নাটক। এছাড়া তিনি কয়েকটি গীতিমুখর নাটকও রচনা করেন। তাঁর মোট নাটকের সংখ্যা ঊনত্রিশ। সবগুলিই মঞ্চের প্রয়োজনে এবং তৎকালীন দর্শকের রুচির দিকে তাকিয়ে লেখা। এগুলির মধ্যে নাট্যরস বিশেষ কিছু নেই। কর্ণার্জ্জুন সেকালে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল মাত্র। অপরেশচন্দ্র নাটকের সংখ্যাই বাড়িয়েছিলেন, গুণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি কিছুই করতে পারেননি। তবে একটি বিষয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম বিদেশি নাটকের সার্থক বঙ্গীকরণ করেছিলেন। তাঁর রাখীবন্ধন ইবসেনের দ্য ওয়ারিয়র অফ হেলগেল্যান্ড এবং আহুতি উইলসন ব্যারেটের দ্য সাইন অফ দ্য ক্রস নাটকের বঙ্গীয় রূপ। এছাড়া তিনি মা, পোষ্যপুত্র প্রভৃতি কয়েকটি উপন্যাসেরও নাট্যরূপ দিয়েছিলেন।

গতানুগতিক ধারার নাট্যকারগণ

[সম্পাদনা]

অপরেশচন্দ্রের সমকালেই গতানুগতিক ধারায় আরও যে কয়েকজন নাট্যকার নাটক রচনা করেছিলেন, তাঁরা হলেন প্রমথনাথ রায়চৌধুরী (১৮৭২—১৯৪৯), ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৮—১৯৩৮), সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৮৯—১৯৬৭), নিশিকান্ত বসুরায় (১৮৮৪—১৯২৯) ও বরদাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত। নাট্যকার হিসেবে এঁরা কেউই কৃতিত্বের অধিকারী নন, মঞ্চসফল নাটকের রচয়িতা মাত্র। প্রমথনাথ রায়চৌধুরীর নাটকগুলির মধ্যে রাজা সীতারাম রায়ের কাহিনি অবলম্বনে রচিত ভাগ্যচক্র এবং হামিরের কাহিনি অবলম্বনে রচিত চিতোরোদ্ধার ঐতিহাসিক নাটক। তাঁর পারিবারিক নাটক জয়-পরাজয় যাত্রাশৈলীর কথাই মনে করিয়ে দেয়। ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারিবারিক নাটক বাঙালী এবং দেশাত্মবোধক নাটক প্যালারামের স্বদেশিকতা একদা জনপ্রিয় হয়েছিল। তিনি কেলোর কীর্তি, বেজায় রগড় প্রভৃতি কয়েকটি প্রহসনও রচনা করেছিলেন। ১৯২৯-৩০ সাল নাগাদ তিনি ইংরেজি দ্য বেলস নাটকের বঙ্গীকৃত রূপ শঙ্খধ্বনি নাটকটি রচনা করেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিন্দু-বীর, মোগল-পাঠান, আলেকজাণ্ডার প্রভৃতি ঐতিহাসিক নাটক এবং সরমা প্রভৃতি পৌরাণিক নাটকও একদা মঞ্চসফল হয়েছিল। কিন্তু এগুলির নাট্যগুণ কিছুই নেই। বরদাপ্রসন্ন দাশগুপ্তের মিসর-কুমারী নাটকটিও একদা প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এতে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে যে তীব্র কটাক্ষ আছে, ‘সাদা’-র শোষণে অত্যাচারিত ‘কালা’-র যে প্রতিবাদ আবন চরিত্রের সংলাপে ধ্বনিত হয়েছে, কৃষ্ণকায় ভারতীয়দের উপর শ্বেতকায় ইংরেজের শোষণের পটভূমিকায় তা সেই সময় একটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু মঞ্চসাফল্যের দিক থেকে নিশিকান্ত বসুরায়ই সম্ভবত এঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য। তাঁর বঙ্গে বর্গী, দেবলাদেবীললিতাদিত্য নামে তিনটি ঐতিহাসিক নাটক একদা রঙ্গমঞ্চে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। তাঁর পারিবারিক নাটক পথের শেষে (১৯২৯) পূর্বসূরিদের পারিবারিক নাটকের তুলনায় নিকৃষ্ট মানের হলেও পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন স্থানে অভিনীত হয়। নাট্যঘটনার সংস্থান ও সংলাপ রচনায় তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর রচনায় দ্বিজেন্দ্রলালের প্রভাব খুব বেশি। এমনকি দেবলাদেবী নাটকের মতিয়া চরিত্রটি সিংহল-বিজয় নাটকের লীলা চরিত্রের হুবহু অনুকরণ মনে হয়।

