বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/গিরিশচন্দ্র ঘোষ

উইকিবই থেকে

বাংলা নাট্যশালা ও নাটকের ইতিহাসে গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪—১৯১২) এক বিস্ময়কর নাম। এই বিস্ময়ের পিছনে প্রধানত আছে এক অসাধারণ অভিনেতা ও নাট্য পরিচালকের সুদীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সেই সঙ্গে তাঁর উনচল্লিশ বছরের অবিরাম নাট্যরচনা। এই ভূরিস্রষ্টা নাট্যকার প্রায় একশোটি নাটক রচনা করেছেন। সংগত কারণেই তিনি সমকালে ‘নটগুরু’ আখ্যা লাভ করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রিয় ‘ভক্ত ভৈরব’ গিরিশচন্দ্রের জীবন এক ধর্মীয় মহিমায় মণ্ডিত এবং আমাদের দেশ গুরুবাদের দেশ বলেই নির্বিচারে তিনি ‘মহাকবি’ আখ্যাও লাভ করেছিলেন। তিনি নটগুরু, অতএব তিনি নিশ্চিতভাবে নাট্যগুরুও হবে—এমন অযৌক্তিক ধারণার বশেই তাঁর গুণমুগ্ধেরাও কখনও তাঁকে শেকসপিয়রের উপরেও আসন দিয়েছিলেন। এই ধারণা ভাবাবেগপ্রসূত স্তুতিবাদ হতে পারে, কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ নাট্যসমালোচনা নয়। গিরিশচন্দ্রের নাটকের আলোচনার প্রথমে তাই পূর্বোক্ত মোহ অপসারণ করে যুক্তির আলোয় সাহিত্যবিচারের পথে অগ্রসর হতে হবে। এর আগে আর-একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। গিরিশচন্দ্র আগে নট (১৮৬৭), পরে নাট্যকার (১৮৭৪)। নাট্য পরিচালক রূপে নাট্যশালাকে বাঁচাতে গিয়েই তিনি নানা শ্রেণির নাটক রচনা করেছিলেন। এই বিষয়ে অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর রঙ্গালয়ে ত্রিশ বৎসর গ্রন্থে লিখেছেন, “নাট্যবাণীর পূজার প্রধান উপকরণ—ইহার প্রাণ—ইহার অন্ন—নাটক। গিরিশচন্দ্র এদেশের নাট্যশালার প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন মানে—তিনি অন্ন দিয়া ইহার প্রাণরক্ষা করিয়াছিলেন, বরাবর স্বাস্থ্যকর আহার দিয়া ইহাকে পরিপুষ্ট করিয়াছিলেন; ইহার মজ্জায় মজ্জায় রসসঞ্চার করিয়া ইহাকে আনন্দপূর্ণ করিয়া তুলিয়াছিলেন; আর এইজন্যই গিরিশচন্দ্র Father of the native stage—ইহার খুড়া জ্যাঠা আর কেহ কোনোদিন ছিল না।” কিন্তু নিছক প্রয়োজনের তাড়নায় রচিত এই নাটকগুলি শৈল্পিক উৎকর্ষ লাভ করতে পারেনি। তাই তাঁর প্রায় একশো নাটকের মধ্যে প্রফুল্ল নাটকটিই আজ কোনও রকমে টিকে আছে। এমনকি যে পৌরাণিক নাটকে তিনি একদা অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যকার ছিলেন, সেগুলিও হারিয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির অন্ধকারে।

নাটকের বিষয়বৈচিত্র্যে গিরিশচন্দ্র একমেবাদ্বিতীয়ম্‌। প্যান্টোমাইম (Pantomime) শ্রেণির নাটক থেকে আরম্ভ করে গীতিনাটক, প্রহসন, পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক ও পারিবারিক—সব ধরনের নাটকই তিনি রচনা করেন। মঞ্চ-কর্তৃত্ব তাঁর হাতে থাকায় তাঁর সব নাটকই মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাট্যকার হিসেবে গিরিশচন্দ্রের যে আসন তাঁর গুণমুগ্ধেরা নির্ধারণ করেন, তার উৎস এখানেই। আগমনী, অকালবোধন, দোললীলা, মায়াতরু, মোহিনী-প্রতিমা, মলিন মালা, পারস্যপ্রসূন, বেল্লিক বাজার, আবুহোসেন, আলাদীন, য্যায়সা কা ত্যায়সা প্রভৃতি তাঁর গীতিনাটক, প্রহসন ও পঞ্চরং (Extravaganza)। রাবণ বধ, সীতার বনবাস, অভিমন্যু বধ, লক্ষ্মণ বর্জন, সীতাহরণ, পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস (১৮৮৩), দক্ষযজ্ঞ (১৮৮৩), নল-দময়ন্তী, শ্রীবৎস-চিন্তা, জনা (১৮৯৩), পাণ্ডব-গৌরব (১৯০০), তপোবল (১৯১১) প্রভৃতি তাঁর পৌরাণিক নাটক। অবতার ও ভক্তজীবনী এবং ভক্তিতত্ত্ব অবলম্বনে তিনি রচনা করেন চৈতন্যলীলা (১৮৮৪), নিমাই-সন্ন্যাস (১৮৮৫), বুদ্ধদেব-চরিত (১৮৮৫), বিল্বমঙ্গল (১৮৮৬), রূপ-সনাতন (১৮৮৭), পূর্ণচন্দ্র (১৮৮৮), নসীরাম (১৮৮৮), করমেতিবাঈ (১৮৯৫), শংকরাচার্য (১৯১০) প্রভৃতি নাটক। আনন্দ রহো (১৮৮১), চণ্ড (১৮৯০), কালাপাহাড় (১৮৯৬), সৎনাম (১৯০৪), সিরাজদ্দৌলা (১৯০৫), মীরকাশিম (১৯০৬), ছত্রপতি শিবাজী (১৯০৭), অশোক (১৯১০) প্রভৃতি তাঁর ঐতিহাসিক নাটক। প্রফুল্ল (১৮৮৯), হারানিধি (১৮৮৯), বলিদান (১৯০৫), শাস্তি কি শান্তি (১৯০৮), গৃহলক্ষ্মী (১৯১২) প্রভৃতি তাঁর পারিবারিক নাটক।

গীতিনাটক, প্রহসন ও পঞ্চরং

[সম্পাদনা]

