আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/উনিশ শতকের সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র
উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে সাময়িক পত্রপত্রিকাগুলির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকগণ ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষকবৃন্দ বাংলা গদ্যের উন্নতিকল্পে প্রভূত পরিশ্রম করে ভূমিকর্ষণ করেছিলেন। সেই কর্ষিত ভূমিতে ফসল ফলানোর উপযোগী আলো-হাওয়া ও জলসিঞ্চনের ব্যবস্থা করেছিল পত্রপত্রিকাগুলি। এইসব সাময়িকপত্র যদি যথাসময়ে গদ্যভাষার বাহন না হয়ে উঠত, তাহলে বাংলা গদ্যসাহিত্য এত দ্রুত সমৃদ্ধি লাভ করত না। তাই গদ্যরীতি গঠনে ও গদ্যসাহিত্যের প্রসঙ্গের বিস্তারে সাময়িকপত্রের অবদান অনস্বীকার্য। বিভিন্ন পত্রিকাগোষ্ঠীকে অবলম্বন করেই সেকালে প্রতিভাবান সাহিত্যিকেরা জাতীয় সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন।
সংবাদপত্রের সূচনা
[সম্পাদনা]আমাদের দেশে সংবাদপত্র বা সাময়িকপত্র প্রকাশের কোনও প্রাচীন ইতিহাস নেই। প্রাচীনকালে সম্ভবত ভাট কবিরাই সাংবাদিকের কাজ করতেন। মুঘল আমলে ‘ওয়াকেয়া-নবিশ’ নামে এক শ্রেণির রাজকর্মচারী সংবাদ-সংগ্রহের কাজ করতেন; কিন্তু তাঁদের বিবরণ প্রকাশিত হত না; রাজকার্যের প্রয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকত। সেই হিসেবে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ অবদান বলা চলে।
১৭৮০ সালে জেমস অগাস্টাস হিকি ইংরেজি ভাষায় হিকি’জ বেঙ্গল গেজেট অর দি অরিজিন্যাল ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভারটাইজার নামে একটি সাপ্তাহিক পত্র প্রকাশ করেন। এটি হিকির গেজেট বা বেঙ্গল গেজেট নামেও পরিচিত। অনেক পরে ১৮১৮ সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য এই নামের অনুকরণে বাঙ্গাল গেজেটি নামে একটি বাংলা সংবাদপত্র সম্পাদনায় করেছিলেন। এটি বাঙালি পরিচালিত প্রথম সংবাদপত্র হলেও বাংলা সাময়িকপত্র প্রকাশ বাঙ্গাল গেজেটি-র আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।
দিগ্দর্শন
[সম্পাদনা]১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা দিগ্দর্শন। কোনও দেশীয় পণ্ডিত তাঁকে এই কাজে সহায়তা করে থাকবেন। বিদ্যালয়-পাঠ্য বিষয়বস্তু প্রকাশের দিকেই এই পত্রিকার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ক্যালকাটা স্কুল-বুক সোসাইটি তাই এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা অনেকগুলি করে কিনে নিয়ে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করত। সোসাইটির অনুরোধেই পত্রিকাটির বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়। দেশীয় সাময়িক পত্রের ইতিহাস গ্রন্থে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যে তালিকা দিয়েছেন, তাতে দেখা যায় পত্রিকাটির বাংলা সংস্করণের ছাব্বিশটি সংখ্যা, ইংরেজি-বাংলা সংস্করণের ষোলোটি সংখ্যা এবং পৃথক ইংরেজি সংস্করণের প্রথম ষোলোটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। দিগ্দর্শন পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল “যুব লোকের কারণ সংগৃহীত নানা উপদেশ প্রদান”। পত্রিকার বিষয়সূচির মধ্যে ছিল ‘হিন্দুস্থানের সীমার বিবরণ’, ‘হিন্দুস্থানের বাণিজ্য’, ‘ইংলণ্ডের বাদশাহের পৌত্রীর মৃত্যু বিবরণ’, ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় বাহাদুরের কথা’ ইত্যাদি—যা থেকে বোঝা যায় তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনামূলক বিষয়বস্তু প্রকাশেই পত্রিকাটির আগ্রহ ছিল বেশি। পত্রিকায় ব্যবহৃত গদ্যভাষা খুব স্বচ্ছন্দ ছিল না বটে, তবে বক্তব্য মোটামুটি সহজবোধ্য ছিল: “পৃথিবী চারিভাগে বিভক্ত আছে। ইউরোপ ও আসিয়া ও আফ্রিকা ও আমেরিকা। ইউরোপ ও আসিয়া ও আফ্রিকা এই তিনভাগ এক মহাদ্বীপে আছে। ইহারা কোন সমুদ্র দ্বারা বিভক্ত নয়। কিন্তু আমেরিকা পৃথক এক দ্বীপে প্রথম দ্বীপ হইতে যে দুই হাজার ক্রোশ অন্তর। অনুমান হয় তিনশত ছাব্বিশ বৎসর আটশত আটানব্বই সালে আমেরিকা প্রথম জানা গেল। তাহার পূর্বে আমেরিকা কোন লোক কর্তৃক জানা ছিল না। সেই নিমিত্ত তাহার প্রথম দর্শনের বিবরণ লিখি।”
সমাচার-দর্পণ
[সম্পাদনা]দিগ্দর্শন বেশিদিন চলেনি। এই পত্রিকা প্রকাশের এক মাস পরেই মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সমাচার-দর্পণ। ড. সুকুমার সেন তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের এই পত্রিকার প্রথম প্রকাশ সম্পর্কে লিখেছেন, “অনুবাদ-অনুসরণের বাহিরে স্বাধীন বাঙ্গালা রচনার পথ খুলিয়া দিলেন শ্রীরামপুরের মিশনারীরা ১৮১৮ অব্দের মে মাস হইতে জন মার্শম্যানের সম্পাদনায় সমাচার-দর্পণ প্রকাশ করিয়া। সমাচার-দর্পণ পরিচালনায় মার্শম্যানের দক্ষিণ হস্ত ছিলেন পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার। সাধারণ বাঙ্গালী পাঠক (তখন সংখ্যায় যৎসামান্য) খবরের কাগজের রস এই প্রথম আস্বাদন করিল এবং তাহাতে বাঙ্গালা গদ্যের ঘরোয়া পরিচয়ের সুযোগ লাভ করিল।”
সমাচার-দর্পণ ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা। এর প্রথম খণ্ড প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের ২৩ মে শনিবার। তারপর থেকে প্রতি শনিবার এটি নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। ইংরেজি ভাষার প্রতি তৎকালীন যুবসমাজের আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে ১৮২৯ সাল থেকে সমাচার-দর্পণ বাংলা-ইংরেজি দ্বিভাষিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৮৪১ সালের ২৫ ডিসেম্বর।
বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসবিদদের কাছে এই পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম। সমসাময়িক বাংলার ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম প্রভৃতি বিভিন্ন দিকের পরিচয় এবং সেকালের সমাজচিত্রের নানা উপাদান এই পত্রিকায় পাওয়া যায়। এতে স্থান পেয়েছিল সেকালের স্ত্রীশিক্ষা ও সতীদাহ রোধের প্রয়াস সম্পর্কিত নানা তথ্য, নানারকম সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংবাদ, নতুন বই প্রকাশের বিবরণ এবং সেই সঙ্গে বেশ কিছু রম্যরচনাও। “এতদ্দেশীয় লোকেদের নিকট সকল প্রকার বিদ্যা প্রকাশ” করা এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্যোগে প্রকাশিত হওয়ায় এতে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম্যকীর্তনের সঙ্গে হিন্দুধর্ম তথা হিন্দুসমাজের নিন্দাবাদ ও কুৎসা রটনার যে প্রয়াস দেখা যায় তাতে রাজা রামমোহন রায়ের মতো সংস্কারকের সঙ্গেও এই পত্রিকার বিরোধ বাধে।
ড. ভূদেব চৌধুরী তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্যায়ে মন্তব্য করেছেন, “জ্ঞাতে ও অজ্ঞাতে বাংলা সাহিত্যের অনাগত কালের নানা সার্থক রচনার অঙ্কুর-সঙ্কেত এই সমাচার-দর্পণের পৃষ্ঠাতেই লক্ষ্য করে থাকি।” সমাচার-দর্পণ প্রথম সংবাদপত্র যাতে কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে অন্যান্য সংবাদপত্রেও এই ধারাটি অব্যাহত থাকে। বাংলা সাহিত্যের নকশা-জাতীয় রচনার সূত্রপাতও এই পত্রিকাতেই ঘটেছিল। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবুবিলাস ও নববিবিবিলাস কিংবা প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা বাবু-বৃত্তান্তের সূচনাও এই পত্রিকাতেই। ১৮২১ সালের ২ জুন এই পত্রিকায় প্রকাশিত বাবুর উপাখ্যান (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ) থেকে কিছু অংশ এই পত্রিকার গদ্যভাষার নিদর্শন হিসেবে উদ্ধৃত করা যায়: “বাবু আপনি চাকরকে হুকুম দিয়া রাখেন ভোরের পূর্বে নিদ্রা ভাঙ্গাইয়া দিও প্রাতঃকালে ঘোড়ার সওয়ার হইয়া বেড়াইতে যাইব। বাবু প্রায় সমস্ত রাত্রি বেশ্যালয়ে ছিলেন। চারিদণ্ড রাতি থাকিতে বাটীতে আসিয়া শয়ন করিয়াছেন। তাহার পরে চাকর নিদ্রা ভাঙ্গাইলেন। সুতরাং উঠিতেই হইল। সেই ঘুম চক্ষে ঘোড়ার উপরে সওয়ার হইয়া যাইতেছেন। দেখেন রৌদ্র হইয়াছে। এইক্ষণে যে পথে সাহেব লোক গিয়াছে সেপথে গেলে লজ্জা পাইব।” ড. সুকুমার সেন লিখেছেন, “সমাচার-দর্পণের সাফল্য বিবিধ বাঙ্গালা সাময়িকপত্রের প্রকাশ ত্বরান্বিত করিয়াছিল। এই সাময়িকপত্রের মধ্যে অনুশীলিত হইয়াই বাংলা গদ্যের জড়তামুক্তি ঘটিয়াছিল।”
গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের বেঙ্গল গেজেট
[সম্পাদনা]১৮১৮ সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা বেঙ্গল গেজেট, যা বাঙ্গাল গেজেটি বা গেজেটি নামেও আলোচিত হয়ে থাকে। একই বছর প্রবর্তিত দিগ্দর্শন ও সমাচার-দর্পণ পত্রিকা দুটির প্রকাশকাল নিয়ে কোনও সংশয় নেই; কিন্তু বেঙ্গল গেজেট কোন মাসের কোন তারিখে প্রথম প্রকাশিত হয় তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দিগ্দর্শন ও সমাচার-দর্পণ শ্রীরামপুরের বিদেশি খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্যোগে ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই হিসেবে বাঙালি সম্পাদিত প্রথম সাময়িকপত্র হিসেবে বেঙ্গল গেজেটি-র গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
সমাচার-চন্দ্রিকা-র সম্পাদক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সংবাদ প্রভাকর-এর সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতে সমাচার-দর্পণ প্রকাশের অল্পকাল আগে বেঙ্গল গেজেটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, সমাচার-দর্পণ-এর কিছুকাল পরে বেঙ্গল গেজেট পত্রিকার প্রথম প্রকাশ। বেঙ্গল গেজেট-এর ম্যানেজার হরচন্দ্র রায় ১৮১৮ সালের ১৪ মে গভর্নমেন্ট গেজেট-এ বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, বেঙ্গলি প্রিন্টিং প্রেস প্রতিষ্ঠার এবং প্রতি শুক্রবার উইকলি বেঙ্গল গেজেট নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগে নেওয়া হয়েছে। উক্ত সরকারি গেজেটেই ৯ জুলাই হরচন্দ্রের দেওয়া আর-একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় যে, পরিকল্পিত পত্রিকাটির প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি ছিল এইরকম: “Having established a BENGALEE PRINTING PRESS and a WEEKLY BENGAL GAZETTE, which he publishes on Fridays, containing the Translation of Civil Appointments and Regulations, and such other LOCAL MATTER as are deemed interesting to the Reader, into a plain, concise and correct Bengalee Language....... No. publication of this nature having hitherto been before the public, HURROCHUNDRA ROY trusts that the community in general will encourage and support his exertions in the attempt which he has made, and afford him a small spare of thin patronage.”