অনেক নাটক লিখলেই যে নাট্যকারের খ্যাতি অর্জন করা যায় না, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জলধর চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০—১৯৬৪), সুধীন্দ্রনাথ রাহা (১৮৯৬—১৯৮৬) ও মহেন্দ্র গুপ্ত (১৯১০—১৯৮৪)। একদা জলধর চট্টোপাধ্যায় নাটকের জগতে একচ্ছত্র আধিপত্য করে গিয়েছেন। রীতিমতো নাটক, পি. ডাবলিউ. ডি. , সত্যের সন্ধান, সিঁথির সিঁদুর, আঁধারে আলো, শক্তির মন্ত্র, ডাক্তার শুভংকর প্রভৃতি অনেক নাটক তিনি লিখেছেন। নাটকগুলি অবাস্তব; এগুলির কাহিনি অসংলগ্ন, চরিত্রচিত্রণেরও পারিপাট্য কিছু নেই। সুধীন্দ্রনাথ রাহা মোগল মসনদ, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি কয়েকটি গতানুগতিক নাটকের রচয়িতা। নাট্যকার হিসেবে মহেন্দ্র গুপ্ত ছিলেন গিরিশচন্দ্রের উত্তরসূরি। তিনি লিখেছেন প্রচুর, কিন্তু তাঁর কোনও নাটকই সাহিত্যগুণসম্পন্ন নয়। উত্তরা, গঙ্গাবতরণ, গয়াতীর্থ, শ্রীদুর্গা, অলকানন্দ, সারথি শ্রীকৃষ্ণ প্রভৃতি পৌরাণিক নাটকের ভাষা কিছুটা মার্জিত হলেও অলৌকিকতা ও অতিনাটকীয়তায় কণ্টকিত। মহারাজা নন্দকুমার, টিপু সুলতান, শত বর্ষ আগে, সোনার বাংলা, অভিযান, সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত, বিজয়নগর, হায়দার আলি, রায়গড় প্রভৃতি ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে তিনি কোনও রকমে গল্পটি বলেই দায় সেরেছেন। টিপু সুলতান, মহারাজা নন্দকুমার, শত বর্ষ আগে প্রভৃতি কয়েকটি নাটকে জাতীয়তাবাদের সোচ্চার ঘোষণা আছে বলে একদা এগুলি জনপ্রিয় হয়েছিল। কঙ্কাবতীর ঘাট, স্বর্গ হতে বড় প্রভৃতি পারিবারিক নাটকেও নাট্যরসবিরোধী বহু অবাস্তব বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে। কাহিনির মধ্যে বহু অসংলগ্নতা পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। নাট্যকারের জীবদ্দশাতেই তাঁর নাটকের কথা জনমানসে থেকে প্রায় মুছে গিয়েছিল।

যোগেশচন্দ্র চৌধুরী

[সম্পাদনা]