গীতিনাটক-রচয়িতা হিসেবেই বাংলা নাট্যজগতে গিরিশচন্দ্রের আবির্ভাব। কিন্তু তাঁর গীতিনাটকগুলি নিতান্তই বৈশিষ্ট্যবর্জিত। গীতরচনার ভাষাতেও তিনি নৈপুণ্য দেখাতে পারেননি। শব্দযোজনাতেও নিম্নরুচির পরিচয় যত্রতত্র বিক্ষিপ্ত। গীতিনাটকগুলির মধ্যে একমাত্র আবুহোসেন সেই যুগে বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু তাঁর প্রহসন ও পঞ্চরংগুলির সংলাপে ও গানে ব্যঙ্গবিদ্রূপ ও কদর্য রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নেই। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, "সে যুগের দর্শকগণ যে কী করিয়া ধৈর্য ধরিয়া নাটমঞ্চে এই সমস্ত অপথ্যগুলি হজম করিত, ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়।”

পৌরাণিক নাটক

[সম্পাদনা]

পৌরাণিক নাটক রচনার পটভূমি

[সম্পাদনা]

পৌরাণিক নাটকের রচয়িতা হিসেবেই গিরিশচন্দ্রের খ্যাতি সমধিক। মনোমোহন বসু গীতাভিনয়ের যে ধারায় নাটক লিখেছিলেন, গিরিশচন্দ্র সেই ধারারই অনুসারী। এই প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনার পূর্বে গিরিশচন্দ্র যে যুগে পৌরাণিক নাটক রচনা করেন, তার পটভূমিটি স্মরণ করা আবশ্যক। বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী যে ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, তারই প্রতিক্রিয়া রূপে সেকালে দেখা দিয়েছিল হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ। এই পুনর্জাগরণে দুটি ধারা ছিল। একটি ধারার প্রবক্তা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মনীষীরা। তাঁরা যুক্তিবাদের আলোয় হিন্দুধর্মের ঐতিহ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ অপর ধারার প্রবক্তাগণ যুক্তি অপেক্ষা চিরাচরিত ভক্তিবিশ্বাসকেই একমাত্র পাথেয় করেছিলেন। এদেশে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের ভক্তিবাদ জনমানসে ফল্গুধারার ন্যায় প্রবাহিত ছিল সেই মধ্যযুগ থেকেই। তার সঙ্গে উনিশ শতকে যুক্ত হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণের মতবাদ। এই যুক্তবেণীর সমন্বয়ে বাঙালির মনে ধর্মচেতনার যে জোয়ার এসেছিল, গিরিশচন্দ্র তারই উত্তুঙ্গ শিখরে আসীন হয়ে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি এবং অবতারকল্প সাধুসন্তের জীবনীকে নাট্যরূপ দিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন।

গিরিশচন্দ্রের পৌরাণিক নাটকের মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

পৌরাণিক নাটক অথবা সন্তজীবনী অবলম্বনে নাটক লিখতে গিয়ে গিরিশচন্দ্র শেকসপিয়রীয় নাট্যাদর্শ গ্রহণ করেছিলেন, আবার যাত্রাশৈলীকেও বর্জন করেননি। ফলে একদিকে যেমন নতুন রসাভাস হয়েছে, অপরদিকে তেমনই বাঙালির নিজস্ব রস-সংস্কারই জয়লাভ করেছে। প্রসঙ্গত তাঁর জনা নাটকটির নাম উল্লেখযোগ্য। অনেকের মতে এটিই তাঁর শ্রেষ্ঠ পৌরাণিক নাটক। জনা চরিত্রটি তিনি শেকসপিয়রের দ্য ট্র্যাজেডি অফ কিং রিচার্ড দ্য থার্ড নাটকের ষষ্ঠ হেনরির বিধবা রানি মার্গারেটের ছায়ায় অঙ্কন করেছেন। প্রতিবিধিৎসু জনার উক্তির সঙ্গে মার্গারেটের উক্তির (প্রথম অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য) সাদৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু পার্থক্য এই যে, জনা শুধুই বাগাড়ম্বরময়ী, তিনি ক্রিয়াশীলা নন। অধিকন্তু ক্ষত্রিয় রমণীর মধ্যে বাঙালি মাতৃসুলভ শঙ্কাই প্রাধান্য পেয়েছে। নায়ক প্রবীরও ক্ষত্রিয় যুবক নয়, যেন বাঙালি মায়ের আদুরে দুলাল। বিদূষকের চরিত্রটিও প্রচ্ছন্ন ভক্তিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সরলবিশ্বাসী বিদূষকের বহু উক্তির মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণের সহজ উপদেশের প্রভাব অতি স্পষ্ট। পুরাণের মধ্যে যে শিক্ষাদান ও উপদেশপ্রবণতা আছে, গিরিশচন্দ্রের পৌরাণিক নাটকগুলিতে সেই প্রচারধর্মিতার প্রাধান্যই লক্ষিত হয়। জনা নাটকের তুলনায় পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাসপাণ্ডব-গৌরব নাটক দুটি অধিকতর নাট্যগুণসম্পন্ন। বিল্বমঙ্গল নাটকে যে নাট্যরস প্রথম দিকে ঘনীভূত হয়েছিল, পরের দিকে উপদেশ-মুখরতায় ও প্রচারধর্মিতায় তা একেবারেই উড়ে গিয়েছে। শংকরাচার্যতপোবল নিকৃষ্ট শ্রেণির নাটক। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পৌরাণিক নাটকের প্রসঙ্গে লিখেছেন, “বলিতে কি প্রাচীন বাঙলার কথক ঠাকুরেরা কথকতার দ্বারা যাহা করিতেন, গিরিশচন্দ্রের পৌরাণিক নাটকগুলি সেই প্রয়োজনই সিদ্ধ করিয়াছে। কথকগণ শুধু কথকতার দ্বারা অশিক্ষিত জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করিয়া পৌরাণিক আখ্যান-চরিত্র ও নীতি-উপদেশের উচ্চ আদর্শ জনসমাজে প্রচার করিতেন। গিরিশচন্দ্রও পৌরাণিক নাটকের দ্বারা জনসাধারণকে ভারতীয় জীবন ও সাধনার নীতিগুলির সুকৌশলে প্রচার করিয়াছিলেন।”

পৌরাণিক নাটকে গান ও অলৌকিকতা

[সম্পাদনা]

