আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/নবীনচন্দ্র সেন
বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে মহাকাব্য-রচয়িতা রূপে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নবীনচন্দ্র সেনের নামও একদা একযোগে উচ্চারিত হত। ১৮৪৮ সালে চট্টগ্রামের নবীনচন্দ্রের জন্ম। তাঁর পিতা সেখানে বিখ্যাত উকিল ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই নবীনচন্দ্র উচ্ছ্বাসপ্রবণ ও কাব্যপ্রিয় ছিলেন। কলকাতায় এফ.এ. পড়ার সময় থেকে তিনি গীতিকবিতা রচনা করতে থাকেন। এরপর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মধ্যে দেশপ্রেমের আবেগ লক্ষ্য করে ইংরেজ সরকার তাঁকে পুরী, রাজগির প্রভৃতি নানা জায়গায় বদলির চাকরিতে নিযুক্ত করে। সেই সব স্থানের প্রাচীন স্মৃতি কল্পনাপ্রবণ কবির মনে এক বিশেষ ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলে। তিনি গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে মহাভারত, ভাগবত ইত্যাদি প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থাদি পাঠ করেন। সেই জ্ঞান ও প্রেরণার ফলে তিনি কয়েকটি আখ্যানকাব্য, জীবনীকাব্য এবং তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী মহাকাব্য রচনা করেন। ১৯০৯ সালে নবীনচন্দ্র প্রয়াত হন। মহাকবির সম্মান তিনি জীবদ্দশাতেই পেয়েছিলেন। তাঁর কবিপ্রতিভায় বায়রনের উচ্ছ্বাস, কীটসের সৌন্দর্যপ্রিয়তা এবং শেলির অতীন্দ্রিয়-বিশ্বাসবোধ সঞ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু মিলটন ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো সংযম-শাসন ও ক্লাসিক-সংহতি তাঁর কাব্যে বা ব্যক্তিচরিত্রে না থাকায় পরবর্তীকালে তিনি সার্থক মহাকবি রূপে গৃহীত হননি।
নবীনচন্দ্র তাঁর জীবনের উপলব্ধি, জ্ঞান ও মনীষার পরিচয় তাঁর রচনার মধ্যে রেখেছেন। তিনি গীতিকবিতা, আখ্যানকাব্য ও মহাকাব্য রচনা করেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গদ্যরচনা প্রবাসের পত্র ও আমার জীবন (পাঁচ খণ্ডে) এবং উপন্যাস ভানুমতী বিশেষ আলোচিত হয় না। কবি হিসেবেই তাঁর সমধিক পরিচিতি। রোম্যান্টিক গীতিকবিতার মাধ্যমেই তাঁর কাব্যরচনার সূত্রপাত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অবকাশরঞ্জিনী (প্রথম খণ্ড১৮৭১, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৭৮)। পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫), ক্লিওপেট্রা (১৮৭৭) ও রঙ্গমতী (১৮৮০) নামে তিনটি আখ্যানকাব্য এবং খৃষ্ট (১৮৯১), অমিতাভ (১৮৯৫) ও অমৃতাভ (১৯০৯) নামে তিনটি জীবনীকাব্য তাঁর রচনা। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিকৃতি, চোদ্দ বছরের নিরলস সাধনার ফল তিনটি মহাকাব্য: রৈবতক (১৮৮৭), কুরুক্ষেত্র (১৮৯৩) ও প্রভাস (১৮৯৬)। কাব্য তিনটি পরস্পর সম্পৃক্ত, একই নায়ক এবং একই কাহিনির বিস্তার। তাই এগুলিকে ত্রয়ী কাব্য বলা হয় এবং এগুলির কাব্যবিচারও একই সঙ্গে করা হয়। এছাড়া তিনি ভগবদ্গীতা ও মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর পদ্যানুবাদও করেছিলেন।
নবীনচন্দ্রের কবিপ্রতিভায় গীতিকবির আবেগ, রোম্যান্টিক কল্পনার অতিচার ও ভাববিহ্বলতার প্রাধান্য দেখা যায়। অবকাশরঞ্জিনী উৎকৃষ্ট গীতিকবিতার সংকলন। কবিতাগুলিতে তাঁর ব্যক্তি-আত্মার চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছে। প্রথম খণ্ডে বাইশটি কবিতা সংকলিত হয়েছিল। ‘বিধবাকামিনী’ কবিতায় কবির সহানুভূতির স্পর্শে বিধবার করুণ মূর্তি বেশ জীবন্ত হয়ে উঠেছে:
