আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রবন্ধসাহিত্য
পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলা ভাষায় প্রবন্ধসাহিত্যের উদ্ভব। জ্ঞানবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তা ও বিতর্কমূলক গদ্যরচনাই প্রবন্ধ। ইংরেজি Essay সাহিত্যের সাদৃশ্যে বাংলায় গদ্যনিবন্ধের সূচনা। ফরাসি দার্শনিক মিশেল দে মঁতেঁই ষোড়শ শতকের শেষভাগে Essais নামে কিছু গদ্য রচনা করেন। ইংরেজ গদ্যলেখকেরা সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় বিষয়নিষ্ঠ রচনার মধ্যে ব্যক্তিগত রুচির সঞ্চার ঘটিয়ে এক বিশেষ শ্রেণির গদ্যরচনায় প্রবৃত্ত হন। এর ফলে প্রবন্ধসাহিত্য নিছক তথ্যসমষ্টি না হয়ে উন্নীত হয় মননশীল সাহিত্যের পর্যায়ে। উনিশ শতকের ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি লেখকেরা জোসেফ অ্যাডিসন, রিচার্ড স্টিল, উইলিয়াম হ্যাজলিট, চার্লস ল্যাম্ব, ফ্রান্সিস বেকন প্রমুখ গদ্যশিল্পীদের অনুসরণে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন প্রবন্ধসম্পদে। এই প্রবন্ধ-রচয়িতাদের শিরোমণি ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধসাহিত্যে বৈচিত্র্য
[সম্পাদনা]বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু পরিমাণগত ও গুণগত উৎকর্ষের বিচারে তাঁর প্রবন্ধসাহিত্যও কম উল্লেখযোগ্য নয়। প্রবন্ধ রচনায় মনীষার সর্বশ্রেষ্ঠ বিকাশ প্রদর্শিত করে তিনি নবজাগ্রত বাঙালি জাতিকে সচেতন করেছিলেন, উদ্বুদ্ধ করেছিলেন জাতীয় ভাবে এবং প্রতিষ্ঠার পথে দিয়েছিলেন প্রথম দীক্ষা। জাতির ইতিহাসে প্রাবন্ধিক বঙ্কিমচন্দ্র তাই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলার ইতিহাস, ধর্ম, সমাজব্যবস্থা, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা সাহিত্যের নবতর আদর্শ স্থাপন করে তিনি জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন। বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রবর্তন করে একদল প্রতিভাবান লেখককে তিনি আকৃষ্ট করেন এবং বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের উন্নতির পথ সুগম করে দেন।
বঙ্কিমচন্দ্র নানা বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন এবং বিষয়ভেদে তাঁর প্রবন্ধ রচনার ভঙ্গিও ছিল স্বতন্ত্র। বাংলা গদ্যভাষার অন্তর্নিহিত শক্তিকে আবিষ্কার করে তিনি জ্ঞানচর্চামূলক, বিচারমূলক ও রসব্যঞ্জনামূলক প্রবন্ধ রচনা করেন। জ্ঞানচর্চামূলক প্রবন্ধগুলিতে তথ্য ও তত্ত্বের প্রাধান্য গম্ভীর নিরাসক্ত ভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে। বিচারমূলক প্রবন্ধগুলিতে সাহিত্য সমালোচনা, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তুলনা, প্রচলিত মতবাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার এবং বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদের সমীক্ষা করা হয়েছে। এই-জাতীয় প্রবন্ধের ভাষায় প্রাঞ্জলতার সঙ্গে তীক্ষ্ণতা ও ব্যক্তিত্বের ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। অন্যদিকে আবার রসব্যঞ্জনামূলক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লঘু ভঙ্গিতে কৌতুক ও ব্যঙ্গের নিপূণ প্রয়োগের মাধ্যমে গুরুতর বিষয়গুলিকে আকর্ষণীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছেন। প্রবন্ধ রচনায় তিনি ছিলেন সব্যসাচী। তথ্য-পরিবেশনের সঙ্গে শিল্পরসের মাধুর্যের মিশ্রণে তিনি এমন এক উন্নত রচনাপ্রণালী উদ্ভাবন করেছিলেন, যার নিদর্শন একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ঔপনিবেশিক যুগে অন্য কোনও প্রাবন্ধিকের রচনায় দেখা যায়নি।