বিশ শতকের গোড়ার দিকে কয়েকজন নাট্যকার বাংলা নাটকে কিছু নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য যোগেশচন্দ্র চৌধুরী (১৮৮৬—১৯৪১)। মঞ্চের প্রয়োজনেই তিনি তাঁর প্রথম নাটক সীতা (১৯২৪) রচনা করেন। প্রায় এক-একটি দৃশ্যেই এক-একটি অঙ্ক শেষ করে নাটকের আঙ্গিকে নতুন ধারা সৃষ্টি করে নাট্যকাহিনিতে তিনি এক দৃঢ়তর সংহতি আনার চেষ্টা করেন। আবার নাদির শাহের কাহিনি অবলম্বনে রচিত ঐতিহাসিক নাটক দিগ্বিজয়ী (১৯২৮) ইবসেনীয় নাট্যশৈলীর প্রয়োগে রচিত। এটিই তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। নন্দরাণীর সংসার, পরিণীতা, মাকড়শার জাল প্রভৃতি তাঁর পারিবারিক নাটক। মহাশিলা, বাংলার মেয়ে, পতিব্রতা, পথের সাথী প্রভৃতি উপন্যাসের নাট্যরূপও তিনি দিয়েছিলেন। যোগেশচন্দ্রের নাটকগুলি, বিশেষত দিগ্বিজয়ী, কিছুটা সাহিত্যগুণান্বিতও বটে।

মন্মথ রায়

[সম্পাদনা]

মন্মথ রায়ের (১৮৯৯—১৯৮৮) প্রথম নাটক মুক্তির ডাক (১৯২৪) একটি একাঙ্কিকা। তাঁর দ্বিতীয় নাটক চাঁদ সদাগর (১৯২৭)। মধ্যযুগীয় মনসামঙ্গলের কাহিনি এটির উপজীব্য। দেবতার বিরুদ্ধে অপরাজেয় মানবাত্মার যে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ এই কাহিনির মধ্যে ফল্গুধারার মতো প্রবহমান ছিল, সেটিকেই মন্মথ রায় তাঁর নাটকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলা নাটকে কিছু নতুনত্ব আনলেন। তাঁর নাটকের কাব্যময় ভাষা দ্বিজেন্দ্রলালের ভাষার অনুসারী। তিনি তাঁর নাটকে অন্তর্দ্বন্দ্ব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। দেবাসুর (১৯২৮), কারাগার (১৯৩০) ও সাবিত্রী (১৯৩১) তাঁর পৌরাণিক নাটক। দেবাসুরকারাগার নাটক দুটিতে তিনি সমকালীন রাজনৈতিক পরিবেশকে পৌরাণিক পরিমণ্ডলের মধ্যে সুসমঞ্জস রূপে প্রবিষ্ট করিয়ে বাংলা পৌরাণিক নাটকের ধারাকে নতুন খাতে প্রবাহিত করেন। কারাগার তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। এই নাটকে পৌরাণিক ভক্তিবাদকে তিনি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছেন। পরিবর্তে সমকালীন স্বাধীনতা আন্দোলনের মর্মবস্তুকে তার মধ্যে করেছেন সঞ্চারিত। অসহযোগ আন্দোলনে হাজারে হাজারে দেশবাসী কারাবরণ করে মুক্তিকে ত্বরান্বিত করছিলেন। তারপরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় এই নাটকের একটি গানে: “হত্যায় আসে হত্যা-নাশন, শৃঙ্খলে তার মুক্তি-ভাষণ, তমোময় কারা করি বিদারণ জাগিছে জ্যোতির্ময়।” অথচ পুরাণ-বিরোধী ভাব কোথাও নাট্যরসকে ক্ষুণ্ণ করেনি। অধিকন্তু কংসের অন্তর্দ্বন্দ্ব চিত্রণে তিনি চমৎকার দক্ষতার দেখিয়েছেন। পুরাণের মধ্যে এই আধুনিকতার সঞ্চারই মন্মথ রায়ের কৃতিত্ব। অশোক (১৯৩৪), মীরকাশিম (১৯৩৮), জীবনটাই নাটক (১৯৫৩), অমৃত অতীত (১৯৬০) প্রভৃতি অন্যান্য নাটকে লেখক এইরকম কৃতিত্বের কোনও সাক্ষর রাখতে পারেননি। মৈমনসিংহ গীতিকার অন্তর্গত মহুয়ার পালা অবলম্বনে তাঁর লেখা মহুয়া (১৯২৯) নাটকটি বিশেষভাবে মঞ্চসফল হয়েছিল।