এখনও দেখি যেন নয়নের কাছে,
দীনভাবে, ম্লানমুখে, বসিয়া দুঃখিনী,
ভাবিতেছে এ সংসারে কার ভাবে বাঁচে,
নীরবে বিরলে বসি, কাঁদে অনাথিনী।
‘পিতৃহীন যুবক’, ‘পতিপ্রেমে দুঃখিনী কামিনী’, ‘হৃদয়-উচ্ছ্বাস’, ‘বিষণ্ণ কমল’ প্রভৃতি কবিতায় কবির ব্যক্তিমনের রোম্যান্টিক রস স্বতঃস্ফূর্ত সাবলীলতায় প্রকাশিত। দ্বিতীয় খণ্ডে তেতাল্লিশটি কবিতা ছিল। যুবরাজ এডওয়ার্ডের ভারত-ভ্রমণ উপলক্ষ্যে লেখা ‘ভারত-উচ্ছ্বাস’ কবিতাটির জন্য কবি ইংল্যান্ড থেকে পঞ্চাশ গিনি পুরস্কার পান। দ্বিতীয় খণ্ডে সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে লেখা এই জাতীয় কিছু কবিতা থাকলেও কবির প্রধান সুর ছিল রোম্যান্টিক ব্যাকুলতা। ‘কেন দেখিলাম’, ‘কি করি’, ‘উত্তর’ প্রভৃতি কবিতায় কবির প্রণয়ানুভূতি, বাসনার আবেগ, সৌন্দর্যের আকর্ষণ, প্রেমের স্বপ্ন ললিত-মধুর ছন্দে প্রকাশ পেয়েছে। এই জাতীয় গীতিকবিতায় নবীনচন্দ্র ছিলেন বিহারীলাল-রবীন্দ্রনাথ গোষ্ঠীর সমগোত্রীয়।
নবীনচন্দ্রের রোম্যান্টিক মনের আখ্যানপ্রিয়তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর আখ্যানকাব্যগুলিতে। এগুলির মধ্যে জাতীয় ভাবের অনুপ্রেরণায় লেখা পলাশীর যুদ্ধ কাব্যটিই প্রধান। মতিলাল ঘোষের উৎসাহে তিনি বাঙালির স্বাধীনতা হারানোর কাহিনি রচনা করেন। ক্লাইভের অপকৌশল, জগৎশেঠ ও মিরজাফরের ষড়যন্ত্রের সিরাজদ্দৌলার পতনের কাহিনি এই কাব্যের বিষয়। মোহনলালের স্বগতোক্তির মধ্যে কবিমনের পরাধীনতার বেদনাবোধ পরিস্ফুট। এই ঐতিহাসিক আখ্যানকাব্যটি পাঁচ সর্গে বিভক্ত। চরিত্রগুলি খুব সুস্পষ্ট হয়নি। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে কবি কাহিনির বন্ধন শিথিল করেছেন এবং পরিমিতিবোধ রক্ষা করতে পারেননি। তাঁর দ্বিতীয় আখ্যানকাব্য ক্লিওপেট্রা। মিশরের দুশ্চরিত্রা রূপসী রানি অনেক রাষ্ট্রনায়কের সর্বনাশ করেছিলেন। নবীনচন্দ্র ইতিহাস-খ্যাত এই নারীকে এই ক্ষুদ্র কাব্যে সহানুভূতির সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। কাব্যটি খুব একটা আলোচিত না হলেও, এটির রোম্যান্টিক সৌন্দর্য উপেক্ষণীয় নয়। নবীনচন্দ্রের অপর আখ্যানকাব্য রঙ্গমতী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি অঞ্চলের কাহিনি। কাব্যের নায়ক বীরেন্দ্র, নায়িকা কুসুমিকা। কাব্যটির পরিণাম বড়োই করুণ। কবির ভাষায়, “এক বৃন্তে ফুটেছিল দুটি ফুল সংসার-কাননে; একসঙ্গে দুটি ফুল পড়িল ঝরিয়া।” ছয় সর্গে কবি এক অদ্ভুত রোম্যান্টিক কাহিনি রচনা করেছেন ইতিহাসের পটভূমিতে, কিন্তু সে ইতিহাস আগাগোড়াই কল্পনা দিয়ে গড়া। স্কটের লেডি অফ দ্য লেক কাব্যের প্রভাব এতে আছে, সম্ভবত অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীর উদাসিনী কাব্যের রোম্যান্টিক প্রেমকাহিনি নবীনচন্দ্রের কল্পনাকে উজ্জীবিত করেছিল। কিন্তু নবীনচন্দ্রের কবিস্বপ্ন, হিন্দু-জাতিত্ববোধের অনুভূতি-তীক্ষ্ণতা এবং রোম্যান্টিক প্রেমের ব্যাকুলতা এই কাব্যের বয়নশিল্পে কবির নিজস্ব সাক্ষর মুদ্রিত করে দিয়েছে।
