বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস

কথাসাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩—১৯৩২) সুখপাঠ্য সহজবোধ্য উপন্যাসের রচয়িতা হিসেবেই বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথের মতো বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না বটে, কিন্তু নিজের পরিতৃপ্ত মনের আনন্দ কাহিনির মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে পাঠককে তৃপ্ত করার কৌশলটি জানতেন। প্রভাতকুমার চোদ্দোটি উপন্যাস ও শতাধিক ছোটোগল্প রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে পুষ্ট করেছিলেন। ১৯০৮ থেকে ১৮৩৩ সালের মধ্যে তিনি রচনা করেন রমা সুন্দরী, নবীন সন্ন্যাসী, রত্নদীপ, জীবনের মূল্য, সিন্দূর কৌটা, মনের মানুষ, আরতি, সত্যবালা, সুখের মিলন, সতীর পতি, প্রতিমা, গরীব স্বামী, নবদুর্গা ও বিদায় বাণী—এই চোদ্দটি উপন্যাস।

প্রভাতকুমারের উপন্যাসে ঘটনার জটিলতা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত কম। রূপকথার রহস্যে ঘেরা রোম্যান্টিক প্রেমের গল্প অথবা লঘু তরল ভাবকল্পনায় পারিবারিক জীবনের স্নিগ্ধ শান্ত রূপ ফুটিয়ে তোলাই ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তাঁর উপন্যাসে বিশুদ্ধ আনন্দের নিস্তরঙ্গ প্রবাহ ছাড়া বেশি কিছু নেই। কোনও জটিল পরিস্থিতি বা গভীরতর জীবনজিজ্ঞাসা দিয়ে তিনি পাঠকের মনে কোনও আলোড়ন সৃষ্টি করেননি। রমা সুন্দরী উপন্যাসের নায়িকা এক দুঃসাহসিকা তরুণী। এক ধনী যুবক তাকে দেখে মুগ্ধ হল। তারপর পারিবারিক সামান্য প্রতিকূলতাকে প্রতিহত করে মিলন ঘটল দুজনের। নবীন সন্ন্যাসী উপন্যাসে এক উচ্চশিক্ষিত তত্ত্বজ্ঞানী যুবক সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন। তারপর হঠাৎ এক নারীর প্রেম তাঁর সন্ন্যাসব্রত ভঙ্গ করল এবং তিনি পরিণত হলেন আদর্শ গৃহীতে। সিন্দূর কোটা উপন্যাসের আইনজ্ঞ লেখক আইনের মারপ্যাঁচে জটিল কাহিনির গ্রন্থি মোচন করেছেন। এক বিবাহিত হিন্দু যুবক এক স্বামী-পরিত্যক্ষা খ্রিস্টান যুবতীর প্রেমে পড়ল। আইন অনুসারে যুবতীর প্রথম বিবাহ যখন অসিদ্ধ ঘোষিত হল তখন সেই যুবকের প্রথমা পত্নী সিঁদুরকৌটো নিয়ে সানন্দে বরণ করল তার সপত্নীকে। প্রভাতকুমারের অধিকাংশ কাহিনিতেই এমন সহজ সমাধান ও সুখাবহ পরিণাম দেখা যায়। তিনি মহত্ত্ব ও আদর্শবাদের উচ্চ শিখরে ওঠেননি, আবার নীচতা ও ভয়ংকরের গহ্বরেও নেমে যাননি। নিতান্ত ঘরোয়া স্বাভাবিক পরিবেশে বাস্তব ঘটনার মধ্যেই কল্পনার মনোরম ইন্দ্রজাল বিস্তার করে পাঠকের হৃদয়ে তৃপ্তি এনেছেন, বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারে আঘাত হানেননি।