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

[সম্পাদনা]

শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৯২—১৯৬১) নাট্যকার হিসেবে প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন শিবাজীর কাহিনি অবলম্বনে গৈরিক পতাকা (১৯৩০) রচনা করে। নাটকটির মধ্যে স্বাদেশিকতার একটা চড়া সুর ছিল, কিন্তু গতানুগতিক ঐতিহাসিক নাটকের অনুবর্তন ছাড়া এর মধ্যে অন্য কোনও নাট্যগুণ ছিল না। তাঁর সিরাজদ্দৌলা (১৯৩৮), রাষ্ট্র-বিপ্লব (১৯৪৪), ধাত্রীপান্না (১৯৪৮) ইত্যাদি ঐতিহাসিক নাটকও নিষ্প্রাণ। এগুলির মধ্যে সিরাজদ্দৌলা নাটকটি তৎকালীন হিন্দু-মুসলমান মিলনের আবেগপূর্ণ আন্দোলনের দিনে আশ্চর্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। গ্রামে গ্রামান্তরে এটি অভিনীত হয়েছে; এমনকি যাত্রার দলেও এর প্রচুর অভিনয় হয়েছে। অবশ্য নাটকটি যাত্রাশৈলীরই অন্তর্গত। এটিকে যাত্রার নাটক বললেও অত্যুক্তি হয় না। এতে উচ্ছ্বাস আছে প্রচুর, কিন্তু সংঘাত বা অন্তর্দ্বন্দ্ব কিছু নেই। আলেয়া এই নাটকের একটি প্রধান চরিত্র। কিন্তু চরিত্রটি সম্পূর্ণ অসম্বন্ধ, তার ক্রিয়াকলাপের মধ্যে কোনও অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাঙালি দর্শকের রসপিপাসা যে সেকালেও যাত্রার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি, সিরাজদ্দৌলা তার জীবন্ত প্রমাণ। ধাত্রীপান্না নাটকে কোনও রকমে শুধু গল্পটিই বলা হয়েছে। একমাত্র ভাষা ছাড়া রাজকৃষ্ণ রায়ের বনবীর নাটকের ঊর্ধ্বে তা উঠতে পারেনি। রাষ্ট্র-বিপ্লব নাটকেও রাষ্ট্রবিপ্লবের গতিপ্রকৃতি কিছু বর্ণিত হয়নি, শুধু শাহজাহানের পুত্র দারার জীবনীটুকু মাত্র বলা হয়েছে। ঝড়ের রাতে, রক্তকমল, তটিনীর বিচার, স্বামী-স্ত্রী, সংগ্রাম ও শাস্তি, নার্সিং হোম, কাঁটা ও কমল (ম্যাকবেথ অবলম্বনে) প্রভৃতি তাঁর পারিবারিক নাটক। ভাবের দিক থেকে এগুলিকে আধুনিক করে তোলার যে প্রয়াস আছে, তা অবাস্তব ক্রিয়ার অতিচারে পর্যাবসিত হয়েছে। এগুলিতে যে সমাজের ছবি দেখা যায়, তার অস্তিত্ব এদেশে বিরল, তা একান্তই লেখকের কল্পনাপ্রসূত। অধিকন্তু নাটকগুলির নায়ক চরিত্র কোনও না কোনও বিশিষ্ট অভিনেতার মুখ চেয়ে অঙ্কিত; অতএব চরিত্রচিত্রণে কেবল সেই অভিনেতাদের আঙ্গিক অভিব্যক্তি ভিন্ন আর কিছুই দেখা যায় না। এক কথায় বলতে গেলে, নাটকগুলি সম্পূর্ণ রূপে কৃত্রিম এবং মানবজীবনের বিকৃত মুখভঙ্গি মাত্র। নাটকগুলি মঞ্চসফল হয়েছিল বলেই শচীন্দ্রনাথ নাট্যকার রূপে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাংলা নাট্যসাহিত্যে উন্নততর কিছুই তিনি দান করতে পারেননি। তাই অল্পকালের মধ্যেই তাঁর নাটক বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