উক্ত বিজ্ঞাপনটির সূত্র থেকেই জানা যায় যে, বেঙ্গল গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৮ সালের ১৪ মে থেকে ৯ জুলাই তারিখের মাঝামাঝি কোনও এক সময়ে। পত্রিকাটির সঠিক নাম ছিল উইকলি বেঙ্গল গেজেট; পরবর্তীকালে আলোচকেরা এটিকে বাঙ্গাল গেজেটি বা গেজেটি ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেছিলেন। এই পত্রিকাতেই সহজ বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় সংক্ষেপে সরকারি চাকরির নিয়োগ-সংক্রান্ত সংবাদ, নিয়মবিধির অনুবাদ ও স্থানীয় প্রসঙ্গ প্রকাশিত হত।
সেই হিসেবে মিশনারিদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকা দুটির সঙ্গে বেঙ্গল গেজেট-এর চরিত্রগত পার্থক্যটিও লক্ষণীয়। দিগ্দর্শন বা সমাচার-দর্পণ-এ সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তি বা নিয়মবিধির অনুবাদ থাকত। সেদিক থেকে বেঙ্গল গেজেট স্বতন্ত্র তাতে সন্দেহ নেই। তবে যেহেতু পত্রিকাটির কোনও কপি পাওয়া যায় না, তাই এর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাও সম্ভব হয় না। শ্রেণিগত বিচারে শুধু গবেষকেরা এটিকে সংবাদপত্র বলে উল্লেখ করে থাকেন।
সম্বাদ কৌমুদী
[সম্পাদনা]১৮২১ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্বাদ কৌমুদী প্রকাশিত হতে থাকে। শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত সমাচার-দর্পণ-এ হিন্দুধর্ম ও হিন্দুসমাজের বিরুদ্ধে কটূক্তি বর্ষিত হতে শুরু করলে তারই প্রতিক্রিয়ায় সম্বাদ কৌমুদী প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি নির্দেশক করে মিশনারিদের কর্মপ্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হলে ধর্ম-বিষয়ক এক তর্কযুদ্ধ শুরু হয় এবং তার ফলে বাংলা গদ্যের প্রকাশভঙ্গিও সুষ্ঠতর হতে শুরু করে। পত্রিকার পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছিল যে, “লোকহিতসাধনই এই সংবাদপত্র প্রচারের প্রধান লক্ষ্য। দেশবাসীর অভাব-অভিযোগের কথাও ইহাতে ভদ্রভাবে প্রকাশ করা হইবে।”
তারাচাঁদ দত্ত ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রাজা রামমোহন রায়কে এই পত্রিকার সম্পাদক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, “যদিও তারাচাঁদ ও ভবানীচরণ প্রথমে পত্রিকার পরিচালক ছিলেন, কিন্তু রামমোহনই ছিলেন প্রধান পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক।” ড. ভূদেব চৌধুরী তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্যায়ে জানিয়েছেন, “রাজা রামমোহন ‘সম্বাদ কৌমুদী’-র একজন অতি উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক এবং শ্রেষ্ঠ লেখক ছিলেন।… ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ‘সম্বাদ কৌমুদী’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।”
রামমোহন সম্বাদ কৌমুদী-তে প্রবন্ধ লিখতেন। তিনি সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করলে রক্ষণশীল ভবানীচরণ প্রথম তেরোটি সংখ্যা প্রকাশের পর এই পত্রিকা ত্যাগ করেন এবং ১৮২২ সালের ৫ মার্চ প্রকাশ করেন সমাচার-চন্দ্রিকা। কিন্তু তারাচাঁদের পুত্র হরিহর দত্তের নামে সম্বাদ কৌমুদী প্রকাশিত হতে থাকে। অবশ্য কার্যত রামমোহনই পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগ পরিচালনা করতেন। মাস তিনেক পরে আর্থিক ঝুঁকির জন্য রামমোহন এই পত্রিকার সম্পাদনা ত্যাগ করেন এবং ১৮২২ সালের ১৪ মে পত্রিকা পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন গোবিন্দচন্দ্র কোঙার। এর চার মাস পরে অবশ্য পত্রিকাটির বন্ধ হয়ে যায়। আসলে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লেখালিখি শুরু হলে পত্রিকার রক্ষণশীল গ্রাহকেরা এই পত্রিকা ত্যাগ করে ভবানীচরণের সমাচার-চন্দ্রিকা-র গ্রাহক হয়েছিলেন। ফলে হিন্দুসমাজের সম্বাদ কৌমুদী-র গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছিল। তবু ১৮২৩ সালের এপ্রিল মাসে আনন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় পত্রিকাটির আবার প্রকাশিত হয় এবং ১৮৩১ সাল পর্যন্ত অস্তিত্ব বজায় রাখে। মাঝে হলধর বসু নামে এক ব্যক্তিও এই পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। আবার রামমোহনের বিলেত যাত্রার পূর্বে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রামপ্রসাদ রায় কিছুদিন পত্রিকাটির সম্পাদনা করেছিলেন। এরপর ১৮৩২ সালের ৫ ডিসেম্বর সমাচার-দর্পণ-এ প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে অনুমিত হয় যে, বারবার সম্পাদক পরিবর্তনের ফলে পত্রিকাটির মানের অবনতি ঘটেছিল। শেষে ১৮৩৩ সালে পত্রিকাটির একেবারেই উঠে যায়।
সম্বাদ কৌমুদী পত্রিকায় নানারকম সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি প্রকাশিত হত প্রগতিশীল চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ নানা প্রবন্ধ। শিক্ষা, সমাজ, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, ইংরেজ কর্মচারী, আমোদ-প্রমোদ ইত্যাদি অনেক কিছুই ছিল এটির বিষয়বস্তু। পত্রিকাটির মাধ্যমে যে-সব আবেদন ও অনুরোধ জানানো হয়েছিল এবং যে-সব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সেগুলিই এটির প্রকৃত উদ্দেশ্যের পরিচায়ক:
- দরিদ্র জনসাধারণের জন্য সরকারের কাছে বিদ্যালয় স্থাপনের অনুরোধ জ্ঞাপন,
- প্রাথমিক শিক্ষায় বিদেশি ভাষার পরিবর্তে মাতৃভাষা বাংলার প্রচলনের আবেদন,
- শ্রাদ্ধাদি কার্যে অর্থ অপচয়ের নিন্দা করে সেই অর্থ শিক্ষার জন্য ব্যয়ের প্রস্তাব,
- বিচারব্যবস্থায় জুরি প্রথা প্রবর্তনের আবেদন,
- বাংলার চাল বিদেশে রপ্তানি বন্ধ করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা,
- জলদূষণ রোধে গঙ্গায় মৃতদেহ নিক্ষেপ বন্ধ করতে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রার্থনা,
- চিকিৎসার সুযোগ বঞ্চিত মধ্যবিত্তের জন্য প্রতিকার চাওয়া,
- উদ্ধত ইংরেজ কর্মচারীদের যথেচ্ছ ঘোড়ার গাড়ি চালানোর নিন্দাবাদ,
- যুবসমাজের চারিত্রিক অবনতি রোধে বিকৃত রুচির যাত্রাভিনয় বন্ধের আবেদন।
সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সামাজিক উন্নতিসাধনই যে সম্বাদ কৌমুদী-র উদ্দেশ্য ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাছাড়া সেকালের পক্ষে এই পত্রিকার ভাষাও ছিল সহজ, সরল ও পরিচ্ছন্ন।
সমাচার-চন্দ্রিকা
[সম্পাদনা]প্রগতিশীল চিন্তার বার্তাবহ সম্বাদ কৌমুদী-র বিরুদ্ধে সমাচার-চন্দ্রিকা ছিল রক্ষণশীলতার ধ্বজাধারী এক পত্রিকা। ১৮২২ সালের ৫ মার্চ ২৬ নং কলুটোলা স্ট্রিটের চন্দ্রিকা যন্ত্রে মুদ্রিত হয়ে প্রথমে সাপ্তাহিক পত্রিকা রূপে প্রকাশিত হয় সমাচার-চন্দ্রিকা। পরবর্তীকালে এটি হয় দ্বি-সাপ্তাহিক এবং ১৮২৪ সালে ৫৩ নং সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট থেকে এটি প্রকাশিত হতে থাকে দৈনিক পত্রিকা রূপে। ১৮৫৩ সালের ১২ এপ্রিল সংবাদ প্রভাকর-এ প্রকাশিত বাংলা সংবাদপত্রের তালিকা থেকে জানা যায় যে, সেই সময় সমাচার-চন্দ্রিকা ছিল অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা।
সমাচার-চন্দ্রিকা-র সম্পাদক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজি, সংস্কৃত, বাংলা ও ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। সম্বাদ কৌমুদী-তে রামমোহন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করলেন ভবানীচরণের সঙ্গে মতান্তর ঘটে তাঁর। সতীপ্রথার সমর্থক ভবানীচরণ রক্ষণশীল সমাজের পক্ষ নিয়ে সম্বাদ কৌমুদী-র সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে প্রকাশ করেন সমাচার-চন্দ্রিকা। এর ফলে একদিকে যেমন সমাচার-চন্দ্রিকা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সম্বাদ কৌমুদী-র প্রচারসংখ্যা হ্রাস পায়। শুধু তাই নয়, রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের নেতা হিসেবে ভবানীচরণ যে ধর্মসভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারও মুখপত্র হয়ে ওঠে সমাচার-চন্দ্রিকা। একদিকে ভবানীচরণ যেমন সতীপ্রথা বজায় রাখার পক্ষে প্রবল জনমত তৈরি করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনই সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের ইংরেজি শিক্ষার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছিলেন। আবার নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষারও বিরোধিতা করেন তিনি। নবযুগের বার্তা তিনি গ্রহণ করতে পারেননি, আর সেই কারণেই রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ গ্রহণ করেছিল তাঁকে।
তবে সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে গোঁড়ামির দিকটি বাদ দিলে এই পত্রিকায় যে অর্থনৈতিক চিন্তা, ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশি রাজশক্তির বিরুদ্ধে স্বাধিকার চিন্তা এবং দেশীয় শিক্ষা প্রসারে আগ্রহ সৃষ্টির প্রয়াস করা হয়েছিল, তা প্রশংসনীয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সমাচার-চন্দ্রিকা নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়। সাংবাদিক হিসেবে ভবানীচরণ ছিলেন প্রথম বাঙালি কলামিস্ট। বাংলা সংবাদপত্রের আদি যুগে তিনি নৈর্বক্তিক ফিচার রচনার মধ্যেও সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যিক সরলতা প্রবর্তনের সক্ষম হয়েছিলেন।
সংবাদ প্রভাকর
[সম্পাদনা]১৮৩১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি (১২৩৭ বঙ্গাব্দের ১৬ মাঘ) উনিশ বছর বয়সী ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক পত্রিকা রূপে প্রথম প্রকাশিত হয় সংবাদ প্রভাকর। পাথুরিয়াঘাটার যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুর পত্রিকাটির প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসাহায্য করেছিলেন। ঈশ্বর গুপ্ত উচ্চশিক্ষিত না হলেও উচ্চ শ্রেণির সাংবাদিক ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পত্রিকাটির অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রোজকার ঘটনা, সরকারের খবর, সামাজিক বিষয় ইত্যাদিও যে সরসভাবে পরিবেশন করা যেতে পারে, তা সংবাদ প্রভাকর-ই প্রথম দেখায়। ১২৪৩ বঙ্গাব্দের ২৭ শ্রাবণ থেকে সংবাদ প্রভাকর তিন দিন অন্তর প্রকাশিত হতে শুরু করে এবং ১২৪৬ বঙ্গাব্দের ১ আষাঢ় এটি রূপান্তরিত হয় দৈনিক পত্রিকায়। ভারতে প্রথম দেশীয় দৈনিক সংবাদপত্র হল সংবাদ প্রভাকর। পাশাপাশি ১২৬০ বঙ্গাব্দ থেকে একটি মাসিক বাংলা প্রভাকর-ও প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের জীবনচরিত ও কবিত্ব’ প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, “এই প্রভাকর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের অদ্বিতীয় কীর্তি।… একদিন প্রভাকর বাঙ্গালা সাহিত্যের হর্তা-কর্তা-বিধাতা ছিলেন।” পত্রিকাটিতে সমসাময়িক নানারকম খবরের পাশাপাশি গদ্যরচনাও প্রকাশিত হত, এবং সেই সঙ্গে থাকত সম্পাদকীয় প্রবন্ধও। ১২৬৫ বঙ্গাব্দের ১২ মাঘ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর পরও বেশ কিছুকাল তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতার সম্পাদনায় পত্রিকাটির প্রকাশিত হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সংবাদ প্রভাকর-এর ভূমিকা নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই পত্রিকা দীর্ঘকাল পাঠকের কাছে নানা ধরনের সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সাহিত্যরস পরিবেশনের দায়িত্বও পালন করে এসেছিল। দ্বিতীয়ত, রামপ্রসাদ সেন, ভারতচন্দ্র রায় প্রমুখ কবির এবং গোঁজলা গুঁই, লালু-নন্দলাল, রামু-নৃসিংহ, হরু ঠাকুর, ভোলা ময়রা, নিত্যানন্দ দাস বৈরাগী, অ্যান্টনি কবিয়াল, কেষ্ট মুচি প্রমুখ কবিওয়ালাদের জীবনী ও রচনা এই পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়। ঈশ্বর গুপ্ত এগুলি সংগ্রহ করে প্রকাশ না করলে অনেক তথ্যই চিরকালের জন্য হারিয়ে যেত। পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকারেরা এই কারণে তাঁর কাছে বিশেষভাবে ঋণী। ঈশ্বর গুপ্তের ইতিহাস-সচেতনতা ও দেশপ্রেমের পরিচয়ও তাঁর এই কাজের মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হয়। তৃতীয়ত, সংবাদ প্রভাকর-কে তিনি সাহিত্যিক নির্মাণের পাঠশালায় পরিণত করেছিলেন। অক্ষয়কুমার দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, মনোমোহন বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অনেক সাহিত্যিকেরই সাহিত্যরচনার হাতেখড়ি হয়েছিল এই পত্রিকার পাতায়। ঈশ্বর গুপ্ত এঁদের উৎসাহ দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র এই বিষয়ে বলেছেন, “আমি নিজে প্রভাকরের নিকটে বিশেষ ঋণী। আমার প্রথম রচনাগুলি প্রভাকরে প্রকাশিত হয়। সে সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত আমাকে বিশেষ উৎসাহ দেন।” চতুর্থত, ১২৫৭ বঙ্গাব্দের নববর্ষ থেকে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার কার্যালয়ে ঈশ্বর গুপ্ত যে সাহিত্যসভার আয়োজন করতেন, তাতে একদিকে যেমন তিনি নিজের লেখা পাঠ করতেন, তেমনই অন্যদিকে পত্রিকার অন্যান্য লেখকেরাও পাঠক করতেন তাঁদের রচনা। আধুনিক কালে এই প্রথম সাহিত্যসভার অনুষ্ঠান। এই সভায় লেখকেরা ছাড়াও অন্যান্য গুণমুগ্ধেরাও যোগ দিতেন।
সংবাদ প্রভাকর-এর লেখক তালিকায় একদিকে যেমন প্রাচীনপন্থী প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশ, গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ, গঙ্গাধর তর্কবাগীশ প্রমুখ ছিলেন, তেমনই অন্যদিকে ছিলেন নব্যপন্থী নীলরত্ন হালদার, গোপালকৃষ্ণ মিত্র, গোবিন্দচন্দ্র সেন, নবীনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র দত্ত, শম্ভুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিমোহন সেন, পূর্ণচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। বস্তুত সংবাদ প্রভাকর হয়ে উঠেছিল প্রাচীন ও নতুন ভাবধারার মিলনক্ষেত্র। এককথায় পত্রিকাটির ছিল সেকালের সমাজের একটি দর্পণ।
১৯৫৯ সালের ২৫ নভেম্বর সংবাদ প্রভাকর-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে এই পত্রিকার গদ্যভাষার নিদর্শন তুলে ধরা যেতে পারে: “বাণিজ্যের নাম লক্ষ্মী। এই লক্ষ্মী এক্ষণে বঙ্গদেশ পরিত্যাগ করিয়া তরণী আরোহণে বিদেশবাসিনী হইতেছেন। এদেশের লোক লক্ষ্মীহারা হইয়া নিতান্ত দীনবেশে দাসত্বের শরণ লইয়াছে।… দেশের ধন বিদেশে যাইতেছেন, দেশে লোক ফকীর হইতেছে, এই দুর্ভাগ্য সকলে অনুভব করিতেছেন না, অনুভব করা থাকুক, স্বপ্নেও বোধহয় সেটা কেহ চিন্তাও করেন না।”
জ্ঞানান্বেষণ
[সম্পাদনা]১৮৩১ সালের ১৮ জুন শনিবার ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর মুখপত্র সাপ্তাহিক জ্ঞানান্বেষণ প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৮৩৩ সালের ১৯ জানুয়ারি থেকে এটি রূপান্তরিত হয় ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষিক পত্রিকায়। পত্রিকাটির প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন (দক্ষিণানন্দন) মুখোপাধ্যায়। তিনিই এই পত্রিকার আর্থিক দায়দায়িত্ব বহন করতেন। পত্রিকা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারকচন্দ্র বসু, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখেরা। এঁরা সবাই ছিলেন হিন্দু কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক ডিরোজিওর শিষ্য এবং মতাদর্শের দিক থেকে প্রগতিপন্থী। এঁদের চিন্তাভাবনায় ও রচনায় তাই সংস্কারমুক্ত মনেরই পরিচয় পাওয়া যায়। জ্ঞানান্বেষণ বহুল প্রচারিত পত্রিকা ছিল না, এর পাঠকসংখ্যাও ছিল সীমিত। শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে পত্রিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করা হত। সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত এই পত্রিকার ভাষাভঙ্গি এবং বক্তব্য ও বিষয়-নির্বাচনে আধুনিকতার পরিচয় থাকলেও উদ্যোক্তাদের সময়াভাব ও অর্থাভাবের ফলে প্রায় দশ বছর চলার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
জ্ঞানান্বেষণ নামকরণ থেকেই পত্রিকাটির উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। শিক্ষিত বাঙালির তীব্র জ্ঞানস্পৃহা থেকেই এই পত্রিকার জন্ম। ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী এই পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডার দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে চেয়েছিল বাঙালি সমাজের সামনে। জাতিকে শিক্ষিত ও সংকীর্ণতা-মুক্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন তাঁরা। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও বিবাদে তাঁদের রুচি ছিল না। তাঁরা ছিলেন স্ত্রীশিক্ষার পক্ষে। রক্ষণশীলেরা তাই এই পত্রিকাকে সুনজরে দেখেননি।
ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সংবাদপত্র ও বাঙালির নবজাগরণ গ্রন্থে জানিয়েছেন যে, বিভিন্ন সময়ে গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, তারিণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, রামচন্দ্র মিত্র ও হরমোহন চট্টোপাধ্যায় এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমেই উনিশ শতকের অসাধারণ প্রতিভাশালী সাংবাদিক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।
পত্রিকার পরিচালকবৃন্দ সকলেই পরবর্তীকালে ভালো চাকরি পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে ১৮৪০ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই বছর ১৬ নভেম্বর ক্যালকাটা ক্যুরিয়ার পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়: "The Gyannaneshun an native Newspaper has we regret to hear, been given up for want of public support. It existed about ten years and was for some time ably conducted by a number of college students. In its palmy days it was a legitimate organ of the educated Hindoos, but since the retirement of Baboo Russicrishna Mullick, and Dackinananden Mookherjee, who orginally established the paper, merely with a view of keeping alive a spirit of liberal enquiry amongst the Hindoos and combating the prejudies of the orthodox party, it exhibited many symptoms of dotage and decay, till in the course of the present week it died a natural death."
জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকার শাণিত ও পরিহাসদীপ্ত ভাষার একটি নিদর্শন দেওয়া যেতে পারে: “কাজলাপাড়াতেও দুই ব্রাহ্মণ ঘটকের কথায় এখানে কন্যা কিনিয়া বিবাহ করিলেন। কিন্তু বহুকালের পর সন্তানাদি উৎপত্তি করিয়া শেষে টের পাইলেন ঘটকেরা প্রতারণাপূর্বক মালাকারের কন্যা বিবাহ দিয়াছেন। ভাটপাড়াতেও এক ব্রাহ্মণ ক্রীত কন্যা বিবাহ করেন এবং বহুকাল সহবাস করিয়া শেষে জানিলেন পোদ-জাতীয় বৈষ্ণবের কন্যাকে গ্রহণ করিয়াছেন। এতদ্ভিন্ন কলিকাতা শহরের মধ্যে এইরূপ স্ত্রী অনেক আছে। আমি সাহসপূর্বক বলিতে পারি ভারী পণ্ডিত ন্যায়রত্নের ও প্রধান বাঁড়ুয্যার ঘরে যে তাঁহারদিগের পুত্র-পৌত্রাদির গৃহিনী সকল আছেন তাহারদিগের মধ্যেই অনেকেই ধোপা, নাপিত, বৈষ্ণব, মালী, কামার, কাপালির কন্যা। কিন্তু সম্পত্তিশালী ব্রাহ্মণের ঘরে পড়িয়া পবিত্রা ব্রাহ্মণী হইয়া গিয়াছেন। এখন তাঁহারদিগের পাকান্ন সকলেই পবিত্র জ্ঞান করেন।"
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা
[সম্পাদনা]১৮৪৩ সালে প্রথম প্রকাশিত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ছিল তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র। চরিত্রে সংবাদপত্র না হলেও বিভিন্ন সময়ে এতে সংবাদও প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকাটি।
তত্ত্ববোধিনী সভা ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা উভয়েরই প্রতিষ্ঠাতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সভাটির উদ্দেশ্য ছিল বেদান্ত-প্রতিপাদ্য ব্রহ্মবিদ্যার প্রচার এবং পত্রিকার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনী-তে লেখেন: “আমি ভাবিতাম তত্ত্ববোধিনী সভার অনেক সভ্য কার্য্যসূত্রে পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে আছেন। তাঁহারা সভার কোন সংবাদই পান না, অনেক সময় উপস্থিত হইতেও পারেন না। সভায় কি হয়, অনেকেই তাহা অবগত নহেন। বিশেষতঃ ব্রাহ্ম সমাজে বিদ্যাবাগীশের ব্যাখ্যান অনেকেই শুনিতে পান না, তাহার প্রচার হওয়া আবশ্যক। আর, রামমোহন রায় জীবদ্দশায় ব্রহ্মজ্ঞান বিস্তার উদ্দেশ্যে যে সকল গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, তাহারও প্রচার আবশ্যক। এতদ্ব্যতীত, যেসকল বিষয় লোকের জ্ঞান বুদ্ধি ও চরিত্র শোধনের সহায়তা করিতে পারে, এমন সকল বিষয়ও প্রকাশ হওয়া আবশ্যক। আমি এইরূপ চিন্তা করিয়া ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রচারের সঙ্কল্প করি।”
ধর্ম নিয়ে বিবাদ অথবা বিরুদ্ধ ধর্মের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা সেযুগের কয়েকটি সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য হলেও, দেবেন্দ্রনাথের সে-সবে রুচি ছিল না। আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ একটি উন্নত মানের পত্রিকা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তিনি। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সে উদ্দেশ্য পূরণ করেছিল, তবে তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি থেকে শুরু করে গ্রামীণ সমাজের দারিদ্র্য, জমিদারের অত্যাচার, সমাজ সংস্কার, স্ত্রীশিক্ষা ও স্ত্রী-স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িক উদারনীতি, স্বদেশপ্রেম, গ্রামাঞ্চলের সার্বিক অবস্থা ইত্যাদি অনেক কিছুই প্রতিফলিত হয়েছিল এই পত্রিকার পাতায়।
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র প্রথম সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। তাঁর পরিকল্পনার নৈপুণ্যে এবং সম্পাদনার কুশলতায় পত্রিকাটি উন্নত মানের পত্রিকা হয়ে ওঠে। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ গ্রন্থে লিখেছেন, “‘তত্ত্ববোধিনী’ বঙ্গদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা হইয়া দাঁড়াইল। তৎপূর্বে, বঙ্গসাহিত্যের, বিশেষতঃ দেশীয় সংবাদপত্র সকলের অবস্থা কি ছিল এবং অক্ষয়কুমার দত্ত সেই সাহিত্যজগতে কি পরিবর্তন ঘটাইয়া দিলেন তাহা স্মরণ করিলে তাঁহাকে দেশের মহোপকারী বন্ধু না বলিয়া থাকা যায় না।”
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র দীর্ঘ ৮৯ বছরের ইতিহাসে অনেকেই এই পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ জন পালন করেন এই দায়িত্বও:
- অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮৪৩—১৮৫৫)
- নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৫৫—১৮৫৯)
- সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (ডিসেম্বর, ১৮৫৯—মার্চ, ১৮৬২; পরবর্তীকালে এপ্রিল, ১৯০৯—এপ্রিল, ১৯১০ এবং এপ্রিল, ১৯১৫—এপ্রিল, ১৯২৩)
- অযোধ্যানাথ পাকড়াশী (১১ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬৫—এপ্রিল, ১৮৬৭; এপ্রিল, ১৮৬৯—১৮৭২)
- হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন (এপ্রিল, ১৮৬৭—এপ্রিল, ১৮৬৯; এপ্রিল, ১৮৭৭—সেপ্টেম্বর, ১৮৭৭)
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন।
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র গদ্যরীতির একটি নিদর্শন দেওয়া যায়: “স্বদেশানুরাগ না থাকিলে স্বদেশের হিতসাধন করিতে প্রবৃত্তি হয় না। আনন্দের বিষয় এই যে এক্ষণে আমাদিগের দেশীয় লোকের হৃদয়ে স্বদেশানুরাগ ক্রমশঃ উদ্দীপ্ত হইতে দেখা যাইতেছে। স্বদেশানুরাগ যতই বৃদ্ধি পাইবে ততই তাহাদের দ্বারা স্বদেশের উপকার সাধন প্রত্যাশা করা যাইতে পারে। ভারতের উদ্ধার কেবল এই স্বদেশানুরাগ বৃদ্ধির প্রতি নির্ভর করতেছে। এই স্বদেশানুরাগ দ্বারা ভারতবর্ষীয় লোকদিগকে যতই ঐক্যসূত্রে বদ্ধ করা যাইবে ততই ভারতের উন্নতিসাধন হইবে।”
উনিশ শতকের প্রথমার্ধের অন্যান্য পত্রপত্রিকা
[সম্পাদনা]উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আরও অনেকগুলি সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়। প্যারীচাঁদ মিত্রের মাসিক পত্রিকা (১৮৫৪), প্রতিবাদী ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর অপর মুখপত্র বিজ্ঞান সেবধি প্রভৃতি পত্রিকা বিদ্যানুশীলন, সাহিত্যরচনা ও গবেষণার কাজে বাংলা গদ্যের উপযোগিতা প্রমাণ করে। সংবাদপত্রগুলি পরস্পরের প্রতিযোগিতায় বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হত। সংবাদ ভাস্কর ও সংবাদ রসরাজ গালাগালি ও কুৎসা রটনায় অদ্বিতীয় ছিল। এই উপলক্ষ্যে বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গরচনার সৃষ্টি হয়। প্রহসন ও ব্যঙ্গ উপন্যাস রচনার যোগ্য গদ্যভাষা সৃষ্টিও হয়েছিল সাংবাদিকতার মাধ্যমেই।
সম্বাদ কৌমুদী-র পাশাপাশি ব্রাহ্মণ সেবধি নামে একটি পত্রিকায় রামমোহন রায় ঔপনিষদিক ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য লেখনী পরিচালনা করেছিলেন। ১৮২২ সাল থেকে শুরু করে কয়েক বছরের মধ্যেই ধর্ম, সমাজ, ঐতিহাসিক গবেষণা, বিজ্ঞান-আলোচনা এবং কাল্পনিক মৌলিক রচনা সাময়িকপত্রকে বাহন করে প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হতে লাগল। পশ্বাবলী, সংবাদ-তিমিরনাশক, বঙ্গদূত, জ্ঞানাঙ্কুর, প্রতিবিম্ব প্রভৃতি বহু পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের বিষয়ের বিস্তৃতি ঘটতে থাকল, বাংলা গদ্যের সরলীকরণ ঘটল, মনীষা ও লিপিকুশলতা প্রকাশের অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হল। সাংবাদিকতার সূত্র ধরেই সাহিত্যিক প্রতিভার উন্মেষ ঘটল। এইভাবে বাংলার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকেরা সকলেই সাময়িকপত্র অবলম্বন করে নিজেদের প্রতিভার প্রকাশের পথ খুঁজে পেলেন।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পত্রপত্রিকা
[সম্পাদনা]বিবিধার্থ সংগ্রহ
[সম্পাদনা]রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদনায় বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৫১ সালে (কার্তিক, ১২৫৮)। ইংরেজি পেনি ম্যাগাজিন-এর আদর্শে প্রচারিত এটিই ছিল বাংলা সাহিত্যে প্রথম সচিত্র মাসিক পত্রিকা। এই পত্রিকা প্রকাশের জন্য রাজেন্দ্রলাল ভার্নাকুলার লিটারেচার সোসাইটির থেকে মাসিক ৮০ টাকা সাহায্য পেতেন। পত্রিকাটির মূল্য ছিল সংখ্যা প্রতি দু আনা (বার্ষিক দেড় টাকা)। সংবাদ প্রভাকর-এ প্রকাশিত বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকার পরিচয় দেওয়া হয়েছে “পুরাবৃত্তেতিহাস প্রাণিবিদ্যা শিল্প সাহিত্যাদি-দ্যোতক” মাসিকপত্র রূপে। পত্রিকার আলোচনার ভঙ্গি ছিল সহজ সরল ও চিত্তাকর্ষক। কালীপ্রসন্ন সিংহও কিছুকাল এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জীবনী, প্রাচীন তীর্থের বিবরণ, নীতিমূলক উপন্যাস, রহস্যকাহিনি, গ্রন্থ সমালোচনাও এতে প্রকাশিত হত। এই পত্রিকাতেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য-এর প্রথম দুটি সর্গ প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের একটি সমালোচনা এবং রামনারায়ণ তর্করত্নের কুলীনকুলসর্বস্ব নাটকের একটি দীর্ঘ সমালোচনাও এতে প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন: “রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয় বিবিধার্থ সংগ্রহ বলিয়া একটি ছবিওয়ালা মাসিকপত্র বাহির করিতেন। তাহারই বাঁধান একভাগ সেজদাদার আলমারির মধ্যে ছিল। সেটি আমি সংগ্রহ করিয়াছিলাম। বার বার করিয়া সেই বইখানা পড়িবার খুশি আজও আমার মনে পড়ে। সেই বড়ো চৌকো বইটাকে বুকে লইয়া আমাদের শোবার ঘরে তক্তাপোশের উপর চিত হইয়া পড়িয়া নীল তিমি মৎস্যের বিবরণ, কাজীর বিচারের কৌতুকজনক গল্প, কৃষ্ণকুমারীর উপন্যাস পড়িতে পড়িতে কত ছুটির দিনের মধ্যাহ্ন কাটিয়াছে।”
মাসিক পত্রিকা
[সম্পাদনা]১৮৫৪ সালের ১৬ অগস্ট প্যারীচাঁদ মিত্রের সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা। রাধানাথ শিকদার এই পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। পত্রিকাটির আদর্শ সম্পর্কে বলা হয়েছিল: “এই পত্রিকা সাধারণের বিশেষত স্ত্রীলোকের জন্য ছাপা হইতেছে, যে ভাষায় আমাদিগের সচরাচর কথাবার্তা হয়, তাহাতেই প্রস্তাব সকল রচনা হইবেক। কিন্তু পণ্ডিতেরা পড়িতে চান, পড়িবেন, কিন্তু তাঁহারদিগের নিমিত্তে এই পত্রিকা নির্মিত হয় নাই।” ড. সুকুমার সেন তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে জানিয়েছেন, এই পত্রিকাটির “উদ্দেশ্য অল্পশিক্ষিত জনসাধারণকে, বিশেষ করিয়া অন্তঃপুরবাসিনীদের শিক্ষাচ্ছলে সাহিত্যরসের যোগান দেওয়া। তাই প্রবন্ধগুলির বিষয় সহজ চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষাপ্রদ, আর ভাষা যথাসাধ্য কথ্যরীতির অনুযায়ী। লেখ্য ও কথ্য ভাষার একপ্রকার মিশ্রণ-রীতিই ছিল ‘মাসিক পত্রিকা’র প্রধান বিশেষত্ব।”
চার বছর চলেছিল মাসিক পত্রিকা। প্যারীচাঁদের আলালের ঘরের দুলাল বইটির প্রায় পুরোটাই এর প্রথম বর্ষের সপ্তম সংখ্যা থেকে ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন, “‘মাসিক পত্রিকা’ প্রকাশে প্যারীচাঁদ এবং তাঁহার সহযোগী রাধানাথ শিকদারের দুঃসাহসিকতা আজও আমাদের বিস্ময়ের বিষয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর ষষ্ঠ দশকে ইঁহারা এই সাহস প্রদর্শন না করিলে বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে আমরা বাংলা সাহিত্যের এমন উন্নতি ও প্রসার আশা করিতে পারিতাম না।” ব্রজেন্দ্রনাথ যে সাহসের কথা উল্লেখ করেছেন, তা ছিল যথাসম্ভব কথ্যভাষার প্রয়োগে এবং সংস্কৃতানুগ গদ্যরীতির বর্জনে। মাসিক পত্রিকা-র গদ্যশৈলীর একটি উহাদরণ থেকে তার প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে ১৮৫৭ সালের জুন মাসে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে: “ব্রাহ্মণদের মধ্যে কুলীনে মেয়ে দিলে যেমন বাপমার মুখ উজ্জ্বল হয়, সেইরূপ স্পার্টাবাসীদের মধ্যে ছেলে লড়াইয়ে মরিলে বাপমার মুখ উজ্জ্বল হইত। এই নিমিত্তে ছেলে যখন লড়াইয়ে যাইত, মা আপনি তাহার হাতে ঢাল তলবার দিতেন। দিয়া বলিতেন – বাপু তুমি লড়াইয়ে যাও।” উল্লেখ্য, এই পত্রিকাতেই সর্বপ্রথম কমা, সেমিকোলন ইত্যাদি বিরামচিহ্নের যথাযথ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
এডুকেশন গেজেট
[সম্পাদনা]বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে এডুকেশন গেজেট একটি স্মরণীয় পত্রিকা। ১৮৫৬ সালের ৪ জুলাই প্রথম প্রকাশের কালে এটির নাম ছিল এডুকেশন গেজেট ও সাপ্তাহিক বার্তাবহ। শিক্ষা বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলের ইনস্পেক্টর হজসন প্রাটের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে ভূদেব মুখোপাধ্যায় সরকারি নীতি সম্পর্কে জনসাধারণকে সরাসরি অবহিত করার জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাব দিলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরই ফলস্বরূপ প্রকাশিত হয় এডুকেশন গেজেট। পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ডব্লিউ. ও’ব্রায়ান স্মিথ ছিলেন নামেই সম্পাদক। সহ-সম্পাদক রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তদারক করতেন পত্রিকার যাবতীয় কাজকর্ম। সরকারের পক্ষ থেকে পত্রিকাটিকে মাসিক দুশো টাকা অনুদান দেওয়া হত।
