বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/বাংলা গদ্যে আলালী ও বিদ্যাসাগরী রীতির বিবর্তন

বাংলা গদ্যসাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রায় উৎপত্তিকাল থেকেই বাংলা গদ্যভাষায় দুটি ভাষারীতির বিকাশ ঘটেছিল। ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে কোচবিহারের রাজা নরেন্দ্রনারায়ণের চিঠিতে বা বৈষ্ণব সহজিয়াদের কড়চা গ্রন্থে অথবা অষ্টাদশ শতকে খ্রিস্টান মিশনারিদের গদ্যরচনায় বাংলা গদ্যের সাধুরীতির একটি ছাঁদ গড়ে ওঠে। ১৭৭৮ সালে ন্যাথানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেড যে ব্যাকরণ লিখেছিলেন তাও ছিল সাধুরীতির ব্যাকরণ। কিন্তু প্রথম যুগের গদ্যগ্রন্থগুলি প্রশ্নোত্তরের আকারে লেখা বলে ভাষার মধ্যে কথ্যরীতির ইঙ্গিতটিও খুব সহজেই ধরা পড়েছিল। যেমন দোম আন্তোনিও ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ গ্রন্থে লিখেছেন, “বলি বড়ো ধর্মিষ্ঠ ছিলো, যে যাহারে চাহিত তাহারে তাহা দিতো এ কারণে পরমেশর ব্রামণ রূপে হইয়া বলিরাজারে ছলিলেন।” অথবা মানোএল দ্য আস্‌সুম্পসাঁও কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ গ্রন্থে লিখেছেন, “সেভিল্যা শুহরে এক গৃহস্থ আছিল, তাহার নাম সিরিলো, সেই সিরিলো কেবল এক পুত্রো জর্মাইল তাহারে এতো দয়া করিলো যে কোনো দিন তাহারে শিক্ষাও না দিলো এবং শাস্তিও না দিলো; সে যাহা করিতে চাহিতো তাহা করিতো।” ভাষার এই প্রকার গঠন সাধুরীতিসম্মত হলেও চলিত ভাষার ভঙ্গিটিই সহজেই লক্ষণীয়।

উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সেখানকার লেখকবৃন্দের প্রচেষ্টায় বাংলা গদ্যে একটি সুস্পষ্ট রীতি গড়ে ওঠে। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়, চণ্ডীচরণ মুন্সী প্রমুখ সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতেরা তৎসম-শব্দবহুল জটিল বাক্যের পরিপূর্ণ সাধুরীতি ব্যবহার করতেন। তাঁদের এই গদ্যরীতি ‘পণ্ডিতী বাংলা’ নামে অভিহিত হয়েছিল। কিন্তু এই সময়েই উইলিয়াম কেরি তাঁর কথোপকথন (১৮০১) গ্রন্থে কথ্যভাষা ব্যবহার করেন: “ওলো তোর ভাতার কারে কেমন ভালবাসে তাহা বল শুনি। আহা, তাহার কথা কহ কেন? এখন আর আমাদের কি আদর আছে?” মৃত্যুঞ্জয় তাঁর প্রবোধচন্দ্রিকা গ্রন্থেও চলিত ভাষা প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এইরকম গদ্যরীতির মধ্যে লঘু রচনাভঙ্গি এবং বিদেশি শব্দের আধিক্য থাকায় এর নাম হয় ‘খ্রীষ্টানী বাংলা’। বিশিষ্ট লেখকেরা সাধুরীতিরই অনুশীলন করতেন। কিন্তু কোনও কোনও রচনায় চলিত রীতির ভঙ্গিটি ফুটে উঠত। যেমন, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের ভাষারীতি বিশুদ্ধ সাধু হলেও তাঁর নকশা-জাতীয় গ্রন্থগুলিতে চলিত রীতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

