বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

উইকিবই থেকে

নাট্যকার রূপে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩—১৯১৩) ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষের প্রবল প্রতিবাদ। যে অলৌকিকতা ও ভক্তিবাদের মোহে বাংলা নাটকের উজ্জ্বল সম্ভাবনার দ্বার গিরিশচন্দ্র রুদ্ধ করেছিলেন, দ্বিজেন্দ্রলাল ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে সেটিকেই উন্মুক্ত করে দেন। এই বিষয়ে তাঁর আদর্শ কখনও মঞ্চ-কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক লাভক্ষতির কাছে অথবা জনরুচির কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। পূর্ববর্তী যে কোনও নাট্যকার অপেক্ষা পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীকে তিনি অধিকতর মাত্রায় সাফল্যের সঙ্গে বাংলা নাটকে ব্যবহার করেছিলেন। নাটকীয় চরিত্রে অন্তর্দ্বন্দ্বের যে অভাব ছিল, দ্বিজেন্দ্রলালই সর্বপ্রথম সেই অভাব পূরণ করেন। বস্তুত তাঁর নাটকে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সঞ্জাত আধুনিক মানস জয়ী হয়েছে।

প্রহসন

[সম্পাদনা]

নাটকের ক্ষেত্রে দ্বিজেন্দ্রলালের আবির্ভাব প্রহসন-রচয়িতা রূপে। কল্কি-অবতার (১৮৯৫), বিরহ (১৮৯৭), ত্র্যহস্পর্শ (১৯০০), প্রায়শ্চিত্ত (১৯০২), পুনর্জন্ম (১৯১১) ও আনন্দবিদায় (১৯১২) তাঁর লেখা প্রহসন। সমাজের ভণ্ডামি, কপটাচার, কুসংস্কার ও উৎকট বিদেশিয়ানার স্বরূপ উদ্ঘাটনই ছিল এই প্রহসনগুলির লক্ষ্য। হাস্যরসাত্মক রচনায় তাঁর মার্জিত রুচি অবশ্য প্রশংসনীয়। তাঁর প্রহসনগুলির প্রধান আকর্ষণ ছিল হাসির গান; এবং হাসির গান রচনায় দ্বিজেন্দ্রলালের সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তবে তাঁর সব প্রহসনই যে নাট্যবিচারে উন্নত শ্রেণির তা বলা চলে না। এগুলির মধ্যে বিরহপুনর্জন্ম প্রহসন দুটিই বহুলাংশে উপাদেয়। আবার আনন্দ বিদায় প্রহসনের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে।

কল্কি অবতার

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের প্রথম প্রহসন কল্কি অবতার (১৮৯৫) আদ্যন্ত ছড়ার মতো মিত্রাক্ষরে রচিত। এতে বিলেত-ফেরত, ব্রাহ্ম, নব্য হিন্দু, গোঁড়া ও পণ্ডিত—এই পাঁচ সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্রূপ বর্ষিত হয়েছে। পরিশেষে কল্কিদেব বিবদমান সম্প্রদায়গুলির মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দিলেন এবং সকলেই বুঝল যে, বিশ্বাস, প্রেম ও মনুষ্যত্বের উপরেই সমাজের প্রকৃত ভিত্তি। প্রস্তাবনায় লেখক বলেছেন যে, কোনও সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর দ্বেষ বা আক্রোশ নেই, বরং পরিহাসের মধ্যে দিয়ে সবার ত্রুটি ও গলদ ধরিয়ে দিয়ে তাদের সংশোধন করাই তাঁর উদ্দেশ্য। প্রহসনটির মধ্যে ঘটনার কোনও অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ নেই, এটি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দৃশ্যের সমষ্টি মাত্র। নিতান্ত অসংলগ্নভাবে অকারণ চরিত্রের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। নিকৃষ্ট ও অবাস্তব সংলাপও অনেক জায়গায় অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।

বিরহ (১৮৯৭) বিশুদ্ধ প্রহসন। ঘটনা-সংস্থাপনের মধ্যে এর হাস্যরস নিহিত। উৎসর্গপত্রে নাট্যকার বলেছেন, “আমার এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য—অল্পায়তনের মধ্যে বিরহের প্রকৃত হাস্যরস অংশটুকু দেখানো”। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলে মনে হয় না। মিথ্যা ধারণা ও ভ্রান্ত সন্দেহ নিরসনের মধ্যে দিয়েই প্রহসনটির কৌতুকরস ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু উপকাহিনির রহস্যময় রোম্যান্সে প্রধান কাহিনি গৌণ হয়ে পড়েছে। প্রহসনের গানগুলি এর প্রধান সম্পদ।

ত্র্যহস্পর্শ

[সম্পাদনা]

ত্র্যহস্পর্শ (১৯০০) আদ্যন্ত নিম্নস্তরের ভাঁড়ামিতেই পূর্ণ। স্থানে স্থানে হাসির টুকরো ছড়িয়ে থাকলেও অবিচ্ছিন্ন ঘটনা-সংস্থানের মধ্যে হাস্যরস জমে ওঠেনি। তবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অলীকবাবুর ধাঁচে আঁকা ডাক্তার ভূদেবের চরিত্রটি বেশ সরস হয়েছে।

প্রায়শ্চিত্ত

[সম্পাদনা]

প্রায়শ্চিত্ত (১৯০২) প্রহসনে বিলেত-ফেরত, নব্য হিন্দু ও শিক্ষিতা স্ত্রীলোকদের নিয়ে উপহাস করা হয়েছে। প্রহসনটির ভাব ও বিষয়ের উপর অমৃতলালের প্রভাব রয়েছে। শিক্ষিতা রোম্যান্স-বাতিকগ্রস্থা স্ত্রী-চরিত্রের হাস্যকর অসঙ্গতিও অমৃতলালের প্রহসনের অনুসরণে অঙ্কিত। চম্পটির সঙ্গে রেবেকার বিচ্ছেদে এবং ইন্দুমতীর বিবাহে অনর্থক একটি ঘোরালো সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে হাস্যরসের সর্বব্যাপী আনন্দের ব্যাঘাত ঘটেছে। চম্পটি অকস্মাৎ কীভাবে খাঁটি হিন্দুতে পরিণত হল, তার যথেষ্ট কারণও দেখানো হয়নি।

পুনর্জন্ম

[সম্পাদনা]

পুনর্জন্ম (১৯১১) অনেক পরে রচিত হয়। লেখক ভূমিকায় বলেছেন যে, এতে নীতিকথার অভাব নেই। এই নীতিকথার ছলে লেখক দর্শককে কতটা হাসাতে বা আনন্দ দিতে পেরেছেন সেটাই এক্ষেত্রে বিচার্য।

নির্দয় কৃপণ কুসীদজীবীর পরিণতি দেখানোই যদি নাট্যকারের অভীষ্ট নীতিশিক্ষা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা সার্থক হয়েছে। যাদবের মুখ থেকে এই নীতি ব্যক্ত হয়েছে, “মরেছিলাম, এ আমার পুনর্জন্ম, আজ নূতন বিশ্বাস নিয়ে আবার বেঁচে উঠেছি। মৃত্যুর পরে যা যা ঘটবে চক্ষের সম্মুখে তার অভিনয় দেখলাম।” যাদব চক্রবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছে যে, নিজেকে ও আত্মীয়স্বজনকে বঞ্চিত করে এবং পরকে শোষণ করে যে অর্থ সঞ্চিত হয় তা বিফলে যায়—এই জ্ঞানই তার পুনর্জন্ম। দারোগা-কনস্টেবলের অহেতুক অত্যাচারের স্বরূপ প্রকাশ করাও নাট্যকারের অন্যতম গৌণ উদ্দেশ্য। মারের চোটে এরা মিথ্যাকে কীভাবে সত্য প্রতিপন্ন করে তা যাদবের কথার মধ্যে দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, “যাক, শেষে রুলের তিন গুঁতোয় প্রমাণ হ’য়ে গেল যে আমি যাদব চক্রবর্তী নই, গুঁতোর চোটে বাবা বলায়—এ ত তুচ্ছ কথা।” প্রহসনের এই অংশে হাস্যাস্পদ ব্যক্তি যাদব নয়, যাদব এখানে হাস্যরস-উদ্রেক্তা—নাট্যকারের মতের বাহন। অন্যায়ভাবে লাঞ্ছিত, উপহাস-কর্তা যাদব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কমলাকান্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু দারোগা-কনস্টেবল-ঘটিত দৃশ্যের পূর্বে যাদব নিজেই উপহাসস্পদ ছিল এবং যাদবের দুর্দশার ও নিজের পরিচয় পরিস্ফুট করার জন্য তার আত্যন্তিক ব্যগ্রতা দেখে পাঠক ও দর্শকের মনে কৌতুকরসের সৃষ্টি হয়েছে।

জটিল ও ঘোরালো ঘটনা-বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে হাস্যরস উদ্রেক করাই প্রহসনের লক্ষ্য। কিন্তু এই প্রহসনে তেমন ঘটনার জটিলতা ও রহস্যময়তা নেই। ঘটনার একই প্রকার সংস্থানের মধ্যে চরিত্রগুলিকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। প্রকৃত যাদব কীভাবে কৌতুকপূর্ণ ষড়যন্ত্রের ফলে নকল যাদবে পরিণত হল, তা দেখে হাসি পায়। কোনও মন্দ দুষ্ট লোকের শাস্তি এবং দুর্দশা দেখলে দর্শক-হৃদয়ে একরকম প্রতিহিংসা-চরিতার্থজনক আনন্দের উদয় হয়, যাদবের ভাগ্যবিপর্যয়েও দর্শক সে-রকম আনন্দ বোধ করে। যেভাবে দশচক্রে ভগবানের ভূত হওয়ার মতো যাদব নকল প্রমাণিত হয়ে গেল, তা অস্বাভাবিক ও অপ্রাকৃত মনে হতে পারে; কিন্তু প্রহসনের মধ্যে অস্বাভাবিক, অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব ঘটনার অবতারণা দোষাবহ নয়, সেদিক থেকে আলোচ্য প্রহসনের কোনও ত্রুটি নেই। নর্তকীঘটিত দৃশ্যটি নেহাত দর্শকের নিম্নরুচির পরিতৃপ্তির জন্য সংযোজিত হয়েছে, মূল ঘটনার দিক থেকে এটিকে বাস্তবিকই অবান্তর ও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

আনন্দবিদায়

[সম্পাদনা]

আনন্দবিদায় (১৯১২) প্রহসনটি লেখকের এক শোচনীয় ভ্রান্তির লজ্জাজনক সাক্ষ্যে বহন করছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিরোধে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন এবং সেই বিরোধের ফলে উত্থিত বিষ স্বয়ং দ্বিজেন্দ্রলালকেই গলাধঃকরণ করতে হয়েছিল। ড. অজিতকুমার ঘোষের ভাষায় “‘আনন্দবিদায়’ সুবিমল দ্বিজরাজের দুরপনেয় কলঙ্ক চিহ্নস্বরূপ।”

পৌরাণিক নাটক

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলাল তিনটি পৌরাণিক নাটক রচনা করেছিলেন: পাষাণী (১৯০০), সীতা (১৯০৮) ও ভীষ্ম (১৯১৪—মৃত্যুর পর প্রকাশিত)। পৌরাণিক নাটকে তিনি পূর্বাগত ভক্তিবাদ ও অলৌকিকতার সংস্কারকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পাশ্চাত্য আদর্শে মানবধর্মকেই উজ্জ্বল করে তুলেছেন। পাষাণী নাটকে অপূর্ণ বাসনার সংঘাতে অহল্যা চরিত্রে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে, পারিপার্শ্বিকের সংঘাতে সেখানে নির্যাতিত মানবাত্মার যে জ্বালান অগ্নুৎগারের ন্যায় ফেটে পড়েছে, তা উৎকৃষ্ট নাট্যগুণসম্পন্ন হয়েছে। তবে ভক্তিবাদী দেশে এইরকম নাটকের সমাদরের কথা নয়, দ্বিজেন্দ্রলালের পৌরাণিক নাটকও তাই জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি।

