আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের ছোটোগল্প ও উপন্যাস
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে ছোটোগল্প ও উপন্যাসের এক স্বর্ণযুগ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সূচিত হয়। তাঁদের সমকালীন ও অব্যবহিত পরবর্তীকালে ছোটোগল্প ও উপন্যাস রচনায় বহু কৃতী সাহিত্যিক নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
হৃদয়বৃত্তিমূলক কথাসাহিত্য
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রোত্তর যুগে ভারতী পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একদল রবীন্দ্রানুসারী সাহিত্যিক মানবজীবনের স্নেহ, প্রেম ও করুণার সূক্ষ্ম সুকুমার সৌন্দর্য প্রকাশ করে কবি-কল্পনার রসে জারিত কথাসাহিত্য রচনা করেছেন। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, মনীন্দ্রলাল বসু প্রমুখ কথাসাহিত্যিকেরা সমস্যা-সংকটহীন জীবনের সুকুমার অনুভূতি রোম্যান্টিকতার মাধুর্যে প্রকাশ করেছেন। মনীন্দ্রলালের রমলা ও সহযাত্রিনী উপন্যাস দুটি জনপ্রিয় হয়েছিল। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, ইন্দিরা দেবী, অনুরূপা দেবী, নিরূপমা দেবী প্রমুখ ঔপন্যাসিকেরা এক সময় বাঙালি পাঠকের রসপিপাসা নিবৃত্ত করেছিলেন। অনুরূপা দেবীর মন্ত্রশক্তি, পোষ্যপুত্র প্রভৃতি উপন্যাসে বাস্তব রস ও রোম্যান্সের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।
চিন্তামূলক মননশীল কথাসাহিত্য
[সম্পাদনা]সবুজ পত্র পত্রিকাকে অবলম্বন করে প্রমথ চৌধুরী বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল কথাসাহিত্যের সূত্রপাত ঘটান। কয়েকজন লেখক ভাবাবেগ যথেষ্ট সংকুচিত করে বুদ্ধিদীপ্ত মার্জিত কাহিনির মাধ্যমে বিগগ্ধ পাঠকের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। বীরবল ছদ্মনামে প্রমথ চৌধুরী চার ইয়ারী কথা লিখলেন। গল্প হলেও এর ধরন প্রবন্ধের মতো। বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল কাহিনির মধ্যে দিয়ে চটকদারি গদ্যরীতি প্রকাশের পারদর্শিতা দেখালেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তিনি সত্যাসত্য নামে এক মহাকাব্যিক উপন্যাস লেখেন। বুদ্ধিপ্রধান যুক্তিসর্বস্ব এক নায়কের জীবনবৈচিত্র্য নিয়ে ছয় খণ্ডে প্রকাশিত হয় এই বিশাল উপন্যাস। এতে কাহিনির বন্ধন শিথিল, গল্পরসও দ্বিধাগ্রস্থ। তাঁর আগুন নিয়ে খেলা ও পুতুল নিয়ে খেলা উপন্যাস দুটিও কৌতূহলোদ্দীপক, কিন্তু স্বাভাবিক গল্পরসে নিষিক্ত নয়। সার্থক ঔপন্যাসিকের প্রতিষ্ঠা তিনি অর্জন করেননি, কিন্তু মননশীল বাক্শিল্পে তিনি অদ্বিতীয়।
বিকৃত-চিন্তামূলক বিদ্রোহাত্মক কথাসাহিত্য
[সম্পাদনা]কালি-কলম ও কল্লোল পত্রিকা দুটিকে কেন্দ্র করে একদল কৃতবিদ্য লেখক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পটভূমিকায় স্বাধীন চিন্তার পথে প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই প্রতিভাবান লেখকদের হাতে বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি স্বতন্ত্র পথ অবলম্বন করে। বুদ্ধদেব বসু ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। বুদ্ধদেব সাড়া উপন্যাস লিখে যৌনচিন্তার স্বাধীনতা প্রকাশ করেন। যুবসমাজে বেশ সাড়াও পড়ে যায়। ক্রমে তাঁর যেদিন ফুটল কমল, একদা তুমি প্রিয়ে, তিথিডোর, মৌলিনাথ প্রভৃতি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিকতার বিরুদ্ধে বাস্তবতার নামে তিনি যে রোম্যান্স সৃষ্টি করলেন তাতে বিকৃত যৌনচিন্তা ও বিদ্রোহই শুধু প্রকাশ পেল, অন্য কিছু নয়। অচিন্ত্যকুমারও বাক্শিল্পের বিশেষ পারদর্শিতার সাহায্যে মানুষের এই বিকৃত জীবনের স্বরূপ উদ্ঘাটনে প্রয়াসী হলেন। তাঁর অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসের মধ্যে বাস্তবতার নামে অশালীনতাই বেশি প্রকট। মানবজীবন সম্পর্কে যে গভীর প্রত্যয় কথাসাহিত্যিকের প্রধান উপজীব্য সেই প্রত্যয়ের অভাব তাঁর লেখায় সুস্পষ্ট।