১৮৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে স্মিথ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে কিছুদিন পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন কানাইলাল পাইন ও ব্রহ্মমোহন মল্লিক। ১৮৬৬ সালের মার্চ মাসে প্যারীচরণ সরকার পত্রিকা সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল তিনশো টাকা। কিন্তু একটি রেল দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। শ্যামনগর রেল স্টেশনের কাছে একটি রেল দুর্ঘটনায় বহু যাত্রী হতাহত হয়েছিলেন। রেল কর্তৃপক্ষ হতাহতের সংখ্যা কম করে দেখিয়েছিল। কিন্তু প্যারীচরণ আলাদাভাবে অনুসন্ধান করে সত্য ঘটনা প্রকাশ করেন। তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। এমনকি আহতদের অনেকের দেহ নিহতদের সঙ্গে মিলিয়ে পদ্মায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এমনকি চুরি করা হয়েছিল তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও। এডুকেশন গেজেট এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে রীতিমতো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে প্যারীচরণের কৈফিয়ত দাবি করলে তিনি জানান যে, তিনি তাঁর জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুযায়ী যা সত্য তাই প্রকাশ করেছেন এবং সরকারের সঙ্গে তাঁর এমন কোনও চুক্তি হয়নি যে, তিনি সত্য প্রকাশ করতে পারবেন না। ১৮৬৮ সালের ৩১ জুলাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই বিবাদের পরিণতিতেই প্যারীচরণ পদত্যাগ করেন।
এডুকেশন গেজেট-এর পরবর্তী সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায় কর্তৃপক্ষকে শর্ত দিয়েছিলেন যে, পত্রিকার সম্পূর্ণত স্বত্ব তাঁকে দিতে হবে এবং বেতনের পরিবর্তে মাসিক তিনশো টাকা পত্রিকাকে দিতে হবে গ্র্যান্ট-ইন-এইড হিসেবে। কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়। ১৮৬৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ভূদেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি তিনশো টাকার পরিবর্তে দুশো টাকা অনুদান পেতেন। কিন্তু ১৮৯৪ সালের ১৫ মে পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করে গিয়েছিলেন। ভূদেব সম্পাদিত এডুকেশন গেজেট-এর প্রথম সংখ্যাতেই পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানানো হয়েছিল: “কোন মত, কোন দল, কোন পক্ষ, অবলম্বন করার আমাদিগের ইচ্ছা নাই। সকল মতেই, সকল দলেই, সকল পক্ষেই, কিছু সত্য এবং কিছু মিথ্যা থাকে—কিছুতেই সত্য অথবা মিথ্যা সম্পূর্ণ অমিশ্র-ভাবে থাকে না। আমরা সত্যের দিকেই থাকিতে চেষ্টা করিব—অসত্য ভিন্ন আর কিছুরই ভয় করিব না—কারণ আশৈশব আমাদিগের এই মহাবাক্যে বিশ্বাস আছে ‘সত্যমেব জয়তে’।” ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনাকালেই এডুকেশন গেজেট পত্রিকায় দেশীয় বর্ষগণনা পদ্ধতি অর্থাৎ, বৈশাখ মাস থেকে বছর গণনা শুরু হয়। পত্রিকাটি কী ধরনের হবে সেই বিষয়ে তিনি জানান: “এডুকেশন গেজেট সর্বপ্রকার শিক্ষা প্রচারেই নিযুক্ত থাকিবে এবং একাধারে সম্বাদ পত্র এবং মাসিক পত্র এবং ত্রৈমাসিক পত্রেরও কাজ, কতকটা করিবে।”
‘ভারতবিলাপ’ ও ‘ভারতসঙ্গীত’ সহ হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহু কবিতা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। দীনবন্ধু মিত্র, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন প্রমুখের রচনা পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। এছাড়া গোবিন্দদেব মুখোপাধ্যায়, পুলিনবিহারী ভাদুড়ী, দ্বারকানাথ চক্রবর্তী, ক্ষেত্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখও এই পত্রিকায় লিখতেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক প্রবন্ধ, সামাজিক প্রবন্ধ, আচার প্রবন্ধ, স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস, বাঙ্গালার ইতিহাস (তৃতীয় ভাগের শেষাংশ) এবং বিবিধ প্রবন্ধ গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগে প্রকাশিত অধিকাংশ প্রবন্ধ এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।
এডুকেশন গেজেট পত্রিকার নিয়মিত বিভাগগুলি ছিল: (১) সম্পাদকীয়, (২) সম্পাদকের লেখা প্রবন্ধ, (৩) সাপ্তাহিক সংবাদ, (৪) রাজকার্যের নিয়োগ, (৫) পত্র প্রেরকের প্রতি সম্পাদকের মন্তব্য, (৬) পাঠকদের পত্র, (৭) কবিতা, (৮) বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, (৯) শিক্ষা সম্পর্কিত আলোচনা, (১০) বিবিধ। পত্রিকাটির সাহিত্য সমালোচনা বিভাগটিও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ। টেকচাঁদ ঠাকুরের (প্যারীচাঁদ মিত্র) অভেদী, দীনবন্ধু মিত্রের জামাইবারিক, রামগতি ন্যায়রত্নের বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব, রাজনারায়ণ বসুর সেকাল আর একাল, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৃত্রসংহার কাব্য, চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের উদ্ভ্রান্ত প্রেম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিকাহিনী প্রভৃতি গ্রন্থের সমালোচনা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
সেকালে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রতিটি বিষয়েই জনমত তৈরিতে এডুকেশন গেজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সাহিত্য বিষয়েও পত্রিকাটির বিশেষ আগ্রহ ছিল। এক কথায়, এডুকেশন গেজেট পত্রিকা নয়, পরিণত হয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠানে।
সোমপ্রকাশ
[সম্পাদনা]১৮৫৮ সালের ১৫ নভেম্বর (১২৬৫ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণ) সোমবার সাপ্তাহিক পত্রিকা সোমপ্রকাশ প্রথম প্রকাশিত হয়। সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ছিলেন এটির সম্পাদক। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পত্রিকাটি প্রকাশে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। পত্রিকার বিষয়ে তিনি দ্বারকানাথকে নানা পরামর্শ দিতেন। কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য তাঁর স্মৃতিকথা গ্রন্থে দ্বারকানাথ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “তাঁহার ‘সোমপ্রকাশ’ বাংলা ভাষাকে ও বাংলা সাহিত্যকে গৌরবশ্রী দান করিয়াছিল। সুন্দর সরল বাংলা ভাষায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, পলিটিকস্ আলোচিত হইতে লাগিল। বাংলা ভাষার সর্বপ্রকার ভাব প্রকাশ করিবার এরূপ ক্ষমতা আছে, ইহা পূর্বে লোকে ভাল করিয়া ধারণা করিতে পারে নাই।” ভূদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর সম্পাদিত এডুকেশন গেজেট পত্রিকায় দ্বারকানাথের মৃত্যুতে লিখেছিলেন, “বিদ্যাভূষণ মহাশয় বাঙ্গালা সংবাদপত্রের প্রথম শিক্ষাগুরু। তাঁহা হইতেই বাঙ্গালা সংবাদপত্রের উন্নতি হয়। পূর্ব্বে ভাস্কর প্রভাকর সমাচারচন্দ্রিকা প্রভৃতি বাঙ্গালা সংবাদপত্র সকল ছিল বটে, কিন্তু সংবাদপত্রের উপযুক্ত বিষয় সহ সেই সকল পত্র নির্গত হইত না। বিদ্যাভূষণ মহাশয়ই সুপদ্ধতিতে বাঙ্গালা সংবাদপত্র পরিচালনের প্রকৃত পথ প্রদর্শন করেন। রাজনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ের আন্দোলন কিরূপ করিতে হয়, তিনি প্রথম তাহা বাঙ্গালা সংবাদপত্রের সম্পাদকদিগকে দেখাইয়া দেন। এক্ষণে পূর্ব্বাপেক্ষা বাঙ্গালা সংবাদপত্রসমূহের অনেক উন্নতি হইয়াছে বটে, কিন্তু সোমপ্রকাশ সংবাদপত্রই যে এ উন্নতির মূল, ইহা সকলকেই স্বীকার করিতে হইবে।” (১৯ ভাদ্র, ১২৯৩ বঙ্গাব্দ)
সোমপ্রকাশ-এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় ১২৬৯ বঙ্গাব্দের ১৫ পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘ভারতবর্ষের আত্মশাসন’ নামক সম্পাদকীয় প্রবন্ধে: “এদেশে একটি জাতীয় সাধারণ সভা করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে। আমরা বারম্বার ইহার প্রস্তাব করিয়াছি।… যতদিন ইহা না হইতেছে ততদিন আমাদিগের যথার্থ স্বাধীনতা ও যথার্থ উন্নতি হইতেছে না।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সোমপ্রকাশ-এর এই প্রস্তাবনার তেইশ বছর পরে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা এবং তারও কিছুকাল পরে সেই সংস্থা ‘জাতীয় সাধারণ সভা’র ভূমিকা গ্রহণ করে ভারতকে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করে।
ধর্ম সম্পর্কে সোমপ্রকাশ ছিল উদার ও সমন্বয়পন্থী। সেকালের রক্ষণশীল হিন্দুরা ব্রাহ্মদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করলেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সহমর্মিতা সৃষ্টিই ছিল এই পত্রিকার লক্ষ্য। ১২৯৩ বঙ্গাব্দের ৮ আষাঢ় সংখ্যায় তাই সোমপ্রকাশ-এ প্রকাশিত হয়: “হিন্দু সমাজ বহুদিন হইতে ব্রাহ্মসমাজের ভাবগতিক উন্নতি ও অবনতির অবস্থা লক্ষ্য করিয়া আসিতেছেন। পূর্ব্বে ব্রাহ্মসমাজের উপর লোকের যে বিদ্বেষ ভাব ছিল ক্রমে তাহা অন্তর্হিত হইতেছে। ব্রাহ্মসমাজ হইতে হিন্দু সমাজ যে কোন উপকার লাভ করেন নাই একথা বলিলে কৃতঘ্নতা প্রকাশ পায়। ক্রমে ব্রাহ্ম হিন্দুকে আদর করিতে শিখিয়াছেন… অনেক কার্য্যে হিন্দু ব্রাহ্ম মিলিত হইয়া ধর্ম্মের গৌরব বৃদ্ধি করিতেছেন।”
দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সোমপ্রকাশ সম্পাদনা করেননি। কাজের চাপে ১৮৬৫ সালের ২ জানুয়ারি থেকে কিছুকালের জন্য তাঁকে সম্পাদনার দায়িত্বও থেকে অব্যাহতি নিতে হয়েছিল। মোহনলাল বিদ্যাবাগীশ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এরপর ১৮৭৮ সালে ভার্নাকুলার প্রেস আইন চালু হলে সরকার-বিরোধী কাজকর্মের জন্য রাজরোষে পড়ে ১৮৭৯ সালে এক বছরের জন্য পত্রিকাটি বন্ধ থাকে। ১৮৮০ সালে (৮ বৈশাখ, ১২৮৭ বঙ্গাব্দ) থেকে নবকলেবরে পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। অবশ্য এর কিছুকাল পরেই পত্রিকাটি হস্তান্তরিত হয়ে যায়।
রহস্য-সন্দর্ভ
[সম্পাদনা]১৮৬৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম প্রকাশিত সচিত্র মাসিক রহস্য-সন্দর্ভ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। এর আগে ১৮৫১ (কার্তিক সংখ্যা) থেকে ১৮৫৯ (চৈত্র সংখ্যা) পর্যন্ত তিনি বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। বিবিধার্থ সংগ্রহ-এর অভাব পূরণের জন্য রহস্য-সন্দর্ভ পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। রহস্য-সন্দর্ভ ভার্নাকুলার লিটারেচার সোসাইটি ও ক্যালকাটা স্কুল-বুক সোসাইটির আনুকূল্য লাভ করে। পত্রিকাটির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে প্রথম সংখ্যায় লেখা হয়: “…অভিনব পত্রের অভিপ্রেত কি তাহার কিয়দংশ ইহার নাম দ্বারাই অনুভূত হইবে। অধিকন্তু এই মাত্র বক্তব্য যে পূর্ব্বে ‘বিবিধার্থ-সংগ্রহ’ নামক মাসিক পত্র যে উদ্দেশ্যে বহুল পাঠকবৃন্দের মনোরঞ্জন করিত ইহাও সেই অভিপ্রায়ে প্রতিষ্ঠিত এবং তাহারই পদাঙ্কানুসরণার্থে সঙ্কল্পিত হইয়াছে…” রাজেন্দ্রলালের সম্পাদনার গুণে পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাজেন্দ্রলাল ষষ্ঠ পর্ব পর্যন্ত মোট ৬৬টি খণ্ড সম্পাদনা করেছিলেন। তারপর দুই বছর পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন প্রাণনাথ দত্ত।
রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এই পত্রিকায় লিখতেন। কয়েকটি ইংরেজি কবিতার রঙ্গলাল-কৃত অনুবাদ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়; যার মধ্যে ছিল ‘প্রভাত-সঙ্গীত’ (মূল রচনা: টমাস ওয়াট), ‘নদী ও কালের সমতা’ (মূল রচনা: টমাস কুপার) ও ‘আদিম নরদম্পতির প্রাতরুপাসনা’ (মূল রচনা: জন মিল্টন)।
রহস্য-সন্দর্ভ পত্রিকার দ্বিতীয় পর্বের ২১শ খণ্ডে টেকচাঁদ ঠাকুরের (প্যারীচাঁদ মিত্র) আলালের ঘরের দুলাল এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী-র সমালোচনা প্রকাশিত হয়। প্রথম গ্রন্থটি সম্পর্কে রাজেন্দ্রলালের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য:
রহস্যসন্দর্ভের পাঠকমণ্ডলী মধ্যে অল্প ব্যক্তি আছেন যাঁহারা শ্রীটেকচাঁদ ঠাকুরের নাম শ্রুত হয়েন নাই। তাঁহার ‘আলালের ঘরের দুলাল’ অনেকের ঘরে আলালের ঘরের দুলাল হইয়া বিরাজ করিতেছে, এবং তিনি একজন সুচতুর রহস্যব্যঞ্জক লেখক বলিয়া প্রসিদ্ধ আছেন।
আমাদের ঠাকুরজী ব্যঙ্গ লিখিতে সম্পূর্ণ সিদ্ধকাম, অতএব ব্যঙ্গ বিষয়ক যে কথা লিপিবদ্ধ করেন তাহা অবশ্যই সর্ব্বত্রই আদরনীয় হয়, কিন্তু নীতি ও ধর্ম্ম সম্বন্ধে তিনি তাদৃশ সফলতা লাভ করিতে পারেন না।
আবার দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের সমালোচনায় রাজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন: “গ্রন্থকারের কল্পনাশক্তি বিলক্ষণ বলবতী এবং যে কোন বিষয়ের আদর্শ শব্দে চিত্রিত করিয়াছেন তাহাই মনোজ্ঞ বোধ হয়।… তাঁহার গ্রন্থখানি যে রসব্যঞ্জক ভাবদ্যোতক ও নূতন প্রণালীর আদর্শস্বরূপ হইয়াছে এই নিমিত্ত আমরা তাঁহাকে সম্যক সাধুবাদ করিলাম।”
অবোধবন্ধু