পাষাণী

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের প্রথম পৌরাণিক নাটক পাষাণী (১৯০০)। নাট্যকার রামায়ণের অহল্যা-উপাখ্যানের এক সম্পূর্ণ অভিনব রূপ দান করেছেন। নাটকে অহল্যা কোথাও পাষাণময় আকৃতি লাভ করেনি, তাই পাষাণী নামকরণও যথার্থ হয়নি। পৌরাণিক চরিত্রগুলিকে একেবারেই সাধারণ মানুষের স্তরে এনে ফেলা হয়েছে। ইন্দ্র নাটকে কামার্ত লম্পট পুরুষ। নাটকের শ্রেষ্ঠ চরিত্র গৌতম। তিনি প্রেম ও ক্ষমার আধার এবং সর্বপ্রকার দুঃখক্লেশে স্থির ও অবিচলিত। অহল্যা ভ্রষ্টা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নির্বিকার প্রশান্ত চিত্তের তাকে গ্রহণ করে মহত্ত্বের পরাকাষ্ঠা দেখালেন। অহল্যা যৌবনের নিষ্ফলতায় ও কামনার ব্যর্থতায় দর্শকের সহানুভূতি উদ্রেক করলেও ইন্দ্রের প্রতি তার প্রেমের মধ্যে নির্লজ্জ লালসা সুপ্রকট। কিন্তু তা সত্ত্বেও নাট্যকার তার পরিণতি ক্ষমাসুন্দর চোখে নিরীক্ষণ করেছেন। অহল্যার পতনের জন্য তার দোষ আছে, কিন্তু অধিকতর দোষ শঠ, প্রতারক, লম্পট পুরুষজাতির—এটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সযত্নে। নারীজাতির প্রতি নাট্যকারের শ্রদ্ধা ও দরদ মাধুরী চরিত্রের মধ্যেও দেখা যায়। মাধুরী পতিত হওয়া সত্ত্বেও সতী-শিরোমণি, তার সহিষ্ণুতা ও পাতিব্রাত্যের তুলনা নেই। কিন্তু কৌতুকরসের প্রাচুর্য এবং গানের বাহুল্য নাটকটির গম্ভীর রসের পরিপন্থী হয়েছে।

রামায়ণ ও ভবভূতির উত্তররামচরিত অনুসরণ করে দ্বিজেন্দ্রলাল সীতা (১৯০৮) রচনা করেন। নাট্যকার আধুনিক দৃষ্টিতে চরিত্রগুলিকে অধিকতর পরিস্ফুট করার জন্য সাহসিকতার সঙ্গে অনেক মৌলিক দৃশ্য সংস্থাপন করেছেন। এতে নাটকটি প্রসাদগুণসম্পন্ন হয়েছে। সীতা মিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা, ক্ষেত্রবিশেষে গৈরিশ ছন্দের অনুকরণ আছে। সংস্কৃত নাটকের প্রভাবে পাত্রীপাত্রীদের উক্তি দীর্ঘ ও বর্ণনাত্মক হয়েছে। তবে অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত রামচন্দ্রের সংলাপ যথেষ্ট নাট্যবেগসম্পন্ন হয়েছে। সীতা চরিত্রের মধ্যে নাট্যকার তাঁর মন-প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। চরিত্রটিকে অতুলনীয় রূপে মহিয়সী ও কমনীয় দেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি স্থানে স্থানে স্বাধীনভাবে ঘটনার সমাবেশ করেছেন। বনবাসের কথা অবগত হয়ে তাঁর সীতা স্বামীর সত্যরক্ষার জন্য স্বেচ্ছায় বনবাসিনী হয়েছেন। সম্রাজ্ঞী হয়েও সুখ ও বিলাসে বিরত, স্বামীর সঙ্গে তপোবনে যে সুখ ভোগ করেছিলেন, তার চিন্তায় বিভোর। রামচন্দ্র কর্তৃক পরিত্যক্তা হয়েও তিনি অনির্বাণ দীপশিখার ন্যায় স্বামীর চিন্তা নিজের অন্তরে জ্বালিয়ে রেখেছেন। সীতার চরিত্র যেভাবে অঙ্কিত হয়েছে তাতে তাঁর বনবাস ও ক্লেশভোগের জন্য রামচন্দ্রের প্রতি দর্শকের বিরাগ আসা স্বাভাবিক। কিন্তু নাট্যকার কৌশলে বশিষ্ঠকে সব কিছুর জন্য দায়ী করে রামচন্দ্রের চরিত্র-মাহাত্ম্য অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। রামচন্দ্র সীতাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ জেনেও বশিষ্ঠের আজ্ঞায় বনবাসে পাঠিয়েছেন এবং পুনরায় বশিষ্ঠের নির্দেশেই শূদ্রক-বধের ন্যায় অন্যায় কাজ করেছেন। বাল্মীকি ও বশিষ্ঠের আলোচনা-কালে বশিষ্ঠের পরাজয়ে তিনি যে ভ্রান্ত, নাট্যকার তা প্রমাণ করেছেন। সীতা চরিত্রের মহত্ত্ব এই নাটকে ব্যক্ত হলেও প্রেম ও রাজকর্তব্যের দ্বন্দ্বে পীড়িত রামচন্দ্রের ট্র্যাজেডিই এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।

ভীষ্ম

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের তৃতীয় পৌরাণিক নাটক ভীষ্ম (১৯১৪) অনেক পরে লেখা। ভীষ্ম পাকা হাতের রচনা, ভাব ও ভাষায় চমৎকারিত্ব নাটকের মধ্যে সুব্যক্ত। এই নাটকেই অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগে নাট্যকার সবচেয়ে বেশি সক্ষম হয়েছেন। নাটকটিতে প্রাচীন ভারতের এক উজ্জ্বল ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে; তাতে শৌর্য-বীর্য, মহত্ত্ব-উদারতা, প্রেম ও ক্ষমার আশ্চর্য লীলা দর্শকের দৃষ্টিকে বিহ্বল ও আবিষ্ট করে রাখে। ভীষ্মের অনমনীয় সংকল্প, আকাশস্পর্শী উদারতা ও সমুদ্রোপম বিশালতা নাট্যকার সশ্রদ্ধ নিষ্ঠায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু চতুর্থ অঙ্ক পর্যন্ত দর্শকের আগ্রহ ও আবেশ যেভাবে জমে থাকে, পঞ্চম অঙ্কে গিয়ে যেত তা কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। যে যুবক দেবব্রত পিতাকে সুখী করার জন্য এত চেষ্টা করলেন, তাঁকে বৃদ্ধ পিতামহের বেশে দেখে দর্শকের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। দুই প্রধান স্ত্রী-চরিত্র অম্বা ও সত্যবতী করুণ ও দুঃখময়। অম্বার উচ্ছ্বসিত অবারিত প্রেম বারবার ভীষ্মের অটল সংকল্পের আঘাতে ব্যর্থ হয়েছে। পদদলিতা সর্পিণীর ন্যায় প্রতিহিংসার ক্রূর বিষ সে ঢেলে দিয়েছে ভীষ্মের উপরে। কিন্তু সত্যবতী তার প্রতি অবিচারের জন্য কারও উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেনি। নিষ্ফল আক্রোশের কেবল নিজের গাত্র দংশন করে ক্ষতবিক্ষত করেছে সে। হস্তিনার যে অনন্তযৌবনা সম্রাজ্ঞী ক্ষমতা ও প্রভাবের অহংকৃত আসনে অধিষ্ঠিত ছিল, সে-ই পরে সকলের উপেক্ষিতা, ঘৃণিত ও অনুকম্পার পাত্রী হয়ে পড়ল। তার এই শোচনীয় পরিণামে বিশেষ ট্র্যাজিক হয়েছে। ট্র্যাজেডির এই ঘন কালো মেঘের মধ্যে হাস্যময়ী বিদ্যুতের আভা অম্বিকা ও অম্বালিকা চকিত দীপ্তিতে দর্শকের অন্তঃকরণ উদ্ভাসিত করে রাখে।

সামাজিক নাটক

[সম্পাদনা]

নাট্যকার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলাল যদি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে থাকেন তবে তা পরপারে (১৯১২) ও বঙ্গনারী (১৯১৬—মৃত্যুর পর প্রকাশিত) নামে দুটি সামাজিক নাটক রচনায়। মাত্র দুটি সামাজিক নাটকই তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু এই শ্রেণির নাট্যরচনায় তিনি দীনবন্ধু মিত্র বা গিরিশচন্দ্র ঘোষকে অতিক্রম করতে পারেননি। বরং পূর্বসূরিদের নাটকের সংলাপে ও চরিত্রচিত্রণে যেটুকু বাস্তবধর্মিতা আছে, দ্বিজেন্দ্রলালে তাও দেখা যায় না। সামাজিক নাটকে তিনি যে রকম কবিত্বময় সংলাপ সৃষ্টি করেছেন, তাতে নাট্যরস ক্ষুণ্ণ হয়েছে। পরপারে নাটকে বিশ্বেশ্বরের যাত্রাসুলভ উক্তিগুলি হাস্যোদ্রেক করে, অথচ চরিত্রটি করুণ-রসাত্মক। বন্দুক, পিস্তল, ফাঁসি, আত্মহত্যা, খুন ইত্যাদি লোমহর্ষক ঘটনা তো আছেই।

পরপারে

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের প্রথম সামাজিক নাটক পরপারে (১৯১২)। নাটকটির কাহিনি পরিণতিহীন, চরিত্রগুলিও অসম্পূর্ণ। গিরিশচন্দ্রের নাটকে যেমন আধ্যাত্মিক পরিণতি লক্ষ্য করা যায়, এই নাটকেও তেমনই পরিণতি দেখা গিয়েছে। যেন নাটকের শেষ কথা এই ক্রিয়াচঞ্চল বাস্তব জীবনে বলা হল না, তা ধ্বনিত হবে জীবনের পরপারে। তাই যে কাহিনি মিলনান্তিক পরিণামের দিকে এগোচ্ছিল, অকারণে কয়েকটি মৃত্যু ঘটিয়ে তার গতি রুদ্ধ করে দেওয়া হল। আকস্মিকভাবে মৃত্যু হল বিশ্বেশ্বর ও সরযূর, মহিমও আচমকাই হয়ে উঠল ভক্ত সাধক। নাট্যকার স্বাভাবিকভাবে কাঁদাতে না পেরে যেন চড় মেরে কাঁদালেন। সন্দেহবাদী ও যুক্তিসর্বস্ব দ্বিজেন্দ্রলালের শেষ জীবনে যে পরিবর্তন ঘটেছিল এই নাটকে তার আভাস পাওয়া যায়। নবকৃষ্ণ ঘোষ তাঁর দ্বিজেন্দ্রলাল গ্রন্থে লিখেছেন, “এই নাটকখানি রচনাকালে কবির হৃদয়ে যে আধ্যাত্মিক ভাবের উন্মেষ হইয়াছিল, তাঁহার জীবন-ইতিহাসে তাহার আভাস পাওয়া যায়।” এই আধ্যাত্মিক ভাব নাটকটিকে প্রশংসনীয় করে তুলতে পারেনি। এই নাটকের আর-একটি ত্রুটি এই যে, এতে ছোরা-পিস্তলের অত্যধিক ব্যবহার এটিকে ডিটেকটিভ উপন্যাসের ন্যায় অতিনাটকীয় করে তুলেছে। নাটকের নায়ক হয়তো মহিম, কিন্তু চরিত্রটি নিতান্তই ক্ষুদ্র, নীচ ও অবিকশিত। মন্দ কাজ করার মতো মানসিক শক্তি ও দৃঢ়তা তার নেই। বিয়ের পরে স্ত্রীর প্রতি সে এতই আসক্ত হয়ে পড়ল যে স্নেহময়ী মাকে পর্যন্ত উপেক্ষা ও অপমান করতে তার বাধল না; আবার মুহূর্তের মধ্যে সে সাধ্বী স্ত্রীকে ত্যাগ করে বেশ্যা শান্তার প্রেমের উন্মাদ হয়ে উঠল। এভাবে একের পর এক অপরাধ করেও তার কোনও দ্বিধা নেই, তাপ-উত্তাপও নেই। নিজের অপরাধ সরযূর উপর নিতান্ত কাপুরুষের মতো চাপিয়ে সে তার চরিত্রের জঘন্যতম প্রবৃত্তিকেই প্রকাশ করেছে। বিশ্বেশ্বরের চরিত্র নাট্যকার তাঁর দাদামশাই প্রসাদদাস গোস্বামীকে আদর্শ করে চিত্রিত করেছিলেন। প্রথম দিকে এই চরিত্রের স্নেহপরায়ণ, পরোপকারী ও রঙ্গরসপ্রিয় ভাবটি বেশ ভালোভাবে ফুটে উঠেছে, কিন্তু অবশেষে তাঁর মনস্তাপ ও আত্মহত্যার দৃশ্য হৃদয়স্পর্শী হয়নি। কালীচরণ চরিত্রে দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশী নাটকের নিমচাঁদ চরিত্রের প্রভাব সুস্পষ্ট। কালীচরণ কলঙ্কের পাঁকে নিমগ্ন হয়েও নিষ্কলঙ্ক। তার উদাসীন, বিবাগী চিত্তের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ন্যায়-অন্যায় বোধ এবং সদাশয়তা বিরাজমান। পতিতা চরিত্রও যে সংযম ও মহত্ত্বের আধার হতে পারে শান্তার মধ্যে নাট্যকার তা দেখিয়েছেন। এই চরিত্রের মধ্যে শরৎচন্দ্রের কোনও সুপরিচিতা নায়িকাকে যেন দেখা যায়, তার দৃপ্ত তেজস্বিতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মধ্যে যেন নোরা বা ইসাডোরা ডানকান উঁকি মারছে।

বঙ্গনারী

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের বঙ্গনারী (১৯১৬) নাটকটির উপর গিরিশচন্দ্রের সামাজিক নাটকের প্রভাব অধিকতর স্পষ্ট। যে সামাজিক সমস্যা এই নাটকের ভিত্তি, তা গিরিশচন্দ্রের বলিদান-এ আলোচিত হয়ে গিয়েছে। দেবেন্দ্র গিরিশচন্দ্রের নাটকের দুঃখশোকপ্রাপ্ত অসংলগ্ন-প্রলাপী পরিবার-কর্তার হুবহু অনুরূপ চরিত্র। উপেন্দ্রও প্রফুল্ল নাটকের রমেশের ন্যায় অমানবিক দৌর্বৃত্তের অধিকারী। বঙ্গনারী সামাজিক নাটক হলেও এতে স্থূল ও রোমাঞ্চকর ঘটনা দ্বারা সুলভ আবেগ-চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সদানন্দের মুখ দিয়ে নাট্যকার নিজের কথা ব্যক্ত করলেও কেদারের চরিত্র বেশি সরস ও প্রাণবন্ত। লঘুচিত্ত, পাগলাটে কেদারের হৃদয় সততা ও মহত্ত্ব দিয়ে গড়া, তার অভিনব গালাগালির শব্দগুলি অত্যন্ত উপভোগ্য। সুশীলা যুক্তিবাদী আধুনিক নারী-শিরোমণি, তার প্রখর বাক্যঘর্ষণে সমাজ-বিদ্রোহ মুহুর্মুহু জ্বলে উঠেছে।

অপেরা

[সম্পাদনা]

সোরাব-রুস্তম

[সম্পাদনা]

‘সুরুচিসঙ্গত অপেরা’ রচনার উদ্দেশ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ রচনা করেন সোরাব-রুস্তম (১৯০৮)। কিন্তু কিছু নাচ-গান থাকলেই অপেরা হয় না, তার বিষয়বস্তু হওয়া দরকার খুব তরল ও লঘু। সোরাব-রুস্তম-এর কাহিনি অতিশয় করুণ ও জটিল। এই কাহিনি নিয়ে যে অপেরা লেখা যায় না, নাট্যকার নিজেও সেটি বুঝেছিলেন। তাই বইটির ভূমিকায় তিনি লেখেন, “সোরাব-রুস্তম দস্তুরমত অপেরা নয়, এক কথায় অপেরায় আরম্ভ হইয়া ক্রমে ক্রমে নাটকে শেষ হইয়াছে।” যে পিতাকে ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সোরাব, সেই পিতার হাতেই সে নিহত হল—এই বিষয়ের মধ্যে নিয়তির যে নিষ্ঠুর চক্রান্ত ফুটে উঠেছে তা দিয়ে এক চমৎকার বিষাদঘন ট্র্যাজেডি রচনা করা যেত।

ঐতিহাসিক নাটক

[সম্পাদনা]

পৌরাণিক বা সামাজিক নাটকের তুলনায় দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলিতেই অনেক বেশি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বস্তুত এই নাটকগুলির জন্যই তিনি বাংলা নাট্যজগতে স্মরণীয়। তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলি হল তারাবাঈ (১৯০৩), রাণা প্রতাপ সিংহ (১৯০৫), দুর্গাদাস (১৯০৬), নূরজাহান (১৯০৮), মেবার পতন (১৯০৮), সাজাহান (১৯০৯), চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১) ও সিংহল বিজয় (১৯১৫—মৃত্যুর পর প্রকাশিত)। ঐতিহাসিক নাটক রচনায় তিনি পাশ্চাত্য শৈলী অনুসরণের ব্যাপারে প্রচুর দক্ষতার দেখিয়েছেন। প্রবল হৃদয়াবেগ, চারিত্রিক দ্বন্দ্ব, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস তাঁর নাটকগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছে। কিন্তু সত্যের খাতিরে বলতেই হয় যে, কাহিনির গ্রন্থনে, বিশেষত উপকাহিনির গ্রন্থনে, তিনি বহু স্থলেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অধিকন্তু কালানৌচিত্য ও পাত্রানৌচিত্র্য দোষ নাটকীয় রসসৃষ্টির পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি কবিসুলভ subjective দৃষ্টি বহু নাটকীয় চরিত্রকে একেবারে মাটি করে দিয়েছে। এটিই দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের মারাত্মক ত্রুটি।

রাজপুত ইতিহাস-নির্ভর ঐতিহাসিক নাটক

[সম্পাদনা]

রাজপুত জাতির ইতিহাস অবলম্বনে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় চারটি নাটক রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে তারাবাঈ ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে একটি দুর্বল রচনা। অন্য তিনটি নাটক রাণা প্রতাপ সিংহ, দুর্গাদাসমেবার পতন নাটক তিনটির নাম কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চারণ করা যায়। তিনটি নাটকের সুরই দেশাত্মবোধের উচ্চ গ্রামে বাঁধা। স্বদেশি আন্দোলনের পরিবেশে রচিত এই তিনটি নাটক বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জনমানসে প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। এই কারণে দ্বিজেন্দ্রলালও সেকালে কীর্তিমান নাট্যকার হতে পেরেছিলেন। মুঘল সম্রাটের সঙ্গে দেশপ্রেমিক প্রতাপ সিংহের সংঘর্ষ রাণা প্রতাপ সিংহ নাটকের বিষয়বস্তু। এই নাটকে নাট্যকার ইতিহাসের যথাযথ অনুকরণে অনেকখানি সফল হয়েছেন। কাহিনি-বিন্যাস ও সংঘাতের ভিতর দিয়ে চমৎকার নাটকীয় রূপ গ্রহণ করেছে এটি। চরিত্রগুলিও অন্তর্দ্বন্দ্বের ঘাত-প্রতিঘাতে বিবৃতির পুতুল না হয়ে জীবন্ত মানুষ হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা গিরিশচন্দ্র ঘোষ অপেক্ষা তিনি নিশ্চিতরূপেই অধিকতর কৃতিত্বের অধিকারী। সর্বোপরি, নাটকটি যাত্রাশৈলী থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু বিপক্ষ সৈন্যের শিবিরে রাজকুমারীদের বিনা বাধায় প্রবেশ কিংবা মেহের উন্নিসার প্রতি অমর সিংহের আসক্তি স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। দুর্গাদাস নাটকে ঔরংজীব ও রাজপুত যোদ্ধা দুর্গাদাসের সংঘর্ষ চিত্রিত হয়েছে। নাটকটিতে উদার আদর্শবাদ তাৎক্ষণিক মোহ সৃষ্টি করলেও নাট্যরসকে অনেকটা লঘু করে ফেলেছে। রাণা প্রতাপ সিংহের পুত্র অমর সিংহের জীবনের প্রধান ঘটনাগুলি মেবার পতন নাটকের বিষয়বস্তু। এই নাটকে নাটকত্ব অপেক্ষা উচ্ছ্বাসই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। উদার বিশ্বমৈত্রীর আদর্শ এবং ‘আবার তোরা মানুষ হ’ গানটি এই নাটকের জনপ্রিয়তার মূল। নতুবা মানসী চরিত্রটিকে তিনি যেভাবে মানসরাগে রঞ্জিত করে তার উপর আধুনিক যুগের সেবাধর্মের আবরণ আরোপ করেছেন, তা কাহিনি ও ভাবের দিক থেকে অনৈতিহাসিক।

তারাবাঈ

[সম্পাদনা]

তারাবাঈ (১৯০৩) দ্বিজেন্দ্রলালের প্রথম ঐতিহাসিক নাটক। যে যুগে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দে কাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন, এটি সেই যুগেরই রচনা। ঐতিহাসিক নাটক লেখার দক্ষতার তখনও তাঁর আয়ত্ত হয়নি। তাই এই নাটকে অনেক দোষত্রুটি দেখা যায়। অমিত্রাক্ষর ছন্দেও তাঁর অধিকার ছিল না, দীর্ঘ ক্রিয়াপদের প্রয়োগে তা নিতান্ত শ্রুতিকটু হয়ে উঠেছে। কর্নেল টডের অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান গ্রন্থের বিবরণ অবিকল অনুকরণ গিয়ে নাট্যকার এই নাটকে দিগভ্রান্ত হয়েছেন। টডের বিবরণে নানা ঘটনা বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে। এই বিক্ষিপ্ততা নাটকীয় রসের অবিচ্ছিন্ন সমগ্রতা নষ্ট করেছেন। নাটকের মধ্যে সর্বাপেক্ষা জীবন্ত চরিত্র হচ্ছে সূর্যমল ও তাঁর স্ত্রী তমসা। উইলিয়াম শেকসপিয়রের ম্যাকবেথ নাটকের ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথ চরিত্র দুটির প্রভাব এই দুই চরিত্রের উপর পড়েছে। ম্যাকবেথের ন্যায় সূর্যমল রাজ্যলাভের উচ্চাশা পোষণ করেছেন এবং ডাইনিদের ভবিষ্যদ্বাণীর ন্যায় চারণীর ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর সেই উচ্চাশাকে বাড়িয়ে তুলেছে। লেডি ম্যাকবেথের মতো তমসাও দ্বিধাগ্রস্থ চিত্ত উত্তেজিত করে দৃঢ় ও কঠোর করতে পেরেছে। সূর্যমলের মধ্যে যে নিরুপায় ও ইতস্তত ভাব, রাজ্যলিপ্সা এবং বাৎসল্যের তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে, তার ফলে চরিত্রটি দর্শকের মনে গভীর রেখাপাত করে। পৃথ্বীরাজ ও তার কাহিনি নাটকের মধ্যে গৌণ হয়ে পড়েছে। এই নাটক রচনার সময় দ্বিজেন্দ্রলালের প্রহসন ও হাসির গানের প্রভাব শেষ হয়নি বলেই তারাবাঈ-এর স্থানে স্থানে কৌতুকরসের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তাঁর পরবর্তী ঐতিহাসিক নাটকগুলির সংহত গাম্ভীর্য এবং অচপল ভাবাবেগ তারাবাঈ-তে আসেনি।

রাণা প্রতাপ সিংহ

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের প্রথম প্রকৃত ঐতিহাসিক নাটক রাণা প্রতাপ সিংহ (১৯০৫)। এই নাটক থেকেই স্বাদেশিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ জাতীয়তাবাদী নাটকের যুগের সূচনা। মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা প্রতাপের অতুলনীয় বীরত্ব, অনুপম দেশপ্রেম ও অপার্থিব ত্যাগের ছবি নাট্যকার শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিক ধারণায় প্রতাপের সূক্ষ্ম কুলমর্যাদাবোধ সমর্থনীয় নাও হতে পারে, কিন্তু স্বদেশরক্ষার্থে তাঁর আপ্রাণ ও অবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। সংকল্প সাধনের জন্য তাঁর মতো দুঃসহ ক্লেশ বরণ এবং অসাধ্য ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তাঁর জীবন বড়োই দুঃখময়। রাজা হয়েও তিনি অতি দীন, বংশগৌরব রক্ষার চেষ্টায় বহু শ্রেষ্ঠ রাজপুত বীরের সাহায্য থেকে বঞ্চিত, নিজের ভাই শক্ত সিংহকে পেয়েও ছেড়েছেন, অন্যায়ের শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের পতিপ্রাণা স্ত্রীকে পর্যন্ত হারিয়েছেন। তাঁর চরিত্রের বেদনাময় গৌরব দর্শকচিত্তকে আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রতাপের পরেই শক্ত সিংহের চরিত্র উল্লেখযোগ্য। শক্তের উল্লেখ টডের অ্যানালস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান গ্রন্থে থাকলেও নাটকের চরিত্রটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নাটকের মৌলিক সৃষ্টি। সে বীর, উদ্ধত, বিদ্বান ও ব্যঙ্গপ্রিয়। জীবনের প্রতি তার আসক্তি নেই; সমাজ ও ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধা নেই; প্রেম ও হৃদয়বৃত্তির সুকোমল লীলার প্রতি তার কোনও আকর্ষণও নেই। কিন্তু তার মনও অবশেষে দৌলত উন্নিসার প্রেমে বশীভূত হল। প্রেমের এই মহিমাময়ী বিশ্ববিজয়িনী শক্তি লেখক দেখিয়েছেন। নাটকে দৌলত উন্নিসা ও মেহের উন্নিসার চরিত্র বিশেষ সরসভাবে অঙ্কিত হয়েছে। উভয়েই শক্ত সিংহকে ভালোবেসেছে, কিন্তু একজন বৃক্ষের ন্যায় স্থির ও নির্বাক, অন্যজন নদীর ন্যায় চঞ্চল ও মুখর। তবে পিতার সঙ্গে মেহের উন্নিসার বিরোধ এবং তার প্রতাপের আশ্রয় গ্রহণের কোনও জোরালো কারণ নেই, শক্ত সিংহের প্রতি তার প্রেমও অর্থহীন, তার নিজের স্বীকারোক্তি ছাড়া এটা দর্শক জানতেও পারে না এবং এই প্রেমের প্রভাবও কোথাও ফুটে ওঠে না। আকবরের চরিত্রে লেখক ভালো ও মন্দের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। আকবর উদার ও গুণগ্রাহী, কিন্তু ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও নারীবিদ্বেষী।

দুর্গাদাস

[সম্পাদনা]

দুর্গাদাস (১৯০৬) নাটকে ঘটনার বাড়াবাড়িতে নাটকের ঐক্য ও সংহতি নষ্ট হয়েছে। বহু রকম চরিত্রের বৈচিত্র্যে এবং নানা ঘটনার বিভিন্নমুখিতায় কোনও বিশেষ কাহিনির প্রভাব মনে দাগ কাটে না। জয়সিংহ-কমলা-সরস্বতী আখ্যান অপ্রয়োজনীয়, শম্ভুজীর ঘটনাও পরিহার্য। সস্তা বীররসের অবতারণায় নাটকের গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য অনেক সময়ে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলালের উদারতা ও অপক্ষপাত-গুণ কাশিম ও দিলীর খাঁর চরিত্রাঙ্কনে প্রমাণিত। দিলীর খাঁর মুখ দিয়ে তিনি হিন্দু-মুসলমান মিলনের অনেক কথা ব্যক্ত করেছেন। দুর্গাদাসকে তিনি দোষ ও দুর্বলতার অতীত আদর্শ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাতে চরিত্রটি অস্বাভাবিক ও অতিমানব-সুলভ হয়ে পড়েছে। নাট্যকার তাঁকে ট্র্যাজিক চরিত্র বলতে চেয়েছেন। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “ইহার ট্র্যাজিডিত্ব চিরজীবনের উপাসনার নিষ্ফলতায়, আজন্ম সাধনায়, অসিদ্ধতায়, প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত চেষ্টার পরাজয়ে। ইহার ট্র্যাজিডিত্ব ঐ এক কথায়—“ব্যর্থ হয়েছে-পারলাম না, এ জাতিকে টেনে তুলতে।”” কিন্তু ট্র্যাজেডির আবেগ ও বেদনাময় নিষ্ফল ভাবটি নাটকের মধ্যে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। ঔরংজীবের শেষ বয়সের ছবি এই নাটকে দেখানো হয়েছে। অবশ্য তাঁর ক্রূর, কুটিল, দ্বন্দ্বময় চরিত্রের পূর্ণতর রূপ পাওয়া যাবে পরবর্তী সাজাহান নাটকে। এই নাটকেও তিনি কপট, পরধর্ম-অসহিষ্ণু গোঁড়া মুসলমান বটে, কিন্তু তাঁর শেষ জীবনের ব্যর্থতা ও বিষণ্ণতা তাঁর চরিত্রটিকে করুণ করে তুলেছে। এখানে তিনি শৌর্য, বীর্য ও প্রভুত্বের আসনে অধিষ্ঠিত নন, বরং তিনি রাঠোর ও রাজপুতের কাছে পরাজিত, দুর্গাদাস ও দিলীর খাঁর দ্বারা উপেক্ষিতা এবং গুলনেয়ারের কাছে ঘৃণাস্পদ। অমিত শক্তিশালী ঔরংজীব যেন এদের কাছে নিতান্ত দুর্বল ও ছোটো হয়ে পড়েছেন। এদের দমন করার, শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা যেন তাঁর নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে। নাটকের মধ্যে সবচেয়ে জীবন্ত ভূমিকা গুলনেয়ারের। ইউরিপিডিসের ইলেকট্রা নাটকের ক্লাইটেমনেস্ট্রা অথবা উইলিয়াম শেকসপিয়রের কিং লিয়ার নাটকের গনেরিলের মতো সে প্রবল ব্যক্তিত্বশালিনী ও ইন্দ্রিয়পরায়ণা নারীচরিত্র। তার দুর্দম প্রবৃত্তি প্রচ্ছন্ন চোরাপথে বিচরণ করে না, বরং ঘূর্ণি হাওয়ার মতো সবার রোষ ও শাসন উড়িয়ে নিয়ে বয়ে যায়; সে গুরুতর অন্যায় করেও কোনওদিন মাথা হেঁট করেনি, সম্রাজ্ঞীর দৃপ্ত ভঙ্গিমায় নিজেকে সর্বনাশের মধ্যে বিলীন করে দিয়েছে।

মেবার পতন

[সম্পাদনা]

নূরজাহান রচনার পর রচিত হয় মেবার পতন (১৯০৮)। এটি উদ্দেশ্যমূলক নাটক। এক উদার সাম্যমূলক ‘মহানীতি’ প্রচার করার জন্যই এটি রচিত। নাটকের ‘ভূমিকা’ অংশে নাট্যকার নিজেই লিখেছেন, “এই নাটকে আমি এক মহানীতি লইয়া বসিয়াছি, সে নীতি বিশ্বপ্রেম।” কল্যাণী, সত্যবতী ও মানসী—এই তিনটি চরিত্র যথাক্রমে দাম্পত্য প্রেম, জাতীয় প্রেম ও বিশ্বপ্রেমের মূর্তি রূপে কল্পিত হয়েছে। এই নাটকের প্রতিপাদ্য বিষয় হল “বিশ্বপ্রীতিই সর্বাপেক্ষা গরীয়সী”। নাটকীয় ঘটনা এবং পাত্রপাত্রীর কথোপকথনে নাট্যকারের বক্তব্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠায় নাটকের ক্রন্দনময় সুর এক সান্ত্বনাময় শক্তিতে নির্বাণ লাভ করেছে। নাট্যকার হঠাৎ অমরসিংহ ও মহাবৎ খাঁর কাল্পনিক মিলনের দৃশ্য সংস্থাপিত করে স্বদেশরক্ষায় সংগ্রাম ব্যর্থ প্রতিপন্ন করেছেন এবং গোবিন্দসিংহ, সগরসিংহ, অজয়সিংহ প্রমুখের মহৎ আত্মোৎসর্গ অকারণ লঘু করে দিয়েছেন। তিনি কাহিনি পরিকল্পনার মধ্যে স্বদেশপ্রেমকেই মূল ভাব রূপে গ্রহণ করেছেন, বিশ্বপ্রেমকে নয়। বিশ্বপ্রেম নাট্যঘটনা ও নাট্যরসের পক্ষে অপ্রয়োজনীয় একটি পার্শ্বচরিত্রের মধ্যেই ফুটে উঠেছে। সেই চরিত্র অনুযায়ী নাটকের পরিণতি ঘটানো অত্যন্ত অসংগত হয়েছে। সেইজন্য নাটকের অন্তিম প্রভাব নৈরাশ্যবাদের স্থলে হয়ে দাঁড়িয়েছে আশাবাদ। এক দুর্লঙ্ঘ্য দুর্জ্ঞেয় নিয়তি সর্বনাশা বাহু বিস্তার করে যেন সব কটি চরিত্রকে জাপটে ধরেছে। একে মেনে নেওয়া ছাড়া যেন আর উপায় নেই—গোবিন্দসিংহ ও অমরসিংহ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, কিন্তু একে রোধ করতে পারেননি। গোবিন্দসিংহ মহিমাময় রাজপুতকুলের অত্যুজ্জ্বল আদর্শ। মহারাণা প্রতাপ সিংহের প্রিয়তম পার্শ্বচর তিনি। সেই মহাবীর স্বর্গীয় রাণার স্বদেশপ্রীতি ও কুলগৌরব তিনি বহন করছেন। সেইজন্য তিনি কন্যাকে ত্যাগ করেছেন, পুত্রকে হারিয়েছেন, কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাধীনতা রক্ষার জন্য চেষ্টা করে গিয়েছেন। এই অটল, অটুট ত্যাগ ও সংকল্পের তুলনা নেই। অমরসিংহের মধ্যে একটা অনুভূতিপ্রবণ, বিশ্লেষণশীল, সূক্ষ্মদর্শী ভাব দেখা যায়। তিনি যে ভাগ্যের উত্তাল তরঙ্গে হাল ছেড়ে দিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে আছেন, যেন ভবিষ্যৎ পরিণতি স্পষ্ট দেখেও তা এড়াবার ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি ত্যাগ করেছেন।

অন্যান্য ঐতিহাসিক নাটক

[সম্পাদনা]

নূরজাহান, সাজাহানচন্দ্রগুপ্ত নাটক তিনটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, অর্থাৎ দেশপ্রেম বা বিশ্বমৈত্রী অথবা অনুরূপ ভাবাদর্শ দ্বারা এগুলির রচনা নিয়ন্ত্রিত হয়নি। এগুলিতে ইতিহাসকে অবলম্বন করে নাট্যকার মানবিক দ্বন্দ্বের অবতারণা করেছেন। এগুলি তাঁর মানসরাগে ততখানি রঞ্জিত নয় বলে কিছু ত্রুটি সত্ত্বেও নাট্যরসে সঞ্জীবিত। হয়তো এই কারণেই সাজাহানচন্দ্রগুপ্ত এতকাল পরেও নাট্যরসিক মহলে আদৃত।

নূরজাহান নাটকে ইতিহাস অবিকৃতভাবে অনুসৃত না হলেও এর গঠনরীতি অত্যন্ত সুসম্পূর্ণ। স্থান-কাল-পাত্রের এমন ঐক্য, পার্শ্বচরিত্রগুলির সংঘাতে নায়িকা চরিত্রের প্রস্ফুটন এবং কাহিনির অগ্রগতি এমন সুন্দরভাবে দ্বিজেন্দ্রলালের আর কোনও নাটকে দেখা যায় না। নাটকটি নায়িকা-নির্ভর এবং নূরজাহানের নারী-প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর উচ্চাশার দ্বন্দ্বই নাটকটির প্রাণ। নূরজাহান প্রবৃত্তির দুরন্ত ঝড়ের ধ্বংসলীলার একটি করুণ ট্র্যাজেডি। নাট্যবিচারে এটিই দ্বিজেন্দ্রলালের শ্রেষ্ঠ রচনা। সাজাহান বহুপঠিত ও বহুবার অভিনীত নাটক। এর পরিণতিতে মৃত্যু নেই, তবুও এটি ট্র্যাজেডি। আধুনিক ট্র্যাজেডিতে মৃত্যুকে অপরিহার্য বলে মনে করা হয় না। দ্বিজেন্দ্রলালই সর্বপ্রথম শেকসপিয়রীয় ট্র্যাজেডির আদর্শকে অতিক্রম করে বাংলা নাটকে আধুনিক ট্র্যাজেডির সূত্রপাত ঘটান। এই নাটকের ট্র্যাজেডি এর নায়ক সাজাহানের অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যেই প্রস্ফুটিত। সাজাহান সম্রাট, অন্যায়কে তিনি ক্ষমা করতে পারছেন না, এটাই ট্র্যাজেডি। সাজাহান শুধু শারীরিকভাবেই পঙ্গু নন, অন্ধ স্নেহে মানসিকভাবেও পঙ্গু। পাপিষ্ঠ ঔরংজীবকে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করার মধ্যে দিয়েই সাজাহানের পিতৃজীবনের ট্র্যাজেডির বেদনা আরও করুণ হয়ে ফুটে উঠেছে। সাজাহানের চরিত্র যে শেকসপিয়রের কিং লিয়র নাটকের রাজা লিয়ার চরিত্রের ছায়া রচিত তাতে সন্দেহ নেই। হয়তো এই কথা স্মরণ করেই মোহিতলাল মজুমদার এই চরিত্রটিকে মুঘল বাদশাহ না বলে বলেছেন “[সাজাহান] ভাবপ্রবণ বাঙালী ভদ্রলোক মাত্র”। প্রকৃতপক্ষে চরিত্রটি কল্পনা করার সময় দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁকে মুঘল সম্রাট রূপেই কল্পনা করেছিলেন, কিন্তু সাজাহানের মুখে তিনি যে সব দীর্ঘ উচ্চ্বাসময় সংলাপ দিয়েছেন (যেমন, “পিতা সব, আর পুত্রদের খাইও না, তাদের বুকের উপর রেখে ঘুম পাড়িও না” ইত্যাদি), সেগুলিই এইরকম অভিযোগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে। সাজাহান নাটকের অন্যান্য কোনও চরিত্রই কিন্তু দ্বন্দ্বময় নয়। এমনকি নাটকে সাজাহানের চেয়ে অনেক বেশি স্থান জুড়ে থাকা ঔরংজীব চরিত্রে আমরা তীব্র দ্বন্দ্বের পরিচয় দেখতে পাই না। দারা ও নাদিরা যাত্রার ছায়ায় রচিত। যুদ্ধের গম্ভীর পরিবেশে পিয়ারার ‘দিল্লীকা লাড্ডু’ প্রার্থনা নিতান্তই অস্বাভাবিক মনে হয়। সুজা-পিয়ারার এবং মহামায়া-যশোবন্তের দৃশ্যগুলি বাদ দিলেও নাটকের কোনও অঙ্গহানি হয় না। অতএব এইরকম অবান্তর দৃশ্য সংযোজন নাট্যকারের অক্ষমতারই পরিচায়ক। সাজাহান-এর মতো চন্দ্রগুপ্ত-ও দ্বিজেন্দ্রলালের জনপ্রিয় নাটক। নাটকটির নায়ক-বিচার ও নামকরণ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও এতে চাণক্য চরিত্রে একটি নতুন আলোকপাত করা হয়েছে। এই বিষয়ে নাট্যকার যে কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, নাটক রচনায় তাঁর সে অধিকার আছে। চাণক্য চরিত্রটিকে ইতিহাসের অনুগত করেও তিনি তাঁর মধ্যে স্নেহ ও ক্ষমতালিপ্সার যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছেন তা নাট্যরস-সমুত্তীর্ণ। এই চরিত্র আজও শ্রেষ্ঠ নটের শক্তিপরীক্ষার মাণদণ্ড। নাটকটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। এতে এণ্টিগোনাসের উপকাহিনিটি মূল কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। ঘটনার অসম্ভাব্যতাও (প্রহরীবেষ্টিত নন্দের পুরোদ্যানে চন্দ্রগুপ্তের একাকী প্রবেশ এবং মাকে নিয়ে প্রস্থান) অন্যতম ত্রুটি। চরিত্রসৃষ্টির ক্ষেত্রেও কিছু অসংগতি দেখা যায়। যুদ্ধ ও রক্তপাত ছাড়া যিনি আর কিছুই জানেন না, সেই আলেকজাণ্ডারকে দিয়ে অযৌক্তিকভাবে এখানে ‘কবিত্বের কসরত’ করানো হয়েছে। ছায়ার মুখে নাট্যকার যে ভাষা দিয়েছেন তা অশিক্ষিত পার্বত্য নারীর মুখে মানানসই হয়নি। প্রেম প্রসঙ্গে তার সাদা-কালোর সমস্যার নামে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বর্ণবিদ্বেষের আভাস পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। হেলেন যখন তার পিতা কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন তার সংলাপের মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যে মিলনের বাণী ধ্বনিত হয়েছে, তাও নিঃসন্দেহে কালানৌচিত্য দোষে দুষ্ট।

নূরজাহান

[সম্পাদনা]

ট্র্যাজেডির বিস্তার ও জটিলতা যেমন সাজাহান নাটকে সবচেয়ে বেশি, ট্র্যাজেডির তীব্রতা ও গভীরতা তেমনই নূরজাহান (১৯০৮) নাটকে সর্বাধিক। সাজাহান নাটকে ট্র্যাজেডি সঞ্চারিত হয়েছে সাজাহান, ঔরংজীব, দারা, সুজা, মহম্মদ, সোলেমান প্রভৃতি চরিত্রে; কিন্তু নূরজাহান নাটকে ট্র্যাজেডি একমাত্র নূরজাহানের চরিত্র অবলম্বন করেই অনন্য মহিমা লাভ করেছে। নাটকটি নিছকই নায়িকা-নামাঙ্কিত নয়, বরং সেই নায়িকা পরিপূর্ণভাবে এই নাটকে ট্র্যাজিক গৌরবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা নাট্যসাহিত্যে আরও অনেক ঐতিহাসিক নাটক নায়িকা-নামাঙ্কিত। তার মধ্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃষ্ণকুমারী অথবা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশ্রুমতী বা সরোজিনী নাটকের নাম করা যায়। কিন্তু সেই সব নাটকের ট্র্যাজিক গুরুত্ব অন্যান্য চরিত্রের উপর নির্ভরশীল। নায়িকাদের সুকোমল জীবন নীরব দুঃখভোগের মধ্যে দিয়ে করুণ হয়েছে, কিন্তু ট্র্যাজিক হয়নি। নূরজাহান ব্যতিক্রম, বোধহয় বাংলা নাট্যসাহিত্যে এমন সংঘাত-তাড়িত ট্র্যাজিক নারী-চরিত্র আর একটিও নেই।

সমালোচক নিকোল অ্যালারডাইস তাঁর দ্য থিয়োরি অফ ড্রামা গ্রন্থে লিখেছেন, “The central figure, then of all great tragedies will be a man or else a woman who like Lady Macbeth or Iphigenia or Medea, has in her temper some adamant qualities and severity of purpose not ordinarily associated with the typically feminine.” অর্থাৎ, ট্র্যাজেডির প্রধান চরিত্র যদি নারী হয়, তবে সেই নারীকেও পুরুষোচিত কিছু বৈশিষ্ট্যে ভূষিত হতে হবে। স্নেহ, মমতা, করুণা, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি নারীসুলভ কোমল গুণ বটে, কিন্তু ট্র্যাজেডির জন্য চাই নির্মম কাঠিন্য, নিষ্করুণ আঘাত ও নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম। সাধারণ নারীর মধ্যে এগুলি সুলভ নয়। কেবল অসাধারণ নারীচরিত্রের মধ্যেই এই গুণগুলি থাকে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি-রচয়িতা ইউরিপিডিস, শেকসপিয়র কিংবা ইবসেনের নাটকে এমন নারীচরিত্র স্থান পেয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলালের নূরজাহানও এইরকমই এক অনন্যসাধারণ চরিত্র। ভারতের সর্বময় কর্ত্রী বলে নয়, নিদারুণ অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে তার জীবন একান্ত দুঃখময় ট্র্যাজিক মর্যাদা লাভ করেছে বলেই সে অনন্য। সে মিডিয়ার ন্যায় প্রতিহিংসা-পরায়ণ, লেডি ম্যাকবেথের ন্যায় অপ্রকৃতিস্থা এবং হেড্ডা গ্যাবলারের ন্যায় দুর্দম প্রবৃত্তির বশীভূতা। কিন্তু অ্যাগামেননের পত্নী ক্লাইটেমনেস্ট্রার সঙ্গে তার সাদৃশ্য সবচেয়ে বেশি। বীর ও উদার স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীহন্তাকেই সে ক্লাইটেমনেস্ট্রার মতো স্বামী বলে গ্রহণ করেছে। ক্লাইটেমনেস্ট্রার মতো সেও কন্যার কাছ থেকে আঘাত পেয়েছে এবং অন্তত ইউরিপিডিসের ক্লাইটেমনেস্ট্রার (ইলেকট্রা নাটকে) সেও তার অন্যায় অপরাধ সত্ত্বেও দর্শকের সহানুভূতির পাত্রী হয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলালও ইউরিপিডিস ও ইবসেনের মতো তাঁর নায়িকা চরিত্রে আদিম প্রবৃত্তির লীলা দেখিয়ে তাকে ঘৃণ্য করে তোলেননি, এক উদার ক্ষমাসুন্দর সহানুভূতির যোগ্যই করে তুলেছেন। তাই নূরজাহান শুধুমাত্র ক্ষমতালোভী লালসাময়ী শয়তান নয়; সে দুর্দমনীয় আবেগ ও দুষ্প্রতিরোধ্য বিবেকের নিষ্ঠুর সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক অসহায়া নারী।

সমগ্র নূরজাহান নাটকে দর্শক যেন একটি ক্রুদ্ধ ঝড়ের উন্মত্ত অভিযান লক্ষ্য করে। সেই ঝড়ের রক্তচক্ষু ও পক্ষবিস্তারের আভাস প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় এবং শেষ দৃশ্যে তার দলিত, বিধ্বস্ত, সর্বগ্রাসী রূপ চারিদিকে আতঙ্ক বিস্তার করে প্রকটিত হয়ে ওঠে। প্রথমেই প্রকাশিত হয় নূরজাহান ও শের খাঁর সুখের দাম্পত্য-চিত্র। নূরজাহান তার জীবনের পঙ্কিল আবর্তকে তলদেশে আটকে তার সংসারের সামনে মমতা ও কর্তব্যের এক পূর্ণ বিকশিত পদ্ম মেলে ধরেছিল। সেই পদ্মের সুরভিত সৌন্দর্যে সরল, পত্নীপ্রাণ শের খাঁর জীবন আত্মহারা হয়ে ছিল। কিন্তু আচমকা ঝড়ের তাড়নায় সেই নিশ্চিন্ত হাস্যময় পদ্মটি কেঁপে উঠল। সেলিম ভারত-সম্রাট, শের খাঁর পাঁচ হাজারির পদ—এই দুইয়ের মাঝে নূরজাহানের অন্ধকার মনে অবরুদ্ধ শয়তানের দাপাদাপি শুরু হয়ে গেল। এক উৎসব-মুখর রাতের কামনা-কলুষিত কটাক্ষের মধ্যে দিয়ে সেই শয়তান তার অন্তরের সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করেছিল; বহুদিন ধরে সেখানে সে চুপ করে ছিল বটে, কিন্তু আবার তার ক্ষুধার্ত হুংকার শোনা গেল। আগ্রায় আসার পর আবার সেলিমের সঙ্গে তার চোখাচোখি হল। শয়তানের মত্ততা আরও বেড়ে গেল। নূরজাহানের বাহ্য রূপেও ফুটে উঠল সেই শয়তানি, সরল ও ক্ষমাশীল শের খাঁর দৃষ্টিও তা ধরে ফেলল। একদিকে স্বামীর প্রতি তার শ্রদ্ধামিশ্রিত আনুগত্য, অন্যদিকে একটি দুর্দম ভোগলোলুপ জিগীষা—এই দুইয়ের প্রাণঘাতী আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে সে স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে এল বর্ধমানে। তার বিবেক ও সংসার দুইই বাঁচল। কিন্তু বর্ধমানে এসেই সে বুঝল, এ তার আত্মরক্ষা নয়, আত্মপ্রবঞ্চনা; কারণ অবদমিত হৃদয়াবেগ ততক্ষণে হতাশ আক্ষেপে তার অন্তর ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছে। শের খাঁর সঙ্গে শেষবার কথা বলতে গিয়ে সে স্বামীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। এ তার অপরাধ নয়, এ তার নিরুপায় পরাজয়। এরপর শের খাঁ নিহত হলেন, নূরজাহানকে আনা হল আগ্রার প্রাসাদে। কিন্তু সমস্যা তবুও মিটল না। বাহ্যিকভাবে নূরজাহানের পথ কণ্টকমুক্ত হল বটে, কিন্তু অন্তরে সেই পথ আরও বিঘ্নসংকুল হয়ে উঠল। নূরজাহান মনে মনে তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য নিজেকেই পরোক্ষভাবে দায়ী করতে লাগল এবং জীবনে যে স্বামীকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে পারেনি, মৃত্যুর পর তারই স্মৃতির প্রতি আনুগত্য রক্ষা করে স্বামীহন্তার বিরুদ্ধে এক ক্ষমাহীন আক্রোশ জাগিয়ে রাখল। অথচ আগ্রা অবরোধের সময় যখন মুক্তির সুযোগ এল তখন এক অনির্দেশ্য বেদনায় তার মন হতাশ হয়ে পড়ল। এরপর আবার তার সামনে প্রলোভন উপস্থিত হল আত্মত্যাগী রেবা ও স্বার্থবাদী আসফের মাধ্যমে। নূরজাহান মনে মনে দগ্ধ হতে লাগল। অবশেষে সে সেলিমকে বিবাহ করতে সম্মত হল, নিজের লালসা-তৃপ্তির জন্য নয়, স্বামীহন্তার উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে। যে দাহনে সে জ্বলছিল, সেই দাহনে এবার জ্বলে উঠল গোটা সাম্রাজ্য। যে শয়তান বাসা করে ছিল তার মনে, তারই হাতে সে তুলে দিল ক্ষমতার রজ্জু। মনে রাখতে হবে, এতে প্ররোচনা ছিল তার ভাই আসফের এবং প্রাথমিক সহযোগিতা ছিল কন্যা লয়লার। কিন্তু যখন সে শয়তান সর্বনাশের অতল পথে তাকে টেনে নিয়ে চলল, তখন আসফ ও লয়লা ফিরে গেল, কিন্তু ফেরার উপায় ছিল না নূরজাহানের। এই অনিবার্য শক্তির তাড়নায় সে চারিদিকে নির্বিকার কাঠিন্যের সঙ্গে ধ্বংসের বীজ বপন করে চলল। এই সর্বব্যাপী ধ্বংসলীলার শোষণে তার নারীত্ব ক্রমে লুপ্ত হয়ে গেল এবং যে শ্রদ্ধাশীল পতিনিষ্ঠার প্রেরণাতে তার উৎপত্তি তাও নিঃশেষে শুকিয়ে গেল। যে আগুন সে পরের ঘর পোড়াবার জন্য জ্বালিয়েছিল, সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল তার নিজের ঘরখানিও। সে ছটফট করে নিজেকে রক্ষা করতে চাইল, কিন্তু পারল না। শেষ দৃশ্যে এই অগ্নিদগ্ধ নূরজাহানের অপ্রকৃতিস্থ আর্তনাদ এক আতঙ্কিত বেদনায় দর্শকের অন্তঃকরণ স্তব্ধ করে দেয়।

অ্যারিস্টটল তাঁর পোয়েটিকস গ্রন্থে ট্র্যাজেডির চরিত্রগুলি সম্পর্কে বলেছেন, “…The most important is that they should be good”. নূরজাহানও অবিমিশ্র পিশাচিনী নয়; স্বাভাবিক নারীসুলভ গুণ ও ধর্মজ্ঞান তার মধ্যেও আছে। কিন্তু দুর্দম প্রবৃত্তির আকর্ষণে সেগুলি তার জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এজন্যই তার চরিত্র ট্র্যাজিক-মহিমা লাভ করে দর্শকের সহানুভূতির যোগ্য হতে পেরেছে। নূরজাহান নাটকে যেভাবে আদিম প্রবৃত্তির ক্রিয়াচঞ্চল রূপ দেখানো হয়েছে এবং যেভাবে চরিত্রের ভিতর থেকে ট্র্যাজেডির উৎপত্তি হয়েছে তাতে নাটকটি শেকসপিয়রীয় ট্র্যাজেডির সমতুল্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি চরিত্রের মূল থেকে উৎপন্ন হলেও এতে একটি অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য শক্তির অদৃশ্য লীলা থাকবেই, তা না হলে ট্র্যাজেডি দর্শকের অন্তরে এমন সীমাহীন হাহাকার উদ্রেক করতে পারে না। এমনকি, শেকসপিয়রের নাটকেও আকস্মিক ঘটনা-সংযোগ, আত্যন্তিক দুর্ভাগ্য প্রভৃতি স্থান পেয়েছে। নূরজাহান নাটকেও ট্র্যাজেডির দায় নূরজাহানের সবচেয়ে বেশি হলেও এতে অনিবার্য শক্তির অলঙ্ঘ্য নিয়ন্ত্রণ-লীলা বারংবার অনুভূত হয়। সে পরোক্ষভাবে শের খাঁ ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর জন্য দায়ী। অথচ এদের কারও মৃত্যুই তার ইপ্সিত ছিল না, কারণ একজনের কাছ থেকে সে পেয়েছিল সংসার, আর অন্যজনের কাছ থেকে সাম্রাজ্য। নাটকের ট্র্যাজেডির জন্য তার দায়ই সবচেয়ে বেশি সন্দেহ নেই; কিন্তু জাহাঙ্গীর, আসফ, লয়লা প্রভৃতি সকলেরই কিছু না কিছু দায় আছে তাও অস্বীকার করা চলে না। ট্র্যাজেডির জগৎ এই সর্বগ্রাসী দুঃখের জগৎ। এখানে সকলেই তাদের ভাব ও আচরণের দ্বারা আমাদের আকাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিক অবস্থাকে উল্টিয়ে দেয় এবং সকলেই এক অলঙ্ঘ্য দুঃখ-পরিণতির দিকে অনিবার্য বেগে অগ্রসর হয়। ট্র্যাজেডির এই অন্তহীন, নিষ্কৃতিহীন সর্বময়তা নূরজাহান নাটকে ফুটে উঠেছে। বাহ্যত নূরজাহানের পরাজয় ও পতন ঘটল মহাবৎ খাঁ-সাজাহান-কর্ণসিংহের কাছে। কিন্তু আসলে তার বড়ো পরাজয় ঘটল অন্তরে—সে পরাজয় তার শয়তানি সত্তার কাছে নারীসত্তার। নূরজাহান যতই একটির পর একটি অন্যায় কাজ করেছে, ততই তার অন্তরের নারীসত্তা নিরুপায়ভাবে আর্তনাদ করতে করতে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সেই শয়তানি-সত্তাটির বিলোপ ঘটল এবং তখনই বাইরে প্রকাশিত হয়ে পড়ল তার অন্তরের সত্তাটি। দেখা গেল, পরাজিত ক্ষতবিক্ষত অপ্রকৃতিস্থ এক নারী। উপরের দেবতা তাকে শাসন করার জন্য ঝড়ের গর্জন ও বিদ্যুতের কশাঘাত শুরু করেছেন, নিচের মানুষ তাকে দমন করার জন্য তার শক্তি ও দর্প চূর্ণ করে তাকে সহায়-সম্বলহীনা এক ভিখারিণী করে ফেলেছে।

শের খাঁ ও জাহাঙ্গীর চরিত্র দুটি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এদের মধ্যে একটি গূঢ় সাদৃশ্য আছে। নারীর প্রেমতৃষ্ণা উভয়ের জীবনেই করুণ পরিণতির কারণ হয়েছে। শের খাঁ স্বেচ্ছায় ঘাতকের হাতে মৃত্যুবরণ করলেন, আর জাহাঙ্গীর তিলে তিলে নিজের জীবন শেষ করে দিলেন। শের খাঁ অমিত শক্তিশালী বীর, কিন্তু তাঁর উদার হৃদয়ের সবটা জুড়ে এক সীমাহীন ভালোবাসা ব্যপ্ত হয়ে ছিল। কিন্তু সেই ভালোবাসা নূরজাহানের কুণ্ঠিত হৃদয়ে আহত হয়ে আর্তনাদ করে উঠল। শের খাঁর অভিমান-ক্ষুব্ধ অন্তর নালিশ করল না, কিছুই বলল না, মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে একটি মৌন দীর্ঘশ্বাস চিরকালের জন্য নূরজাহানের অন্তরের গভীরে সঞ্চিত করে রেখে গেল।

জাহাঙ্গীরের চরিত্র আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ক্রিয় মনে হলেও আসলে তাঁর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব কাজ করছে। তাঁর অভিমান ছিল যে, তিনি ন্যায়পরায়ণ। কিন্তু এই ন্যায়পরায়ণতা বারংবার তাঁর দুর্দমনীয় রূপতৃষ্ণার কাছে পরাজিত হয়েছে। তিনি জানেন, অন্যের বিবাহিতা পত্নীর প্রতি লোভ করা অন্যায়; তিনি জানেন, শের খাঁকে বিনা কারণে হত্যা করাও অপরাধ। তবুও তিনি কঠোরভাবে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারেননি। নূরজাহানের ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর তার একটির পর একটি নৃশংস কাজে জাহাঙ্গীরের ন্যায়বোধ তীব্রভাবে আহত হয়েছে, অথচ তা প্রতিরোধ করার আগ্রহ বা শক্তি তাঁর থাকেনি। সেজন্য নিজের জাগ্রত বিবেকবুদ্ধিকে জোর করে নিস্তেজ করার জন্য তিনি আরও বেশি মদ্যপানে করেছেন, আরও বেশি সম্ভোগের স্রোতের গা ঢেলে দিয়েছেন, “সুরা, সৌন্দর্য ও সঙ্গীত আমায় ঘিরে থাকুক! আর তার উপর তুমি তোমার রূপ, কণ্ঠস্বর, আলিঙ্গন দাও, প্রিয়ে। চক্ষু থেকে পৃথিবী নিভে যাক।” এই সব কথার মধ্যে পরিতৃপ্তি সৌন্দর্যকামনা নেই, এগুলির মধ্যে এক মরণাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির অন্তিম বেদনা ধ্বনিত হয়েছে। অধ্যাপক সাধনকুমার ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “এই অনিচ্ছা অলসের বা দুর্বলের অনিচ্ছা নহে, এই অনিচ্ছার উৎস আত্মগত অবসাদ—আত্মপীড়ন কামনা। এই সময় হইতে জাহাঙ্গীরের মধ্যে এক বৈরাগ্যের করুণ সুর বাজিতে থাকে—মনে হয়, তিনি যেন নিজের প্রতি নিজে প্রতিশোধ লইতেছেন।”

নূরজাহানের কন্যা লয়লা নাটকে নূরজাহানের এক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি রূপে উপস্থিত। লয়লার সঙ্গে গ্রিক নায়কের ইলেকট্রা চরিত্রের সাদৃশ্য দেখা যায়। ইলেকট্রার ন্যায় লয়লাও পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে সংকল্পবদ্ধ এবং মাতৃ-অপরাধের প্রতিকারে প্রবৃত্ত। ইউজিন ও’নিলের মউর্নিং বিকমস ইলেকট্রা নাটকের এজরা ম্যাননের স্ত্রী ক্রিস্টিনের সঙ্গে কন্যা ল্যাভিনিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই প্রসঙ্গে তুলনীয়। লয়লার মনও নূরজাহানের ন্যায় কঠোর, সর্বনাশী শক্তির সঙ্গে সেও প্রথমে হাত মিলিয়েছিল। কিন্তু খসরুর মৃত্যুর পর আহত, অনুতপ্ত চিত্তের সে এই শক্তির কাছ থেকে সরে দাঁড়াল। তখন থেকে আর প্রতিহিংসাময়ী কন্যা নয়, বরং স্নেহ, মমতা ও করুণায় গড়া নারী। তার এই নারীসত্তার সঙ্গে নূরজাহানের শয়তানি সত্তার তীব্র লড়াই চলছে। কিন্তু যখন নূরজাহানের শয়তানি সত্তা বিলুপ্ত হয়ে গেল, তখন আর নূরজাহানের সঙ্গে তার কোনও বিরোধ রইল না। তখন কন্যার অপার স্নেহ ও মমতা নিয়ে সে অভাগিনী মায়ের দুঃখ চোখের জলে মুছিয়ে দিতে চাইল। ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা উল্কাপিণ্ডের ন্যায় খসে পড়ল, কিন্তু করুণা ও মমতায় স্নিগ্ধ জ্যোতি অকম্পিত শিখায় জ্বলতে লাগল।

সাজাহান

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের ঐতিহাসিক নাটকগুলির মধ্যে সাজাহান (১৯০৯) শ্রেষ্ঠ এই বিষয়ে সমালোচকেরা প্রায় একমত। নাটকটির জনপ্রিয়তা পরবর্তীকালেও অক্ষুণ্ণ ছিল। নাটকের মধ্যে বহু ধরনের চরিত্র এবং বিভিন্ন উপকাহিনি থাকা সত্ত্বেও সুনিপুণ শিল্পকৌশলে সব ঘটনা ও চরিত্রগুলিকে অবিচ্ছিন্নভাবে গেঁথে দিয়েছেন নাট্যকার। নাটকটির অভিনয়ের সময় ঘটনাপুঞ্জ অতি দ্রুত তালে পা ফেলে জটিল ভাবতরঙ্গের নিমেষের উত্থান ও নিমেষের পতনে অন্তর রুদ্ধ করে দেয়। মনে হয়, পলক ফেলারও অবসর নেই। ঐতিহাসিক কাহিনির প্রতি বিশ্বস্ত থেকে, সেই কাহিনিকে এক অখণ্ড অবিচ্ছিন্ন নাটকীয় রসে জমিয়ে তোলা সহজ কাজ নয়। নাট্যকার সেই কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। সাজাহানের নামে নামকরণ হলেও, সাজাহান এই নাটকের প্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী চরিত্র নন। ড. সুকুমার সেন তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন, “সাজাহানের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় সাক্ষীর ভূমিকা। ট্র্যাজেডির দিক দিয়াও সাজাহান নামকরণের সার্থকতা আছে বলিয়া বোধ হয় না।” সাজাহান পুরুষসিংহ বটে, কিন্তু সেই সিংহ খাঁচায় বদ্ধ, তাঁর ক্রুদ্ধ গর্জন নিরন্ধ্র কারাপ্রাচীর নিষ্ফলভাবে মাথা ঠুকছে, বাইরে কারও কানে তা প্রবেশ করছে না। রাজা লিয়ারের ন্যায় সন্তানের কৃতঘ্নতায় তিনি নিঃসঙ্গভাবে তাঁর আক্রোশ ও অভিশাপ রুদ্র প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু জগৎ তাঁর অতীত ঐশ্বর্য ও ভূতপূর্ব ক্ষমতার কথা চিন্তা করে তাঁকে সম্ভ্রম জানায়নি। তাঁর চরিত্র আদ্যন্ত একই রকম—স্নেহাতুর, অপ্রকৃতিস্থ ও অসহায়। তিনি চলমান ঘটনার নিরুপায় স্রষ্টা, শক্তিমান স্রষ্টা নন। প্রকৃতপক্ষে যিনি কাহিনির মধ্যস্থলে বিরাজ করে সমস্ত চরিত্রকে নিয়ন্ত্রিত করছেন, তিনি ঔরংজীব। ঔরংজীবের কুটিল, নিষ্ঠুর চক্রান্ত অজগরের ন্যায় অন্যান্য চরিত্রগুলিকে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরেছে, তারা যেন নিরুদ্ধ হাহাকারে জীবন সাঙ্গ করেছে। সাজাহান, দারা, সুজা, মোরাদ, সোলেমান, মহম্মদ—এতগুলি চরিত্রের করুণ ট্র্যাজেডি কেবল একটিমাত্র লোকের জন্য ঘটেছে। অথচ নাট্যকার তাঁকে একেবারেই নির্দ্বন্দ্ব হৃদয়হীন পিশাচ করেও আঁকেননি। তিনি নিষ্ঠুর, উৎপীড়ক ও কূটনৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন বটে, কিন্তু তিনি একেবারেই স্নেহহীন, যুক্তিহীনও নন। মাঝে মাঝে তাঁর মেঘাচ্ছন্ন হৃদয়াকাশ চিরে কোনও সুকোমল বৃত্তি চকিত দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ঔরংজীবের সূক্ষ্ম শাণিত বুদ্ধি বারংবার জয়লাভ করেছে বটে, কিন্তু তাঁর সর্বশেষ পরাজয় হয়েছে হৃদয়বৃত্তির করুণ আবেদনে। দারার কাহিনি নাটকের মধ্যে সবচেয়ে দুঃখবহ, তাঁর সংগ্রাম দুঃখময় এবং সবশেষে তাঁর নিদারুণ শোচনীয় পরিণতি হৃদয়বিদারক। সোলেমান ও মহম্মদকে পিতৃভক্ত, কর্তব্যপরায়ণ, উদারহৃদয় চরিত্র রূপে দেখানো হয়েছে। দিলদার শেকসপিয়রের Fool চরিত্রের ন্যায় বাহ্যত মূর্খ ও নির্বোধ হলেও প্রকৃতপক্ষে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী ও হৃদয়বান চরিত্র। জাহানারার চরিত্রে স্নেহ ও ত্যাগ, বুদ্ধি ও হৃদয়, তীক্ষ্ণতা ও কোমলতার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। কর্ডেলিয়ার মতোই সে পিতার প্রতি স্নেহশীলা এবং মমতাময়ী, আবার বুদ্ধি ও কৌশলের খেলায় ঔরংজীবের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর এই শক্তিমতী প্রভাবশালী চরিত্রের পাশে পিয়ারার উচ্ছল প্রাণময় হাল্কা চরিত্র চমৎকার বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। পিয়ারার চপল পরিহাসপ্রিয় ভাসমান বাক্যমেঘের তলায় যে দুঃখ ও কষ্ট অল্প অল্প করে সঞ্চিত হয়ে আছে, তাতেই চরিত্রটি বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

চন্দ্রগুপ্ত

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের ঐতিহাসিক নাটকের চূড়ান্ত সাফল্য লক্ষ্য করা যায় সাজাহান নাটকে। মুঘল সাম্রাজ্যের কাহিনি শেষ করে নাট্যকার বিশ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন হিন্দু রাজত্বের দিকে। দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকার নবকৃষ্ণ ঘোষ তাঁর দ্বিজেন্দ্রলাল গ্রন্থে লিখেছেন, “মিনার্ভা থিয়েটারের অভিনেতা শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ ঘোষ মহাশয় একদিন কথায় কথায় দ্বিজেন্দ্রলালকে বলেন, ‘রায় সাহেব, এতদিন পিঁয়াজ রসুন খাইয়ে গায় গন্ধ ক’রে দিয়েছেন, এইবার একটু ঘি আলোচাল খাইয়ে দিন না।’ দ্বিজেন্দ্র উত্তর দেন, ‘আচ্ছা, এইবার তাই হবে।’ দ্বিজেন্দ্রের অন্তরঙ্গ শ্রীযুক্ত অধর মজুমদার মহাশয় বলেন—‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক সেই প্রতিশ্রুতির ফল।”

চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১) নাটকের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে নাট্যকারকে হিন্দু পুরাণ, কিংবদন্তি ও গ্রিক ইতিহাসের উপর নির্ভর করতে হয়েছিল। বিষ্ণুপুরাণ এবং মহাবংশ, দিব্যাবদান, মহাপরিনিব্বাণসুত্ত প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ এবং জাস্টিন ও প্লুটার্কের ইতিহাস-গ্রন্থে চন্দ্রগুপ্তের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। নাট্যকার নাটকের বীজ মোটামুটি এই সব গ্রন্থের বিবরণ থেকে সংগ্রহ করেছেন। কোথাও তিনি ঐতিহাসিক বিবরণ নিজের খেয়ালখুশি মতো পরিবর্তিত করেননি। পুরাণ, কিংবদন্তি ও জাস্টিনের বিবরণ অনুসরণ করে নাট্যকার চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্র বংশোদ্ভূত বলেছেন। অবশ্য আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয় বংশজাত। নাটকের প্রথম দৃশ্যে সেকেন্দারের (আলেকজান্ডার) সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের সাক্ষাৎকার বর্ণিত হয়েছে। চন্দ্রগুপ্ত নির্বাসনের কালে আলেকজান্ডারের সঙ্গে দেখা করে নন্দকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য উত্তেজিত করেছিলেন, এই ঘটনা ইতিহাস-প্রসিদ্ধ। সেলুকাস ও এণ্টিগোনাসের বিরোধের কথাও ইতিহাসবিদেরা স্বীকার করেন। অবশ্য এণ্টিগোনাস যে সেলুকাসের পুত্র এটি নাট্যকারের নিজস্ব কল্পনা। এখানে স্বাধীনতা প্রকাশ করে তিনি সুনিপুণ নাট্যদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। হেলেন ও চন্দ্রগুপ্তের বিবাহে নাটকের সমাপ্তি—এটিও ইতিহাসে আছে। চাণক্যের কূট চক্রান্তে চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন—এটিই নাটকের প্রধান ঘটনা এবং অবশ্যই ইতিহাসসম্মত। নাট্যকার চাণক্যের তীক্ষ্ণবুদ্ধি, জটিল কূটনীতি এবং অসামান্য ক্ষমতার বর্ণনা সম্ভবত মুদ্রারাক্ষস নাটকের প্রভাবে এঁকেছেন। তাই সংস্কৃত নাটকটির ন্যায় তাঁর নাটকেও চাণক্য মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেছেন। একমাত্র ছায়া ছাড়া আর সব চরিত্রই ঐতিহাসিক; সুতরাং নাট্যকার ইতিহাসের মর্যাদা যে রক্ষা করেছেন তা বলাই যায়। তবে চরিত্রগুলি বিচিত্র ঘটনার মধ্যে দিয়ে বিকশিত করাই নাট্যকারের দায়িত্ব ও কৃতিত্ব, ইতিহাস সেখানে তাঁকে সাহায্য করেনি।

