আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/গদ্যসাহিত্যের সূত্রপাত
উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার ও সংস্কৃতিতে নবদীক্ষিত বাঙালি জাতির জ্ঞান ও কর্মের প্রকাশ ঘটেছিল বাংলা ভাষায় গদ্যচর্চার মাধ্যমে। বাংলা গদ্য গঠনের সৌন্দর্যে, ভাবপ্রকাশের উপযোগিতায় এবং সাহিত্যিক গৌরবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় উনিশ শতকের মধ্যভাগেই। কিন্তু তার আগেও—এমনকি খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতক থেকেই—বাংলা গদ্যরচনার কিছু কিছু নিদর্শন গবেষকদের হাতে এসেছে। পয়ার ছন্দ সব ধরনের ভাবপ্রকাশের উপযোগী ছিল বলে মধ্যযুগে সকলেই ছন্দে গ্রন্থরচনা করতেন, গদ্যনিবন্ধ রচনায় কারও উৎসাহ সেকালে ছিল না। তবু চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ, সহজিয়া বৈষ্ণবদের কড়চা অথবা আরও পরবর্তীকালে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের নিবন্ধ প্রভৃতি নানা উপকরণ গদ্যরচনার নিদর্শন রূপে পাওয়া গিয়েছে।
কোচবিহারের রাজার চিঠি ও অন্যান্য দলিল
[সম্পাদনা]প্রাচীন বাংলা গদ্যের নিদর্শন হিসেবে কিছু চিঠিপত্রের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া সম্পত্তি দান ও হস্তান্তরের দলিলগুলিও গদ্যেই লেখা হত। প্রাচীন চিঠির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোচবিহারের রাজার একটি চিঠি। ১৫৫৫ সালে রাজা নরনারায়ণ যে চিঠিটি লিখেছিলেন, তার ভাষা ছিল বেশ প্রাঞ্জল। বৈষয়িক প্রয়োজনে লেখা গদ্যভাষার প্রকাশযোগ্যতার দিকেই লেখকেরা বেশি নজর দিতেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় আত্মবিক্রয়মূলক দু-চারটি দলিল পাওয়া গিয়েছে। সেগুলিও ভাষাও খুব স্পষ্ট: “এগার রূপাইয়া পাইয়া স্ব-ইচ্ছাপূর্বক আত্মবিক্রয় করিলাম।” অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কারারুদ্ধ নন্দকুমার তাঁর পুত্রকে যে চিঠিটি লিখেছিলেন তাও আদি যুগের গদ্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন: "মুখ-প্রক্ষালনাদি কিছুই করিতে পারি নাই। নাসাগ্রে প্রাণ হইল। ফসীহৎ যত যত পাইলাম তাহা কত লিখিব।" আবার ভূকৈলাসের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল ১৭৯৪ সালে বড়োলাটের কাছে যে দরখাস্ত দেন, তাতেও উৎকৃষ্ট বাংলা গদ্য ব্যবহার করা হয়।
বৈষ্ণব নিবন্ধে গদ্য
[সম্পাদনা]খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে বৈষ্ণব সহজিয়া সাধকেরা গদ্য-পদ্য মিশ্রিত প্রশ্নোত্তরমূলক এক ধরনের কড়চা রচনা করতেন। নরোত্তম দাসের দেহকড়চা বইটিতে এইরকম কিছু গদ্যের নিদর্শন পাওয়া যায়। নাথযোগী ও বৈষ্ণব বৈরাগীরাই এই ধরনের কড়চা রচনা করেছেন। বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থগুলিতেও গদ্যের সঙ্গে ছড়া মিশে গিয়েছিল। লেখকেরা কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া ঠিক করে রীতিমাফিক গদ্য রচনা করতে পারেননি বটে, কিন্তু প্রয়োজনসিদ্ধি ও শিক্ষাদানের ব্যাপারে বাংলা গদ্যের উপযোগিতা প্রমাণ করেছিলেন।
দোমিঙ্গো দে সোসা
[সম্পাদনা]খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের গদ্যচর্চার প্রচেষ্টাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠার আগেও পাদরিরা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে গদ্যরচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁরা এই কাজে অগ্রসর হলেও বাংলা গদ্যসাহিত্য তাঁর প্রয়াসের মাধ্যমে বিশেষ উপকৃত হয়। পর্তুগিজ পাদরিদের মধ্যে দোমিঙ্গো দে সোসা-ই সম্ভবত প্রথম বাংলা গদ্য রচনা করেছিলেন। ১৫৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ফার্নান্দেজ নামক শ্রীরামপুরের এক কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠিতে জানান যে, তিনি ধর্মবিষয়ক একটি কড়চা লিখে পাদরি সোসা-কে দিয়ে বাংলায় অনুবাদ করিয়েছেন। সম্ভবত ১৫৯৮ সালের শেষভাগে বইটি অনূদিত হয়।
