আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/বঙ্কিম-সমকালীন ঔপন্যাসিক গোষ্ঠী
বাংলা উপন্যাসের প্রথম যথার্থ শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সমকালে এবং অব্যবহিত পরবর্তী যুগে তাঁরই পন্থা অনুসরণ করে অথবা স্বতন্ত্র পথে একদল প্রতিভাবান লেখক বাংলা উপন্যাসের সমৃদ্ধিসাধন করেছিলেন।
রমেশচন্দ্র দত্ত
[সম্পাদনা]ঔপন্যাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৮—১৯০৯) বঙ্কিমচন্দ্রের ন্যায় সমুচ্চ কল্পনাশক্তির অধিকারী না হলেও ঐতিহাসিক ও গার্হস্থ্য উপন্যাস রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা ছটি উপন্যাসের মধ্যে প্রথম দুটি রোম্যান্সধর্মী। বঙ্গবিজেতা (১৮৭৪) উপন্যাসে তিনি টোডরমল্লের সমকালীন বাংলার ইতিহাসের প্রেক্ষিতে ইন্দ্রনাথ ও বিমলার রোম্যান্টিক প্রেমকাহিনির বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস বা কল্পনা কোনওটাই এখানে সার্থক হয়নি। তাঁর মাধবীকঙ্কণ (১৮৭৭) উপন্যাসটিতে ইতিহাস নিছকই পটভূমি। শাহজাহানের অন্তিমকালে পুত্রদের কলহের রাজনৈতিক পটভূমির মধ্যে একটি রোম্যান্টিক প্রেমের গল্প গ্রথিত হয়েছে। টেনিসনের Enoch Arden আখ্যানকাব্যের অনুকরণে রমেশচন্দ্র প্রেম সমস্যায় নরেন্দ্র, হেমলতা ও শ্রীশের জীবনের শোকাবহ পরিণাম বিবৃত করেছেন। বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে তাঁর মহারাষ্ট্র জীবন-প্রভাত (১৮৭৮) ও রাজপুত জীবন-সন্ধ্যা (১৮৮৯) উল্লেখযোগ্য। প্রথমটিতে বর্ণিত হয়েছে শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা জাতির উত্থানের কাহিনি এবং দ্বিতীয়টির উপজীব্য রাজপুত জাতির পতনের বিবরণ। স্বদেশপ্রেমের প্রেরণাতে তিনি উপন্যাস দুটিতে জাতির নিগূঢ় জীবনসত্যকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। ইতিহাসকে জীবনানুভূতিতে জীবন্ত করে তুলে তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয়ও দিয়েছেন। বিধবাবিবাহ ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে ভিত্তি করে রমেশচন্দ্র সংসারে (১৮৮৬) ও সমাজে (১৮৯৪) নামে দুটি সামাজিক উপন্যাস রচনা করেন। খুব শিল্পসম্মত রচনা না হলেও বিধবাবিবাহ ও অসবর্ণ বিবাহের সমর্থন করে তিনি সাহসী প্রগতিশীল মনোভাবের পরিচয় দেন এই দুই উপন্যাসে। তাছাড়া বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনের প্রতিরূপ রচনায় তিনি বাস্তবিকতার পরিচয় দিয়ে যুগের নিরিখে প্রশংসার দাবি রেখেছেন।
সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
[সম্পাদনা]বঙ্কিমচন্দ্রের অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৪—১৮৮৯) উপন্যাস রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত পালামৌ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন যে, সঞ্জীবচন্দ্রের প্রতিভায় গৃহিণীপনার অভাব। এই মন্তব্য তাঁর উপন্যাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাঁর মাধবীলতা (১৮৮৫) উপন্যাসে কাহিনির বন্ধন শিথিল এবং রূপকথার রহস্যে ঘেরা। এই উপন্যাসের কাহিনির পরবর্তী ঘটনা কণ্ঠমালা (১৮৭৭) উপন্যাসে বর্ণিত এবং শৈল চরিত্রে আতিশায্য ও অবাস্তবতার বড়ো বাড়াবাড়ি দেখা যায়। রামেশ্বরের অদৃষ্ট (১৮৭৭) উপন্যাসে গল্প-কৌতূহল চমৎকার; কিন্তু ঘটনার বিন্যাস ও চরিত্রের সংহতি রচনায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দেননি। সঞ্জীবচন্দ্রের ঐতিহাসিক উপন্যাস জাল প্রতাপচাঁদ (১৮৮৩) বর্ধমান রাজবাড়ির ঘটনা অবলম্বনে রচিত চমৎকার কাহিনি। ইতিহাস-নিষ্ঠায় ও কাহিনি-গ্রন্থনের কৌশলে তিনি দক্ষতা দেখিয়েছেন এতে।
তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়
[সম্পাদনা]বঙ্কিমযুগে গার্হস্থ্য উপন্যাস রচনায় বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৪৩—১৮৯১)। পেশায় চিকিৎসক এবং সাহিত্যক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাবমুক্ত এই সাহিত্যিক বাংলা গ্রাম্যজীবন, যৌথ-পরিবারে ভ্রাতৃবিরোধ অবলম্বনে বাস্তবধর্মী উপন্যাস রচনায় প্রবৃত্ত হন। স্বর্ণলতা (১৮৭৪) তাঁর প্রথম ও সর্বপ্রধান কীর্তি। রোম্যান্সের পথ পরিহার করে বাঙালির প্রকৃত সংসারচিত্র যথাযথভাবে প্রকাশ করে তিনি প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। স্বর্ণলতা-র নাট্যরূপ সরলা-র অভিনয়ও বিশেষ জনপ্রিয় হয়। একটি একান্নবর্তী পরিবারে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শশিভূষণ উপার্জনকারী এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিধুভূষণ গানবাজনা নিয়ে ব্যস্ত। বড়ো বউয়ের নিষ্ঠুরতায় সংসারটি ছারখার হয়ে গেল। এই করুণ কাহিনিই উপন্যাসের বিষয়। প্রসঙ্গক্রমে নীলকমল চরিত্রের সাহায্যে সমাজের ও ব্যক্তিমানুষের নিপুণ আলেখ্য রচনা করা হয়েছে এই উপন্যাসে। তবু মনে হয় যে, তারকনাথের মধ্যে বস্তুভেদী শিল্প-প্রতিভা ছিল না, বাচ্যান্তরের অভিব্যঞ্জনা দিতে তিনি ব্যর্থ। তিনি ফোটোগ্রাফারের মতো জীবনের অসংসক্ত ছবি ধরেছেন, জীবন দর্শন করেননি বা করাননি। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসগুলিতে বিষয়বৈচিত্র্য ও জীবনদর্শনের বিশিষ্টতার অভাবে তা কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। ললিত ও সৌদামিনী (১৮৮২), হরিষে বিষাদ (১৮৮৭), তিনটি গল্প (১৮৮৯), বিধিলিপি (১৮৯১), অদৃষ্ট (১৮৯২) প্রভৃতি তাঁর অন্যান্য উপন্যাস। কিন্তু স্বর্ণলতা-র খ্যাতি তাঁর অন্যান্য রচনাগুলিকে একেবারেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
প্রতাপচন্দ্র ঘোষ
[সম্পাদনা]বঙ্কিমচন্দ্র-প্রবর্তিত ধারাকে অনুসরণ না করে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেন প্রতাপচন্দ্র ঘোষ (১৮৩৯—১৯২০)। তাঁর বঙ্গাধিপ-পরাজয় (প্রথম খণ্ড ১৮৬৯, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৮৪) উপন্যাসের বিষয়বস্তু যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্যের মুঘল-বিরোধিতা ও পরাজয়ের কাহিনি। তিনি বর্ণনায় ইতিহাসের আনুগত্য রক্ষা করতে গিয়ে ঘটনাগত ঐক্য ও চরিত্রগত সংগতি রক্ষা করতে পারেননি। সমগ্র রচনাটিও নীরস বিবৃতিতে পরিণত হয়েছে। তিনি ইতিহাসে পণ্ডিত ছিলেন; কিন্তু তাঁর মানসিকতায় শিল্পগুণের অভাব ছিল।
স্বর্ণকুমারী দেবী