বিধায়ক ভট্টাচার্য

[সম্পাদনা]

জনরুচির কাছে আত্মসমর্পণের অপর দৃষ্টান্ত বিধায়ক ভট্টাচার্য (১৯০৭—১৯৮৬)। মেঘমুক্তি (১৯৩৮), মাটির ঘর (১৯৩৯), বিশ বছর আগে (১৯৪০), রক্তের ডাক (১৯৪১), খবর বলছি (১৯৫০), ক্ষুধা (১৯৫৬) প্রভৃতি তাঁর পারিবারিক নাটক। একমাত্র মধুর সংলাপ ছাড়া তাঁর নাটকে আকর্ষণীয় আর কিছুই নেই। প্রধানত রোম্যান্সের আতিশায্যই তাঁর নাটকের নাট্যরস ক্ষুণ্ণ করেছে। কাহিনির পরিধিও সংকীর্ণ। বিবাহিতা নায়িকার পূর্বপ্রণয়ী, প্রায় নপুংসক নায়ক, মদ, রিভলভার, খুন—বহু নাটকের কাহিনিই প্রায় এরই মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। সম্ভবত মাটির ঘর তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক। এটিতে গিরিশচন্দ্রের বলিদান নাটকের প্রভাব অতিমাত্রায় লক্ষিত হয়। করুণাময় এখানে সত্যপ্রসন্নে রূপান্তরিত, তাঁর তিন কন্যা তন্দ্রা, নন্দা ও ছন্দায় পরিণত, করুণাময়ের কন্যাদের করুণ পরিণতির মতো এই নাটকেও কেউ বিষ খেয়েছে, কেউ পাগল হয়ে গিয়েছে। বলিদান যেমন নিকৃষ্ট মেলোড্রামা, মাটির ঘর-ও তাই; অথচ এটি এক সময়ের জনপ্রিয় নাটক। বরং বিধায়কের সেই তিমিরে, তাই তো প্রভৃতি প্রহসন হিসেবে প্রশংসনীয়। তাঁর মধুর সংলাপ প্রহসন শ্রেণির নাটকের পক্ষে বিশেষ উপযোগী হয়েছে।

প্রমথনাথ বিশী

[সম্পাদনা]

প্রহসন-জাতীয় বিদ্রূপাত্মক নাট্যরচনায় প্রমথনাথ বিশী (১৯০১—১৯৮৫) সত্যই কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন। তাঁর ঋণং কৃত্বা (১৯৩৫), মৌচাকে ঢিল (১৯৩৮), ঘৃতং পিবেৎ (১৯৩৯), পারমিট প্রভৃতি উৎকৃষ্ট ব্যঙ্গাত্মক প্রহসন।

জীবনী নাটক

[সম্পাদনা]

বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৯—১৯৭৯; ছদ্মনাম বনফুল) বাংলা নাটকে জীবনী নাটকের ধারাটির পথিকৃৎ। তাঁর শ্রীমধুসূদন (১৯৩৯) ও বিদ্যাসাগর (১৯৪১) নাটক দুটির বহু ক্ষেত্রেই চমৎকার নাট্যরসের সমাবেশ ঘটেছে। এই প্রসঙ্গে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৯১৮—১৯৭০) রামমোহন এবং বিধায়ক ভট্টাচার্যের এন্টনি কবিয়াল (১৯৬৭) নাটক দুটির নামও উল্লেখযোগ্য।