গিরিশচন্দ্র অজস্র গান লিখেছিলেন। একমাত্র বিল্বমঙ্গল নাটকের গানগুলিই সুরচিত এবং তার চেয়েও বড়ো কথা সুপ্রযুক্ত। অন্যান্য নাটকের এক, দ্বৈত ও সমবেত গানগুলি যাত্রার প্রভাবে রচিত এবং যাত্রার মতোই যত্রতত্র নির্বিচারে প্রযুক্ত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু মিত্র যে বাস্তবধর্মী নাট্যসম্ভাবনার আভাস দিয়েছিলেন, গিরিশচন্দ্র তাকে উজ্জ্বলতর না করে নাট্যধারাকে মধ্যযুগীয় ভক্তিবাদ ও অলৌকিকতাবাদের মোহে আচ্ছন্ন করে দেন। একটি বিশেষ কালে তা দর্শককে আকৃষ্ট করেছিল; কিন্তু তাঁর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী কালের মধ্যেই পরিবর্তিত সমাজ-পরিবেশের নিরিখে তা বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যায়।

ঐতিহাসিক নাটক

[সম্পাদনা]

যুগের দাবি মেটাতে গিরিশচন্দ্র কয়েকটি ঐতিহাসিক নাটক ও ইতিহাসাশ্রয়ী নাটক লিখেছিলেন। এগুলির মধ্যে সিরাজদ্দৌলা, মীরকাশিমছত্রপতি শিবাজী নাটক তিনটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে বাংলায় যে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল এবং স্বাদেশিক আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছিল, এই নাটক তিনটি সেই পরিবেশেই রচিত হয়। তাই এগুলিতে ইতিহাস ও নাটক যতটা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে জাতীয়তাবাদের উচ্ছ্বাস। নাট্যগুণের অভাবে ঐতিহাসিক নাটক রচনায় তিনি বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে পারেননি। অবশ্য তাঁর সিরাজদ্দৌলা নাটকে কিছুটা ঐতিহাসিক কাহিনি অনুসরণের প্রয়াস দেখা যায়। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত সিরাজদ্দৌলা নামক ইতিহাস-গ্রন্থ এই নাটকের একমাত্র উৎস। ঘটনার বিন্যাসে তিনি এই বইটির উপরই বিশ্বস্তভাবে নির্ভর করেছেন। তবু যাত্রার প্রভাবে করিম চাচা ও জহরা নামে দুটি অনৈতিহাসিক চরিত্র এর নাট্যরস অনেকটা ক্ষুণ্ণ করেছে। এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে বহু অসম্ভব ঘটনা নাটকে ঢুকে পড়েছে। জগৎশেঠের বৈঠকখানায় ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন আলোচনায় নবাব-অনুগামী করিম চাচার উপস্থিতি অসম্ভব বলেই মনে হয়। প্রতিহিংসা-পরায়ণা জহরা যেভাবে সিরাজের অন্দরমহল থেকে ইংরেজ শিবিরে যখন তখন প্রবেশ করছে, তারও সম্ভাব্যতা নেই। ফকির দানশা সিরাজের সময়ে জীবিত না থাকলেও এই চরিত্রটিকে তিনি নাটকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, এমনকি তাঁকে ‘বাঙাল’ সাজাতে গিয়ে চরিত্রটিকেই লঘু করে ফেলেছেন। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “অহেতুক স্বাদেশিক উচ্ছ্বাস, স্থানকালপাত্রের কালানৌচিত্য দোষ (anachronism), নাটকীয় বাস্তব ঘটনাকে মেলোড্রামাটিক ফুৎকারে উড়াইয়া দিয়া এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাস, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকের সীমাকে অবহেলাভরে লঙ্ঘন করিয়া যাওয়ার অনুচিত ঝোঁক গিরিশচন্দ্রের ঐতিহাসিক নাটকগুলিকে আধুনিক পাঠক ও দর্শকের রুচির প্রতিকূল করিয়া তুলিয়াছে।”

পারিবারিক ও সামাজিক নাটক

[সম্পাদনা]

গিরিশচন্দ্রের পারিবারিক ও সামাজিক নাটকগুলির মধ্যে প্রফুল্ল, বলিদানশাস্তি কি শান্তি নাটক তিনটিই প্রধান। অপরেশচন্দ্রের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, গিরিশচন্দ্র বলেছিলেন, “realistic বিষয় নিয়ে নাটক লেখা আর নর্দমা-ঘাঁটা এক।” উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। পারিবারিক ও সামাজিক নাটক রচনায় গিরিশচন্দ্রের অনীহা ও তাঁর লেখক-মানসের স্বরূপ এই মন্তব্য থেকে ফুটে ওঠে। তবু সম্ভবত রঙ্গমঞ্চের তাগিদেই এই ধরনের নাটক তিনি লিখেছিলেন। কাহিনি গ্রন্থনে, খুন-জখম-হত্যা-আত্মহত্যার ঘনঘটায় তিনি দীনবন্ধুকেই অনুকরণ করেছিলেন, কিন্তু দীনবন্ধুর মতো নাটকীয় চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেননি। তিনটি নাটকই কলকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে কোনও না কোনও সামাজিক সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। বলিদান নাটকে পণপ্রথার সমস্যা, শাস্তি কি শান্তি নাটকে বাল্যবিধবাদের সমস্যা এবং প্রফুল্ল নাটকে ক্ষীণভাবে মদ্যপান ও মামলা-মোকদ্দমার মতো সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে প্রচার থাককেও তা হয়ে উঠেছে মূলত যৌথ পরিবারের ভাঙনের কাহিনি। তিনটি নাটকেই ট্র্যাজেডি রচনার প্রয়াস আছে। কিন্তু করুণাময়, প্রসন্নকুমার বা যোগেশ কেউই আত্মপ্রত্যয়পূর্ণ সংগ্রামশীল নায়ক নয়; তাই নাটকগুলি করুণ হলেও ট্র্যাজিক হয়নি। ট্র্যাজেডিতে ভয়, বিস্ময়, করুণা দর্শককে স্তম্ভিত করে রাখে, কাঁদালেও কেবলই কাঁদায় না। কিন্তু এই তিনটি নাটক কেবলই কাঁদিয়েছে।