জ্ঞানচর্চামূলক প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধসাহিত্যে জ্ঞানচর্চামূলক রচনার সংখ্যাই বেশি। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় প্রবন্ধ রচনার মাধ্যমে তাঁর হাতেখড়ি। বঙ্গদর্শন প্রবর্তনের আগে ইংরেজি ভাষায় স্বনামে ও ছদ্মনামে কয়েকটি প্রবন্ধও লিখেছিলেন। আবার বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হওয়ার পরেও নবজীবন, প্রচার, সাধারণী প্রভৃতি পত্রিকায় ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্য-বিষয়ক অনেক প্রবন্ধ রচনা করেন তিনি। এগুলি পরে বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলিত হয়। বিজ্ঞান রহস্য (১৮৭৫), প্রবন্ধ পুস্তক (১৮৭৯), বিবিধ প্রবন্ধ (প্রথম ভাগ ১৮৮৭, দ্বিতীয় ভাগ ১৮৯২), ধর্মতত্ত্ব (১৮৮৮) প্রভৃতি গ্রন্থের অধিকাংশ প্রবন্ধই জ্ঞানচর্চামূলক। সাম্য প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালে। যে যুগে পাশ্চাত্য সমাজেও সাম্যবাদ ভীতিপ্রদ ছিল, সেই যুগে বঙ্কিমচন্দ্র মানবসভ্যতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করে শ্রেণিবিদ্বেষ-জর্জরিত সমাজের আমূল সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছেন এই গ্রন্থে। অবহেলিত কৃষকদের প্রতি সমবেদনা এই গ্রন্থেই প্রথম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারিত হয়। ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য দর্শনের ভিত্তিতে ভারতীয় ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বঙ্কিমচন্দ্রের বিচিত্র প্রতিভার পরিচায়ক। জ্ঞানচর্চামূলক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের যুক্তিনিষ্ঠা, তথ্যপ্রিয়তা, বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি ও মননের গভীরতা বিস্ময়ের উদ্রেক করে।
বিচারমূলক প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]বঙ্কিমচন্দ্রের বিচারমূলক প্রবন্ধগুলির অধিকাংশই বিবিধ প্রবন্ধ নামক গ্রন্থের দুই ভাগে প্রকাশিত। এছাড়া বিবিধ সমালোচনা (১৮৭৬) ও কৃষ্ণচরিত্র (১৮৮৬) গ্রন্থ দুটিও বঙ্কিম-মনীষার বিস্ময়কর সাক্ষর। বিবিধ সমালোচনা-য় তিনি পাশ্চাত্য দার্শনিক মতগুলির বিশ্লেষণ ও বিচার করেছেন এবং কোঁৎ, মিল, বেন্থাম প্রমুখ বস্তুবাদী দার্শনিকদের যুক্তি খণ্ডন করে দর্শনতত্ত্বের নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন। দ্বিতীয় গ্রন্থে কৃষ্ণের চরিত্র-চিত্রণে তিনি বিচারমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করে কৃষ্ণকে পূর্ণ মনুষ্যত্বের প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। অন্ধবিশ্বাসের স্থলে প্রামাণ্য যুক্তির প্রতিষ্ঠা বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ধর্মতত্ত্ব গ্রন্থে গুরুশিষ্যের সংলাপের মাধ্যমে মানবধর্মই যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং মানবিক বৃত্তিগুলির সম্যক অনুশীলনই যে শ্রেষ্ঠ সাধনা তা প্রতিপাদন করেছেন। ধর্ম ও দর্শন ছাড়া সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধ রচনাতেও বঙ্কিমচন্দ্র অসাধারণ রসবুদ্ধি ও বিশ্লেষণশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। বঙ্গদর্শন-এ একটি সমালোচনা বিভাগ ছিল। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, দীনবন্ধু মিত্র, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখ সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের যথাযথা বিচার করেছেন। এছাড়া "জয়দেব", "বিদ্যাপতি", "উত্তররামচরিত", "শকুন্তলা-মিরান্দা-দেসদিমনা" প্রভৃতি নামে উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ রচনা করে সমালোচনা সাহিত্যের দিকনির্দেশ করে দিয়েছেন।