[সম্পাদনা]১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে যোগেন্দ্রনাথ ঘোষের সম্পাদনায় অবোধবন্ধু পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যায় পকেটবুকের আকারে প্রকাশিত পত্রিকাটি পরবর্তী সংখ্যা থেকেই রূপান্তরিত হয়েছিল পত্রিকার আয়তনে। প্রতি সংখ্যার দাম ছিল দু আনা; বার্ষিক মূল্য কলকাতায় এক টাকা এবং কলকাতার বাইরে এক টাকা বারো আনা।
কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর সঙ্গে পত্রিকাটির ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। তিনি যে শুধু এই পত্রিকায় লিখতেন তা-ই নয়, বরং পত্রিকা প্রকাশেই সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতেন। দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যায় তার উল্লেখ করে প্রকাশিত হয়েছিল: “…আমার পরম বন্ধু শ্রীযুক্ত বাবু বিহারীলাল চক্রবর্তী মহাশয়ের নাম এস্থলে উল্লেখ না করিয়া পারিলাম না। তিনি অবোধবন্ধুর জন্য এরূপ শারীরিক ও মানসিক যত্ন ও পরিশ্রম স্বীকার করিয়াছেন যে অবোধবন্ধু চিরকাল তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রহিল।”
কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর অবোধবন্ধু-র প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৮৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত (১২৭৩ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন থেকে ১২৭৪ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যা) এটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। নতুন করে পত্রিকাটির দ্বিতীয় ভাগ শুরু হয় ১৮৬৯ সালের এপ্রিল মাসে (১২৭৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা)।
দ্বিতীয় বর্ষের নবম সংখ্যা থেকে (১২৭৫ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যা) বিহারীলাল পত্রিকাটির স্বত্বাধিকারী হন। তাঁর নিসর্গসন্দর্শন, বঙ্গসুন্দরী, সুরবালা কাব্য প্রভৃতি এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর সম্পাদনাকালেই হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইন্দ্রের সুধাপান (শ্রাবণ ১২৭৬ সংখ্যা) এবং কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের পৌলবর্জিনী, নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবন বৃত্তান্ত ও অন্যান্য রচনা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
‘বিহারীলাল’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকা সম্পর্কে লিখেছেন, “বাংলা ভাষায় বোধ করি সেই প্রথম মাসিকপত্র বাহির হইয়াছিল যাহার রচনার মধ্যে একটা স্বাদবৈচিত্র্য পাওয়া যাইত। বর্তমান বঙ্গসাহিত্যের প্রাণসঞ্চারের ইতিহাস যাঁহারা পর্যালোচনা করিবেন তাঁহারা অবোধবন্ধুকে উপেক্ষা করিতে পারিবেন না। বঙ্গদর্শনকে যদি আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের প্রভাতসূর্য্য বলা যায় তবে ক্ষুদ্রায়তন অবোধবন্ধুকে প্রত্যুষের শুকতারা বলা যাইতে পারে।” জীবনস্মৃতি গ্রন্থে ছেলেবেলায় অবোধবন্ধু পাঠের স্মৃতি-রোমন্থন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও লেখেন, “এই কাগজেই বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতা প্রথম পড়িয়াছিলাম। এখনকার দিনের সকল কবিতার মধ্যে তাহাই আমার সব চেয়ে মন হরণ করিয়াছিল। তাঁহার সেই সব কবিতা সরল বাঁশির সুরে আমার মনের মধ্যে মাঠের ও বনের গান বাজাইয়া তুলিত।"
বঙ্গদর্শন
[সম্পাদনা]১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন প্রথম প্রকাশিত হয়। বৈশাখ ১২৭৯ থেকে চৈত্র ১২৮২ সংখ্যা পর্যন্ত তিনিই ছিলেন এই পত্রিকার সম্পাদক। পত্রিকাটির নামকরণের পিছনে ১৮৪২ সালে প্রকাশিত বেঙ্গল স্পেকটেটর পত্রিকার নামের প্রভাব থাকা সম্ভব।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্গদর্শন প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা। এটি ছিল একটি উচ্চ মানের সাহিত্য পত্রিকা। বঙ্কিমচন্দ্র বুঝেছিলেন, “যতদিন না সুশিক্ষিত জ্ঞানবন্ত বাঙ্গালী বাঙ্গালা ভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, ততদিন বাঙ্গালীর উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই।” এই উপলব্ধিই তাঁকে বঙ্গদর্শন-এর পরিকল্পনায় প্রবুদ্ধ করে। পত্রিকার ‘পত্রসূচনা’ অংশে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, “…এই পত্র আমরা কৃতবিদ্য সম্প্রদায়ের হস্তে, আরও এই কামনায় সমর্পণ করিলাম যে, তাঁহারা ইহাকে আপনাদিগের বার্ত্তাবহরূপ ব্যবহার করুন। বাঙ্গালী সমাজে ইহা তাঁহাদিগের বিদ্যা, কল্পনা, লিপিকৌশল, এবং চিত্তোৎকর্ষের পরিচয় দিক। তাঁহাদিগের উক্তি বহন করিয়া, ইহা বঙ্গ-মধ্যে জ্ঞানের প্রচার করুক।” পত্রিকাটির অপর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষিত শ্রেণির মাধ্যমে অশিক্ষিত শ্রেণিকে আলোকিত করে তোলা এবং পত্রিকাকে সেই কাজের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। মুখার্জি’স ম্যাগাজিন-এর সম্পাদক শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে ১৮৭২ সালের ১৪ মার্চ লেখা একটি চিঠিতে বঙ্কিমচন্দ্র তাই জানান, “I have myself projected a Bengali Magazine with the object of making it the medium of communication and sympathy between the educated and the uneducated classes.”
‘পত্রসূচনা’ অংশে বঙ্কিমচন্দ্র আরও জানিয়েছিলেন, “আমরা এই পত্রকে সুশিক্ষিত বাঙ্গালীর পাঠোপযোগী করিতে যত্ন করিব।” তাই এতে উন্নত মানের উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, রম্যরচনা, সমালোচনা ইত্যাদি প্রকাশিত হত। প্রকাশিত প্রবন্ধগুলির বিষয়বৈচিত্র্যও অনস্বীকার্য। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, সংগীত, ভাষাতত্ত্ব, সাহিত্য ইত্যাদি ছিল সেগুলির আলোচ্য বিষয়।
বঙ্গদর্শন-এ বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা (গল্পাকারে), চন্দ্রশেখর, যুগলাঙ্গুরীয়, লোকরহস্য, বিজ্ঞানরহস্য, কমলাকান্তের দপ্তর, সাম্য ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। পাঠক মনোরঞ্জন ও বৈচিত্র্য আনার জন্য তিনি আপাতলঘু ব্যঙ্গাত্মক যে-সব প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তারই নিদর্শন লোকরহস্য ও কমলাকান্তের দপ্তর। এগুলিতে তিনি হাল্কা সুরে গভীর কথা শুনিয়েছেন। বঙ্গদর্শন-এর পৃষ্ঠাতেই আফিমখোর স্বভাব-দার্শনিক, কবি ও দেশপ্রেমিক কমলাকান্তের আবির্ভাব। পত্রিকাটি প্রকাশিত না হলে বঙ্কিমচন্দ্র আদৌ এই চরিত্রটি সৃষ্টি করতেন কিনা সন্দেহ। এই পত্রিকা সম্পাদনা না করলে বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার ধারাও অন্যরকম হত। বঙ্গদর্শন-এর তাগিদেই তিনি তাঁর কয়েকটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনা করেন। আবার এই পত্রিকাতেই তিনি সাহিত্য সমালোচনার আধুনিক রীতির সূত্রপাত ঘটান। পক্ষপাতশূন্য সমালোচক বঙ্কিমচন্দ্র সমকালীন সাহিত্যকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তেমনই পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্য সমালোচনার রীতিকেও প্রভাবিত করেছেন। তাঁর প্রশংসায় লেখকেরা উৎসাহিত হয়েছেন, আবার নিন্দায় হয়েছেন সচেতন ও সতর্ক। এক কথায়, বঙ্গদর্শন বঙ্কিমচন্দ্রকে আরও বেশি করে লিখতে বাধ্য করেছিল, পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর রচনার গতিও কমে গিয়েছিল।
বঙ্গদর্শন-কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী লেখকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। প্রয়োজনে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের লেখা সংশোধন করে দিতেন। এভাবে তিনি বহু লেখক তৈরি করেন। রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, রামদাস সেন, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্কিম-অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, প্রফুল্লচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, লালমোহন বিদ্যানিধি, চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, পূর্ণচন্দ্র বসু, চন্দ্রনাথ বসু, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, জগদীশনাথ রায়, চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ এই লেখকগোষ্ঠীর অন্যতম। বঙ্গদর্শন পত্রিকাকে কেন্দ্র করে এই লেখকেরা বাংলা সাহিত্যে নবযুগের সূচনা ঘটান।
বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে বঙ্গদর্শন পত্রিকার একটি স্থায়ী মূল্য আছে। এমন উন্নত মানের সাহিত্য পত্রিকা এর আগে প্রকাশিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি গ্রন্থে যথার্থই লিখেছেন, “বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন আসিয়া বাঙ্গালীর হৃদয় একেবারেই লুট করিয়া লইল।”
কর্মব্যস্ততা ও সময়াভাবে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন বন্ধ করে দেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনায় পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। তিনি বৈশাখ ১২৮৪ থেকে চৈত্র ১২৮৫, বৈশাখ ১২৮৭ থেকে আশ্বিন ১২৮৮ এবং বৈশাখ থেকে চৈত্র ১২৮৯ সংখ্যা পর্যন্ত এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এরপর শ্রীশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এই পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১২৯০ বঙ্গাব্দের কার্তিক থেকে মাঘ সংখ্যা পর্যন্ত। রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩০৮ থেকে চৈত্র ১৩১২ সংখ্যা পর্যন্ত। বিশ শতকে সত্যজিৎ চৌধুরীর সম্পাদনায় নৈহাটি থেকে পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। তবে এখন এটি মাসিক নয়।
প্রচার
[সম্পাদনা]১৮৮৪ সালের জুলাই মাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নব্য হিন্দুধর্মের মুখপত্র রূপে প্রচার পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যা অর্থাৎ শ্রাবণ ১২৯৩ সংখ্যা থেকে মাঘ ১২৯৩ সংখ্যা পর্যন্ত (মাঝে কয়েক মাস বাদে) ধারাবাহিকভাবে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বশেষ উপন্যাস সীতারাম। এই সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ধর্মপিপাসু। তাঁর সেই ধর্মজিজ্ঞাসার পরিচয় পাওয়া যায় এই প্রচার এবং অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত নবজীবন পত্রিকায়। প্রচার-এর শ্রাবণ ১২৯১ সংখ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র ‘হিন্দুধর্ম’ নামে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ভারতী পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১২৯১ সংখ্যায় তার প্রতিবাদ করেন। প্রচার পত্রিকাতেই বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণ চরিত্রের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে তাঁর গভীর মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি কৃষ্ণকে ঐতিহাসিক চরিত্র রূপে দেখেন এবং কৃষ্ণ-সম্পর্কিত শাস্ত্রবর্ণিত অলৌকিক বৃত্তান্তগুলি বর্জন করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সংস্কারমুক্ত ও যুক্তিনিষ্ট। এভাবে কৃষ্ণের চরিত্রকে আগে কখনও দেখা হয়নি। প্রচার পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র দেবতত্ত্ব-সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছিলেন এবং ভগবদ্গীতার ব্যাখ্যা রচনায় প্রবৃত্ত হয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৬শ শ্লোক পর্যন্ত ব্যাখ্যাও করেছিলেন। কিন্তু দুটি রচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রচার পত্রিকায় হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুজ ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার বড়াল, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য প্রমুখ অনেকেই লিখতেন। অক্ষয়কুমারের ‘অলস জোছনাময়ী নিথর যামিনী’ (ভাদ্র ১২৯৩ সংখ্যা), ‘ভালবাসা’ (ফাল্গুন ১২৯৩ সংখ্যা), ‘সে’ (১২৯৫ সংখ্যা) কবিতাগুলি এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নবকৃষ্ণের ‘শেষ’ কবিতাটিও ১২৯৫ সালে প্রচার-এ প্রকাশিত হয়েছিল।
নবজীবন
[সম্পাদনা]১৮৭২ সালে অক্ষয়চন্দ্র সরকারের সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা নবজীবন। ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত এটি প্রকাশিত হয়েছিল (শ্রাবণ ১২৯১ থেকে ভাদ্র ১২৯৬ সংখ্যা)। এটি ছিল একটি উন্নত মানের পত্রিকা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, চন্দ্রনাথ বসু, ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখ অনেকেই এই পত্রিকায় লিখতেন। স্বয়ং অক্ষয়চন্দ্রের ‘বদরসিক’, ‘কুঞ্জ সরকার’, ‘সুন্দরবনে ব্যাঘ্রাধিকার’, ‘হলধর ঘটক’, ‘পূজার গল্প’ প্রভৃতি লঘু চালের রচনা এবং সঙ্গে অন্যান্য আরও কিছু লেখা এতে প্রকাশিত হয়েছিল।
বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মতত্ত্ব-এর অংশবিশেষ প্রথম নবজীবন-এ প্রকাশিত হয়। ১২৯১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যায় ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের জীবনী’ নামে রবীন্দ্রনাথের একটি সাক্ষরবিহীন ব্যঙ্গরচনা এতে প্রকাশিত হয়; তাতে রহস্যচ্ছলে জানানো হয় যে, ভানুসিংহ ঠাকুর আসলে রবীন্দ্রনাথ হলেও হতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজপথের কথা’ গল্পটি নবজীবন-এর অগ্রহায়ণ ১২৯১ সংখ্যায় ছাপা হয়। চন্দ্রনাথ বসুর হিন্দু বিবাহ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে নবজীবন-এ ছাপা হয়েছিল। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলির মধ্যে আছে ‘মহাশক্তি’ (পৌষ ১২৯১), ‘বিবর্ত্তন’ (বৈশাখ ১২৯২), ‘মহাতরঙ্গ’ (অগ্রহায়ণ ১২৯২), ‘জড়জগতের বিকাশ’ (আষাঢ় ১২৯৩), ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১২৯৩), ‘বৈদেশিক সভ্যতা’ (শ্রাবণ ১২৯৪) ইত্যাদি। নবজীবন পত্রিকার গদ্যশৈলীর একটি নিদর্শন নিচে দেওয়া হল: “ভাই হাততালি! তোমার দুটী হাতে ধরি, তুমি ভাই একবার ক্ষান্ত দাও,—তোমার চট্চট্ গর্জনে একবার বিরাম দাও। যে বিধির বিড়ম্বনায় অগাধ জলে পড়িয়াছে, তাহাকে মাথায় ঘা দিয়া ডুবাইয়া দিলে আর কি পুরুষার্থ আছে? আমরা ত অগাধ জলেই আছি, তবে ভাই হাততালি! আর আমাদিগকে ডুবাইয়া দিবার জন্য তোমার এত আড়ম্বর কেন?” (অক্ষয়চন্দ্র সরকার, ‘ভাই হাততালি’, মাঘ ১২৯১ সংখ্যা)
ভারতী
[সম্পাদনা]বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন বন্ধ হয়ে গেলে উচ্চ মানের একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রধানত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎসাহে ১৮৭৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় মাসিক ভারতী পত্রিকা। প্রথম সাত বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম সংখ্যায় (শ্রাবণ ১২৮৪) পত্রিকার নামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি লেখেন, “ভারতীর উদ্দেশ্য যে কি, তাহা তাহার নামেই স্বপ্রকাশ। ভারতীর অর্থ বাণী, আর এক অর্থ বিদ্যা, আর এক অর্থ ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। বাণী স্থলে স্বদেশীয় ভাষার আলোচনাই আমাদের উদ্দেশ্য…।”
রয়্যাল আর্ট পৃষ্ঠা ফর্মায় ছাপা ভারতী-র মূল্য ছিল বার্ষিক সাড়ে তিন টাকা। প্রথমে প্রতি মাসের ১৫ তারিখে, পরে ১ তারিখে প্রকাশিত হত পত্রিকাটি। প্রথম সংখ্যা ছাপা হয় পাঁচশো কপি। পরবর্তীকালে কোনও কোনও সংখ্যা এক হাজার কপিও ছাপানো হয়।
প্রথম সংখ্যায় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভূমিকা’ ছাড়াও ‘তত্ত্বজ্ঞান কতদূর প্রামাণিক’ ও ‘গঞ্জিকা’ নামে দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘গঞ্জিকা’ কৌতুকরসাত্মক রচনা। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর জ্ঞান নীতি ও ইংরেজি সভ্যতা নামে একটি ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের তিনটি রচনা প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে ‘ভারতী’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল কবির সাক্ষর ছাড়াই। এছাড়া ছিল মেঘনাদবধ কাব্য-এর একটি সমালোচনা, যা প্রকাশিত হয় কয়েকটি সংখ্যায়। রবীন্দ্রনাথের ‘ভিখারিণী’ গল্পটিও প্রকাশিত হয় প্রথম সংখ্যায়। এছাড়া ছিল অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরীর ধারাবাহিক রচনা বঙ্গসাহিত্য এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদকের বৈঠক। দ্য ক্যালকাটা রিভিউ পত্রিকায় লেখা হয়, “The style of the Bharati is extremely good and graceful. It is completely free from faults of imitation and mannerism.”
কবিতা, গল্প-উপন্যাস ও সাহিত্য-বিষয়ক প্রবন্ধে পত্রিকাটি ছিল বিশেষ সমৃদ্ধ। এছাড়া রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, শিক্ষা, অভিনয় ইত্যাদি বিষয়েও অনেক প্রবন্ধ এতে স্থান পায়। গ্রন্থ সমালোচনাও প্রকাশিত হত। থাকত বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদও। ১৮৭৭ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত (সর্বশেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে) প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী দেবী, হিরণ্ময়ী দেবী ও সরলা দেবী চৌধুরাণী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মতিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে, এমনকি ভারতের বাইরেও এর প্রচার ছিল। পত্রিকাটি প্রকাশিতও হত ঠিক সময়ে।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনে এই পত্রিকার গুরুত্ব কম নয়। তাঁর বহু কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ ইত্যাদি এতে প্রকাশিত হয়। কবিকাহিনী ও ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী-র গানগুলি ছাড়া এতে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, ‘জুতা আবিষ্কার’, ‘তোমরা ও আমরা’, ‘দুঃসময়’, ‘দীনদান’, ‘দেবতার গ্রাস’, ‘নববর্ষা’, ‘পসারিনী’, ‘বর্ষশেষ’, ‘বর্ষামঙ্গল’, ‘মদনভস্মের পরে’, ‘মদনভস্মের পূর্বে’, ‘সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’, ‘স্বপ্ন’ ইত্যাদি বিখ্যাত কবিতা। ‘অতিথি’, ‘ডিটেকটিভ’, ‘দেনাপাওনা’, ‘অধ্যাপক’, ‘দুরাশা’, ‘দুর্বুদ্ধি’, ‘দৃষ্টিদান’, ‘নতুন পুতুল’, ‘নষ্টনীড়’, ‘নামের খেলা’, ‘পণরক্ষা’, ‘পরীর পরিচয়’, ‘বিদূষক’ প্রভৃতি গল্পও প্রথম প্রকাশিত হয় ভারতী পত্রিকাতেই। রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস করুণা এবং রঙ্গনাট্য চিরকুমার সভা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রবন্ধ ‘অন্তর বাহির’, ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’, ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’, ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’, ‘গ্রাম্যসাহিত্য’, ‘ছোট ও বড়’, ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ প্রভৃতি প্রবন্ধ।
ছোটোদের জন্য লেখা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোর ফুলকি ও নালক এতেই প্রকাশিত হয়। ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের কয়েকটি রচনাও এতে প্রকাশিত হয়। ভারতী লেখকগোষ্ঠীর অন্যান্য লেখকেরা হলেন অক্ষয়কুমার বড়াল, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, অজিতকুমার চক্রবর্তী, অনুরূপা দেবী, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, অমৃতলাল বসু, অসিতকুমার হালদার, আশুতোষ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, করুণানিধন বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, কিরণধন চট্টোপাধ্যায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনেন্দ্রকুমার রায়, দীনেশচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ সেন, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, নরেন্দ্র দেব, নিরুপমা দেবী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ। ভারতী প্রকাশিত হত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে। এই পরিবারের অনেকেই এই পত্রিকায় লিখতেন। তবে ঠাকুর পরিবার-বহির্ভূত অনেক বিশিষ্ট সাহিত্যিকই ছিলেন ভারতী লেখকগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে যে একটি নতুন ধারার সাহিত্য রচনার জোয়ার এসেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।
বিভিন্ন পর্বে ভারতী সম্পাদনায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী, হিরণ্ময়ী দেবী ও সরলা দেবী চৌধুরাণীর মতো মহিলা সাহিত্যিকেরা। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কৃতিত্ব এই পত্রিকায় বহু লেখিকার সমাবেশে। অনঙ্গমোহিনী দেবী, অনুজা ঘোষ, অনুপমা দেবী, অনুরূপা দেবী, অমলা দেবী, অমিয়বালা দেবী, আমোদিনী ঘোষজায়া, ইন্দিরা দেবী (সুরূপা দেবী), ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, উমাশশী দেবী, ঊর্মিলা দেবী, কমলা দেবী, কল্যাণী দে, কৃষ্ণভাবিনী দাস, গিরিবালা দেবী, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, নিরুপমা দেবী, নিস্তারিনী দেবী, নীহারবালা দেবী, প্রতিভা দেবী, প্রফুল্লময়ী দেবী, প্রভাময়ী দেবী, প্রসন্নময়ী দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী, বিনয়কুমারী দেবী প্রমুখ লেখিকার আবির্ভাব ঘটে এই পত্রিকায়।
ভারতী-তে প্রকাশিত প্রবন্ধসাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্যও অনস্বীকার্য। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন সংস্কৃতি ও শিল্প-বিষয়ক প্রবন্ধ: বাংলার ব্রত প্রবন্ধমালা, ‘ছেলে ভোলানো ছড়া’, ভারত শিল্পের ষড়ঙ্গ প্রবন্ধগুচ্ছ, ‘শিল্প ও শিল্পী’, ‘শিল্পের ত্রিধারা’। অবিনাশচন্দ্র দাস লিখেছেন প্রাচীন ভারত বিষয়ে: ‘ঋগ্বেদের প্রাচীনত্ব’, ‘কিষ্কিন্ধ্যার অবস্থান’, ‘প্রাচীন ভারতে রাজ্যশাসন প্রণালী’। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ ‘কিরাত জাতি’, ‘কুকী’ ও ‘তিপ্রা বা তিপারা জাতি’ প্রবন্ধে জাতিতত্ত্ব আলোচনা করেন; আবার বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান সম্পর্কে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন ‘বাঙলার প্রথম: প্রথম বাঙলা ব্যাকরণ’ ও ‘প্রথম বাঙলা অভিধান’ প্রবন্ধে। অম্বিকাচরণ রক্ষিত রচনা করেন ‘গার্হস্থ্য চিকিৎসাবিদ্যা’ ও ‘ভারত ভৈষজ্য তত্ত্ব’। আশুতোষ চৌধুরী উচ্চশিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে এবং আশুতোষ রায় চীনের ধর্ম ও শিল্পকলা নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন। উপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রবন্ধ রচনা করেন তুকারাম ও বৌদ্ধধর্ম মিয়ে। আবার কৈলাসচন্দ্র সিংহ অব্দ, আদিশূর, ইবন বতুতা, এম. বার্নিয়ার ও হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণবৃত্তান্ত, উড়িষ্যার ইতিহাস, গুপ্ত ও লিচ্ছবি রাজন্যবর্গ, চট্টগ্রামের পুরাতত্ত্ব, জাজনগর রাজ্য ইত্যাদি নানা বৈচিত্র্যময় বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন। গল্প-উপন্যাস ছাড়াও চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন ‘ভাষা-রহস্য’, ‘ভাষার গঠন ও উন্নতি’, ‘লিখন সৃষ্টির ইতিহাস’ ইত্যাদি ভাষাতত্ত্ব-বিষয়ক প্রবন্ধ। ‘অযোধ্যা’, ‘কর্ণপ্রয়াগ’, ‘দেবপ্রয়াগ’, ‘নন্দপ্রয়াগ’, ‘বদরিকাশ্রমে’, ‘যোশীমঠ’, ‘রুদ্রপ্রয়াগ’, ‘শ্রীনগর’ ইত্যাদি ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনা করেন জলধর সেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লেখেন ‘আধুনিক জাপান’, ‘আধুনিক ভারত ও য়ুরোপীয় সভ্যতার প্রভাব’, ‘আধুনিক য়ুরোপীয় সঙ্গীত’, ‘কালিদাসের নাটক’, ‘জুলিয়াস সীজার’ ইত্যাদি। দ্বিজেন্দ্রনাথের ‘শঙ্করাচার্যের দার্শনিক সিদ্ধান্ত’, ‘কান্টের দর্শন ও বেদান্ত দর্শন’, ‘দ্বৈতবাদ ও অদ্বৈতবাদ’ প্রবন্ধে দার্শনিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ পাওয়া যায়। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের "কুন্দনন্দিনী ও সূর্যমূখী", "মেঘদূত", "বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস", "মুকুন্দরাম চক্রবর্তী" ইত্যাদিতে তাঁর সাহিত্যপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। এক কথায় স্বাদবৈচিত্র্যে ভারতী পত্রিকাটি ছিল অনবদ্য।
বালক
[সম্পাদনা]মাসিক পত্রিকা বালক ১৮৮৫ সালে (১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে) জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত হয়। ঠাকুর পরিবারের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের সাহিত্য রচনায় এবং লেখা প্রকাশে উৎসাহ দানে উদ্দেশ্যে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের লেখার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অন্যান্যদের কিশোরপাঠ্য গদ্য ও পদ্যরচনাও এতে ছাপা হত। রবীন্দ্রনাথই পত্রিকাটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। বালক পত্রিকার তাগিদেই তিনি ছোটোদের জন্য গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও নাটক লিখতে শুরু করেন। প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতা ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ ও গল্প ‘মুকুট’। এরপর আষাঢ় সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর ‘সাত ভাই চম্পা’ কবিতাটি। এই সংখ্যা থেকে ফাল্গুন সংখ্যা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় উপন্যাস রাজর্ষি। এই সময় রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি কৌতুকনাট্যও রচনা করেছিলেন, যেগুলি বালক-এর বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়: রোগের চিকিৎসা (জ্যৈষ্ঠ ১২৯২), পেটে ও পিঠে (আষাঢ় ১২৯২), ছাত্রের পরীক্ষা (শ্রাবণ ১২৯২), অভ্যর্থনা (ভাদ্র ১২৯২), চিন্তাশীল (আশ্বিন-কার্তিক ১২৯২), ভাব ও অভাব (অগ্রহায়ণ ১২৯২), রোগীর বন্ধু (পৌষ ১২৯২), খ্যাতির বিড়ম্বনা (মাঘ ১২৯২), অর্থ ও অনর্থ (ফাল্গুন ১২৯২) ও আর্য ও অনার্য (চৈত্র ১২৯২)। জ্যৈষ্ঠ থেকে চৈত্র সংখ্যা পর্যন্ত ‘চিরঞ্জীবেষু’ ও ‘শ্রীচরণেষু’ শিরোনামে পরিকল্পিত ঠাকুরদা ও নাতির মধ্যে যে পত্রবিনিময় হয়, সেগুলিও রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পিত। দুই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি চিঠিগুলিতে প্রকাশিত। এগুলির পরিকল্পনায় অভিনবত্ব অনস্বীকার্য।
