আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ
ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (১৮৬৮—১৯২৭) দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সমকালীন নাট্যকার। দ্বিজেন্দ্রলাল যেখানে বাংলা নাটককে যেভাবে উচ্চ গ্রামে বাঁধতে চেয়েছিলেন এবং তার মধ্যে বহু নতুন ভাবের সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন, সেখানে ক্ষীরোদপ্রসাদ প্রায় বিশ্বস্তভাবে প্রচলিত নাট্যধারাকেই অনুসরণ করে লোকরঞ্জনকারী নাট্যকার হিসেবে একটি সংকীর্ণ কালসীমায় বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে একমাত্র আলমগীর নাটকটি ছাড়া তাঁর প্রায় সব নাটকই হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্তরালে। আলমগীর নাটকটিও যে টিকে থাকে, তার গৌরব যত না নাট্যকারের তার চেয়েও বেশি অভিনেতা শিশিরকুমার ভাদুড়ীর বিস্ময়কর অভিনয় প্রতিভার। অপেরা বা গীতিমুখর নাটক, পৌরাণিক নাটক, কাল্পনিক নাটক, ঐতিহাসিক নাটক—প্রায় সব ধরনের নাটকই লিখেছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। কিন্তু তাঁর নাটকে রোম্যান্সের প্রাধান্য এত বেশি ছিল যে সব কটি নাটককেই রোম্যান্টিক নাটক বললে অত্যুক্তি হয় না।
অপেরা বা গীতিমুখর নাটক
[সম্পাদনা]ক্ষীরোদপ্রসাদের গীতিমুখর নাটকগুলির মধ্যে আলিবাবা (১৮৯৭), কিন্নরী (১৯১৮), করুণা, প্রমোদ-রঞ্জন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বস্তুত এই ধরনের নাটকেই তাঁর নাট্যপ্রতিভার স্বাভাবিক স্ফূরণ ঘটেছে। আলিবাবা সেকালে বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল। এই নাটকের কাহিনির স্বচ্ছন্দ গতি এবং লঘু কৌতুকরসই এটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। কাহিনিটি আরব্য উপন্যাস-নির্ভর হওয়ায় ঘটনার অসম্ভাব্যতার প্রশ্নটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবু গল্পের মাঝে নাট্যকার চরিত্রগুলির মধ্যে গূঢ় ব্যঞ্জনা আনতে পেরেছেন বলেই এই নাটকের শিল্পচাতুর্য প্রশংসনীয়। এটির একক, দ্বৈত ও সমবেত গানগুলির আকর্ষণও দুর্নিবার। কিন্নরী ও করুণা সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।
পৌরাণিক নাটক
[সম্পাদনা]উলুপী, সাবিত্রী (১৩০৯ বঙ্গাব্দ), ভীষ্ম (১৩২০ বঙ্গাব্দ), নরনারায়ণ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) প্রভৃতি ক্ষীরোদপ্রসাদের পৌরাণিক নাটক। অর্জুন কর্তৃক পরিনীতা ও পরে পরিত্যক্তা নাগকন্যা উলুপীর উপাখ্যান উলুপী নাটকের বিষয়বস্তু। এতে যেমন কাহিনি-বিন্যাসের চমৎকারিত্ব আছে, তেমনই আবার উলুপী চরিত্রে দ্বন্দ্ব-বিকাশের প্রয়াসও লক্ষণীয়। সাবিত্রী নাটকটি গতানুগতিক। ভীষ্ম নাটকে গিরিশচন্দ্রকেই অনুসরণ করেছেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। কালের পরিধি এই নাটকে অতিমাত্রায় বিস্তৃত হওয়ায় ঘটনাগত ঐক্যের অনেক অভাবও সুপ্রচুর। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে কাহিনি পরস্পর-সংযুক্ত না হয়ে যেন লাফিয়ে চলেছে। ফলে একটা কেন্দ্রীয় রস কোথাও দানা বাঁধতে পারেনি। কাহিনি-বিন্যাসে এই শৈথিল্য যাত্রারীতিরই লক্ষণ। যাত্রাশৈলীর অনুকরণে নাটকে বহু অবান্তর ঘটনা ও চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। গম্ভীর চরিত্রে তরল হাস্যরস সৃষ্টির প্রয়াসও যাত্রার লক্ষণাক্রান্ত। অধিকন্তু যাত্রার মতো নাটকে অনাবশ্যক গান সংযোজিত হয়েছে। অবশ্য এই নাটকে যাত্রাসুলভ অলৌলিকতাবাদকে তেমন গুরুত্ব দেননি নাট্যকার। বরং ভীষ্মের চরিত্রে মানবীয় গুণ আরোপ করে চরিত্রটিকে অনেকটা বাস্তবতা দিয়েছেন। তবু নাটকটি উৎকৃষ্ট নাটক হয়নি। ক্ষীরোদপ্রসাদের পৌরাণিক নাটকগুলির মধ্যে নরনারায়ণ শ্রেষ্ঠ। এই নাটকটিকেও সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত বলা চলে না। তবু নাটকটির প্রধান গুণ এই যে, শেকসপিয়রীয় রীতির অনুসরণে এখানে নায়ক কর্ণের চরিত্রের ভিতর দিয়েই নাট্যকাহিনি বিকশিত হয়ে উঠেছে এবং এই চরিত্রে নাট্যকার প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতেও সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। অন্যান্য চরিত্রগুলি অবিকশিত। যাত্রার অনুকরণে ভাঁড়ামির অবতারণা করতে গিয়ে শকুনির মতো খল চরিত্রেও তরল কৌতুকরস সৃষ্টি করেছেন নাট্যকার। তাছাড়া এই নাটকে কৃষ্ণভক্তির প্রাবল্য যাত্রাশৈলীরই অনুসরণ মাত্র।
কাল্পনিক নাটক
[সম্পাদনা]রঘুবীর, খাজাহান, রঞ্জাবতী, আহেরিয়া, রত্নেশ্বরের মন্দিরে প্রভৃতি ক্ষীরোদপ্রসাদের কাল্পনিক নাটক। এগুলি রোম্যান্সেরই আধিক্য, চরিত্রের সংঘাত বা নাট্যকাহিনির বিকাশ দেখা যায় না। রঘুবীর এক সময়ে শিশিরকুমারের অভিনয় গুণে রঙ্গমঞ্চে বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল।
ঐতিহাসিক নাটক
[সম্পাদনা]ক্ষীরোদপ্রসাদের ঐতিহাসিক নাটকগুলির মধ্যে নন্দকুমার (১৩১৪ বঙ্গাব্দ), প্রতাপ আদিত্য (১৯০৩), আলমগীর (১৯২১), পদ্মিনী, চাঁদবিবি, বাংলার মসনদ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। প্রসিদ্ধ রাজপুত কাহিনির আধারে পদ্মিনী রচিত। বিজাপুরের মহীয়সী বীরাঙ্গনা চাঁদবিবির কাহিনি চাঁদবিবি নাটকের উপজীব্য। মুর্শিদকুলি খাঁর দৌহিত্র্য বাংলার নবাব সরফরাজ খাঁ বাংলার মসনদ নাটকের নায়ক। অতিমাত্রায় রোম্যান্স-প্রবণতা তিনটি নাটককেই যথার্থ নাটক হয়ে উঠতে দেয়নি। চাঁদবিবি