প্রফুল্ল তাঁর প্রথম পারিবারিক নাটক। এটিকে তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটকও মনে করা হয়। কিন্তু নাটকটির মধ্যে নাটকীয় দ্বন্দ্ব বা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রামের স্পৃহা নায়কের মধ্যে দেখা যায় না। ব্যাংক ফেলের কথা শুনে ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার কিছু অংশও উদ্ধার করা যায় কিনা তা না ভেবে নায়ক অপরিমিত মদ্যপানে করতে শুরু করে এবং সমগ্র নাটকে আকণ্ঠ মদেই ডুবে থাকে। নায়কের এমন আচরণ নাট্যরস-পরিপন্থী। গিরিশচন্দ্রের সামাজিক নাটকের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে ড. সুকুমার সেন লিখেছেন, “গিরিশের সামাজিক নাটকে প্রথম বিশেষত্ব হইতেছে এই যে, ইহাতে কলিকাতার মধ্যবিত্ত গৃহস্থ জীবনের কাহিনী মাত্র স্থান পাইয়াছে। দ্বিতীয় বিশেষত্ব ব্যাংক-ফেল্‌, ঋণের দায়ে ডিক্রীজারি, চাকুরিহানি, গৃহবিক্রয়, চুরির অভিযোগ, কন্যার পতিবিয়োগ ইত্যাদি সমস্ত বিপৎপাত একসঙ্গে অথবা পর পর দ্রুতবেগে ঘটিয়া গিয়াছে এবং তাহার ফলে গৃহকর্তা স্ত্রীলোকের অধিক মুহ্যমান হইয়া পড়িয়াছে। তৃতীয় বিশেষত্ব বিপৎপাতের মূলীভূত চক্রান্তের স্রষ্টা হইতেছে নায়কের ভ্রাতা, বাল্যবন্ধু অথবা ভ্রাতৃস্থানীয় স্নেহাস্পদ ব্যক্তি। তাহার সঙ্গে উকিল অ্যাটর্নি দালালের যোগ থাকিবেই। ভাগ্যহত নায়ক বিকৃতমস্তিষ্ক হইয়াও ঘটনাবলীর পরিণতি সহজ মানুষের মতো লক্ষ্য ও অনুমান করিয়া যাইবে। চতুর্থ বিশেষত্ব নীলদর্পণের আদর্শে নাটকের শেষে আত্মহত্যা, হত্যা এবং ‘পতন ও মৃত্যু’ ইত্যাদির প্রাচুর্য থাকিবে। নাটকের ভাগ্যহত পাত্রপাত্রীকে সংসার-ভূমি হইতে একেবারে নিকাশ করিয়া তবেই যবনিকা-পতন হইতেছে গিরিশচন্দ্রের নাট্যকৌশল।” এই নাট্যকৌশল যাত্রাশৈলীর অনুসারী। গিরিশচন্দ্রের শিল্পীমানস যাত্রানাটক ও গীতাভিনয়ের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে তিনি মধুসূদন বা দীনবন্ধুর আধুনিক আদর্শ গ্রহণ করতেও সক্ষম হননি। তবে একথা অনস্বীকার্যে যে, বাংলা নাটকের অভাবের যুগে তিনি অজস্র নাটক লিখে বাংলা রঙ্গমঞ্চকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এটিই গিরিশচন্দ্রের প্রধান কৃতিত্ব।

মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

গিরিশযুগের পূর্বে বাংলা নাটক অভিজাত সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদেরই বাড়িতে অথবা বাগানবাড়িতে অভিনীত হত। গিরিশচন্দ্র ও তাঁর সহযোগীরাই প্রথম সেই নাটককে নিয়ে এলেন জনতার দরবারে। কিছুকাল পূর্বে কলকাতায় নাট্যশালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের সদস্যরাই তা দেখার সুযোগ পেতেন। ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠিত হল। সেদিন থেকেই নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে সূচিত হল এক গৌরবময় অধ্যায়। নাট্যশালার প্রসারেই নাটকের প্রচার সম্ভব হয়। দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখের শ্রেষ্ঠ নাটকগুলি পূর্বে রচিত হলেও সেগুলির প্রকৃত ও যথাযোগ্য সমাদর সাধারণ নাট্যশালার দর্শকগণের প্রশংসার মাধ্যমেই হয়েছিল। সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আমৃত্যু গিরিশচন্দ্র বাংলা নাট্যমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁকে কেন্দ্র করে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি, অমৃতলাল বসু, অমৃতলাল মিত্র, অমৃতলাল মুখোপাধ্যায়, মহেন্দ্রলাল বসু প্রমুখ নট ও নাট্যকার বাংলা নাটকের সমৃদ্ধি সাধনে নিযুক্ত হন। গিরিশচন্দ্র ও তাঁর সহকারীরা বাংলা নাট্য আন্দোলনকে এক চূড়ান্ত রূপ প্রদান করেন। সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠা, রঙ্গমঞ্চ পরিচালনা ও অভিনয়-শিল্প শিক্ষাদানে গিরিশচন্দ্রের সমকক্ষ কেউ বাংলায় ছিলেন না। গিরিশচন্দ্র অনেক নাটক লিখেছিলেন বটে, কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা এই যে, তিনি রঙ্গমঞ্চের শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও রক্ষাকর্তা। তাঁর পূর্বে নাট্যশালার নিতান্ত শৈশবাবস্থা এবং তাঁর পরেই আবার নাট্যশালার অকাল বার্ধক্যের সূচনা ঘটে। নাট্যশালার গৌরবময় যৌবন কেবল গিরিশচন্দ্রের সময়েই প্রকট হয়েছিল। রঙ্গালয়ের অধ্যক্ষ ও অভিনেতা রূপেই গিরিশচন্দ্রের আত্মপ্রকাশ এবং হয়তো একমাত্র এই রূপেই তাঁর জীবনের সর্বোত্তম বিকাশ ঘটতে পারত। কিন্তু নাট্যশালার প্রয়োজনেই তাঁর প্রতিভার অপর একটি দিক প্রকাশিত হল এবং প্রতিভাবান জনপ্রিয় অভিনেতার সঙ্গে খ্যাতনামা নাট্যকারের নিরলস প্রচেষ্টার সংযোগ সাধিত হল। গিরিশচন্দ্র নাট্যরচনায় হাত দেওয়ার আগে মধুসূদন ও দীনবন্ধুর নাটক এবং বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলির নাট্যরূপ নাট্যশালার চাহিদা মিটিয়ে আসছিল। কিন্তু ক্রমে সেগুলি পুরোনো হয়ে এল এবং দর্শকেরা নতুন নাটক দেখতে চাইলেন। দর্শকের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে এবং নাট্যশালাগুলিকে নতুন ধরনের নাটক দিয়ে সমৃদ্ধ করার আশা নিয়ে গিরিশচন্দ্র নিজে নাটক লিখতে শুরু করলেন। সেই সময় থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রমে নিত্য নতুন নাটক লিখে চললেন তিনি। এইসব নাটক সেকালের রঙ্গমঞ্চগুলিকে নতুন রসের আভাস দিয়েছিল। গিরিশচন্দ্রের মতো এত বেশি সংখ্যায় নাটক বাংলার আর কোনও নাট্যকার লেখেননি, সৃষ্টির এই বাহুল্য যথার্থই সকলের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