নবনাট্য আন্দোলন

[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালের বহু ঘটনা বাঙালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এক গুরুতর পরিবর্তন এনেছিল। এই ইতিহাস ভাঙনের ইতিহাস, দ্বিধা ও সংশয়ের ইতিহাস, বহু সৎ মূল্যবোধ অস্বীকারের ইতিহাস। কিন্তু এরই সঙ্গে দেখা দিয়েছিল প্রবল সমাজ সচেতনতা। যা হয়ে উঠেছিল তৎকালীন নাটকেরও মুখ্য বৈশিষ্ট্য। এরই প্রথম প্রকাশ বিজন ভট্টাচার্যের (১৯০৬—১৯৭৮) নবান্ন (১৯৪৪) নাটকটি। পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিকায় রচিত এই নাটকটি কিন্তু নাটক না হয়ে হয়েছে নাট্যচিত্র মাত্র। মরা চাঁদ (১৯৪৬), গোত্রান্তর (১৯৬১) প্রভৃতি তাঁর পরবর্তী রচনাগুলি বরং অনেক বেশি নাট্যগুণসম্পন্ন। এই শ্রেণির অপর নাট্যকার তুলসী লাহিড়ী (১৮৯৭—১৯৫৯)। তাঁর দুঃখীর ইমান (১৯৪৭), ছেঁড়া তার (১৯৫০), পথিক (১৯৫১), উলুখাগড়া প্রভৃতি নাটকের বলিষ্ঠ সমাজ সচেতনতাই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নানা সমস্যার বাস্তব রূপ এই সব নাটকে আশ্চর্য কুশলতার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। ছেঁড়া তার একটি উৎকৃষ্ট সামাজিক নাটক। সামাজিক শোষণ ও নির্যাতনের পটভূমিকায় এই নাটকে এক কৃষক দম্পতির জীবনকে যে গভীর দ্বন্দ্বময় রূপ দেওয়া হয়েছে, তাতে এটি বাংলা নাট্যসাহিত্যে একটি উৎকৃষ্ট ট্র্যাজেডির হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে জিতেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরিচয় (১৯৪৯) ও প্রশ্ন নাটক দুটির নামও উল্লেখ করা যায়। সামান্য ত্রুটি সত্ত্বেও পরিচয় একটি উৎকৃষ্ট ট্র্যাজেডি। সলিল সেন অবশ্য নতুন ইহুদী নাটকে যে সম্ভাবনা নিয়ে দেখা দিয়েছিলেন, মৌ-চোর, ডাউন ট্রেন প্রভৃতি তাঁর পরবর্তী নাটকে তার বিশেষ চিহ্ন দেখা যায় না। পরবর্তীকালে উৎপল দত্তের (১৯২৯—১৯৯৩) কয়েকটি নাটক বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ছায়ানট (১৯৫৮), অঙ্গার (১৯৫৯), ফেরারী ফৌজ (১৯৬১), কল্লোল (১৯৬৫) প্রভৃতি নাটক আধুনিক বাংলা নাটকের প্রতিনিধিস্থানীয়।

বিদেশি নাটকের বঙ্গীকরণ

[সম্পাদনা]

বিশ শতকে উৎকৃষ্ট বিদেশি নাটকের বঙ্গীকরণের প্রবণতাও দেখা যায়। ইবসেনের অনুসরণে পুতুল খেলা (দ্য ডল’স হাউস), প্রেত (ঘোস্টস), দশচক্র (অ্যান এনিমি অফ দ্য পিপল), বনহংসী (দ্য ওয়াইল্ড ডাক); চেকভের অনুসরণে আমের মঞ্জরী (দ্য চেরি অচার), শঙ্খচিল (দ্য সিগাল); গোর্কির অনুসরণে নীচের মহল (দ্য লোয়ার ডেপথস; পিরানাদেল্লোর অনুসরণে নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র (সিক্স ক্যারেকটারস ইন সার্চ অফ অ্যান অথর) প্রভৃতি নাটক বিদগ্ধজনের প্রশংসা অর্জন করেছে।