বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

উইকিবই থেকে
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের গোড়া থেকেই শিক্ষিত সমাজে একটি স্বাদেশিকতার বোধ জেগে ওঠে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল সেই স্বদেশ-সাধনার অন্যতম পীঠ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথের বিশেষ উদ্যোগে দেশবাসীকে স্বদেশবোধে উদ্বুদ্ধ করতে ১৮৬৭ সালে প্রবর্তিত হয় হিন্দুমেলা। দেবেন্দ্রনাথের চতুর্থ পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৮—১৯২৫) এই স্বাদেশিকতার আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট। তিনি নিজেই লিখেছেন, “হিন্দুমেলার পর হইতেই কেবলই আমার মনে হইত—কী উপায়ে দেশের প্রতি লোকের অনুরাগ ও স্বদেশপ্রীতি উদ্বোধিক হইতে পারে। শেষে স্থির করিলাম, নাটকে ঐতিহাসিক বীরত্ব-গাথা ও ভারতের গৌরব-কাহিনী কীর্তন করিলে হয় তো কতকটা উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইতে পারে।” বাংলায় প্রথম ঐতিহাসিক নাটক রচনা করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর সেই কৃষ্ণকুমারী নাটকের উদ্দেশ্য ইংরেজি ট্র্যাজেডির অনুসরণে বাংলায় ট্র্যাজেডি রচনা হলেও, তাতে ভীমসিংহের উক্তিকে দেশপ্রেমের কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটকে দেশপ্রেমের বাণী ঘোষিত হল স্পষ্ট ভাষায়। বিদেশি ইংরেজ রাজশক্তি সেই বাণী উচ্চারণের পথে বাধা ছিল বলে অপরাপর বৈদেশিক শক্তিকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছিলেন তার প্রতীক রূপে। তাঁর নাটকের ক্ষেত্রে কালানৌচিত্য প্রভৃতি দোষ থাকলেও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের এই নাটকগুলিই যে সেকালে জাতীয়তাবাদ প্রচারের সহায়ক হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। পরবর্তীকালে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ তাঁরই অনুসরণে দেশাত্মবোধক নাটক রচনায় অনুপ্রাণিত হন। এইজন্য জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে দেশাত্মবোধক ঐতিহাসিক নাটকের জনকও বলা চলে।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক নাটক

[সম্পাদনা]

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক নাটকগুলির নাম পুরুবিক্রম (১৮৭৪), সরোজিনী (১৮৭৫), অশ্রুমতী (১৮৭৯) ও স্বপ্নময়ী (১৮৮২)। আলেকজান্ডারের সঙ্গে পুরুর সংঘাতের কাহিনি পুরুবিক্রম-এর ভিত্তি। আলাউদ্দিন খিলজির চিতোর আক্রমণ সরোজিনী নাটকের বিষয়। রানা প্রতাপ ও মানসিংহের দ্বন্দ্ব অশ্রুমতী-তে বিবৃত। এবং স্বপ্নময়ী-র আখ্যানবস্তু বাংলায় শোভাসিংহের বিদ্রোহ। নাটক ইতিহাস না হলেও ঐতিহাসিক নাট্যকার ইতিহাসের মর্যাদা লঙ্ঘন করেন না। অথচ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বহু জায়গায় ঠিক সেটাই করেছেন। যেমন, পুরুবিক্রম-এ দেশপ্রেমের প্রেরণা নয়, রানি ঐলবিলাকে লাভের বাসনাই পুরুকে আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণায় উদ্বুদ্ধ করেছে। এতে পুরুর মহত্ব, দেশপ্রেমের মর্যাদা ও নাট্যকারের ইতিহাস-নিষ্ঠা তিনই নষ্ট হয়েছে। সরোজিনী নাটকে ভৈরবাচার্য নামক জনৈক ছদ্মবেশী পাঠানকে দিয়ে বেদমন্ত্রাদি উচ্চারণ করানো হয়েছে, যা অসম্ভব। স্বপ্নময়ী নাটকে লম্পট শোভাসিংহের উপর আরোপিত দেশপ্রেম এক অসম্ভাব্য রোম্যান্সের অতিকল্পনায় অলীক বস্তুতে পরিণত হয়েছে। আবার বংশগৌরবকে কেন্দ্র করে যে প্রতাপসিংহের সঙ্গে মানসিংহের বিবাদ, অশ্রুমতী-তে সেই প্রতাপসিংহের কন্যার সঙ্গে আকবর-পুত্র সেলিমের প্রণয় প্রদর্শিত হয়েছে। তবু রোম্যান্স-আশ্রিত দেশাত্মবোধক নাটকের পথিকৃৎ রূপে বাংলা নাট্যসাহিত্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটি স্থান নিশ্চিতরূপেই রয়েছে।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রহসন

[সম্পাদনা]

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কতকগুলি প্রহসনও রচনা করেছেন। কিঞ্চিৎ জলযোগ (১৮৭২), এমন কর্ম করব না আর (১৮৭৭; পরে অলীকবাবু নামে প্রকাশিত, ১৯০০), হঠাৎ নবাব (১৮৮৪), হিতে বিপরীত (১৮৯৬), দায়ে পড়ে দারগ্রহ (১৩০৯ বঙ্গাব্দ) ইত্যাদি প্রহসনগুলির মধ্যে একটি স্মিত হাস্যের ধারা প্রবাহিত। হঠাৎ নবাব প্রহসনটি ফরাসি নাট্যকার মলিয়ের-এর একটি প্রহসনের অনুসরণে রচিত।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অনুবাদ নাটক

[সম্পাদনা]

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ অনেক সংস্কৃত, ফরাসি ও ইংরেজি নাটকের অনুবাদও করেছিলেন। তাঁর অনূদিত নাটকগুলি প্রায় বৈশিষ্ট্যবর্জিত হলেও, অনুবাদ নাটকের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের জন্য একটি কৃতিত্ব তাঁর প্রাপ্য।