আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/উপন্যাসের সূত্রপাত
বাংলা উপন্যাস উনিশ শতকের সৃষ্টি এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ প্রভাব। ইংরেজি Novel ও Romance-এর আদর্শেই বাংলা সাহিত্যে যথাক্রমে সামাজিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাস রচিত হয়। গল্প শোনার কৌতূহল মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। সেই প্রবৃত্তির তাড়নাতেই কথাসাহিত্যের উদ্ভব। গল্পের মধ্যে একদিকে যেমন থাকা বাস্তববোধ ও অভিজ্ঞতা, তেমনই অন্যদিকে থাকে রহস্য-রোমাঞ্চ, অবিশ্বাস্য ও অসম্ভবের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ। কথাসাহিত্যের এই দ্বিবিধ রূপ থেকেই নভেল ও রোম্যান্সের সৃষ্টি। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে ইতালীয় লেখক বোকাচিও কয়েকটি বাস্তবধর্মী গল্প লিখে সেগুলির নাম দিয়েছিলেন Novella Storie অর্থাৎ নতুন গল্প। তার থেকেই ইংরেজিতে Novel শব্দটির উৎপত্তি। নভেল বা উপন্যাস তাই বাস্তবধর্মী জীবনাশ্রয়ী কাহিনি। মানুষের জীবনে ঘটতে পারে এমন বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে উপন্যাসের কাহিনি রচনা করা হয়। রোম্যান্সে অপর দিকে কল্পনারই প্রাধান্য। অলৌকিক রোমাঞ্চকর অদ্ভুত ঘটনার সমাবেশে বিস্ময় ও কৌতূহল জাগিয়ে তোলার উপযোগী কাহিনি উদ্ভাবন করতে হয় রোম্যান্স রচনার সময়। সেখানে চরিত্রকে ছাপিয়ে প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে ঘটনা। এককথায় বললেম, উপন্যাস বাস্তবধর্মী, রোম্যান্স কল্পনাপ্রধান; উপন্যাস চরিত্রকেন্দ্রিক, রোম্যান্স ঘটনাবহুল; উপন্যাসে জীবন প্রত্যক্ষ, কিন্তু রোম্যান্সে জীবন কিছুটা দূরে কল্পনালোকের বিষয়। এই জন্যই রোম্যান্স রচয়িতারা ইতিহাসের ক্ষীণ আলোছায়ায় বিচরণ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
উপন্যাসের সূত্রপাত
[সম্পাদনা]বাংলা উপন্যাসে ইংরেজি নভেল ও রোম্যান্স উভয় ধারারই প্রভাব পড়েছিল। উপন্যাসের মধ্যে বাস্তবতাবোধ ও মানবতাবোধের যে প্রাধান্য থাকে তা মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যেও অল্পবিস্তর দেখা দিয়েছিল। তা উপন্যাস ছিল না বটে, কিন্তু উপন্যাসের বীজ নিহিত ছিল তাতে। বাংলা মঙ্গলকাব্যের গল্পে, বিশেষত কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে কাহিনিবিন্যাস ও চরিত্রচিত্রণে বাস্তবমুখিতায় উপন্যাসের কিছু লক্ষণ ফুটে উঠেছিল। অন্যদিকে মুসলমান কবিদের লেখা প্রণয়মূলক আখ্যানকাব্যেও প্রকট হয়েছিল রোম্যান্সের লক্ষণ। কিন্তু কথাসাহিত্যের বিশিষ্ট আঙ্গিক রূপে গদ্য উপন্যাস উনিশ শতকে ইংরেজি উপন্যাসের আদর্শেই প্রথম রচিত হয়।
উপন্যাস রচনার প্রথম প্রচেষ্টা
[সম্পাদনা]বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস রচনার প্রথম প্রচেষ্টা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। অধ্যাপক সুকুমার সেন মধুমল্লিকাবিলাস নামে একটি কাব্যগ্রন্থের উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন, “পদ্যে লেখা হইলেও বইটি উপন্যাসই।… [ইহার মধ্যে] গার্হস্থ্য উপন্যাসের অসন্দিগ্ধ বীজ বর্তমান।” পুথিটি ১৮৪১ সালে লেখা। রচয়িতার নাম মধুসূদন চক্রবর্তী। তারও আগে সামাজিক নকশা-জাতীয় রচনায় উপন্যাসের অঙ্কুর দেখা দিয়েছিল। আবার কেউ কেউ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত ও মুন্সিদের লেখা নীতিমূলক গল্পগুলির মধ্যেই উপন্যাস সাহিত্যের সম্ভাবনা সন্ধান করেছেন; তবে সেগুলিতেও ছিল ওই উপন্যাসের অঙ্কুর মাত্রই। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবুবিলাস (১৮২৩) নিতান্ত নকশা-জাতীয় ব্যঙ্গরচনা হলেও কাহিনির বাস্তবতা ও চরিত্রসৃষ্টিতে উপন্যাসের মূল লক্ষণাক্রান্ত। প্যারীচাঁদ মিত্র ভবানীচরণের অনুকরণেই জনশিক্ষামূলক নকশা রচনা করতে গিয়ে বাংলা উপন্যাসের সার্থক সম্ভাবনা সূচিত করেছিলেন।