রসব্যঞ্জনামূলক প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধসাহিত্যে অপর এক শ্রেণির রচনা ছিল, যা তথ্যমূলক নীরস গদ্যপ্রবন্ধ নয়, বরং রসব্যঞ্জনামূলক ও হাস্যরসাত্মক। বঙ্কিম-প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ বিকাশ এই-জাতীয় রচনাগুলির মধ্যেই ঘটে। এগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কমলাকান্তের দপ্তর। কমলাকান্ত চক্রবর্তীর ছদ্মপরিচয়ে লেখক নিজের জীবনের চরম অভিজ্ঞতাকে অনন্যসাধারণ শৈল্পিক সুষমায় প্রকাশ করেছেন। টমাস ডি কুইন্সির আত্মজীবনীমূলক রচনা কনফেসনস অফ অ্যান ইংলিশ ওপিয়াম ইটার-এর অনুসরণে ১৮৭৫ সালে এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আফিং-খোর কমলাকান্তের জবানিতে বঙ্কিমচন্দ্র ব্যঙ্গকৌতুকের সহায়তায় আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। এই বইতে বঙ্কিমচন্দ্রের স্বদেশপ্রীতি, অধঃপাতিত বাঙালির প্রতি দরদ এবং সামাজিক দুর্গতির প্রতিকারের সদিচ্ছা ব্যক্ত হয়েছে। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর এই রচনাটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করতেন। এই বইটিরও আগে ১৮৭৪ সালে ব্যঙ্গরচনা লোকরহস্য প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গ্রন্থে ব্যাঘ্রাচার্য-বৃহল্লাঙ্গুল", "বাবু", "গর্দভ", "হনুমদ্বাবু সংবাদ" প্রভৃতি বিদ্রূপাত্মক রচনায় বঙ্কিমচন্দ্রে উন্নত স্তরের হাস্যরসের কশাঘাতে আঘাত করেছেন আদর্শভ্রষ্ট বাঙালি জাতিকে। মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত (১৮৮৪) নামে বইটিতেও ব্যঙ্গচ্ছলে বঙ্কিম বাঙালি জীবনের নানা অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের স্বদেশপ্রেম, ঐতিহ্যপ্রীতি, নীতিবোধ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলি পরিহাসপ্রিয়তা ও সূক্ষ্ম রসবোধের সঙ্গে মিশে এই-জাতীয় রচনাগুলিকে অপূর্ব রসপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রবন্ধসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান
[সম্পাদনা]প্রবন্ধসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান প্রকৃতই বিস্ময় ও শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। সরকারী চাকরিতে নিযুক্ত এক ব্যক্তি হয়েও তিনি নিজ প্রতিভার জোরে উপন্যাস সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের দিকনির্দেশনা করে দিয়েছিলেন। যুক্তিবাদ, নির্ভুল তথ্যের ব্যবহার, সুগভীর তত্ত্বের আলোচনা, সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি প্রভৃতি মস্তিষ্কপ্রসূত বিষয়গুলিকে হৃদয়রসে জারিত করে গদ্যপ্রবন্ধের মধ্যে তিনি শুধু শিল্পসুষমাই আনলেন না, বরং জ্ঞানচর্চার যথাযথ পথটিও দর্শিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে ব্যঙ্গকৌতুকের কশাঘাতে বাঙালিকে জর্জরিত করে দেখিয়ে দিলেন জাতীয় অবক্ষয়ের প্রকৃত কারণটিও। এই কারণেই ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের পাশাপাশি প্রাবন্ধিক বঙ্কিমচন্দ্রও বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন।