আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/বাংলা গদ্যে চলিত রীতির বিবর্তন
বাংলা সাহিত্যে গদ্যভাষা প্রবর্তন আধুনিক যুগের ঘটনা। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে গদ্যরচনার সামান্য কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। বৈষ্ণব সহজিয়াদের রচনা, কয়েকটি চিঠিপত্র, খ্রিস্টান মিশনারিদের কিছু অনুবাদকর্ম ও প্রচারপত্রে কোনও সুস্পষ্ট গদ্যরীতি গড়ে ওঠেনি। ধর্মান্তরিত বাঙালি দোম আন্তোনিও ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ লিখেছিলেন; যেটি প্রশ্নোত্তরমূলক রচনা। মানোএল দ্য আস্মুম্পসাঁউ রচনা করেন কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ। এটিতেও বাংলা গদ্যরীতি সুনির্দিষ্ট রূপ লাভ করেনি। শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের ধর্মপ্রচারকেরা এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকবৃন্দ বাংলা গদ্যচর্চায় মনোযোগী হলে উনিশ শতকের গোড়াতেই প্রথম বাংলা গদ্যরীতির একটি ধারা গড়ে ওঠে। বাংলা গদ্যের প্রথম প্রচেষ্টায় সাধুভাষার ছাঁদটিই অভিব্যক্ত হয়।
বাংলা গদ্য চলিত রীতির সুস্পষ্ট সূচনা দেখা যায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ উইলিয়াম কেরির কথোপকথন (১৮০১) বইটিতে। এটি কেরি লিখেছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিলিয়ানদের বাংলা শিক্ষার জন্য। কলেজের অন্যতম অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার বইটি লিখতে তাঁকে বিশেষ সাহায্য করেছিলেন বলে মনে করা হয়। বইটিতে বাঙালির দৈনন্দিন জীবন, স্ত্রীলোকের আচার, বহু গ্রাম্য প্রসঙ্গ নাটকীয় ভঙ্গিতে কথোপকথনের ভাষায় বলা হয়েছে। বইটির ইংরেজি আখ্যাপত্র ছিল “Dialogues intended to facilitate the acquiring of the Bengalee Language.” এটি চলিত গদ্যরীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। মুখের ভাষাকে অনুকরণ করতে গিয়ে লেখক শ্লীলতা ও গ্রাম্যতার সীমাও লঙ্ঘন করেছেন। ‘মাইয়া কোন্দল’, ‘স্ত্রীলোকে ২ কথাবার্তা’ প্রভৃতি অংশ এই দৃষ্টান্ত স্বরূপ। নকশা-জাতীয় বিদ্রূপাত্মক রচনার মাধ্যমেই চলিত রীতির ব্যবহার বেশি হয়েছিল। মহৎ ভাবের প্রকাশক গুরুগম্ভীর রচনায় এর স্থান ছিল না। কেরির সমসাময়িক মৃত্যুঞ্জয় ঠিক চলিত ভাষা লেখেননি। তবু তাঁর প্রবোধচন্দ্রিকা গ্রন্থে বিশ্ববঞ্চকের কাহিনিতে চলিত ভাষার আমেজ আছে: “ইহা শুনিয়া বিশ্ববঞ্চক কহিল—তবে কি আজি খাওয়া হবে না, ক্ষুধায় মরিব? তৎপত্নী কহিল—মরুক ম্যানে, আজি কি পিঠা না খাইলেই নয়? দেখি দেখি হাঁড়িখুঁড়ি, খুদকুঁড়া যদি কিছু থাকে।” এই ভাষায় চলিত রীতির তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা দেখা যায়।
চলিত রীতির বিবর্তনের ইতিহাসে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদানও উল্লেখযোগ্য। তিনি স্বনামে ও প্রমথ শর্মা ছদ্মনামে রচনা করেন কলিকাতা কমলালয়, নববাবুবিলাস ও নববিবিবিলাস। এগুলির ছাঁদ সাধুভাষার হলেও চলিত ভঙ্গিটিই বেশ ফুটে উঠেছে। এই জাতীয় ব্যঙ্গাত্মক নকশা অবলম্বনেই প্যারীচাঁদ মিত্র আলালের ঘরের দুলাল এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোম প্যাঁচার নক্সা লেখেন। টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে প্যারীচাঁদ প্রকাশ করেছিলেন তাঁর বইটি। “ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত বাদ দিলে এটিই বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস। বইটিতে চলিত রীতির সুন্দর নিদর্শন আছে। প্যারীচাঁদের রচনার স্বাভাবিক রীতি ছিল সাধুভাষার ছাঁদে। কিন্তু এই উপন্যাসে তিনি পাত্রপাত্রীর কথোপকথনে চলিত ভঙ্গি অনুসরণ করেন: “বাবুরাম বাবু চাকরকে বলিলেন—ওরে হরে, শীঘ্র বালী যাইতে হইবে, দুচার পয়সায় একখানা চল্তি পান্সী ভাড়া কর্ তো। বড় মানুষের খানসামারা মধ্যে মধ্যে বেয়াদফ হয়। হরে বলিল—মোশায়ের যেমন কাণ্ড, ভাত খেতে বস্তেছিনু, ডাকাডাকাতি ভাত ফেলে রেখে এস্তেছি। চল্তি পান্সী ভাড়া করা আমার কর্ম নয়, এ কি থুৎকুড়ি দিয়ে ছাতু গোলা?” উদ্ধৃতির ভাষায় বিশুদ্ধ চলিত রীতি নেই; কিন্তু চলিত ভঙ্গির স্বাচ্ছন্দ্য সহজেই অনুভব করা যায়।
