বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/দীনবন্ধু মিত্র

উইকিবই থেকে
দীনবন্ধু মিত্র

মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরে বাংলা নাটকে যিনি অসাধারণ শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০—১৮৭৩)। মধুসূদনের অনুসারী হয়ে অনেকেই ভাবগম্ভীর নাটক ও প্রহসন রচনায় অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু জগৎ ও জীবন সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে কেউ যথার্থ নাট্যকার হতে পারেন না, সেই দুর্লভ দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছিলেন দীনবন্ধুই। তাঁর পূর্বসূরিদের মধ্যে সেই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না, এমনকি তাঁর অব্যবহিত উত্তরকালের নাট্যকারগণ দীনবন্ধুকে আদর্শ রূপে লাভ করেও নাট্যকারের সেই অপরিহার্য দৃষ্টিকোণ থেকে নাটক রচনায় প্রবুদ্ধ হতে পারেননি। সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার এর কারণ নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছেন, “নাটক রচনায় মানুষের জীবন ও মানুষকে যে-চক্ষে দেখিবার শক্তি আবশ্যক হয়, বাঙালীর সে-দৃষ্টি স্থির নহে, অতিশয় চঞ্চল। যে ঘটনাস্রোতে আপামর মানবসমাজের বিভিন্ন চরিত্র বিভিন্ন গতিমুখে নিরন্তর ভাসিয়া চলিয়াছে—সেই স্রোতের একটা অংশকে সমগ্রতায় উপলব্ধি করিয়া, অবিন্যস্ত ঘটনারাশির মধ্যে একটা অর্থের সামঞ্জস্য বিধান করিয়া ঘটনার দৈবরূপ ও মানবচরিত্রের অন্তর্নিহিত নিয়তিরূপকে কার্যকারণসূত্রে বিধৃত করিয়া যে-নাটক রচনা সম্ভব হয়, বাঙালীর চরিত্রে ও মনে তাহার প্রতিকূল প্রবৃত্তিই নিহিত রহিয়াছে।” এই কারণে বাঙালি কাব্য ও কথাসাহিত্যে যে নৈপুণ্য দেখিয়েছে, নাটকে তা দেখাতে পারেনি। দীনবন্ধুর বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি তন্ময় দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। নাট্যরচনার বিভিন্ন কলাকৌশলের দিক থেকে তিনি হয়তো তেমন কৃতিত্বের নিদর্শন রেখে যেতে পারেননি, কিন্তু শ্রেষ্ঠ নাটকীয় দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী রূপে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর রচনায় সকল মানুষের প্রতি যে উদার সহানুভূতির ভাব লক্ষ্য করা যায়, তা এই তন্ময় দৃষ্টিভঙ্গিরই উপজাত। তাঁর সৃষ্ট সাধারণ মানুষের চরিত্রগুলি অমার্জিত সংলাপে, বলিষ্ঠ উপস্থাপনায় এবং কৌতুকরসের আড়ালেও অশ্রুর আভাসে যে রস সৃষ্টি করেছে, তাও শ্রেষ্ঠ নাটকীয় রসেরই প্রকাশ।

সামাজিক নাটক

[সম্পাদনা]

দীনবন্ধুর প্রথম নাটক নীলদর্পণ (১৮৬০)। নাটকটি সম্বন্ধে বিশদ আলোচনার পূর্বে এটির শ্রেণিবিচার করে নেওয়া আবশ্যক। নিঃসন্দেহে এটি একটি সামাজিক নাটক। কিন্তু উনিশ শতকের সামাজিক নাটক সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত ছিল। পরিচিত সমাজের কোনও পরিবারের কাহিনিকে কেন্দ্র করে লেখা যে-কোনও নাটককেই সামাজিক নাটক আখ্যা দেওয়া হত। ব্যাপক অর্থে তাহলে সব নাটককেই সামাজিক নাটক বলতে হয়। কারণ, ঐতিহাসিক নাটকের পাত্রপাত্রীরাও কোনও কোনও সময়ের সমাজকে আশ্রয় করে এবং পৌরাণিক নাটকের দেবদেবীদের চরিত্রেও মানবীয় ভাব আরোপিত হয় বলে তাঁরাও বলতে গেলে মানবসমাজেরই প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সামাজিক নাটক তাকেই বলা চলে যে নাটকে সামাজিক শক্তির সংঘর্ষেই নাটকের কাহিনি আবর্তিত হয় এবং নাটকীয় চরিত্রগুলির উত্থান-পতন ঘটে। যে নাটকের কাহিনি কেবল পরিবারকে কেন্দ্র করেই প্রধানত আবর্তিত হয় এবং যেখানে বাইরের সামাজিক শক্তির কোনও সংঘর্ষই থাকে না, সেই নাটককে পারিবারিক নাটক বা গার্হস্থ্য নাটক বলাই সমীচীন। দীনবন্ধুর লীলাবতী পারিবারিক নাটক। পরবর্তীকালে গিরিশচন্দ্র ঘোষের প্রফুল্ল, গৃহলক্ষ্মী এবং অন্যান্য নাট্যকারের অনেক নাটকও এই শ্রেণিভুক্ত। কিন্তু নীলদর্পণ সামাজিক নাটক। এর কাহিনি সামাজিক শক্তির তাড়নায় পরিণতির দিকে ছুটে গিয়েছে। সামাজিক শক্তি বলতে কয়েকটি নৈতিক অনুশাসনের প্রভাবকেই বোঝায় না, অর্থনৈতিক প্রভাবও তার পিছনে ক্রিয়াশীল থাকে। বস্তুত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই সমাজব্যবস্থাকে পরিচালিত করে। সেকালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের নীলকরদের শোষণে কৃষকসমাজ এক নিদারুণ দুর্দশার শিকার হয়েছিল। তা তাদের পারিবারিক জীবনকেও প্রভাবিত করেছিল। নীলদর্পণ নাটকে গোলোকচন্দ্র বসু ও সাধুচরণের পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে সেই তাণ্ডবের ছবি আঁকা হয়েছে। নীলদর্পণ তাই সামাজিক নাটক। অধিকন্তু ওই দুই পরিবার তৎকালীন বহু বিপর্যস্ত বাঙালি পরিবারের প্রতীক। এই কারণে নীলদর্পণ পরিবার-কেন্দ্রিক নাটক হয়েও সামাজিক শক্তির দ্বারা প্রভাবিত সামাজিক নাটক। লক্ষণীয় এই যে, দীনবন্ধুর সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি তৎকালীন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ধ্যানধারণার অপরিপক্কতার যুগেও বিদেশি রাজশক্তির সহায়তায় পরিপুষ্ট ও প্ররোচিত বিদেশি বণিকের বর্বর শোষণযন্ত্রের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদেও সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। দীনবন্ধুর এই দুঃসাহসিকতাই পরবর্তীকালে নাট্যকারদের উদ্দীপ্ত করে দেশাত্মোবোধক নাটক রচনায়।

নীলদর্পণ

[সম্পাদনা]

নীল বিদ্রোহ ও নীলদর্পণ নাটক

[সম্পাদনা]

১৭৭৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নীলকরদের হাতে নীল চাষের ভার ছেড়ে দেয়। অল্পকালের মধ্যে নীলকরেরা দেশীয় রায়তের উপর অত্যাচার শুরু করে। তারা অনেক সময় জমিদারদের কাছ থেকে জমিদারি ইজারা বা পত্তনি নিত এবং চাষিদের টাকা দাদন দিয়ে নীল আদায় করত। এই দাদন একবার নিলে চাষি আর সারা জীবনের মতো ঋণ থেকে মুক্তি পেত না। লোকে নীলের চাষে লোকসান দেখে তা চাষ করতে অস্বীকার করলে তাদের উপর নিদারুণ অত্যাচার চলত। নীলকরেরা চাষিদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিত, জোর করে তাদের আটক করত, নির্মম বেত্রাঘাত করত, এমনকি তাদের ঘরের মেয়েদের সম্মানহানি করতেও কুণ্ঠিত হত না। ১৮৫৯-৬০ সালে নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান, পাবনা, খুলনা ও যশোহর জেলায় হিন্দু-মুসলমান চাষিরা একযোগে নীল বোনা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে নীলকরদের সঙ্গে তাদের যে বিবাদ বাধে, ইতিহাসে তাই নীল বিদ্রোহ নামে খ্যাত। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই দীনবন্ধু তাঁর নীলদর্পণ নাটক রচনা করেন। পুস্তকে গ্রন্থকারের নাম ছিল না, ‘কেনচিৎ পথিকেনাভিপ্রণীতম্‌’ ছদ্মনামে নাটকটি ঢাকার একটি ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়। পাদরি জেমস লং এটির একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। তাতে লেখা ছিল “Translated into English by a native. With an introduction by the Rev. J. Long, 1861.” অনুবাদক এই ‘নেটিভ’ হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বইটি প্রকাশের জন্য লং-এর এক হাজার টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ড হয়। কিন্তু বইটি ইংল্যান্ডে ইংরেজদের মধ্যে নীলকরদের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে ইন্ডিগো কমিশন বসে এবং কালক্রমে নীলকরদের অত্যাচার প্রশমিত হয়। এই কারণেও নীলদর্পণ নাটকটির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে। হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো-এর আংকেল টম’স কেবিন এবং চার্লস ডিকেন্সের অলিভার টুইস্ট যেমন যথাক্রমে আমেরিকার ক্রীতদাস প্রথা এবং ইংল্যান্ডের শিশু নিপীড়নের মূলে প্রবল আঘাত হেনে সে-সবের উচ্ছেদসাধনে বিশেষ সাহায্য করেছিল, তেমনই নীলদর্পণ-ও দরিদ্র রায়তদের উপর নীলকরদের অত্যাচার সর্বসমক্ষে উদ্ঘাটিত করে তার প্রশমনে কার্যকরী হয়েছিল। আরও একটি কারণে নীলদর্পণ বাংলা নাটক ও নাট্যশালার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই নাটকের অভিনয়ের মাধ্যমেই ১৮৭২ সালে প্রথম বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের উদ্বোধন করা হয়েছিল।

নীলদর্পণ নাটকের সংক্ষিপ্ত কাহিনি

[সম্পাদনা]

নীলদর্পণ নাটকটি গড়ে উঠেছে প্রধানত স্বরপুরের গোলোকচন্দ্র বসুর পরিবারকে কেন্দ্র করে। গোলোকের জ্যেষ্ঠ পুত্র নবীনমাধব নীলকরের অত্যাচার থেকে প্রজাদের রক্ষা করত বলে নীলকুঠির বড়ো সাহেব আই. আই. উড্‌ তাকে শাসন করার জন্য নিরীহ গোলোককে মিথ্যা ফৌজদারি মামলায় কারারুদ্ধ করে। গোলোক কারাগারে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ছোটো সাহেব পি. পি. রোগ্‌ প্রজা সাধুচরণের কন্যা ক্ষেত্রমণিকে নিজের কুঠিতে এনে ধর্ষণের চেষ্টা করলে, নবীনমাধব মুসলমান প্রজা তোরাপের সাহায্যে ক্ষেত্রমণিকে উদ্ধার করে। কিন্তু গর্ভবতী ক্ষেত্রমণির পেটে রোগ্‌ সাহেব ঘুষি মারায় গর্ভস্রাব হয়ে তার মৃত্যু হয়। নীল বোনা নিয়ে উড্‌ সাহেব নবীনমাধবকে অপমানসূচক কথা বলে। ক্রুদ্ধ নবীনমাধব সাহেবকে পদাঘাত করলে সাহেব তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে। তাতেই নবীনমাধবের মৃত্যু হয়। গোলোকের পত্নী সাবিত্রী স্বামী ও পুত্রের শোকে উন্মাদিনী হয়ে কনিষ্ঠা গৃহবধূর গলায় পা দিয়ে তাকে মেরে ফেলেন। পরে চৈতন্য হলে নিজের কাজের জন্য শোকে প্রাণত্যাগ করেন। সংক্ষেপে এই হল নীলদর্পণ নাটকের কাহিনি।

সমালোচনা

[সম্পাদনা]

নীলদর্পণ নাটকের আখ্যানবস্তু সর্বাংশে নাট্যগুণসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেনি। সংলাপের ভাষা নিম্নশ্রেণির চরিত্রের মুখে যেমন সুন্দর ও বাস্তব হয়েছে, উচ্চশ্রেণির পাত্রপাত্রীদের মুখের ভাষা তেমনই হয়েছে আড়ষ্ট ও কৃত্রিম। স্বগতোক্তির বাহুল্য ও দীর্ঘ বক্তৃতাও রসহানি ঘটিয়েছে। সর্বোপরি মৃত্যুর ঘনঘটা নাটকের ট্র্যাজেডিকে ব্যর্থ করে এটিকে মেলোড্রামায় পরিণত করেছে। ড. সুকুমার সেন লিখেছেন, “নীলদর্পণ ঠিক নাটক নহে, নাট্য-চিত্র। ইহাতে কোনো চরিত্রের পরিণতি অথবা মানব-জীবনের কোনো মৌলিক সমস্যা কিংবা ব্যক্তির সহিত ব্যক্তির চিত্ত-সংঘর্ষ আলিখিত হয় নাই। একটি বিশেষ সময়ে বিশেষ অবস্থায় পতিত কতকগুলি অসহায় মানুষের অত্যাচার-জীবনের বাস্তব চিত্র ছাড়া ইহাতে আর কিছুই নাই। গ্রাম্য চরিত্রগুলির মধ্যে মানব-জীবনের যে অনাবৃত খণ্ডিত রূপটুকুর চকিত দর্শন পাই, শুধু তাহাই নীলদর্পণকে সমসাময়িক নাট্যরচনাগুলি হইতে স্বতন্ত্র করিয়া স্থায়ী মূল্য দান করিয়াছে।” কিন্তু এ-কথাও সত্য যে, এই নাট্যচিত্রগুলি অতিমাত্রায় জীবন্ত ও বাস্তব। ক্ষেত্রমণির উপর রোগ্‌ সাহেবের অত্যাচারের দৃশ্যে দীনবন্ধু যে অভ্রান্ত নাটকীয় দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন, বাংলা নাটকের ইতিহাসে তা অতুলনীয়। তোরাপ, ক্ষেত্রমণি, সাধুচরণ, রাইচরণ, আদুরী, গোপী, পদী ময়রানী, রোগ্‌ সাহেব, উড্‌ সাহেব প্রভৃতির চরিত্র এমন নাটকীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে সৃষ্টি করা হয়েছে যে, আজ পর্যন্ত এই ধরনের চরিত্রসৃষ্টিতে দীনবন্ধুকে কেউ অতিক্রম করতে পারেননি। এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা স্মরণীয়। বিশ শতকে গণনাট্য রচনার যে জোয়ার এসেছিল, নীলদর্পণ নাটকই তার পথনির্দেশ করে দিয়ে গিয়েছিল। গণনাট্য আন্দোলনের পটভূমিকায় নীলদর্পণ-কেই বলা চলে প্রথম প্রকৃত বাংলা গণনাটক।

অন্যান্য নাটক

[সম্পাদনা]

দীনবন্ধুর অন্যান্য নাটক হল নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩), বিয়েপাগ্‌লা বুড়ো (১৮৬৬), সধবার একাদশী (১৮৬৬), লীলাবতী (১৮৬৭), জামাই-বারিক (১৮৭২) ও কমলে কামিনী (১৮৭৩)। নবীন তপস্বিনীকমলে কামিনী রোম্যান্টিক নাটক। এগুলির কাহিনিবিন্যাসে অথবা চরিত্রচিত্রণে দীনবন্ধু বিশেষ কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। বস্তুত এই শ্রেণির নাটক রচনা দীনবন্ধুর প্রতিভার আদৌ অনুকূল ছিল না। হালকা রঙ্গ-রসিকতা বা কৌতুকরসই তাঁর স্বাভাবিক নৈপুণ্য প্রকাশের ক্ষেত্র। তাই ব্যর্থতার মধ্যেও তিনি নবীন তপস্বিনী নাটকে রাজমন্ত্রী জলধর ও তাঁর স্ত্রী জগদম্বার যে ছবি এঁকেছেন, তার হাস্যরস দর্শককে সহজেই আকৃষ্ট করে। লীলাবতী নাটকেও সামাজিক পটভূমিকায় রোম্যান্টিক প্রণয়চিত্র আঁকা হয়েছে। কিন্তু এই নাটকেও দীনবন্ধু নাট্যকার হিসেবে ব্যর্থতাই বরণ করেছেন। এখানে কাহিনির জটিলতা যেমন অবান্তর, ললিত-লীলাবতীর প্রণয়ালাপও তেমনই স্বভাবাবিকরূপে হাস্যকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু নদেরচাঁদ ও হেমচাঁদের রঙ্গরস যে বিশেষ উপভোগ্য হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। কোনও কোনও সমালোচক হেমচাঁদ-নদেরচাঁদের বিশেষ একটি দৃশ্যের সংলাপকে অশ্লীল মনে করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেই বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের মুখে মার্জিত সংলাপ কৃত্রিমতায় পর্যাবসিত হত। নাটকীয় চরিত্রকে নাট্যকার যদি নিছক রুচির দোহাই দিয়ে পরিমার্জিত করেন, তাহলে দর্শকের সেই শ্লীলতা-রুচিই পরিতৃপ্তি হতে পারে, তাতে যথাযথ নাটকীয় চরিত্র সৃষ্টি হতে পারে না। দীনবন্ধু বাস্তব জগৎকেই দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন, সেখানে কাউকেই কৃত্রিমতায় অনুরঞ্জিত করার প্রশ্ন ওঠে না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো রুচিবান মনীষীও তাই বলেছেন যে, তোরাপ বা আদুরী যদি শ্লীলতার মাত্রা বজায় রেখে কথা বলত তবে আমরা ছেঁড়া-তোরাপ বা কাটা-আদুরীকেই পেতাম।

প্রহসন

[সম্পাদনা]

দীনবন্ধুর প্রতিভা মুখ্যত প্রহসন রচনার প্রতিভা। তাঁর প্রহসনগুলিই তার প্রমাণ। প্রহসনের ক্ষেত্রে তিনি মধুসূদনের অনুসারী হয়েও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তাঁর কৌতুকরসের বৈশিষ্ট্য হল এই যে, তাতে হাস্যরসের সঙ্গে করুণরস মিশে আছে। এই প্রসঙ্গে মোহিতলাল মজুমদার লিখেছেন, “উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, ‘লীলাবতী’র হেমচাঁদ-চরিত্রে অতি সূক্ষ্মভাবে এই রস সঞ্চারিত হইয়াছে। ‘বিয়েপাগলা বুড়ো’ আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বিবাদ করিয়া, যুবা সাজিয়া, নকল বাসর-ঘরে, নকল-শালাজদের কানমলা সহ্য করিবার চেষ্টা করিয়াও যখন সহসা ‘মরে গেছি! মরে গেছি! ও রামমণি!’ বলিয়া তাহার বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র পালয়িত্রী ও রক্ষয়িত্রী বর্ষীয়সী বিধবা কন্যার নাম ধরিয়া চিৎকার করিয়া ওঠে—তখন এই হাস্যরসে আর এক রসের সঞ্চার হয়; নিজ বার্ধক্য অস্বীকার করিয়া যে-বৃদ্ধ বিগত-যৌবনের অভিনয় করিতেছে, সে যে কিছুতেই জরাকে ফাঁকি দিতে পারিতেছে না, নিমেষের মোহও টিকিতেছে না,—নিয়তির সহিত কঠিন সংগ্রামে বিমূঢ় মানবের এই অবস্থা যেমন হাস্যোদ্দীপক, তেমনি তাহার অন্তরালে গভীর সহানুভূতির কারণ রহিয়াছে। কিন্তু সে সহানুভূতিকালে অদৃষ্ট বা বিধাতার বিরুদ্ধে কোনও আক্রোশের ভাব নাই—ইহাই উৎকৃষ্ট হিউমারের নিদর্শন।” জামাই-বারিক নাটকে দীনবন্ধুর হাস্যরস বেশ নিবিড় হয়ে উঠেছে। ঘরোয়া রসিকতা ও ছড়া-প্রবাদের মধ্যে দিয়ে বাঙালির প্রাণরস সেকালে কীভাবে প্রবাহিত হত, তার একটি উজ্জ্বল চিত্র এই নাটকে পাওয়া যায়।

সধবার একাদশী ও নিমচাঁদ চরিত্র

[সম্পাদনা]

নাট্যরসের দিক থেকে সধবার একাদশী নাটকটিই দীনবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এই নাটকে নব্যশিক্ষিত যুবসমাজকে নিয়ে রঙ্গব্যঙ্গ করা হয়েছে। এটিতে মধুসূদনের একেই কি বলে সভ্যতা-র ছাপ থাকলেও দীনবন্ধুর প্রহসনটি চরিত্রের দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একেই কি বলে সভ্যতা শুধুই প্রহসন, কিন্তু সধবার একাদশী প্রহসন থেকে নাটকে উন্নীত। এর মধ্যে কাহিনির বিকাশ ও পরিণতি দেখা যায়। এর নায়ক নিমচাঁদ দত্ত বা নিমে দত্ত দীনবন্ধুর অমর সৃষ্টি। নিমচাঁদ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, কিন্তু নিজেকে সংযত রাখার শিক্ষা তার নেই, সে আকণ্ঠ মদ্যপানে অভ্যস্থ। এই মদ পাশ্চাত্য সভ্যতার মদও বটে। কিন্তু নিজের অধঃপতন সম্পর্কে সে সম্পূর্ণ সচেতন, তাই মনের গভীর বেদনাকে লঘু পরিহাসের আবরণে ঢেকে সে দিনযাপন করে চলেছে। জীবনে সে যে পরাজিত এই কথা ঢাকার জন্য তার বাক্‌চাতুরীর নানা প্রয়াস। কিন্তু তার জীবন “বাইরে যবে হাসির ঘটা, ভিতরে থাকে চোখের জল”। এটিই নিমচাঁদের জীবনের ট্র্যাজেডি। ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “তাহার মধ্যে দীপ্ত মনীষা ও আত্মসম্মানহীন আচরণ, উচ্চ চিন্তা ও মদ্যাসক্তি, বুদ্ধির অভিমান ও আত্মগ্লানি, মোসাহেবি ও স্পর্ধিত সত্যভাষণ এমন আশ্চর্য সমন্বয় লাভ করিয়াছে যে, সে নীতিজ্ঞানহীন অক্ষম বুদ্ধিজীবিসম্প্রদায়ের এক চিরন্তন প্রতিনিধিরূপে অমরত্বে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।… নিমচাঁদ নিজ অধঃপতন সম্বন্ধে মর্মান্তিকভাবে সচেতন; তাহার সমস্ত স্ফূর্তি-মাতলামির মধ্যে একটা বিরাট সম্ভাবনার অপচয়জনিত অনুশোচনার সুর ধ্বনিত হইয়াছে। বিদেশী সাহিত্যের অমৃতরসের সঙ্গে সে বিজাতীয় জীবনাদর্শের গরল এক চুমুকেই পান করিয়াছে—তাহার সমস্ত প্রকৃতিই এই অমৃত-বিষের যুগ্ম উপাদানে গঠিত।… নিমচাঁদ-চরিত্র সমাজনীতি-বিপর্যয়ের এক চিরস্থায়ী ফলরূপে, সমস্ত লঘু-তরল, ইতর ভোগবিলাসের পঙ্কিল আবর্ত হইতে উত্থিত, এক কলঙ্ক-ভাস্বর বিকৃতির প্রতীকরূপে অবিলুপ্ত মহিমায় বিরাজিত।” এই প্রহসনের বাঙাল রামমাণিক্য ও ঘটিরাম ডেপুটিও দুটি অবিস্মরণীয় বাস্তব চরিত্রচিত্রণ। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সধবার একাদশী সম্পর্কে বলেছেন, “বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে এ একখানি জাতীয় সম্পত্তি।”