চন্দ্রগুপ্ত বিশেষ জনপ্রিয় ও অভিনয়োপযোগী নাটক, কিন্তু এর নাট্যকলা ও ঘটনা-সংস্থাপন ত্রুটিমুক্ত নয়। ঘটনা ও চরিত্রের অসঙ্গতি ও অসংলগ্নতা অনেক স্থলেই লক্ষ্য করা যায়। নাটকের নামকরণও যথার্থ হয়নি। চাণক্যের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সমস্ত কাহিনিকে একেবারেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে; তাঁর পাশে চন্দ্রগুপ্তকে নিতান্ত ম্লান ও অপরিস্ফুট মনে হয়েছে। শক্তির পরীক্ষায় যে চন্দ্রগুপ্ত মহৎ নন তাও নাটকে একবার প্রমাণিত হয়েছে। একমাত্র প্রথম দৃশ্য ছাড়া সর্বত্রই তিনি নিষ্প্রভ। নাটকের মধ্যে দুটি কাহিনি আছে: চন্দ্রগুপ্ত, চাণক্য ও মুরাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রধান কাহিনি এবং সেলুকাস, এণ্টিগোনাস ও হেলেনকে কেন্দ্র করে নির্মিত গ্রিক উপকাহিনি। নাট্যকলা অনুযায়ী, উপকাহিনি সর্বথা মূল কাহিনির অধীন হবে এবং তা ঘটনার সাদৃশ্যে বা বৈসাদৃশ্যে মূল কাহিনির গতিকে দ্রুত ধাবমান করে তুলবে। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত নাটকে দুটি কাহিনি একেবারেই স্বতন্ত্র, এতে উপকাহিনিটি মূল কাহিনির উপর নির্ভরশীল হয়নি। শেষে হেলেনের বিবাহ দ্বারা দুটি কাহিনিকে যুক্ত করা হল বটে, কিন্তু দুটি নদী যেন সমান্তরাল রেখায় প্রবাহিত হয়ে অবশেষে একটি কৃত্রিম খালের দ্বারা মিলিত হল। হেলেন এবং চন্দ্রগুপ্তের সম্বন্ধটি ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে দেখা যায়, হেলেন চন্দ্রগুপ্তের কথা চিন্তা করছে, তারপর পঞ্চম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যেও সেলুকাস, হেলেন ও চন্দ্রগুপ্তের কথোপকথনের সময় মনে হয়, হেলেন চন্দ্রগুপ্তের প্রতি অনুরক্ত; কিন্তু অবশেষে দেখা যায় যে, হেলেন চন্দ্রগুপ্তকে ভালোবাসেনি। দুটি রাজ্যের মিলন সাধনের জন্যই সে চন্দ্রগুপ্তকে বিবাহ করতে উদ্যত হয়েছে। তার আত্মদান যেন হৃদয়বৃত্তির স্বাভাবিক পরিণতি নয়, যেন একটি রাজনৈতিক চাল মাত্র। চন্দ্রগুপ্ত ও হেলেনের মধ্যে কোনও সময়ে হৃদয়ের আদান-প্রদান বা বোঝাপড়াও হয়নি, হেলেনের সম্মুখে অকস্মাৎ একবার চন্দ্রগুপ্তের প্রেমের বিস্ফোরণ তাই অসংলগ্ন ও পূর্বাপর-সম্বন্ধ-রহিত মনে হয়। ছায়ার প্রেম উপেক্ষিত থেকে গেল অপর এক গভীরতর প্রেমের আকর্ষণে নয়, নেহাত প্রয়োজনের খাতিরে। ছায়ার প্রেমের মর্যাদা অকারণে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। নাটকে সংযোগস্থলের ঐক্য (Unity of Place) নেই। গ্রিস, আফগানিস্তান ও ভারতবর্ষে ঘটনাস্রোতে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়েছে। তৃতীয় অঙ্কের ষষ্ঠ দৃশ্যে নন্দের বীভৎস হত্যার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা রঙ্গমঞ্চে দেখানো অসঙ্গত। প্রাচ্য নাট্যকলা অনুযায়ী, এমন হত্যাদৃশ্য নিষিদ্ধ এবং পাশ্চাত্য নাটকে রঙ্গমঞ্চে হত্যা থাকলেও হত্যার এমন বিস্তারিত লোমহর্ষক দৃশ্য কখনও প্রশংসনীয় বা সমর্থনীয় হয়নি।

চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রে প্রথমে মনে পড়ে চাণক্যকে। চাণক্য নাট্যকারের অদ্ভুত সৃষ্টি। এই কৃষ্ণকায় শীর্ণ ব্রাহ্মণের মধ্যে যেন প্রতিহিংসার উত্তপ্ত লাভা টগবগ করে ফুটছে, সামান্য ফাঁক পেলেই যেন জ্বলন্ত অগ্নিস্রাব চারপাশের সব কিছু ভস্ম করে ফেলবে। চাণক্য ব্রাহ্মণের লুপ্ত তেজ ও ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর কুশাগ্র বুদ্ধি, অনধিগম্য কূটনীতি ও বজ্রকঠোর ব্যক্তিত্ব স্বীয় সংকল্প সিদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু চাণক্যের ট্র্যাজেডি এইখানে যে, এমন এক অসম শক্তিশালী, অমিত প্রভাবশালী চরিত্র শেষপর্যন্ত হঠাৎ ভেঙে পড়ল। তা হৃদয়ের কাছে বুদ্ধির পরাজয়, স্নেহের কাছে শক্তির পরাজয়। যে মূর্তিমান প্রতিহিংসা বীভৎস সর্বনাশী শক্তিকে প্রতিক্ষণ আলিঙ্গন করেছে, তা যেন স্নেহ-কোমলতার শান্তিজলে অবগাহনের পর নবজীবন লাভ করে বসল। চন্দ্রগুপ্ত অপেক্ষা উপনায়ক এণ্টিগোনাসের চরিত্র দর্শকের দৃষ্টি ও ঔৎসুক্য অনেক বেশি আকর্ষণ করে। এণ্টিগোনাস বীর, অহংকারী, উদার ও মহৎ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার চরিত্র নিতান্ত ট্র্যাজিক ও বিষাদময়। হেলেনের পাষাণ হৃদয়ে তার উচ্ছ্বসিত প্রেমতরঙ্গ আছাড় খেয়ে নিষ্ফল আর্তনাদ করেছে এবং পিতৃপরিচয়ের দুর্জ্ঞেয় রহস্য তাকে দিগভ্রান্ত করেছে। গ্রিক বীর ইডিপাস পিতাকে না জেনে হত্যা করেছিল, এবং এণ্টিগোনাসও না চিনে পিতার সঙ্গে শত্রুতা করেছে, এমনকি তাঁকে বন্দীও করেছে। এর মধ্যে যে irony আছে, তা সফোক্লিসের irony-র সমতুল্য। সেলুকাসের মধ্যে সন্তানবৎসল পিতৃত্ব এবং মুরার মধ্যে স্নেহাতুর মাতৃত্বের গৌরব ও মাধুর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সিংহল বিজয়

[সম্পাদনা]

চন্দ্রগুপ্ত নাটকের পরে দ্বিজেন্দ্রলাল যে নাটকগুলি লিখেছিলেন সেগুলি খুব উচ্চ শ্রেণির নয়। বাঙালি বীর বিজয়সিংহের সিংহল-বিজয়ের কাহিনি অবলম্বনে তিনি সিংহল বিজয় (১৯১৫) রচনা করেন। তবে ঐতিহাসিক ঘটনা অপেক্ষা হৃদয়ের ভাবদ্বন্দ্বই এই নাটকে প্রাধান্য লাভ করেছে। বিষয়বস্তুর মধ্যে ঐক্য ও সংহতির নিতান্ত অভাব দেখা যায় এতে। আবেগের আতিশায্য মাত্রা ছাড়িয়ে অনেক সময়ই তরল হয়ে পড়েছে। হত্যা ও নিষ্ঠুরতার আধিক্যও বিশেষ পীড়াদায়ক। বিজয়সিংহ পিতা ও বিমাতার বিরাগভাজন হয়ে স্বদেশ ত্যাগ করে শ্যামদেশ জয় করে বসল এবং পুনরায় বঙ্গদেশে ফিরে এল, অবশেষে আবার সে নির্বাসিত হল। এতে ভাব ও অবস্থার পুনরুক্তি হয়েছে। কুবেণীর সঙ্গে সমুদ্রবক্ষে বিজয়সিংহের সাক্ষাৎকারের দৃশ্যও অত্যন্ত অবাস্তব ও অস্বাভাবিক হয়েছে। বস্তুত নাটকটিতে একমাত্র কুবেণীর চরিত্র ছাড়া আর কিছুই উল্লেখযোগ্য নয়।

দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকে সংলাপের ভাষা

[সম্পাদনা]

দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের সংলাপের ভাষাও আলোচনার বিষয়। তিনি বাংলা নাটকের জন্য এক আশ্চর্য গতি, ঝংকার ও কাব্যময় গদ্যভাষা সৃষ্টি করেছিলেন। গিরিশচন্দ্র কাব্যছন্দেও কবিতা সৃষ্টি করতে পারেননি, অথচ দ্বিজেন্দ্রলাল গদ্যে তাই করেছেন। কিন্তু এটি একদিকে যেমন কৃতিত্ব, অন্যদিকে নাটকের পক্ষে বাধা স্বরূপ। কারণ অতিমাত্রায় কাব্যধর্মীয় সংলাপে যে কৃত্রিমতা থাকে, নাটকীয় চরিত্র ফুটিয়ে তোলার পক্ষে তা অনুকূল নয়। যেখানে হৃদয়বৃত্তির তরঙ্গ-বিক্ষোভ আছে, সেখানে এইরকম ভাষা সঙ্গত হয়েছে, কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর নাটকে সর্বত্রই এই ভাষা প্রয়োগ করে নাটককে অস্বাভাবিক করে তুলেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মনে হয়, নাটকীয় চরিত্র নয়, দ্বিজেন্দ্রলালই যেন তাদের হয়ে কথা বলছেন। নাট্যকারের আত্মগুপ্তি-ধর্ম তিনি রক্ষা করতে পারেননি। এটিই নাট্যরচনায় দ্বিজেন্দ্রলালের সর্বপ্রধান ত্রুটি।

মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

নাট্যকার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলালকে অগ্রণী নাট্যকার বলা চলে না। তাঁর অনাটকীয় subjective দৃষ্টিভঙ্গিই এর কারণ। চরিত্রচিত্রণে, সংলাপ রচনায় তিনি নিজস্ব আদর্শকেই নাটকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নাটকে কাহিনিগ্রন্থনের দোষ আছে, কালানৌচিত্য দোষ আছে, আবার ঘটনার অসম্ভাব্যতার ত্রুটিও দেখা যায়। তবু নাট্যকার হিসেবে তাঁর প্রধান কৃতিত্ব এই যে, তিনিই প্রথম পাশ্চাত্য শৈলীর সার্থক অনুসরণ করে নাটকে আধুনিক বিশ শতকের মানসিকতার সূত্রপাত করেছেন। পূর্বসূরিদের বিবৃতিবহুল ঐতিহাসিক নাটককে অতিক্রম করে তিনি জীবনরসে পরিপূর্ণ নাটক রচনা করতে পেরেছেন। নাটককে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি হাতিয়ার করে তুলতে পেরেছিলেন বলেও চারণ-নাট্যকার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।