গিরিশচন্দ্র সম্ভবত বাংলার সর্বাপেক্ষা ভাগ্যবান নাট্যকার। দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ অনেক নাট্যকার শ্রেষ্ঠ প্রতিভার অধিকারী হয়েও সমালোচকেরা কাছে প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পাননি। কিন্তু গিরিশচন্দ্র জীবদ্দশাতেই নাট্যসমালোচকদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন। গিরিশচন্দ্রের বহু অনুরাগী সমালোচক তাঁকে শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের মর্যাদা দান করেন। এঁদের অধিকাংশই ছিলেন গিরিশচন্দ্রের সমসাময়িক এবং কাছের মানুষ। তাই পরিচালক, ব্যবস্থাপক, শিক্ষক এবং সর্বোপরি অসাধারণ অভিনেতা গিরিশচন্দ্র এঁদের দৃষ্টিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন রেখেছিলেন যে, নাট্য-সমালোচনায় এঁরা অপক্ষপাতী বিশ্লেষক দৃষ্টি সজাগ রাখতে পারেননি। ড. সুকুমার সেন লিখেছেন, “নাটকের শাশ্বত সাহিত্যমূল্য ততটুকুই যতটুকু দ্বারা ইহাতে মানবজীবনরস কালদেশাতিশায়ী শিল্পসৌন্দর্য লাভ করিতে পারে।” গিরিশচন্দ্রের নাট্যকৃতিত্বও কিন্তু এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপটেই আলোচ্য।

গিরিশচন্দ্র যে সময়ে নাট্যকার রূপে আবির্ভূত হলেন, তখন বাংলা নাট্যসাহিত্যের শৈশব ও কৈশোর অতিক্রান্ত হয়ে যৌবন সূচিত হয়েছে। তাঁর পূর্বেই প্রতিভাবান নাট্যকারেরা বিভিন্ন নাট্যধারার প্রবর্তন করেছিলেন, গিরিশচন্দ্র সেই ধারায় বহু সংখ্যক নাটক লিখে নাট্যশালাকে সচল রেখেছিলেন—এটিই তাঁর কৃতিত্ব। তিনি পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক অনেক ধরনের নাটক লিখেছিলেন, কিন্তু সব ক্ষেত্রেই বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করেছিলেন তাঁর পূর্বসূরিদের নির্দেশিত পথ। সামাজিক নাটকে তিনি দীনবন্ধুর নাটক, বিশেষত নীলদর্পণ-এর দ্বারা প্রভাবিত। করুণরসের প্রাবল্য, অকারণ মৃত্যুর আতিশায্য এবং চরিত্রের অতিরঞ্জন প্রভৃতি নীলদর্পণ-এর বৈশিষ্ট্যগুলি গিরিশচন্দ্রের নাটকে সমভাবে বিদ্যমান ছিল। ঐতিহাসিক নাটকে তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নাটকে যে বীররসের আধিক্য এবং স্বদেশি ভাবোদ্দীপন দেখা যায়, গিরিশচন্দ্রের ঐতিহাসিক নাটকেও সেইসব বিশেষত্ব আছে। ধর্মপ্রাণ বাঙালির হৃদয় জয় করতে হলে পৌরাণিক নাটক লেখা দরকার, গিরিশচন্দ্রও তা বুঝেছিলেন। মনোমোহন বসু থেকে রাজকৃষ্ণ রায় পর্যন্ত যে পৌরাণিক গীতাভিনয়, অপেরা প্রভৃতির ধারা চলে আসছিল, তা গিরিশচন্দ্রের পৌরাণিক নাটকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অবশ্য পৌরাণিক নাটকে তাঁর কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের জন্য সেগুলি সম্পূর্ণত যাত্রা বা গীতাভিনয়ের অনুরূপ হয়নি।

গিরিশচন্দ্র তাঁর পৌরাণিক নাটকে রামায়ণ ও মহাভারত থেকে অনেক কাহিনি গ্রহণ করেছিলেন। সাধারণ বাঙালির ন্যায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারতই তাঁর মানসিক সংস্কৃতি গঠন করেছিল। কৃত্তিবাসী ও কাশীরামের ভাব ও ভাষা তাঁর অনেক নাটকেই অবিকল অনুসৃত হয়েছিল। ইতিপূর্বে মধুসূদন রাম ও রাবণ চরিত্রের পরিকল্পনায় অভিনব মৌলিকত্ব দেখিয়েছিলেন, কিন্তু কৃত্তিবাসের প্রতি সশ্রদ্ধ আনুগত্যের জন্য গিরিশচন্দ্র মধুসূদনকে অনুসরণ করেননি। তাঁর রাম, রাবণ প্রভৃতি চরিত্র খাঁটি কৃত্তিবাসী চরিত্রেরই অনুরূপ হয়েছে। গিরিশচন্দ্র ও নাট্যসাহিত্য গ্রন্থে জানা যায়, স্বয়ং নাট্যকারও এই দুই বাঙালি কবির প্রতি তাঁর ঋণ স্বীকার করে কুমুদবন্ধু সেনকে বলেছিলেন, “…মহাকবি কাশীরাম দাস, কৃত্তিবাসী আমার ভাষার বনিয়াদ। আমার লেখায় তাঁদের প্রভাবও দেখতে পাবে।”

গিরিশচন্দ্রের নাটকে দেশীয় ও জাতীয় ভাব অধিক হলেও বিদেশি ভাব ও সাহিত্যের আদর্শও তিনি কিছুটা গ্রহণ করেছিলেন। কুমুদবন্ধু সেনকে তিনি বলেছিলেন, “মহাকবি সেক্ষপীয়রই আমার আদর্শ। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছি।” শেকসপিয়রের ন্যায় তিনিও নাটকের পঞ্চাঙ্ক বিভাগ সর্বত্র মেনে চলেছেন। শেকসপিয়রের অনুসরণে তিনি আদিম প্রবৃত্তির সংঘাত এবং প্রবল ভাবের (passion) আতিশায্য বর্ণনা করেছেন। মানবসমাজের যত অন্যায় ও দুষ্কৃতি, শেকসপিয়র সে সব কিছুই অঙ্কন করেছিলেন। গিরিশচন্দ্রের নাটকেও ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, প্রতিহিংসা, ব্যভিচার, নরহত্যা প্রভৃতি সব ধরনের অপরাধ ও পাপ দেখানো হয়েছে। বিদূষক প্রভৃতির চরিত্রের উপর শেকসপিয়রের Fool চরিত্রের প্রভাব কিছুটা পড়েছে। শেকসপিয়রের ন্যায় গিরিশচন্দ্রও লঘু ও হাস্যরসাত্মক ভাবপ্রকাশের জন্য গদ্য এবং গম্ভীর ও ওজস্বী বিষয় ব্যক্ত করার জন্য পদ্য ব্যবহার করেছেন।