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫—১৯৩২) উপন্যাস রচনায় বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। সাহিত্যের প্রায় সকল বিভাগেই তিনি সাবলীল সৌন্দর্যের পরিচয় দিয়েছেন। ঐতিহাসিক রোম্যান্স ও সামাজিক উপন্যাস রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। পৃথ্বীরাজ ও সংযুক্তার কাহিনি অবলম্বনে লিখিত দীপনির্বাণ (১৮৭৬) উপন্যাসটিতে তিনি কল্পনাশক্তি ও স্বদেশপ্রেমের সুন্দর পরিচয় দিয়েছেন। মিবার রাজ (১৮৭৭), বিদ্রোহ (১৮৯০), ফুলের মালা (১৮৯৪) প্রভৃতি তাঁর ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাস। গার্হস্থ্য জীবন অবলম্বনে লেখা তাঁর উপন্যাসগুলিও কম আকর্ষণীয় হয়নি। উগ্র প্রগতিবাদ নারীসমাজে প্রবেশ করলে দাম্পত্যজীবনের শান্তি ও শৃঙ্খলা কীভাবে বিপর্যস্ত হয় তা দেখিয়েছেন স্নেহলতা (১৮৯২-৯৩) উপন্যাসে। ছিন্ন মুকুল (১৮৭৯), মালতী (১৮৮১) প্রভৃতি উপন্যাসে রোম্যান্সরসের প্রাধান্য থাকলেও সমসাময়িক সমাজজীবনের জীবন্ত চিত্র এতে প্রতিবিম্বিত। উনিশ শতকের শেষভাগে তাঁর মতো বিদূষী নারী-সাহিত্যিক বাংলায় আর জন্মগ্রহণ করেননি।
বঙ্কিমযুগের অন্যান্য ঔপন্যাসিক
[সম্পাদনা]বঙ্কিমযুগের অন্যান্য ঔপন্যাসিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দামোদর মুখোপাধ্যায় (১৮৫৩—১৯০৭), ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৪৯—১৯১১), যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু (১৮৫৪—১৯০৫), ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭—১৯১৯), শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৮—১৯১৯), শ্রীশচন্দ্র মজুমদার (১৮৬০—১৯০৮) প্রমুখ। বঙ্কিমচন্দ্রের আত্মীয় দামোদর মুখোপাধ্যায় বঙ্কিমচন্দ্রের পরিত্যক্তা লেখনী ধারণ করে বাহাদুরি প্রদর্শনের জন্য দুর্গেশনন্দিনী-র পরিশিষ্ট নবাবনন্দিনী এবং কপালকুণ্ডলা-র পরিশিষ্ট মৃন্ময়ী রচনা করেন। ডিটেকটিভ কৌতূহলের গল্প লিখতে ভালোবাসতেন তিনি। বিমলা, মা ও মেয়ে, দুই ভগিনী, জয়চাঁদের চিঠি, কর্মক্ষেত্র, সোনার ফসল, যোগেশ্বরী, অন্নপূর্ণা, সপত্নী, নবীনা প্রভৃতি অনেকগুলি গল্প তিনি রচনা করেন। স্যার ওয়াল্টার স্কটের ব্রাইড অফ ল্যামার মুর উপন্যাস অবলম্বনে কমলকুমারী এবং উইকলি কলিসের ওম্যান ইন হোয়াইট অবলম্বনে শুক্লবসনা সুন্দরী নামে উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। কিন্তু সাহিত্যে তাঁর কীর্তি স্থায়ী হয়নি। ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস লেখায় হাত দেন। তাঁরা সমাজ সংস্কারের প্রেরণায় হিন্দুধর্মের পক্ষে এবং ব্রাহ্মধর্ম ও খ্রিস্টানদের অনুকরণের বিরোধিতায় আক্রমণাত্মক গল্প রচনা করতেন। ইন্দ্রনাথের কল্পতরু এবং যোগেন্দ্রচন্দ্রের মডেল ভগিনী, চিনিবাস চরিতামৃত, কালাচাঁদ, শ্রীশ্রীরাজলক্ষ্মী প্রভৃতি উপন্যাস সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কঙ্কাবতী, ডমরু-চরিত, ফোক্লা দিগম্বর প্রভৃতি গ্রন্থে নির্মল কৌতুকরস সৃষ্টি করে গল্প রচনায় কৃতিত্ব দেখান। পারিবারিক জীবনের বহু সমস্যা অবলম্বনে আদর্শবাদী উপন্যাস রচনা করেন শিবনাথ শাস্ত্রী। তাঁর মেজবৌ, যুগান্তর ও নয়নতারা উল্লেখযোগ্য রচনা। শ্রীশচন্দ্র মজুমদার শক্তিকানন, ফুলজানি, কৃতজ্ঞতা প্রভৃতি উপন্যাসে বাংলার গ্রামজীবনের ছবি চমৎকার ফুটিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ফুলজানি উপন্যাসের বিশেষ প্রশংসা করেন।