চলিত রীতির ধারাটি প্রথমাবস্থায় চিন্তামূলক প্রবন্ধসাহিত্যে ব্যবহৃত হয়নি। বিদ্রূপাত্মক নকশা-জাতীয় রচনা এবং নাটকে স্ত্রীলোক ও নিম্নবর্গীয় চরিত্রের সংলাপেই চলিত ভাষা প্রযুক্ত হত। ভবানীচরণের পথ ধরে প্যারীচাঁদ মিত্র আলালের ঘরের দুলাল লিখে কথাসাহিত্যে চলিত ভাষার প্রয়োগসিদ্ধি দেখালেন। এদিকে কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোম প্যাঁচার নক্সা লিখে দেখালেন বর্ণনাত্মক রচনায় চলিত রীতির সুষ্ঠু প্রয়োগ। প্রথম যুগে এই রীতিটিই অবশ্য মর্যাদাসম্পন্ন ছিল না। প্যারীচাঁদ ও কালীপ্রসন্ন উভয়েই তাঁদের অন্যান্য রচনায় ‘পণ্ডিতী বাংলা’ রীতিটিই অনুসরণ করতেন। তবু মোটামুটি বলা যায় যে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে গদ্যরচনার যে দুটি রীতি উদ্ভুত হয়েছিল, তার একটিকে ধরে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায় প্রমুখ গদ্যশিল্পীরা অগ্রসর হয়েছিলেন; আর-একটিকে ধরে প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখেরা ভাষারীতির পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন। এই দুই রীতি যথাক্রমে ‘বিদ্যাসাগরী রীতি’ ও ‘আলালী রীতি’ নামে অভিহিত হয়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত বাংলা ভাষায় সাধুরীতির সার্থক প্রতিষ্ঠাতা। তাঁরা গদ্যরীতিকে ঋজু, সংহত ও যুক্তিনিষ্ঠ করে তত্ত্বের বাহন করে তোলেন। বিদ্যাসাগরের রচনায় প্রাঞ্জলতা, শ্রুতিমাধুর্য ও প্রসাদগুণের সমাবেশ ঘটেছিল। উপযুক্ত ছেদচিহ্ন ব্যবহার করে তিনি গদ্যকে করে তোলেন ছন্দময়। তাঁর রচনায় লালিত্য ও গাম্ভীর্যের সমন্বয় ঘটেছিল। শকুন্তলা, সীতার বনবাস, বেতাল পঞ্চবিংশতি প্রভৃতি গ্রন্থে তিনি ভাষার আশ্চর্য নমনীয়তা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর গদ্যরীতিই পরবর্তীকালে প্রাবন্ধিকদের আদর্শ রীতি হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিদ্যাসাগরী রীতি অবলম্বন করেই বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পীর গৌরব লাভ করেছিলেন।

সাধুরীতির চরম উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শন প্রকাশ করে তিনি গদ্যরীতির একটি সার্থক রূপ প্রকাশ করলেন। বিদ্যাসাগর উপযুক্ত ভাষা রচনার ক্ষেত্রে প্রস্তুত করেই দিয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র সেই ভাষায় ধ্বনিমাধুর্য সঞ্চার করে ভাষার গৌরব আরও বৃদ্ধি করলেন। উপন্যাস, প্রবন্ধ, সমালোচনা ও রম্যরচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তুললেন। প্রকাশের সারল্যকেই তিনি ভাষার শ্রেষ্ঠ গুণ মনে করতেন। দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতি উপন্যাসের ভাষাভঙ্গি খুবই উন্নত স্তরের। গদ্যভাষাকে কাব্যসৌন্দর্যে মণ্ডিত করার অসাধারণ দক্ষতায় বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর বিবিধ প্রবন্ধ, লোকরহস্য, কমলাকান্তের দপ্তর প্রভৃতি রচনার ভাষায় হৃদয়ধর্ম ও মননশীলতা উভয় বৃত্তিকেই উজ্জ্বল করে তুলেছে। তিনি আলালী ও বিদ্যাসাগরী রীতির একটি সুসমঞ্জস সমন্বয় সাধন করেছিলেন। এইজন্য তাঁকে “শবপোড়া, মরাদাহ” বলে ব্যঙ্গও করা হয়েছিল। কিন্তু রামমোহন থেকে আরম্ভ করে বিদ্যাসাগরী, আলালী, হুতোমী প্রভৃতি পর্যায়ে গদ্যরীতির যে স্বাভাবিক বিচিত্রমুখী বিকাশ, বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে সেই ঐতিহ্যেরই পূর্ণ রূপ প্রকাশিত হয়েছে। বস্তুত বিদ্যাসাগরী ও আলালী রীতির সমন্বয়ের মাধ্যমেই বাংলা গদ্যের এক সর্বব্যাপী পরিণত রূপ গড়ে ওঠে। সেটিই ক্রমশ বিবর্তিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে সাধু ও চলিত রীতির সর্বতোমুখী সমন্বয়ী রূপ ধারণ করে। ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে সাহিত্যিক উৎকর্ষে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার মূলে বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সমন্বয় সাধনা তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।