হানা ক্যাথারিন মুলেন্সের ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত
[সম্পাদনা]১৮৫৮ সালে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল নামক রচনাটিকে অনেকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাসের মর্যাদা দিতে চান। কিন্তু ঐতিহাসিক বিচারে ১৮৫২ সালে প্রকাশিত ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত নামক রচনাটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাস্তবধর্মী উপন্যাস। হানা ক্যাথারিন মুলেন্স নামে এক বিদেশিনী খ্রিস্টান মহিলা The Last Day of the Week নামে এক ইংরেজি আখ্যানের ছায়ায় একটি দরিদ্র বাঙালি খ্রিস্টান পরিবারের ছবি এঁকেছেন এই উপন্যাসে। বইটি দীর্ঘকাল ভারতের খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলগুলিতে পাঠ্যপুস্তক ছিল; কিন্তু ধর্মত্যাগী বাঙালি খ্রিস্টানদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কাহিনি হওয়ায় বাঙালি হিন্দুসমাজ বরাবরই বইটিকে উপেক্ষা করে এসেছিল। বইটির ভাষা অত্যন্ত সরল ও সুন্দর। কিন্তু ঘটনাবিন্যাসের কোনও কৌশল বা চরিত্রসৃষ্টিতে কোনও বিশেষত্ব না থাকায় দীর্ঘ বিবৃতিমূলক একটানা গল্পটি প্রথম শ্রেণির উপন্যাস হিসেবে মর্যাদা লাভ করেনি। প্রথম যুগে রচিত সাহিত্যের ইতিহাসে বইটির উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশ শতকের মধ্যভাগে বইটি পুনরায় প্রকাশিত হয় ও গবেষকদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল
[সম্পাদনা]টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা আলালের ঘরের দুলাল উপদেশাত্মক ও নকশা-জাতীয় রচনা হলেও প্রথম জীবনধর্মী উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত। প্যারীচাঁদ এই বইতেই চরিত্র, কাহিনি, বাস্তব পরিবেশ, অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রভৃতি প্রকাশ করে উপন্যাসের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন। বাবুরাম বাবুর বর্ণনা প্রসঙ্গে অষ্টাদশ শতকের জীবনচিত্র জীবন্ত আলেখ্য রূপে ধরা দিয়েছে। চরিত্রসৃষ্টিতেও প্যারীচাঁদ ঔপন্যাসিক কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় চরিত্র মতলাল ধনীগৃহের আদুরে ছেলের যথার্থ প্রতিভূ। অ্যাটর্নির কেরানি বাঞ্ছারাম, বক্রেশ্বরবাবু ও ঠকচাচা প্রতিটি চরিত্রই নিপূণ তুলিতে আঁকা। মুকুন্দ চক্রবর্তীর ভাঁড়ুদত্তের মতো ঠকচাচা একটি বিশিষ্ট চরিত্র, কাহিনির গতি নিয়ন্ত্রণে এক উল্লেখযোগ্য শক্তি। সাহিত্যের দরবারে এই ঠকচাচা একটি চিহ্নিত চরিত্র, যাকে typa character বলা যায়। প্যারীচাঁদের রচনায় প্রধান দোষ নীতিপ্রচার ও কাহিনিগ্রন্থনে শিথিলতা। মনে হয়, কয়েকটি নকশাচিত্র যেন একটি দুর্বল সূত্রে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তা না হলে এটিই বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক জীবনাশ্রয়ী উপন্যাস তবে পারত। তবে সেই দিক দিয়ে এটিকে চার্লস ডিকেন্সের Picwick Papers উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করা যেতেই পারে।
কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নক্সা
[সম্পাদনা]
উপন্যাস রচনার পরবর্তী উদ্যম হল হুতোম প্যাঁচার নক্সা। তবে এই রচনাটি নামেও নকশা, লক্ষণেও নকশা; উপন্যাসের লক্ষণ এর মধ্যে নেই বললেই চলে। সমসাময়িক সমাজের ছবি এঁকে গল্পরস সৃষ্টির চেষ্টা আছে বলেই কথাসাহিত্যের প্রসঙ্গে বইটি আলোচ্য। হুতোম ছদ্মনামে কালীপ্রসন্ন সিংহ ১৮৬৪ সালে বইটি প্রকাশ করেন। কলকাতার সম্পন্ন গৃহস্থদের জীবনযাত্রা, তৎকালীন পূজাপার্বণ ও সামাজিক উৎসবের নিঁখুত বিবরণ এই বইটিতে পাওয়া যায়। কথ্য ভাষায় অভব্য ভঙ্গিতে ব্যঙ্গ করাই ছিল বইটির উদ্দেশ্য কোনও কোনও গবেষকের অনুমান, বইটির প্রকৃত রচয়িতা কালীপ্রসন্নের বন্ধু তথা হরিদাসের গুপ্ত কথা গ্রন্থের লেখক ভূদেবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়; কালীপ্রসন্নের অর্থানুকূল্যে বইটি প্রকাশিত হয় মাত্র।