রবীন্দ্রনাথের রচনা ছাড়াও বালক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় রাসকিনের অনুবাদ (অগ্রহায়ণ ও পৌষ ১২৯২), বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধ ও কবিতা (ফাল্গুন ১২৯২), সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা (বৈশাখ ১২৯২) ইত্যাদি প্রকাশিত হয়।
১২৯৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে বালক যুক্ত হয় ভারতী পত্রিকার সঙ্গে।
সাধনা
[সম্পাদনা]১৮৯১ সালে (১২৯৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে) দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় মাসিক সাধনা পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। তবে তিনি ছিলেন নামেই সম্পাদক। রবীন্দ্রনাথই ছিলেন এই পত্রিকার কর্ণধার তথা প্রধান লেখক। প্রথম সংখ্যা থেকে রোজনামচার আকারে লেখা তাঁর আড়াই মাসের বিদেশ ভ্রমণের কাহিনি য়ুরোপযাত্রীর ডায়েরি প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথম সংখ্যা থেকেই এই পত্রিকায় বাংলা সাময়িকপত্র সমালোচনার একটি বিভাগ চালু হয়। ইংল্যান্ডের পত্রপত্রিকা থেকেও নানা ধরনের লেখা অনূদিত হয়ে এতে প্রকাশিত হতে থাকে। সাহিত্য পত্রিকায় চন্দ্রনাথ বসু ‘আহারতত্ত্ব’ নামে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তার প্রতিবাদে সাধনা-র দ্বিতীয় সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘আহার সম্বন্ধে চন্দ্রনাথ বসুর মত’ প্রবন্ধটি। বিতর্ক জমে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি গল্প সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়: ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (অগ্রহায়ণ ১২৯৮), ‘সম্পত্তি-সমর্পণ’ (পৌষ ১২৯৮), ‘দালিয়া’ (মাঘ ১২৯৮), ‘কঙ্কাল’ (ফাল্গুন ১২৯৮), ‘মুক্তির উপায়’ (চৈত্র ১২৯৮), ‘ত্যাগ’ (বৈশাখ ১২৯৯), ‘একরাত্রি’ (জ্যৈষ্ঠ ১২৯৯), ‘একটি আষাঢ়ে গল্প’ (আষাঢ় ১২৯৯), ‘জীবিত ও মৃত’ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১২৯৯), ‘রীতিমতো নভেল’ ও ‘স্বর্ণমৃগ’ (আশ্বিন ১২৯৯), ‘জয়-পরাজয়’ (কার্তিক ১২৯৯), ‘কাবুলিওয়ালা’ (অগ্রহায়ণ ১২৯৯), ‘ছুটি’ (পৌষ ১২৯৯), ‘সুভা’ (মাঘ ১২৯৯), ‘মহামায়া’ (ফাল্গুন ১২৯৯), ‘দান প্রতিদান’ (চৈত্র ১২৯৯), ‘সম্পাদক’ (বৈশাখ ১৩০০), ‘মধ্যবর্তিনী’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩০০), ‘অসম্ভব কথা’ (আষাঢ় ১৩০০), ‘শাস্তি’ (শ্রাবণ ১৩০০), ‘একটি পুরাতন গল্প’ (ভাদ্র ১৩০০), ‘সমাপ্তি’ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩০০) ইত্যাদি।
শব্দতত্ত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আটটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সাধনা পত্রিকায়: ‘নিছনি, ১’ (চৈত্র ১২৯৮), ‘নিছনি, ২’ (চৈত্র ১২৯৯), ‘পঁহু’ (জ্যৈষ্ঠ ১২৯৯), ‘স্বরবর্ণ অ’ (আষাঢ় ১২৯৯), ‘প্রত্যুত্তর: পঁহু-প্রসঙ্গ, ১’ (শ্রাবণ ১২৯৯), ‘স্বরবর্ণ এ’ (কার্তিক ১২৯৯), ‘টা টে টো’ (অগ্রহায়ণ ১২৯৯), ‘প্রত্যুত্তর: পঁহু-প্রসঙ্গ, ২’ (চৈত্র ১২৯৯)। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলা শব্দ ও ছন্দ’ প্রবন্ধটিও প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকায় (শ্রাবণ ১২৯৯)। সাধনা-য় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য প্রবন্ধগুলি হল ‘ডায়ারি’ (মাঘ ১২৯৯ থেকে আশ্বিন-কার্তিক ১৩০০ সংখ্যা, পরবর্তীকালে এই রচনাগুলি পরিবর্তিত নামে পঞ্চভূত সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়), ‘শিক্ষার হেরফের’ (পৌষ ১২৯৯), ‘কর্মের উমেদার’ ও ‘স্ত্রী-মজুর’ (মাঘ ১২৯৯), ‘রাজসিংহ’ (চৈত্র ১৩০০), ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ (বৈশাখ ১৩০১) ইত্যাদি । ‘স্ত্রী-মজুর’ প্রবন্ধটিই সম্ভবত এদেশের স্ত্রী মজুদরদের সমস্যার নিয়ে প্রথম আলোচনা।
সাধনা পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের নাট্যকাব্য চিত্রাঙ্গদা ও প্রহসন গোড়ায় গলদ (ভাদ্র ১২৯৯)। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ব্যঙ্গরচনা পয়সার লাঞ্ছনা (জ্যৈষ্ঠ ১৩০০), প্রাচীন দেবতার নতুন বিপদ (আষাঢ় ১৩০০), অরসিকের স্বর্গপ্রাপ্তি (ভাদ্র ১৩০০) ইত্যাদি।
সাধনা পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলি কবিতাও প্রকাশিত হয়েছিল, যেগুলির মধ্যে ‘সমুদ্রের প্রতি’ (বৈশাখ ১৩০০) ও ‘এবার ফিরাও মোরে’ (চৈত্র ১৩০০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সাধনা-র চতুর্থ বর্ষে (১৩০১-১৩০২ বঙ্গাব্দ) পত্রিকার সম্পাদনার ভার নেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বেশ কয়েকটি কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এই পর্বে। বস্তুত সাধনা-কে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রসাহিত্যে প্রাচুর্য দেখা দেয়।
সাধনা পত্রিকার একটি শক্তিশালী লেখকগোষ্ঠী ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগদানন্দ রায়, উমেশচন্দ্র বটব্যাল, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী প্রমুখ অনেকেই এই পত্রিকায় লিখতেন। জগদানন্দের ‘সাময়িক সার সংগ্রহ’ ও ‘বর্ষণ’ (অগ্রহায়ণ ১৩০০) এবং ‘প্রতীচ্য গণিত’ (আষাঢ় ১৩০১) এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বলেন্দ্রনাথের ‘কালিদাসের চিত্রাঙ্কনী প্রতিভা’, ‘মৃচ্ছকটিক’, ‘উত্তরচরিত’, ‘জয়দেব’, ‘পশুপ্রীতি’, ‘কাব্যে প্রকৃতি’ প্রবন্ধগুলি এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়।
সাধনা পত্রিকাটি ছিল স্বল্পায়ু। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এর মূল্য চিরস্থায়ী।
বঙ্গবাসী
[সম্পাদনা]রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক পত্রিকা বঙ্গবাসী প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালের ১০ ডিসেম্বর (১২৮৮ বঙ্গাব্দের ২৬ অগ্রহায়ণ)। উনিশ শতকের বাংলা যে ধর্মীয় বিতর্কের সূত্রপাত হয়, তাতে কয়েকটি পত্রিকার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আদি ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র তত্ত্বকৌমুদী, নব্য হিন্দুসমাজের মুখপত্র নবজীবন এবং সেই সঙ্গে বঙ্গবাসী-কে কেন্দ্র করে এই ধর্মীয় বিতর্ক তীব্র হয়ে ওঠে।
বঙ্গবাসী-র সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রচন্দ্র বসু। অল্পদিনের মধ্যেই পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেকালে মফস্বলে পত্রিকা বলতে বঙ্গবাসী-কেই বোঝাতো। বঙ্গবাসী ছিল খাঁটি বাঙালিয়ানার পৃষ্ঠপোষক। এই পত্রিকার অধিকাংশ রচনাই ছিল রঙ্গব্যঙ্গাত্মক। সাধারণ পাঠকের কাছে এগুলি ছিল বেশ সহজবোধ্য। যোগেন্দ্রচন্দ্র ছিলেন পত্রিকার অন্যতম লেখক। তাঁর রঙ্গব্যঙ্গাত্মক রচনা দ্বারা পরবর্তীকালে অনুপ্রাণিত হন ইন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। চন্দ্রনাথ বসু ছিলেন এই পত্রিকার আর-এক উল্লেখযোগ্য লেখক। যোগেন্দ্রচন্দ্র ও চন্দ্রনাথ উভয়েই ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রতি বিরূপ। রবীন্দ্রনাথে এঁদের ব্যঙ্গ করে ‘শ্রীমান দামু বসু এবং চামু বসু সম্পাদক সমীপেষু’ নামে একটি কবিতা লেখেন। এটি কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
হিতবাদী
[সম্পাদনা]সাপ্তাহিক পত্রিকা হিতবাদী প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯১ সালের মে মাসে (১৭ জ্যৈষ্ঠ ১২৯৮ বঙ্গাব্দ)। সেই সময় প্রকাশিত অপর দুই সাপ্তাহিক পত্রিকার মধ্যে বঙ্গবাসী ছিল রক্ষণশীল হিন্দুধর্মের প্রচারক এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ থেকে প্রচারিত সঞ্জীবনী যা কিছু পুরনো তারই বিরুদ্ধাচারী। ফলত প্রকৃত সাহিত্যপত্রের অভাব পূরণ করতেই হিতবাদী চালু হয়। পত্রিকার নামকরণ করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই এই পত্রিকার নীতিবাক্য (motto) ঠিক করে দেন “হিতং মনোহারি চ দুর্লভং বচঃ”। প্রধান সম্পাদক হন কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য, সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রাজনীতি বিভাগের সম্পাদক হন মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়। পত্রিকার মূলধন পঁচিশ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়েছিল আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে। এভাবে যৌথ মালিকানায় পত্রিকা প্রকাশ বাংলা সাহিত্যের তথা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে এর আগে দেখা যায়নি।
প্রতি সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথের একটি করে গল্প এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত। এভাবেই প্রকাশিত হয় ‘দেনাপাওনা’, ‘পোষ্টমাস্টার’, ‘গিন্নী’, ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’, ‘ব্যবধান’ ও ‘তারাপ্রসন্নের কীর্তি’। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে হিতবাদী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলির জন্যই। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর রবীন্দ্রজীবনী গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন, “হিতবাদীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক মাস দেড়েকের বেশি ছিল না; কর্মকর্তাদের ফরমাশ হইয়াছিল যে গল্পগুলি আরও লঘুভাবে লিখিলে ভালো হয়। তাঁহারা সাপ্তাহিকের জন্য বোধ হয় হাল্কা গল্প চাহিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ন্যায় আর্টিস্টের পক্ষে ফরমাইশি গল্প লেখা অসম্ভব; অল্পদিনের মধ্যে হিতবাদীর সহিত সম্বন্ধ ছিন্ন হইল।” রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকায় প্রবন্ধও লিখেছেন। তাঁর ‘অকালবিবাহ’ প্রবন্ধটি এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
পরবর্তীকালে পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর বদল ঘটে। ১৮৯৪ সালের ২১ মে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের সম্পাদনায় হিতবাদী পুনরায় প্রকাশিত হয়। ১৯০৭ সালের ৪ জুলাই তাঁর মৃত্যুর পরেও কিছুকাল সখারাম গণেশ দেউস্কর, জলধর সেন প্রমুখের চেষ্টায় পত্রিকাটি চালু ছিল।
জন্মভূমি
[সম্পাদনা]মাসিক পত্রিকা জন্মভূমি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯০-৯১ সালে (পৌষ ১২৯৭)। পত্রিকাটি “বঙ্গবাসীর অধ্যক্ষগণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত” হয়। এঁদের মধ্যে যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুও ছিলেন। পত্রিকাটি ছিল উচ্চ মানের। পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম সংখ্যায় ‘সূচনা’ শিরোনামে লেখা হয়, “আমরা অনেকদিন হইতে একখানি প্রথম শ্রেণীর মাসিকপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করিয়া আসিতেছিলাম—কারণ আমাদের ধ্রুব বিশ্বাস ভাল মাসিকপত্র ব্যতীত লোকশিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। সংবাদপত্রে লোকের অর্দ্ধ শিক্ষা হয়, মাসিকপত্র সে শিক্ষা সম্পূর্ণ করিয়া তুলে। হিন্দুর যাহাতে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়, এই কামনা অন্তরে রাখিয়া, আমরা মাসিকপত্র প্রকাশার্থ প্রথম কল্পনা করি…”
পত্রিকাটির নবম ভাগের প্রথম-চতুর্থ সংখ্যা (পৌষ-চৈত্র ১৩০৫) পর্যন্ত প্রকাশিত হয় বঙ্গবাসী কার্যালয় থেকে। তারপর পত্রিকাটির হাতবদল ঘটে। নবপর্যায়ের বঙ্গবাসী (শ্রাবণ ১৩০৭—আষাঢ় ১৩০৮) প্রকাশ করেন নরেন্দ্র দত্ত।
নবীনচন্দ্র সেনের অমিতাভ কাব্যের অংশবিশেষ ‘বুদ্ধদেব’ নামে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কেদারনাথ চৌধুরীর ছত্রভঙ্গ ও পাণ্ডবনির্বাসন নাটক দুটি এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়। অক্ষয়কুমার বড়ালের ‘সংসারে’, ‘আহ্বান’, ‘প্রার্থনা’ ইত্যাদি কবিতাও এতে প্রকাশিত হয়েছিল।
বামাবোধিনী
[সম্পাদনা]১৮৬৩ সালের মে মাসে প্রথম প্রকাশিত হয় বামাবোধিনী সভার মুখপত্র বামাবোধিনী পত্রিকাটি। স্ত্রীশিক্ষা প্রচারই ছিল এটির মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হত “কন্যায়েবং পালনীয়” শ্লোকাংশটি। নারীসমাজের নানা সমস্যা এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত। ফাল্গুন ১২৭৪ সংখ্যায় লেখা হয়, “বাল্যবিবাহ রীতি এদেশ হইতে নির্ব্বাণ না হইলে সকল চেষ্টাই বিফল হইবে। বঙ্গদেশে এত বিদ্যার গৌরব, প্রতি বর্ষে এত বি.এ. এম.এ. হইতেছে কিন্তু স্ত্রী জাতির দুরবস্থা প্রায় পূর্ববৎই রহিয়াছে। আমাদিগের এই বিষয় কিছুতেই নিরাকৃত হইল না। মূর্খ, কলহপ্রিয় ইন্দ্রিয়পরতন্ত্র এ সুবর্ণমণ্ডিত স্ত্রীর সহবাসে আমাদিগের শিক্ষিত সম্পদায় কিরূপে পরিতৃপ্তি লাভ করেন?”