শেকসপিয়রের জুলিয়াস সিজার, হ্যামলেট, ম্যাকবেথ প্রভৃতি নাটকে যেমন প্রেতাত্মার অস্তিত্ব আছে, গিরিশচন্দ্রের চণ্ড, কালাপাহাড় ইত্যাদি নাটকেও তেমনই অশরীরী ছায়ামূর্তির আবির্ভাব দেখানো হয়েছে। শেকসপিয়রের সঙ্গে এইসব সাদৃশ্য সত্ত্বেও জোর দিয়ে বলা যায় যে, গিরিশচন্দ্রের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাঁর নাট্যগুরুর আদর্শের গুরুতর প্রভেদও বিদ্যমান। গিরিশচন্দ্রের সব নাটকই ধর্মভাব ও নীতিবোধে আচ্ছন্ন। এটিই তাঁর সর্বপ্রধান নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাঁর নাটকের মধ্যে দেশীয় ঐতিহ্যের ভাব ও সংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত এবং তাঁর নাটকীয় রীতিও সর্বতোভাবে শেকসপিয়রের অনুসারী নয়। তাই শেকসপিয়রের সঙ্গে তাঁর নাটকে গভীর ঐক্য অনুসন্ধান করতে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

ভাষা ও ছন্দের দিক থেকেও গিরিশচন্দ্র বাংলা নাটকের অনেক সংস্কার সাধন করেছিলেন। মধুসূদন, দীনবন্ধু প্রমুখ নাট্যকারের গদ্য সংলাপ সংস্কৃত ভাষার প্রভাবে ক্ষেত্রবিশেষে আড়ষ্ট ও অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। গিরিশচন্দ্রই প্রথম নাটকীয় সংলাপ সাবলীল করতে সক্ষম হলেন, নাটকীয় চরিত্রগুলিতে তিনি আরোপ করলেন তাদের নিজস্ব ভাষা। সংস্কৃত নাটকের বিদূষক প্রভৃতি যেমন প্রাকৃত ভাষায় কথা বলে, গিরিশচন্দ্রের বিদূষক প্রভৃতি হাস্যরসাত্মক চরিত্রগুলিও তেমনই কলকাতা অঞ্চলের ইতর ভাষা (slang) ব্যবহার করে। গম্ভীর ও মার্জিত ভাষার সঙ্গে বৈপরীত্য দেখিয়ে নাট্যকার এই ভাষা হাস্যরস উদ্রেক করার জন্য প্রয়োগ করেছেন বটে, তবে একই ধরনের চরিত্রের মুখে প্রত্যেক নাটকে একই ভাষা একঘেয়ে ও বৈচিত্র্যহীন হয়েছে। তাছাড়া তাঁর ভাষায় সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনার অভাব দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের নাটকের ভাষায় যে wit এবং অপরূপ কারুকার্য দেখা যায়, গিরিশচন্দ্রের ভাষায় তা নেই।

গিরিশচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব গৈরিশ ছন্দ। এই ছন্দের আবিষ্কর্তা অবশ্য তিনি নন। তাঁর পূর্বেই কালীপ্রসন্নের হুতোম প্যাঁচার নক্সা-এ, ব্রজমোহন রায়ের দানব-বিজয় নাটকে এবং রাজকৃষ্ণ রায়ের কাব্যে এই ছন্দ ব্যবহৃত হয়। কিন্তু গিরিশচন্দ্রই এই ছন্দ সংস্কার করে নাটকের উপযোগী করে তোলেন। নাটকে দীনবন্ধু-ব্যবহৃত পয়ার এবং মধুসূদন-প্রবর্তিত চতুর্দশাক্ষরী অমিত্রাক্ষর ছন্দ অনুকূল নয়, কারণ ওই দুই ছন্দে ভাবের দ্রুত ও অবিরাম গতি সম্ভব হয় না। কিন্তু গৈরিশ ছন্দের মধ্যে দিয়ে নাটকীয় ক্রিয়া ও চরিত্র দ্রুতগতি লাভ করে এবং কথোপকথন দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর মনে হয় না। গিরিশচন্দ্রের এই মৌলিক নাটকীয় ছন্দের জন্যই তাঁর পৌরাণিক নাটকগুলি গতানুগতিক একঘেয়েমি থেকে রক্ষা পেয়েছে।