বাস্তববুদ্ধিমূলক মানবিক কথাসাহিত্য
[সম্পাদনা]জীবন সম্পর্কে গভীর প্রত্যয় এবং বাস্তবসম্মত কথাসাহিত্যের রচয়িতা শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জগদীশ গুপ্ত প্রমুখ লেখকেরা। সমাজের নিম্নশ্রেণির মধ্যে যে জীবন-চেতনা, সমাজব্যবস্থার মধ্যে যে মনুষ্যত্বের অবমাননা এবং তার ফলে যে শোষণ ও বঞ্চনা, তা এই লেখকেরা শিল্পসুন্দর মূর্তিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। শৈলজানন্দের ‘নারীমেধ’ ছোটোগল্প এবং নীহারিকা ওয়াচ কোম্পানী ও বধূবরণ উপন্যাসে জীবনের বাস্তব বর্ণনাকে আশ্রয় করে ট্র্যাজেডির রূপটি প্রস্ফুটিত। প্রেমেন্দ্র মিত্র সাধারণ নিম্নবিত্ত সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জীবনরসের সন্ধান করেছেন। পাঁক ও মিছিল উপন্যাসে তিনি নিষ্করুণ বাস্তব ঘটনার মধ্যে মানবিক অনুভূতির বৈশিষ্ট্যগুলি প্রদর্শন করেন। জগদীশ গুপ্তের বিনোদিনী গল্প-সংকলনের ছোটোগল্পগুলির মধ্যে মানবিক ভাব-পরম্পরার বিচিত্র বিন্যাস পাঠককে অভিভূত করে। এঁরা সবাই উপন্যাস ও ছোটোগল্প রচনায় মানবিক আবেদন ও বাস্তববুদ্ধির সুস্পষ্ট পরিচয় দিয়েছেন।
কৌতুকরসাত্মক কথাসাহিত্য
[সম্পাদনা]ছোটোগল্প ও উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে কৌতুকরসের সাহায্যে জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন এই যুগের কয়েকজন লেখক। বঙ্গবাসী পত্রিকাকে অবলম্বন করে যে বিদ্রূপাত্মক গল্পকথার অমার্জিত আক্রমণ হত, রবীন্দ্রনাথ তা পরিহার করে লঘু কৌতুকের সুমার্জিত রীতির সন্ধান দেন। সেই রীতি অনুসরণ করে কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় এবং পরশুরাম ছদ্মনামে রাজশেখর বসু নির্মল সংযত হাস্যরসে কথাসাহিত্যকে উদ্ভাসিত করেন। কেদারনাথের বাগ্বৈদগ্ধ্যের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর কোষ্ঠীর ফলাফল, ভাদুড়ী মশাই ও আই হ্যাজ উপন্যাসে। তাঁর কথাসাহিত্য বুদ্ধিদীপ্ত রচনার শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। বুদ্ধির সূক্ষ্মতার সঙ্গে বাক্চাতুর্য ও অসঙ্গতির অপূর্বতার মধ্যে পরিশীলিত হাস্যরসের প্রতিষ্ঠা। পরশুরাম এই পথেই কৌতুক-গল্প রচনা করে অভূতপূর্ব খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গড্ডলিকা, কজ্জলী, হনুমানের স্বপ্ন প্রভৃতি গল্প-সংকলন শিক্ষিত রুচিবান বাঙালি পাঠকের বিশেষ সমাদর লাভ করে। তাঁর রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদ মূল গ্রন্থের নির্বাচিত অংশের চলিত ভাষায় রূপান্তর। এই রচনাগুলি পাঠকমহলে যতটা রুচিকর হয়েছে, তাঁর কৌতুক-গল্পগুলিও তার চেয়ে কম রুচিকর হয়নি। নির্মল কৌতুকের অফুরন্ত নির্ঝর প্রবাহিত করেছেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর নীলাঙ্গুরীয় উপন্যাসটির মধ্যে জীবন সম্পর্কে এক প্রসন্ন সহাস্য দৃষ্টির পরিচয় এবং রোম্যান্সের স্নিগ্ধমধুর স্বপ্নচ্ছায়া মিশে আছে। তাঁর গল্পসাহিত্যে শিবপুরের গণ্শা-ঘোঁৎনা যে নির্মল কৌতুকের মনোরম দীপ্তি প্রকাশ করেছে, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা নেই। রাণুর নায়িকাত্বে যে কটি গল্প রচিত হয়েছে, তা শিশু-মনস্তত্ত্ব ও কৌতুক-কৌতূহলের এক বিস্ময়কর রহস্য। জীবনকে যে এমন প্রসন্ন মাধুর্যে দেখা যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ই তা দেখিয়েছেন।