নাটকে আধুনিক যুগের অতি-সচেতন স্বাধীনতার বার্তা হিন্দু-মুসলমান চরিত্র নির্বিশেষে এমন প্রাধান্য লাভ করেছে যে, শত প্রয়াস সত্ত্বেও নাটকের প্রচারধর্মিতাকে চেপে রাখা যায়নি। তার উপর উৎকট কল্পনাবিলাস ও ঘটনার অসম্ভাব্যতা তো আছেই। সেকালের স্বাদেশিক পরিবেশে প্রতাপ আদিত্য নাটকটি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কিন্তু নাট্যবিচারে এটি নিকৃষ্ট। প্রতাপাদিত্যকে জাতীয় বীর রূপে অঙ্কিত করতে গিয়ে তিনি কাহিনির ঐতিহাসিকতা খর্ব করেছেন, তারপর রোম্যান্সের বল্গাহীন পথে কল্পনাকে ছেড়ে দিয়েছেন। সম্ভাব্যতার সীমাকেও তা অনেক জায়গাতেই অতিক্রম করে গিয়েছে। বিজয়ার মেরি-মূর্তি ধারণ, বা নাটকের শেষে ব্রিটানিয়ার আবির্ভাব—কল্পনার এই অতিচার যাত্রাতেই সম্ভব, নাটকে নয়। নাটকটির সম্পর্কে স্বাদেশিকতার দে দোহাই দেওয়া হয়, তাও কোনও নাট্যচরিত্রের বিকাশের মাধ্যমে উপস্থিত হয়নি, মাত্র কয়েকটি সংলাপের উপরই তার অস্তিত্ব নির্ভর করছে। তুলনায় আলমগীর উন্নততর নাটক। বলা যায়, আলিবাবা-র পর ক্ষীরোদপ্রসাদের নাটক হিসেবে একমাত্র আলমগীর-এর নামই করা চলে। এতেও অনাটকীয় অনেক বিষয় আছে, অনেক অসম্ভাব্যতারও অবতারণা করা হয়েছে। নাটকের শেষে ইতিহাসখ্যাত হিন্দু-বিদ্বেষী আলমগীরের মুখে শোনা যায়, “হে কবি, বছর যাক, যুগ যাক, শতাব্দীর চলে যাক, শতাব্দীর পারে, একদিন তোমার তুলিকামুখে আলমগীরের এ মিলন-অভিলাষ—হিন্দু-মুসলমানের মিলন-অভিলাষ মুখর হোক।” নিঃসন্দেহে এই উক্তি আলমগীরের নয়, বরং স্বদেশি আদর্শে ভাবিত নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদের। নাট্যচরিত্রে নাট্যকারের এ-হেন উৎকট আত্মপ্রকাশ তাঁর অক্ষমতাকেই প্রকাশ করে। দুর্ভেদ্য মুঘল হারেমে ভীমসিংহের উপস্থিতি অথবা অন্যত্র ভীমসিংহকে বীরাবাঈ-এর স্তন্যদান অবাস্তব উপকথার সমতুল্য। একমাত্র আলমগীর ও উদিপুরীর মধ্যে নাট্যকার চমৎকারভাবে যে দ্বন্দ্বের অবতারণা করেছেন, তা-ই এই নাটকটির শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। বস্তুত এই দুই চরিত্র-চিত্রণ উচ্চ শ্রেণির নাট্যপ্রতিভার নিদর্শন।
মূল্যায়ন
[সম্পাদনা]ক্ষীরোদপ্রসাদের নাটক সম্পর্কে মোহিতলাল মজুমদারের উক্তিটি স্মরণীয়, “ঘটনা, চরিত্র ও সংস্থিতির কোনো কাণ্ডজ্ঞান তাঁহার ছিল না—তাঁহার নাটকের action কল্পনার অতিচারের দ্বারা প্রায়ই দূষিত হইয়াছে; ভাবের কবিত্বময় উচ্চতা—একরূপ নিছক idealism—তাঁহার নাটকগুলিকে উৎকট রোমান্সে পরিণত করিয়াছে।” এই কারণেই প্রতিভাধর নাট্যকার হয়েও তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে কোনও স্থায়ী সাহিত্যিক উৎকর্ষের নিদর্শন রেখে যেতে পারেননি।