বাংলা নাট্যসাহিত্যে দীনবন্ধু মিত্রের অবদান

[সম্পাদনা]

রামনারায়ণ তর্করত্ন পর্যন্ত বাংলা নাট্যরচনার কালকে প্রস্তুতি পর্ব আখ্যা দেওয়া যায়। নাটক রচনায় নাট্যকারেরা কোন পথ অবলম্বন করবেন, প্রস্তুতি পর্বে বস্তুত তারই পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল। পৌরাণিক নাটক, ইংরেজি নাটকের অনুকরণে ট্র্যাজেডি, সামাজিক সমস্যা অবলম্বনে ব্যঙ্গাত্মক নাটক—মূলত এইসব বিষয়েই তৎকালীন নাট্যকারেরা দৃষ্টি দিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়-নির্বাচনে অতিরিক্ত কিছু দান করতে পারেননি তাঁরা। মাইকেল মধুসূদন দত্তই প্রথম যথার্থ নাটক রচনা করেন। গতানুগতিকতার শৃঙ্খল ভেঙে তিনি বাংলা নাটকে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন; এবং এ বিষয়ে, বিশেষত প্রহসনের ক্ষেত্রে, সাফল্যও অর্জন করেন। মধুসূদনের কালকে তাই প্রয়াস পর্ব বলা যায়। দীনবন্ধু মিত্র এই পর্বেরই অন্যতম নাট্যকার। মধুসূদন সামাজিক বিষয়কে অবলম্বন করে যে প্রহসন রচনার পথ দেখিয়েছিলেন, দীনবন্ধুর প্রহসনেই তার পরিপূর্ণতা দেখা গেল এবং প্রহসন হয়েও তা হয়ে উঠল নাট্যধর্মী।

কিন্তু দীনবন্ধুর প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর নাটকীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এইরকম দৃষ্টিভঙ্গি পূর্ববর্তী কোনও নাট্যকারের তো ছিলই না, পরবর্তীকালেও এমন অভ্রান্ত নাটকীয় দৃষ্টির দৃষ্টান্ত বিরল। সেই দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের প্রতি উদারতা ও সহানুভূতি। এইরকম দৃষ্টিভঙ্গি প্রথম শ্রেণির নাট্যকারেরই লক্ষণ। নিকৃষ্ট চরিত্র সৃষ্টি করতেও তিনি কাউকে কোথাও শ্লেষে বিদ্ধ করেননি, অকারণ বিদ্রূপ করেননি অথবা অন্যায় আঘাত করেননি। নাট্যকারের প্রধান ধর্মই হল এই যে, তিনি সর্ববিষয়ে নির্বিকার ও নিরাসক্ত হবেন। কোনও দুর্বৃত্তের চরিত্র আঁকতে তিনি যেমন তাকে অভিশাপ দেবেন না, তেমনই সাধু চরিত্র সৃষ্টি করেও তাকে আশীর্বাদ করতে যাবেন না। এই নির্বিকার দৃষ্টি নিয়ে তিনি জীবন ও জগৎকে প্রত্যক্ষ করবেন। দীনবন্ধুর এই দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল। আরও একটি বিষয় স্মরণীয়। মানুষকে বিচার করতে গিয়ে (যেমন নীলদর্পণ-এর অত্যাচারী ও চরিত্রহীন রোগ্‌ সাহেবের ক্ষেত্রে) যদি তিনি প্রচলিত নীতিধর্মের সাহায্য নিতে যেতেন, তাহলে নাট্যকার হিসেবে তাঁর ব্যর্থতাই প্রমাণিত হত। আর্টের নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন—তাই আর্টের ক্ষেত্রে তিনি ‘higher morality’-কেই অনুসরণ করেছেন।