কালীপ্রসন্নও ছদ্মনামে হুতোম প্যাঁচার নক্সা প্রকাশ করেন। খাঁটি কলকাতার কথ্যভাষায় তিনি সমকাল ও হঠাৎ বড়োলোকেদের ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন। এই বই প্রকাশের পূর্বেও কলকাতার হাটহদ্দ ও বাবুদের দুগ্গোচ্ছব নামে দুটি বেনামি বই প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকের ধারণা এ-দুটিও কালীপ্রসন্নেরই রচনা। হুতোম প্যাঁচার নক্সা রুচিবান লোকের প্রশংসা পায়নি। বঙ্কিমচন্দ্র বইটির প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। কলকাতার সমাজের কদর্যতার একটি নগ্ন চিত্র এই বইতে পাওয়া যায়। তবে বিষয়বস্তু যাই হোক, চলিত গদ্যের উৎকৃষ্ট সাহিত্যিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বইটির ভাষাভঙ্গি প্রশংসনীয়: “অমাবস্যার রাত্তির—অন্ধকার ঘুরঘুট্টি—গুরুগুরু করে মেঘ ডাকছে—থেকে থেকে বিদ্যুৎ তড়পাচ্ছে, গাছের পাতাটি নড়চে না, মাটি থেকে যেন আগুনের তাপ বেরুচ্চে। পথিকেরা একএকবার আকাশ পানে চাচ্ছেন, আর হনহন করে চলেছেন, কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ কচ্চে, দোকানীরা ঝাঁপতাড়া বন্ধ করে ঘরে যাবার উজ্জুগ কচ্চে, গুড়ুম করে নটার তোপ পড়ে গ্যালো।” একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, চলিত রীতির সাহিত্যিক জৌলুস এই ভাষায় আছে।
কেরির চলিত ভাষা কথোপকথনের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত। সেকালের নাটকের সংলাপেও চলিত ভাষার ব্যবহার যথেষ্ট দেখা যায়। প্যারীচাঁদ ও ভবানীচরণের রচনায় কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুখের ভাষায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সমালোচনা ও বর্ণনাত্মক বিষয়ে চলিত রীতির ব্যবহার একমাত্র কালীপ্রসন্নই সাহসের সঙ্গে করেছিলেন। তিনি সাধুরীতি রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তবু হুতোম প্যাঁচার নক্সা-য় মুখের ভাষাকে উচ্চারণানুগ বানানে চিত্ররূপ রচনার উপযোগী করে উপস্থাপিত করেন তিনি। এইভাবেই ব্যাকরণের পরোয়া না করে, বর্ণবিন্যাসের প্রচলিত রীতি অগ্রাহ্য করে, লোকনিন্দার সম্ভাবনা ভুলে চলিত ভাষায় উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনার পথের সন্ধান দিয়ে যান তিনি। এই ভাষায় পরিণামে বীরবলী রীতিতে বিবর্তিত হয়ে সাহিত্যিক ভাষার ক্ষেত্রে যুগান্তর এনেছিল।
উনিশ শতকেই নাটক ও ব্যঙ্গাত্মক নকশা-জাতীয় রচনায় চলিত রীতিকে অবলম্বন করা হয়; কিন্তু চিন্তামূলক গুরুগম্ভীর রচনায় চলিত রীতির উপযোগিতা নিয়ে লেখকদের মধ্যে সংশয় থেকেই যায়। বীরবল ছদ্মনামে প্রমথ চৌধুরী সবুজ পত্র নামক পত্রিকার মাধ্যমে চলিত ভাষাকে সর্বপ্রথম সব রকম ভাবপ্রকাশ ও তত্ত্বালোচনার উপযোগী করে তোলেন। চলিত রীতিতে বক্তব্য বিষয় লঘু হয়ে যায়, এই বিশ্বাসের বশে প্রমথ চৌধুরীর বিরুদ্ধ সমালোচনাও হয়। ললিত বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, ধর্মতত্ত্ব, দর্শনশাস্ত্র ও সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে চলিত ভাষার প্রয়োগ বিষয়বস্তুর উপযোগী কীভাবে হতে পারে। কিন্তু বীরবল প্রমাণ করলেন যে, চিন্তামূলক প্রবন্ধ ও অনুভূতিমূলক রসসাহিত্য দুইই চলিত রীতিতে সম্ভব। তবে বীরবলী রীতি আলালী বা হুতোমী রীতির তুলনায় অনেক মার্জিত ও অনুশীলিত। তিনি লোকের মুখের কথ্য উচ্চারণকে গ্রহণ করেননি বা উচ্চারণানুগ বানান প্রয়োগেরও চেষ্টা করেননি। তিনি নীললোহিতের গল্পে এবং বীরবলের হালখাতা-য় সাধু গদ্যরীতির কাঠামোর মধ্যে প্রচুর তৎসম শব্দের সমাবেশ ঘটিয়েছেন এবং ক্রিয়াপদে ও সর্বনামে উচ্চারণভিত্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। ফলে তাঁর ভাষা কিছুটা কৃত্রিম ও গুরুভার হয়ে পড়েছে।
বীরবলী রীতি বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। তবে বীরবল ভাষার বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ফলে পরবর্তী বাংলা রচনায় চলিত রীতির স্বচ্ছন্দ সাবলীল ব্যবহার প্রবর্তিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ জীবনের সব রচনায় চলিত ভাষা ব্যবহার করেছেন। চলিত ভাষা হয়ে উঠেছে সব রকম ভাব প্রকাশের শক্তিশালী বাহন। বর্তমান যুগে তাই শুধু ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটক বা ভ্রমণসাহিত্যই নয়, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তত্ত্বের আলোচনা, সংবাদ পরিবেশন, সমীক্ষা, সাহিত্য সমালোচনা সর্বত্রই চলিত ভাষার অবাধ ব্যবহার সম্ভব হয়েছে।