রোম্যান্স রচনার সূত্রপাত
[সম্পাদনা]উপন্যাস সাহিত্যের আরেকটি দিক হল রোম্যান্স। এই দিকে প্রথম পদক্ষেপ করেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, গন্তব্যে উপনীত হন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। মাঝে ব্যর্থ উদ্যম করেছিনেন কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য ও গোপীমোহন ঘোষ। কন্টার নামে এক ইংরেজ লেখকের Romance of History বইটির দুটি কাহিনি নিয়ে ভূদেব মুখোপাধ্যায় রচনা করেন ঐতিহাসিক উপন্যাস (১৮৬২)। প্রথম কাহিনি সফল স্বপ্ন কিছুটা প্রবাদমূলক। দ্বিতীয় কাহিনি অঙ্গুরীয় বিনিময়-এর উৎস The Marhatta Chief কাহিনিটি। শিবাজীর সঙ্গে সম্রাট আওরঙ্গজেবের কন্যা রোশেনারার প্রণয় অবলম্বনে এই কাহিনি রচিত। তবে ভূদেব কাহিনি-পরিকল্পনায় মূলের হুবহু নকল না করে নিজস্ব কল্পনারও সুন্দর পরিচয় দিয়েছেন। অপর রচনা স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৯৫) গ্রন্থে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বন করে বিস্ময়কর কল্পনাচাতুর্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য ছিলেন বিশিষ্ট অধ্যাপক। তিনি ফরাসি উপন্যাস Paul et Virginie অনুবাদ করে (পৌলবর্জিনী, ১৮৬৮) খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত দুরাকাঙ্ক্ষের বৃথা ভ্রমণ (১৮৫৭) ও বিচিত্রবীর্য (১৮৬২) ইতিহাসাশ্রয়ী রোম্যান্স। প্রথম গল্পে নায়ককে বক্তা রূপে স্থাপন করে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে লেখক এক দুরাকাঙ্ক্ষ ব্যক্তির ব্যর্থ ভ্রমণকাহিনি রূপে উপস্থাপিত করেছেন। ঘটনাবিন্যাস ও কল্পনাবিস্তারে বইটি যথেষ্ট রোম্যান্স রস পরিবেশন করলেও উপন্যাসের সংহতিজাত বাস্তবমুখী রসবিকাশ করতে পারেনি। গোপীমোহন ঘোষ অযোধ্যায়র রাজপরিবারের কাহিনি অবলম্বনে বিজয়-বল্লভ (১৮৬৩) নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন। বইটিতে অবিশ্বাস্য ঘটনা ও অলৌকিকতার এতই বাহুল্য যে এটি রূপকথাতেই পর্যবসিত হয়েছে। বইটি এককালে জনপ্রিয় হয়েছিল, কিন্তু উপন্যাসের মর্যাদা পায়নি।
সূচনা পর্বের উপন্যাসের সাহিত্যমূল্য
[সম্পাদনা]উপন্যাস সাহিত্যের সূচনা পর্বে উপন্যাসের গতি সামাজিক জীবনের বাস্তবতা এবং দূরবর্তী কল্পনালোক উভয় দিকেই প্রবাহিত হয় বাংলা ভাষায় সামাজিক ও ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার সূত্রপাত ঘটায়। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই তা শিল্পসার্থকতা অর্জন করতে পারেনি। উপন্যাসে কাহিনি, চরিত্র ও বাস্তব-পরিবেশ উপস্থাপনা প্রয়োজন। সবার উপরে উপন্যাসের মধ্যে এক গভীর জীবনসত্য আভাসিত হয়ে ওঠে। প্রথম যুগের উপন্যাস নামাঙ্কিত গল্পকথাগুলির মধ্যে জীবন সম্পর্কে এক ধরনের তরল কৌতূহল ও নীতিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থাকায় রচনাগুলি নকশা-জাতীয় রচনাই থেকে গিয়েছে। রোম্যান্স রচনার চেষ্টার মধ্যেও জীবনের গভীরতম সত্যকে, দূরবর্তী কল্পলোকের সঙ্গে নিকটবর্তী বাস্তব জগতের সার্থক মিলনকে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ফলে এই রচনাগুলিতে তরল ভাবকল্পনা ও অস্পষ্ট রহস্যের রোমাঞ্চমাত্র সৃষ্টি হয়েছে। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ লেখনীর মুখে বাংলা ঐতিহাসিক ও সামাজিক উপন্যাস উভয়ই প্রথম সার্থক শিল্পরূপ লাভ করেছিল।