দোম আন্তোনিও দে রোজারিও: ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ
[সম্পাদনা]পর্তুগিজ পাদরিরা কয়েকটি ব্যাকরণ ও অভিধান লিখে বিদেশিদের বাংলা শেখার পথ প্রস্তুত করেন। ধর্মমাহাত্ম্য প্রচারের জন্য ও হিন্দুধর্মকে হেয় করার জন্য তাঁরা গদ্যচর্চা করতেন। এমনই এক ধর্মপ্রচারক ছিলেন দোম আন্তোনিও দে রোজারিও। তিনি ছিলেন এক বাঙালি রাজকুমার। ছেলেবেলায় মগ দস্যুদের দ্বারা অপহৃত হন এবং পরবর্তীকালে পর্তুগিজ পাদরির কাছে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেন। তাঁর লেখা ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ বইটির বিষয় ছিল "জনৈক খ্রীষ্টান অথবা রোমান ক্যাথলিক ও জনৈক ব্রাহ্মণ বা হিন্দুদিগের আচার্যের মধ্যে শাস্ত্র সম্পর্কীয় তর্ক ও বিচার"। সম্ভবত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রোমান হরফে বইটি রচিত হয়। লিসবনে রক্ষিত এই বইটি সম্ভবত সেখানেই মুদ্রিত হয়েছিল। বইটির উদ্দেশ্য যাই হোক, এটিতে যে বাঙালির রচনার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছিল তাতে সন্দেহ নেই।
মানোএল দ্য আস্মুম্পসাঁউ: কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ
[সম্পাদনা]মানোএল দ্য আস্মুম্পসাঁউ নামে অপর এক পর্তুগিজ পাদরি খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম্য প্রচার করে সম্ভবত ১৭৩৪ সালে কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ নামে আর-একটি বই লেখেন। এটিও লিসবন শহরে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। এটিই প্রথম মুদ্রিত বাংলা বই। ১৭৪৩ সালে বইটির মুদ্রণকার্য সমাপ্ত হয়। এই বইতে লেখক যে ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তাতে দেশীয় লোকের সহযোগিতা ছিল। ভাষায় বিদেশির জড়তা আছে, তবে ব্যাকরণের নিয়মে ভাষাকে বাঁধার চেষ্টা প্রশংসনীয়।
অন্যান্য নিদর্শন
[সম্পাদনা]আরও দু-একজন পাদরি কিছু বই লিখেছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও সরকারি কাজের প্রয়োজনে কিছু গদ্যানুশীলন করে। কিন্তু তার কোনও সাহিত্যিক মূল্য নেই। এই প্রসঙ্গে হ্যালহেডের ব্যাকরণের কথা উল্লেখ করা যায়। ইংরেজি ভাষায় লেখা ব্যাকরণের উদাহরণগুলি সব বাংলা। বাংলা হরফে মুদ্রিত এটিই প্রথম বই। কোম্পানির কয়েকটি আইনের অনুবাদ গ্রন্থও প্রাচীন গদ্যের নিদর্শন। ডানকান কৃত ইম্পে কোড (১৭৮৫), এডমনস্টোন কৃত কার্যবিধির অনুবাদ (১৭৯১), ফরস্টার কৃত কর্নওয়ালিস কোড (১৭৯৩) প্রভৃতি এই-জাতীয় অনুবাদ গ্রন্থের উদাহরণ।
দেশীয় লেখকদের কৃতিত্ব
[সম্পাদনা]আধুনিক বাংলা গদ্যের সৃষ্টিতে বিদেশিদের উদ্যম আমাদের উপকারে এসেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু গদ্যভাষার গঠনশিল্পে বিদেশিদের কৃতিত্ব সর্বত্র স্বীকার করা যায় না। তাঁরা অর্থের বিনিময়ে দেশীয় লেখকদের দিয়ে লিখিয়ে নিতেন। খাঁটি পর্তুগিজ লেখকের লেখা কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ বইটির তুলনায় বাঙালির নিজের হাতে লেখা ব্রাহ্মণ-রোমান-ক্যাথলিক-সংবাদ বইটির ভাষাশিল্প উন্নততর। আবার অনুবাদকদের অনেকেই ছিল উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তাঁরাও অধীনস্থ দেশীয় লেখকদের দিয়ে লেখাতেন। নন্দকুমারের চিঠি ও দলিলের ভাষা পাদরিদের ভাষার তুলনায় অনেক প্রাঞ্জল। গদ্য-শিল্পরচনায় বাঙালির দানই তাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত মনে হয়।