গিরিশচন্দ্র যখন নাট্যরচনায় হাত দেন তখন বাংলায় হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের যুগ। ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর ধর্মদ্রোহের দিন অতিক্রান্ত এবং ব্রাহ্ম আন্দোলনের সাময়িক চাঞ্চল্যও স্তিমিত। বাঙালি পুনরায় আত্মপ্রতিষ্ঠ হয়ে নিজের ধর্ম ও সমাজ সংরক্ষণে ব্রতী। এই পরিবেশে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেন পৌরাণিক কাহিনির নিয়ে মহাকাব্য-আখ্যানকাব্য রচনা শুরু করেছেন এবং বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভা যুক্তিবাদের নিরিখে হিন্দুধর্মের সারতত্ত্ব অনুশীলনে নিরত হয়েছে। এমন এক সর্বজনীন ধর্মপ্লাবন গিরিশচন্দ্রের ধর্মভাবকে পুষ্ট করলেও তাঁর জীবনে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য প্রভাব এসেছিল শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গলাভের মাধ্যমে। এই দুই ধর্মনেতা তাঁর মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গি এমনভাবে প্রভাবিত করেছিলেন যে, তাঁর সমস্ত নাটকে ভক্তিভাবের অবারিত উচ্ছ্বাস দেখা যায়। বিল্বমঙ্গল-এর পাগলিনী, নসীরাম-এর নামচরিত্র এবং কালাপাহাড়-এর চিন্তামণি প্রভৃতি চরিত্রের উপর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ প্রভাব বিদ্যমান। জনা-র বিদূষক, পাণ্ডব-গৌরব-এর কঞ্চুকী, গৃহলক্ষ্মী-র অবধূত প্রভৃতি চরিত্রও শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ অনুসারে কল্পিত। আবার ভ্রান্তি-র রঙ্গলাল, মায়াবসান-এর কালীকিঙ্কর, বলিদান-এর কিশোর এবং শাস্তি কি শান্তি-র পাগল প্রভৃতি চরিত্রে স্বামী বিবেকানন্দের প্রেম ও সেবাধর্মের মূর্তিমান আদর্শ চিত্রিত হয়েছে। কোনও বিশেষ ভক্ত চরিত্র নাটকের অঙ্গহানি করে না, এবং পৌরাণিক বা ধর্মমূলক নাটকে ভক্তিরসের আধিক্য দোষাবহ নয়। কারণ সেইসব নাটকে ধর্ম ও ভক্তির আদর্শই দর্শক আশা করে থাকে। রূপ-সনাতন, ধ্রুব-চরিত্র, প্রহ্লাদ-চরিত্র, বিল্বমঙ্গল প্রভৃতি নাটকে ধর্মভাবের আধিক্য বরং দর্শকের মনকে আপ্লুত করে। কিন্তু এই ধর্মভাব যখন ঐতিহাসিক বা সামাজিক প্রভৃতি বাস্তব নাটকে সংক্রামিত হয়, তখনই তা নাটকীয় রসের পরিপন্থী হয়ে ওঠে। আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও ধর্মাদর্শ গিরিশচন্দ্রের মনপ্রাণকে এমনভাবে আচ্ছন্ন ও অভিভূত করে রেখেছিল যে, বাস্তব রাজ্যের স্থূল বিষয়ে তিনি তাঁর দৃষ্টি বেশিক্ষণ নিবদ্ধ রাখতে পারতেন না। তাঁর নাটকের বাস্তব চরিত্র ও ঘটনাগুলি যেন এক অদৃশ্য ধর্মীয় শক্তির দ্বারা অমোঘভাবে আকৃষ্ট হয়েছে। সুতরাং তাঁর যে কোনও নাটক কিছুক্ষণ দেখেই সেগুলির সুনিশ্চিত পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা হয়ে যায়। গিরিশচন্দ্রের এই সর্বব্যাপী ধর্মভাব ধর্মপ্রাণ বাঙালির কাছে তাঁর নাটককে আদরণীয় করেছে, কিন্তু বাস্তবনিষ্ঠ সমালোচকের কাছে সেগুলিকে করে তুলেছে দোষাবহ। এই ধর্মভাবের প্রাবল্যেই তাঁর ঐতিহাসিক নাটক অশোক, কালাপাহাড় ইত্যাদির ঐতিহাসিকতা নষ্ট হয়েছে এবং সামাজিক নাটক শাস্তি কি শান্তি, মায়াবসান প্রভৃতিকে অনর্থক ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। অনেক সময়েই তিনি পাত্রপাত্রীর মুখ দিয়ে অভীষ্ট ধর্মতত্ত্বের আলোচনা করে তাঁর স্বরূপ নাটকের মধ্যে প্রকাশ করে ফেলেছেন। এর ফলে নাট্যকারের আত্মগুপ্তি-ধর্মও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

গিরিশচন্দ্রের এই প্রবল ধর্মভাব ও নীতিবোধের জন্য নাটকের চরিত্রগুলি তাঁর মানসিক আদর্শ অনুযায়ী পরিণতি লাভ করেছেন। তাঁর নাটকে পাপী ও পুণ্যাত্মা উভয় চরিত্রই আছে, কিন্তু ধর্ম ও নীতির জয় ও গৌরব প্রদর্শনের জন্যই তিনি এই চরিত্রগুলির বিকাশ ঘটিয়েছেন। পাপের পরাজয় এবং ধর্মের জয় ঘটে—এ সাধারণ নীতিশাস্ত্রের কথা। তা দেখিয়ে দর্শকের ধর্ম ও নীতিবোধকে পরিতৃপ্ত করা যায়, কিন্তু তার মধ্যে সূক্ষ্ম শিল্পনৈপুণ্যের অবকাশ নেই। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বিশ্বজনীন মানবনীতিকে কখনও অগ্রাহ্য করেন না বটে, কিন্তু সে নীতি খুব গূঢ় ও গভীর। সাধারণ মানুষের ভালো-লাগা মন্দ-লাগা এবং পাপপুণ্যবোধ দ্বারা তার পরিমাপ করা যায় না। অনেক সময়েই অপরাধী ও পাপী তাঁর সহানুভুতি ও দরদ পেয়ে থাকে এবং ভয়াবহ পরিণতির মধ্যে সব সময়ে তাদের চরিত্র পরিণতি প্রাপ্ত হয় না। শাইলক নিষ্ঠুর নরাধম, কিন্তু তার চরিত্রও দর্শকের সহানুভূতি আকর্ষণে সমর্থ হয়। কিং লিয়ার নাটকে এডমন্ড মানবসমাজের জঘন্য অপরাধে অপরাধী হলেও মনে হয় যে, সমাজের কাছ থেকে সে কেবল ঘৃণা ও ধিক্কার পেয়েছে বলেই সমাজের প্রতি সে এমন প্রতিহিংসা-পরায়ণ হয়ে উঠেছে। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক সৃষ্ট চরিত্র মাত্রই এমন জটিল। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের চরিত্রগুলি নিতান্ত সরল ও সহজবোধ্য, হয় তারা খুব ভালো অথবা নিতান্ত মন্দ। মন্দ চরিত্রের পরিণতি হয় প্রাপ্য শাস্তিতে অথবা আমূল পরিবর্তনে। গিরিশচন্দ্রের অনেক মন্দ চরিত্র কঠোর শাস্তি ও ভয়াবহ পরিণাম লাভ করেনি সত্য, কিন্তু তারা নিশ্চয়ই শেষ পর্যন্ত খুবই সৎ ও ধার্মিক হয়ে উঠেছে। হারানিধি-র মোহিনী, মায়াবসান-এর যাদব ও মাধব এবং বলিদান-এর মোহিত ও দুলাল প্রভৃতি এভাবেই ধর্মের স্পর্শে নতুন মানুষ হয়ে উঠেছে, যতক্ষণ না এইরকম পরিণতি দিতে পেরেছেন, ততক্ষণে গিরিশচন্দ্রের ধর্ম ও নীতিবোধ সন্তুষ্ট হয়নি। সোণা, কাদম্বিনী, গঙ্গা, চিন্তামণি প্রভৃতি পতিতা চরিত্রও তাঁর নাটকে সাধু ও ধর্মপন্থা অবলম্বন করেছে। বার্নার্ড শ মিসেস ওয়ারেন’স প্রফেশন নাটকে পতিতাবৃত্তির অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু গিরিশচন্দ্র পতিতা-সমস্যা নিয়ে তেমন আলোচনা করেননি অথবা শরৎচন্দ্রের ন্যায় পতিতার সূক্ষ্ম অনুভূতি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিশ্লেষণ করেননি। শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে এসে গিরিশচন্দ্র পতিত ও অভাজনে কৃপা করার মহৎ প্রবৃত্তি লাভ করেছিলেন। সেইজন্য লাঞ্ছিতা হতভাগিনী পতিতাদের ধর্মপথে নিয়োজিত করে তিনি তাদের আধ্যাত্মিক মুক্তির বিধান দিয়েছেন নাটকে। ব্যক্তিগত জীবনে রঙ্গালয়ের মধ্যে দিয়ে গিরিশচন্দ্র পতিতাদের জীবন সংশোধনের চেষ্টা করেছেন। ‘অভিনেত্রীর কটাক্ষ’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “নালার জল গঙ্গায় আসিয়া পড়িয়া গঙ্গাজল হইয়া যায়। পরশমণি স্পর্শে ব্যাধ-গৃহের লোহাও কাঞ্চনে পরিণত হয়; সাধুসঙ্গে কুচরিত্রা সন্ন্যাসিনী হন; ভগবদ্ভক্ত হরিদাসকে ছলনা করিতে গিয়া বেশ্যা মোহিনী পরমা বৈষ্ণবী হইয়াছিল। আমাদেরও আশা, সদাশয় ব্যক্তির পদার্পণে রঙ্গালয় পবিত্র হইবে, ও ঘৃণিত অভিনেত্রীরাও স্বীয় শিল্পানুরাগিণী মাতৃদুগ্ধে পরিপুষ্ট বৃত্তি পরিহারপূর্বক সাধুজনের কৃপার ভাজন ও প্রশংসার পাত্রী হইবে।” তাঁর নাটকেও সোণা, গঙ্গা, চিন্তামণিরা সকলেই ধর্ম আশ্রয় করে তাদের বেশ্যাজীবনের কলুষ ও কলঙ্ক ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। সুতরাং পতিতাদের প্রতি গিরিশচন্দ্রের দৃষ্টি পতিতাপাবক মহাপ্রাণের দৃষ্টির সঙ্গে অভিন্ন। পতিতাজীবনের প্রেম ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সংঘাত, সেই জীবনের করুণ ট্র্যাজেডি গিরিশচন্দ্র বিশ্লেষণ করে দেখাতে চাননি। তাঁর পতিতা চরিত্রেরা সকলেই মানবীয় দুর্বলতার ঊর্ধ্বে স্থিত ধর্মব্রতী সন্ন্যাসিনী হয়ে গিয়েছে। একমাত্র মোহিনী-প্রতিমা নাটকে গিরিশচন্দ্র সাহানাকে ধর্মার্থিনী যোগিনী না করে তার জীবনের বেদনার স্পর্শটি ফুটিয়ে তুলেছেন। সাহানা তার প্রেমাস্পদকে অন্যের হাতে সঁপে দিয়ে যে চরম আত্মত্যাগ করল তাতে তার চরিত্র নিতান্ত ট্র্যাজিক ও মহীয়সী হয়ে উঠল। সাহানা শরৎচন্দ্রের সাবিত্রী, বিজলী, চন্দ্রমুখী প্রভৃতি প্রসিদ্ধ চরিত্রকে মনে করিয়ে দেয়। এই নাটকটি গিরিশচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক সৃষ্টি।

