বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

উইকিবই থেকে

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮১৭ সালে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ প্রচুর ঐশ্বর্যের মধ্যে প্রতিপালিত হলেও আবাল্য ধর্মপ্রাণ ছিলেন। তাঁর মনের গঠনে বিশুদ্ধ ভক্তিবাদ ও যুক্তিবাদের অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছিল। তাই তিনি রাজা রামমোহন রায়ের পথ ধরে বেদান্ত-প্রতিপাদ্য হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠায় ও ধর্মসংস্কারে মন দেন এবং পরিণত বয়সে আখ্যাত হন ‘মহর্ষি’ নামে। তাঁর সমগ্র রচনাবলিই ধর্ম-সম্বন্ধীয়। ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের কাজে তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। ধর্মের মূল তত্ত্ব সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ধার করে সহজ বাংলায় প্রকাশ করার জন্য তিনি অনেক চেষ্টা করেন। বেদ অভ্রান্ত কিনা তা প্রমাণের চেষ্টা করেন এবং ঋগ্বেদ অনুবাদের কাজ শুরু করেন। পরবর্তীকালে এই কাজে তিনি আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশকে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব তত্ত্ববোধিনী সভা স্থাপন ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রবর্তন। ১৮৪৩ সালে পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করে তিনি অক্ষয়কুমার দত্তকে সম্পাদক নিযুক্ত করেন। তত্ত্ববোধিনী লেখকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রিত করে বাংলা ভাষায় একটি সাধু গদ্যশৈলীর নির্মাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ব্রাহ্মধর্মের বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য প্রতিবাদনে লেখনী ও মনোযোগকে সর্বদা ব্যস্ত রাখতেন বলে তিনি সাহিত্যিক খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর পুত্রকন্যাদের অনেকেই বাংলা সাহিত্যের স্মরণীয় ব্যক্তি রূপে বাংলা ও বাঙালি জাতিকে গৌরবান্বিত করেছিলেন। ১৯০৫ সালে কলকাতাতেই দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটে।

দেবেন্দ্রনাথের সাহিত্যকৃতিকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করেছে তাঁর আত্মজীবনী। ১৮ থেকে ৪১ বছর বয়স পর্যন্ত নিজের জীবনকথা লিখে প্রিয়নাথ শাস্ত্রীকে দেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশ করতে বলেন। বইটি গদ্যভাষার উৎকৃষ্ট একটি দৃষ্টান্ত। সাত্ত্বিক ভাব ও মন নিয়ে ধর্ম সম্পর্কে তিনি যে আলোচনাগুলি করেছেন, ভাষাশিল্পের ইতিহাসে সেগুলিও উল্লেখনীয়। তাঁর লেখা ব্রাহ্মধর্ম (১৮৫০), আত্মতত্ত্ববিদ্যা (১৮৫২), ব্রাহ্মধর্মের মত ও বিশ্বাস (১৮৬০), কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের বক্তৃতা (১৮৬২), ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান (১৮৬৬), জ্ঞান ও ধর্মের উন্নতি (১৮৯৩) প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর সাহিত্যিক কৃতিত্বের নিদর্শন। ধর্মীয় বিতর্ক ও ধর্মান্দোলনের মধ্যে দিয়ে তিনি বাংলা ভাষার প্রকাশযোগ্যতা অনেকটা বাড়িয়ে তুলেছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে তিনি যে সাহিত্যিকগোষ্ঠী গড়ে তোলেন, তা বঙ্গদর্শন সাহিত্যিকগোষ্ঠীর তুলনায় কম শক্তিশালী ছিল না। শিল্পসম্মত বাংলা গদ্যের অন্যতম শিল্পী ও উৎসাহদাতা হিসেবে দেবেন্দ্রনাথের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য।