ধর্মসাহিত্য চর্চার ফলে নবীনচন্দ্রের মনে মহাপুরুষদের জীবনকাহিনি সম্পর্কে কৌতূহল জেগেছিল। তার ফলে তাঁদের জীবনকথাকে কাব্যকথায় রূপান্তরিত করেছিলেন তিনি। অবতারতত্ত্ব সম্পর্কে কবির মনের এক বিশেষ অনুভূতি এই কাব্যগুলিতে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যথা এগুলির বিশেষ কোনও কাব্যগুণ নেই। খৃষ্ট কাব্যে বাইবেলের কাহিনির অনুসরণ এবং মানবপ্রেমিক যিশুর মূর্তি অঙ্কনের চেষ্টা করা হয়েছে। বুদ্ধদেবের জীবনকথা অমৃতাভ কাব্যে বর্ণিত হয়েছে। সিদ্ধার্থে জীবে প্রেম ও ত্যাগের মাহাত্ম্যকে কবি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবন অবলম্বনে অমৃতাভ তাঁর শেষ জীবনের রচনা ও মৃত্যুর পরে প্রকাশিত। ভক্তিভাবের উচ্ছ্বাস এই কাব্যের বিশেষত্ব। এই জাতীয় কাব্যগুলিতে ছন্দে লেখা বিবৃতিই প্রধান, শিল্প-কুশলতার একান্ত অভাব।
ত্রয়ী কাব্যের জন্যই নবীনচন্দ্রের নিন্দা ও প্রশংসা। কৃষ্ণের পৌরাণিক আখ্যানকে উনিশ শতকের মানবতাবাদে জারিত করে তিনি ত্রয়ী কাব্য রচনা করেন। রৈবতক-এ সুভদ্রাহরণ, কুরুক্ষেত্র-এ অভিমন্যু বধ এবং প্রভাস-এ যদুবংশ ধ্বংস কাব্য তিনটির কেন্দ্রীয় ঘটনা। মহাভারতের কাহিনির সঙ্গে কল্পিত ঘটনা ও চরিত্র জুড়ে নবীনচন্দ্র যে নতুন মহাভারত রচনা করেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেটিকে “The Mahabharata of the Nineteenth Century” বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন। মূল কাহিনির রূপান্তরে বা ব্যতিক্রমে কাব্যগুলির ক্ষতি যত না হয়েছে, তার চেয়ে ক্ষতি হয়েছে কবির অসংযত কল্পনায় এবং অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ও প্রসঙ্গান্তর সৃষ্টি করে মহাকাব্যের সংহতি ও মহিমা ক্ষুণ্ণ করায়। প্রথম মহাকাব্যের উপযোগী ঘটনাসংস্থান (plot) ও চরিত্রসৃষ্টি (characters) এই কাব্যে নেই। কৃষ্ণ “এক ধর্ম এক রাজ্য এক সিংহাসন” স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সংকল্প করলেন “খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতে এক সূত্রে গেঁথে দেব আমি”। আর্য-অনার্যের মিলন ঘটিয়ে মহান ভারতবর্ষ রচনার সংকল্প মহাকাব্যের উপযুক্ত বিষয় বটে। কিন্তু প্রথমেই দুর্বাসাকে নিয়ে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ে গোল বাধল এবং কাহিনিটি হয়ে উঠল এক রোম্যান্টিক প্রেমের উপাখ্যান। অর্জুন সুভদ্রার অনুরাগী, এদিকে বাসুকি ব্যাকুল সুভদ্রাকে পাওয়ার জন্য। অন্যদিকে জরুৎকারু কৃষ্ণের অনুরাগিনী, প্রেমে প্রত্যাখ্যাতা হওয়ায় সে প্রতিহিংসার বশে বিবাহ করল কৃষ্ণবিদ্বেষী দুর্বাসাকে। শৈলজাকে বাসুকি অর্জুন হত্যায় নিয়োগ করলে সে পুরুষের ছদ্মবেশে অর্জুনের সান্নিধ্যে এসে অর্জুনেরই প্রেমে পড়ল। এইভাবে এক বিস্ময়কর প্রেমের গল্পে মহাকাব্যের আদর্শ ভেসে গেল, কাহিনি হয়ে পড়ল কক্ষচ্যুত। আবার নায়ক কৃষ্ণ একেবারেই নিষ্ক্রিয় চরিত্র। মুখে তাঁর বড়ো বড়ো তত্ত্বকথা, কিন্তু কাজ পারিবারিক জীবনে লঘু হাস্যরসে অবসর বিনোদন। সুভদ্রা, সুলোচনা প্রভৃতি চরিত্র নিতান্তই অবাস্তব। অপৌরাণিক ও অনৈতিহাসিক আখ্যান পরিকল্পনা এবং অবাস্তব চরিত্র সৃষ্টির জন্য ত্রয়ী কাব্য ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া কবি গীতিকবিতার উচ্ছ্বাসেরই আতিশায্যে বর্ণনাগুলিকে তরল করে মহাকাব্যের সংযম নষ্ট করেছেন, ছন্দ ও অলংকার প্রয়োগেও নৈপুণ্যের অভাব দেখা গিয়েছে। চরিত্রে ও পরিস্থিতিতে কিছুটা নাটকীয়তা থাকায় নানা স্থলে কাহিনি আকর্ষণীয় হয়েছে বটে, কিন্তু মহাকাব্যের গঠন-শিল্প ও চরিত্রসৃষ্টির বিশেষত্ব সম্পর্কে নবীনচন্দ্রের ধারণা স্পষ্ট ছিল না। তাই মহাকাব্য রচনায় তিনি ব্যর্থই হয়েছেন বলা যায়।