গিরিশচন্দ্রের জীবনী ও নাটক আলোচনা করলেই মনে হয় যে, জীবন সম্পর্কে তাঁর গভীর ও দার্শনিক ধারণা ছিল। তাঁর তৎসন্ধিৎসু মন জীবনের সব সমস্যার মূল অনুসন্ধান করেছিল। তাঁর ধর্মপ্রবণতা ও সাধুসঙ্গ তাঁকে জীবন সম্পর্কে আরও বেশি জিজ্ঞাসু করে তুলেছিল। তাই জীবনের হাল্কা দিকটির সঙ্গে গিরিশচন্দ্রের যোগ স্থাপিত হয়নি। দেবেন্দ্রনাথ বসু গিরিশচন্দ্রের জীবনে লিখেছেন, “গিরিশচন্দ্রের কল্পনা উচ্চ ধ্যানে ও উচ্চ আদর্শ চিন্তায় সর্বক্ষণ বিভোর হইয়া থাকিত। এজন্য প্রহসনের নিম্নভূমিতে অবতরণ করিতে চাহিত না।” দীনবন্ধু কিংবা অমৃতলালের ন্যায় গিরিশচন্দ্র নাটকে তাই জীবনের হাস্যমধুর, চপল-চটুল মুহূর্তগুলির পরিচয় দেননি। করুণরস অথবা ভক্তিরসের গম্ভীর ও সমাহিত ধ্বনি তাঁর সমস্ত নাটকে ব্যাপ্ত হয়ে আছে। গিরিশচন্দ্র কুমুদবন্ধু সেনকে বলেছিলেন, “আমার drama-গুলো light নয়, serious mood-এ serious think না করলে সব বুঝতে পারবে না। superficially আমার drama পড়া চলবে না।” তাই তাঁর রসে বিশুদ্ধ হাস্যরসের অভাব। বিদূষক প্রভৃতি চরিত্রের হাস্যরসের তারল্যও ধর্মভাবের প্রাবল্যে সমাধি লাভ করেছে। তিনি যে পঞ্চরংগুলি লিখেছিলেন, সেগুলির মধ্যে ব্যঙ্গবিদ্রূপ ও কদর্য রসিকতা আছে, কিন্তু নির্মল হাস্যরসের স্নিগ্ধ ধারা নেই।

গিরিশচন্দ্রের নাটকে দোষত্রুটি থাকলেও তাতে অকপট আন্তরিকতার অভাব নেই। তিনি নিজে যা দেখেছেন, তাই লিখে গিয়েছেন। কুমুদবন্ধু সেনকে বলেছেন, “আমি বই লিখতে লোককে ফাঁকি দি না। যেটা feel করছি, যে সত্য practical life-এ realise করেছি, যা জীবনে মরণে পরম সত্য ব’লে জেনেছি তাই সবার ভিতরে বিলিয়ে দিতে চেষ্টা করেছি।” ধর্মগুরুর সঙ্গলাভ করেছিলেন বলেই তাঁর নাটকে ধর্মভাবের আধিক্য, আবার বেশ্যা-সংসর্গেও বাস করতে হয়েছিল বলে তাদের কথাও তিনি লিখেছেন।