এই ‘higher morality’-র প্রেরণাতেই নাটক রচনার আর-একটি লক্ষণ তাঁর মধ্যে বিকশিত হয়েছিল। তা দীনবন্ধুর objective বা বস্তুনিষ্ঠ কল্পনা। Subjective বা আত্মগত রস-কল্পনা থেকে তা আলাদা; এবং আলাদা বলেই কাব্য-উপন্যাস থেকে নাটক আলাদা প্রকৃতির। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে একমাত্র দীনবন্ধু ভিন্ন আর কোনও নাট্যকারের মধ্যে এইরকম বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যান্য নাট্যকারেরা সবাই চরিত্রসৃষ্টি করতে গিয়ে ব্যক্তিগত রুচি-সংস্কার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। সেই হেতু এক অর্থে, দীনবন্ধুকেই খাঁটি বাঙালি নাট্যকার বলা যায়। অবশ্য এ-কথা সত্য যে, সাধারণ শ্রেণির মানুষের বাইরে যে-সব চরিত্র তিনি সৃষ্টি করতে গিয়েছেন, উপযুক্ত সংলাপের অভাবে তাদের অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। তবু চরিত্র হিসেবে ওই চরিত্রগুলি যে জীবন্ত, এ-কথাও অস্বীকার করা যায় না। অধিকন্তু নিমচাঁদ, তোরাপ, ক্ষেত্রমণি, রোগ্‌ সাহেব, আদুরী প্রভৃতি শ্রেণির মানবচরিত্র চিত্রণে আজও তাঁর সমকক্ষ কেউ হয়ে উঠতে পারেননি। মানুষকে দেখার ও দেখাবার এই যে নতুন ভঙ্গি, এটিই বাংলা নাট্যসাহিত্যে দীনবন্ধুর শ্রেষ্ঠ দান। পরবর্তীকালেও বহু নাট্যকারের নাটকে এই দানের প্রভাব অনস্বীকার্য।

একটি বিষয়ে দীনবন্ধু বাংলা নাটকের বিষয়বস্তুর ক্ষেত্র প্রসারিত করে গিয়েছেন। তিনি কেবল সামাজিক বিষয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমায়িত রাখেননি, সমকালীন অর্থনৈতিক শোষণের এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের বাস্তব চিত্রটিও এঁকে গিয়েছেন। নীলদর্পণ নাটকটি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এতখানি সমাজ-সচেতনতা তৎকালীন আর কোনও নাট্যকারের মধ্যে দেখা যায়নি। এই নাটক নিয়ে একটি আন্দোলন হয়েছিল বলেই নয়, সাধারণ মানুষের আন্দোলনের নাটক বলেই নীলদর্পণ এক মহৎ সৃষ্টি। শিল্প-বিচারে নাটকটি ত্রুটিমুক্ত না হলেও সমকালীন শিক্ষিত জনমানসের বিচারে দীনবন্ধুর মধ্যে যে তীক্ষ্ণ সমাজ-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়, ক্ষমতাসীন শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে নিরুপায় শোষিতের প্রতি তাঁর যে অকুণ্ঠ নির্ভীক সমর্থন দেখা যায়, বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে সেটিই এক বিশেষ দান। পরবর্তীকালে এই ধারাতেই জাতীয়তাবাদী নাটক রচিত হয়েছে এবং আরও পরে নবনাট্য আন্দোলনের ধারায় যে সব গণনাট্য রচিত হয়েছে, তাও নীলদর্পণ-এরই ফলশ্রুতি।

মোট কথা, প্রতিভার অক্ষমতা হেতু রামনারায়ণের মধ্যে যে অসম্পূর্ণতা এবং অতিমাত্রায় কবিত্বের জন্য মধুসূদনের নাটকে যে কৃত্রিমতা পরিলক্ষিত হয়েছিল, দীনবন্ধুতে এসে বাংলা নাটক সেই সব ত্রুটি থেকে অনেকটা মুক্ত হয়, নাটকের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়; সর্বোপরি বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রচিত্রণ ও তীক্ষ্ণ সমাজ-সচেতনতার আবির্ভাব ঘটে। এটিই বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক নতুন সমৃদ্ধির যুগকে আহ্বান করে আনে।