শুধু পত্রিকা প্রকাশ নয়, স্ত্রীশিক্ষায় উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য পত্রিকাটি মহিলাদের মধ্যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজনও করত। দেশের সমস্ত বালিকা বিদ্যালয়ে পত্রিকাটি বিনামূল্যে প্রেরিত হত।
অন্তঃপুরবাসিনীদের শিক্ষার জন্য পত্রিকাটি একটি সংক্ষিপ্ত পাঠক্রম চালু করতে চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্বামীরা এই পাঠক্রম অনুসরণ করে স্ত্রীদের শিক্ষা দেবে। বামাবোধিনী-র বক্তব্য ছিল, “স্ত্রী ও পুরুষ উভয়কেই লইয়াই জনসমাজ হইয়াছে। অতএব স্ত্রীদের পরিত্যাগ করে কেবল পুরুষদের উন্নতি করিলে তাহাতে জনসমাজের উন্নতি হইবে না… স্ত্রীগণ সকলেই বিদ্যাবতী না হইলে সে দেশের কখনই প্রকৃত মঙ্গল হইবে না ইহা কয়জন ব্যক্তির মনে বিশ্বাস হইয়াছে?” (পৌষ ১২৭২)
মেয়েদের নানা দুরবস্থার প্রতি পত্রিকাটির দৃষ্টি ছিল। ১৮৮২ সালের নভেম্বরে পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, “মুসলমান কুলবালাগণের অবস্থার একটি চিত্র। আমরা মনে করি হিন্দু রমণীরাই পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা দুর্ভাগা। কিন্তু মুসলমান নারীগণের অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করিলে অশ্রুপাত না করিয়া স্থির থাকা যায় না। হিন্দু রমণীগণ অনেকস্থলে ঐহিক সুখে বঞ্চিত হইয়াও পারলৌকিক সদ্গতি লাভের উপায় করিতে পারেন, কিন্তু মুসলমান স্ত্রীলোকদিগের ঐহিক পারত্রিক উভয় পথই কণ্টকাকীর্ণ।”
বধূনির্যাতনের বিরুদ্ধেও অবতীর্ণ হয়েছিল বামাবোধিনী। ১৮৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে ‘বধূ শাসন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, “কলিকাতার কোন ভদ্র গৃহের ১২ বৎসরের একটি পুত্রবধূ একটি সন্দেশ চুরি করিয়া খাইয়াছিল বলিয়া জটিলা শাশুড়ী খুন্তি পোড়াইয়া তাঁহার গাত্রের নানা স্থানে দাগাইয়া দেন। সিয়ালদহের ম্যাজিষ্ট্রেট বাবু রামশঙ্কর সেনের বিচারে এই শাশুড়ীর ৪ মাস কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা অর্থদণ্ড হইয়াছে। শাশুড়ীগণ সতর্ক হউন। সেকালের বউ জ্বালান ধর্ম্ম পালন করিবার এ সময় নয়।”
পত্রিকাকেন্দ্রিক লেখকগোষ্ঠী
[সম্পাদনা]সাহিত্যে গোষ্ঠীচেতনা নিতান্ত আধুনিক কালের ব্যাপার নয়। সব দেশেই সাহিত্য রচনায় দলগঠনের প্রবণতা আছে। বাংলা সাহিত্যে অনুরূপ গোষ্ঠীচেতনা অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে। চর্যাপদ, বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলি এবং বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য রচনায় গোষ্ঠী গঠিত হত। তখন গোষ্ঠীবোধ জাগত ধর্মসম্প্রদায়ের ভিত্তিতে। আধুনিক কালে সাহিত্যিক আদর্শ বা দার্শনিক মতবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দল গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক কালে সাহিত্য রচনায় রাজনৈতিক চেতনাও গুরুত্ব পেয়েছে। উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারায় সাময়িকপত্রকে কেন্দ্র করে লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। গোড়ার দিকে সাংবাদিকতার মাধ্যমেই লেখকগোষ্ঠী তাঁদের মনোভাব ও মত প্রকাশ করতেন। এইভাবে সেই যুগে সংবাদ প্রভাকর, বিদ্যোৎসাহিনী, জ্ঞানাঙ্কুর, বিবিধার্থ সংগ্রহ, বঙ্গদর্শন, বান্ধব, অবোধবন্ধু প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যিকগোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়েছিল।
তত্ত্ববোধিনী গোষ্ঠী
[সম্পাদনা]দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪৩ সালের ১৬ অগস্ট। সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত এবং পৃষ্ঠপোষক ও উপদেষ্টা ছিলেন স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ও তাঁর সহকারী রাজনারায়ণ বসু। ব্রাহ্মধর্ম প্রচারই এই পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। দেবেন্দ্রনাথ ও রাজনারায়ণের ধর্মীয় বক্তৃতা এবং অক্ষয়কুমারের জ্ঞানচর্চামূলক নানা নিবন্ধ এতে প্রকাশিত হত। বাঙালির মনের সংকীর্ণতা দূর করে বুদ্ধিগ্রাহ্য বিশ্ববোধ জাগ্রত করার জন্য অক্ষয়কুমার ও তাঁর অনুগামীরা প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী লেখকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। দেবেন্দ্রনাথ, রাজনারায়ণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ লেখকবৃন্দ বাংলা গদ্যের জড়তা দূর করে, রচনায় বিষয়বৈচিত্র্য এনে রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য সমালোচনা, রম্যরচনা ইত্যাদির প্রকাশে শিক্ষিত বাঙালির বৌদ্ধিক বিকাশের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত রাজেন্দ্রলাল মিত্র ইংল্যান্ডের পেনি ম্যাগাজিন-এর আদলে বাংলা ভাষায় মাসিক পত্রিকা নামে প্রথম সচিত্র মাসিকপত্র প্রকাশ করেন। এই গোষ্ঠীরই দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ প্রকাশ করেন সোমপ্রকাশ। বিদ্যাসাগর এই পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
বঙ্গদর্শন গোষ্ঠী
[সম্পাদনা]১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালির হৃদয় জয় করে নেয়। বাংলা গদ্যের একটি সুন্দর ছাঁদ গড়ে নিয়ে বঙ্গদর্শন গোষ্ঠীর লেখকবৃন্দ বিষয়বৈচিত্র্য ও রসবৈচিত্র্যে বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করে। বঙ্কিমচন্দ্র এই পত্রিকায় নিজের একাধিক উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ব্যঙ্গাত্মক রম্যরচনা প্রকাশ করেন। তাঁর অনুগামী লেখকগোষ্ঠী নানা বিষয় নিয়ে লেখালিখি করে পত্রিকাটির মান উন্নত করে তোলেন। দেশের অতীত ইতিহাস ও প্রাচীন গৌরবের আলোচনায় যাতে বাঙালির আত্মসম্মানবোধ জাগে সেই দিকে লক্ষ্য রেখে বঙ্কিমচন্দ্র এই লেখকগোষ্ঠীকে চালনা করতেন। রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, রামদাস সেন, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বঙ্গদর্শন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন শক্তিশালী লেখক। রাজকৃষ্ণ ও প্রফুল্লচন্দ্র সাহিত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করতেন। রামদাস ও হরপ্রসাদ আলোচনা করতেন প্রত্নতত্ত্ব। সাহিত্য সমালোচনাও প্রকাশিত হত নিয়মিত। প্রবন্ধসাহিত্যে বাংলা গদ্যের সমুন্নতি এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই সম্ভাবিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের অসুস্থতায় তাঁর অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র কিছুদিন বঙ্গদর্শন সম্পাদনা করেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ যখন এই পত্রিকা সম্পাদনার ভার নেন, তখন এর নাম হয় নবপর্যায় বঙ্গদর্শন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্গদর্শন একটি বিরাট স্তম্ভস্বরূপ।
ভারতী ও সাধনা গোষ্ঠী
[সম্পাদনা]ভারতী পত্রিকার পরিকল্পনা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ১৮৭৯ সালে রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথের সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার লেখকগোষ্ঠীতে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার বড়াল, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, শরৎকুমারী দেবী, কেশবচন্দ্র সেন, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ। বাংলা কাব্যের স্বর্ণযুগ এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। এই পত্রিকার অনুষঙ্গী রূপে ১৮৯১ সালে সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাধনা পত্রিকা। পরে রবীন্দ্রনাথ নিজে এটির সম্পাদনার ভার নেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির পথে যে-সব মূল্যবান উপকরণের জোগান দিয়েছিল, তার মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই দুই পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথ সাধনা-কে তাঁর “হাতের কুঠার” বলতেন। সাহিত্যের কমনীয় মূর্তি তিনি এই পত্রিকার মাধ্যমেই গড়েছিলেন। ভারতী ও সাধনা বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রযুগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। বাংলা সাহিত্যে যত বিচিত্র প্রকাশকলা উদ্ভাবিত হয়েছে, তার অধিকাংশই এই দুই পত্রিকাকে অবলম্বন করে সূচিত হয়েছিল। তাই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পর্যালোচনায় ভারতী ও সাধনা গোষ্ঠীর প্রসঙ্গ অপরিহার্য।
অবদান
[সম্পাদনা]বাংলা গদ্যের বিকাশে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের অবদান অনস্বীকার্য। গদ্যভাষাকে সুশৃঙ্খল, সুসংযত ও সর্বপ্রকার ভাব বহনের উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রগুলি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। খ্রিস্টান মিশনারিদের দিগ্দর্শন, সমাচারদর্পণ থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর প্রভৃতি সংবাদপত্র বাংলা গদ্যকে মার্জিত, শ্রুতিমধুর, সুখপাঠ্য ও সহজবোধ্য করার কাজ নিপুণভাবে করেছে এবং এখনও করছে। গদ্যভাষার শক্তিসঞ্চারের কাজে সংবাদপত্রগুলির এই ভূমিকা নিতান্ত তুচ্ছ নয়। সংবাদপত্র প্রকাশের আগে মিশনারিরা বাইবেলের অনুবাদে ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজে যে গদ্যভাষা ব্যবহার করতেন, তাতে সৌন্দর্য তো দূরের কথা, গুরুতর অন্বয়গত ত্রুটির জন্য বক্তব্যকে সুষ্ঠুভাবে প্রকাশের ক্ষমতাও ছিল না। গদ্যভাষার সেই আড়ষ্টতা কেটে যায় এবং ভাষার প্রবাহ স্বচ্ছ ও সাবলীল হয়ে ওঠে সংবাদপত্রের মাধ্যমে। সাংবাদিকেরাই প্রথম বাংলা গদ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন।
১৮১৮ সালে বাংলা ভাষায় সাময়িকপত্রের সূচনা। প্রথমে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন ও ধর্মীয় বিতর্ক চলত। সমাজ সংস্কারের নানা প্রস্তাব এবং পরস্পরের প্রতি দোষারোপের জন্য গদ্যভাষাকে কিছুটা ঘষামাজা করে নিতে হত। মিশনারিদের সমাচারদর্পণ, রাজা রামমোহন রায়ের সম্বাদকৌমুদী ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমাচার চন্দ্রিকা নানা মতবাদের ভিত্তিতে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে বাংলা গদ্যের প্রকাশভঙ্গিকে ক্রমশ উন্নত করে তোলে। ক্রমে এই সব পত্রপত্রিকায় জ্ঞানগর্ভ নিবন্ধ ও মৌলিক রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। পশ্বাবলী, বঙ্গদূত, সংবাদ-তিমিরনাশক, জ্ঞানান্বেষণ, বিজ্ঞান সেবধি প্রভৃতি নানা শ্রেণির সাময়িকপত্র গদ্যানুশীলন করে বাংলা গদ্যের অন্তর্নিহিত শক্তির প্রমাণ তুলে ধরে। ক্রমে বিভিন্ন পত্রপত্রিকাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যিকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে এবং মৌলিক সাহিত্য রচনার অভিনব উপকরণে বাংলা গদ্যের ভাণ্ডার পূর্ণ হতে শুরু করে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় সংবাদ প্রভাকর প্রকাশের পরই সাহিত্যিকগোষ্ঠী গদ্যসাহিত্য রচনায় তৎপর হন। ১৮৩৯ সালে এটি প্রথম বাংলা দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর সম্পাদক কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত একাধারে সাহিত্যসেবী ও সাংবাদিক রূপে বাংলা গদ্যের সাহিত্যিক ঐতিহ্য সৃষ্টি করেন।
পত্রপত্রিকার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের বিভিন্ন শৈলী ও বিষয়বস্তুর বিস্তার ঘটতে থাকে। গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ, রম্যরচনা, তত্ত্বালোচনা ও সাহিত্য গবেষণার নানা দিক সাংবাদিকেরা তুলে ধরেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনা, সমাজ সংস্কার, সাহিত্যচর্চা ও শিক্ষাপ্রসারের মন দিয়েছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভা সক্রিয় হতে পেরেছিল। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-কে কেন্দ্র করে বাংলা গদ্যের একটি গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গি, যাকে সাধুভাষার ছাঁচ বলা যায়, তা গড়ে ওঠে। বিদ্যাসাগরও এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এই পত্রিকার স্তম্ভ স্বরূপ ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত। দার্শনিক চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক মননশীলতা বাংলা গদ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-য় অক্ষয়কুমার ও রাজনারায়ণ বসু বাংলা গদ্যকে শালীনতা ও সৌষ্ঠবে মণ্ডিত করেছিলেন। বাংলা চলিত রীতির গদ্যভাষার প্রবর্তন ও কথাসাহিত্য রচনায় বাংলা গদ্যের ব্যবহারকৌশল দেখিয়েছিলেন মাসিক পত্রিকা-র সম্পাদক প্যারীচাঁদ মিত্র। টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে তিনি আলালের ঘরের দুলাল লিখে বাংলা গদ্যকে নতুন পথে চালিত করেন। বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকার সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোম প্যাঁচার নক্সা লিখে বাংলা গদ্যের চলিত রীতির সাহিত্যিক উপযোগিতা প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলা গদ্যভাষা শৈল্পিক সুষমায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে বঙ্কিমচন্দ্রের বিস্ময়কর প্রতিভায়। বঙ্গদর্শন প্রতিষ্ঠা করে এবং সেই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক সাহিত্যিকগোষ্ঠী নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা গদ্যসাহিত্যকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের স্তরে উন্নীত করে দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলি বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত হয়। তাঁর অনুপ্রেরণায় সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা গদ্যকে উন্নতির শীর্ষে তুলে ধরেন। সাধারণী, নবজীবন, প্রচার প্রভৃতি পত্রিকাতেও এই গোষ্ঠীর লেখকেরা গদ্যভাষাকে শিল্পিত রূপ প্রদানের কাজে নিযুক্ত থাকেন।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে কয়েকটি উৎকৃষ্ট সাময়িকপত্রের উদ্ভব ঘটেছিল। আত্মনিষ্ঠ রচনায় কাব্যগুণসম্পন্ন গদ্যরীতির উদ্ভাবনা এগুলিতেই। এগুলির মধ্যে সাধনা, ভারতী, বালক প্রভৃতি পত্রিকার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। আবার সঞ্জীবনী, বঙ্গবাসী, হিতবাদী, সাহিত্য ইত্যাদি পত্রিকা, রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় নবপর্যায় বঙ্গদর্শন এবং আরও অনেক পত্রিকার দানও উল্লেখযোগ্য। সবশেষে প্রমথ চৌধুরী সবুজ পত্র প্রতিষ্ঠা করে চলিত গদ্যরীতির মাধ্যমে উচ্চতর মানসিকতা প্রকাশের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন। বাংলা সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রের সুদীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশের প্রত্যেকটি স্তরে পত্রপত্রিকা একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।