বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/উনিশ শতকের মহিলা কবিগণ

উইকিবই থেকে

উনিশ শতক নানা দিক থেকেই ছিল বাঙালির নবজাগরণের যুগ। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে এই যুগে যে প্রভূত আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তার ঢেউ প্রবেশ করে বাঙালির অন্তঃপুরেও। কবি ও সাংবাদিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় বহু মহিলা কবির রচনা প্রকাশ করে বাংলার নারীসমাজকে কবিতা রচনায় উৎসাহিত করেছিলেন। শিক্ষিত বাঙালির মনের আবেগ যখন অন্তর্মুখী গীতিকবিতার মাধ্যমে মুক্তিলাভ করতে শুরু করেছিল, তখন শিক্ষিতা মহিলারাও কবিতা রচনায় এগিয়ে এলেন। গীতিকবির বৈশিষ্ট্যসূচক প্রতিভা হয়তো সকলের ছিল না, কিন্তু অন্তরের অনুভূতিকে ছন্দে গেঁথে প্রকাশের চেষ্টায় তাঁদের উদ্যম ছিল প্রশংসনীয়। মহিলা কবিরা গার্হস্থ্য জীবনের অনুভূতি, স্নেহ, প্রেম ও বাৎসল্যবোধকে অবলম্বন করে কবিতা লিখতেন; তাঁদের হৃদয়াবেগ প্রকাশ পেত দেশপ্রেম, ঈশ্বরভক্তি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনার ক্ষেত্রেও। তাঁদের কেউ কেউ বিশেষ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। কয়েকজন কবির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করলেই সেকালের মহিলা কবিদের কাব্যধারার স্বরূপটি প্রকাশিত হবে।

মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়

[সম্পাদনা]

মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪৮—১৯৩০) কাব্যগ্রন্থ বনকুসুম প্রকাশিত হয় ১৮৮২ সালে। তিনি বৈষ্ণব কবিতার প্রভাবে প্রেমের কবিতাই বেশি লিখেছেন; কিন্তু গার্হস্থ্য প্রেমের সীমা অতিক্রম করে প্রেমের কোনও রসলোক নির্মাণে সক্ষম হননি। ‘প্রোষিতভর্তৃকা’, ‘স্বাধীনভর্তৃকা’, ‘মিলনে’, ‘বিরহে’ প্রভৃতি কবিতায় লোকোত্তর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে না পারলেও এগুলিতে বাঙালি গৃহবধূর হৃদয়াবেগ যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘প্রোষিতভর্তৃকা’-য় যখন মোক্ষদায়িনী বলেছেন,

সে হল সাহেব আমি যে বাঙালী
আর কিলো আছে আশা,
লয়ে ইংরাজিনী করিবে সঙ্গিনী
ভুলে যাবে ভালোবাসা।

তখন সেখানে বিলেতপ্রবাসী স্বামী সম্পর্কে আশঙ্কার মনোভাব বিশ্বের বিরহিণীর বেদনা হতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু বাঙালি বধূর মনোবেদনা অকৃত্রিম সরল ও সুন্দর ভাষায় ফুটে উঠেছে। মনে রাখতে হবে, সেই যুগের অধিকাংশ মহিলা কবির লেখা এই ধরনেরই ছিল।

স্বর্ণকুমারী দেবী

[সম্পাদনা]

রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৭—১৯৩২) কবিতা ও গান (১৮৯৫) নামে কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন। তাঁর কবিতাগুলির সংগীতধর্ম অপূর্ব। তিনি দাম্পত্য প্রেম ও দেশপ্রেমের অনেক কবিতা লিখেছেন। প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা রচনাতেও তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর "শ্রাবণ" শীর্ষক কবিতাটিতে বর্ষণমুখর শ্রাবণসন্ধ্যার একটি চমৎকার রূপ প্রকটিত হয়েছে। এর মধ্যে কবির ব্যক্তিমনের ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষাও ফুটে উঠেছে:

সখি, নব শ্রাবণ মাস!
জলদ ঘনঘটা দিবসে সাঁঝছটা
ঝুপ ঝুপ ঝরিছে আকাশ।

গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী

[সম্পাদনা]

উনিশ শতকের মহিলা কবিদের মধ্যে কবিতার উৎকর্ষের বিচারে গিরীন্দ্রমোহিনী দাসীর (১৮৫৮—১৯২৪) রচনাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অশ্রুকণা (১৮৮৭), আভাস (১৮৯০) ও অর্ঘ্য (১৯০২) তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম। অর্ঘ্য গ্রন্থে তিনি প্রথম শ্রেণির কাব্যকলার পরিচয় দিয়েছেন। নরনারীর প্রেমের প্রভেদ-তত্ত্ব গিরীন্দ্রমোহিনী একটি কবিতায় প্রকাশ করে বলেছেন,

তুমি ভালবাস রূপগৌরব
সুকোমল তনু শিরিষ পেলব
বিম্ববরণ অধর-পল্লব
নয়নের সুধামাখা বিষ;
আমি ভালবাসি, চিত্ত আমারি
তৃপ্ত তাহাতে অহর্নিশ।

প্রেমিকা নারীর হৃদয়ানুভূতিকে গিরিন্দ্রমোহিনী ইঙ্গিতপূর্ণ করে তোলার উপযুক্ত কাব্যভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। ‘বেলা যায়’ শীর্ষক কবিতায় তিনি বিষাদিনীর উদাস দৃষ্টির গূঢ় তাৎপর্য প্রকাশ করেছেন:

ও গো অনিমেষে, কি দেখিছ মুখে
চেয়ো না অমন করিয়া;
আছে দুইখানি প্লাবনের মেঘ
এই আঁখি কোণ ভরিয়া।

গিরীন্দ্রমোহিনী দেশাত্মবোধক কবিতাও অনেক লিখেছেন। তাঁর স্বদেশিনী (১৯০৬) কাব্যে ‘শিবাজী উৎসব’, ‘ঋণশোধ’ প্রভৃতি কবিতার আবেগ প্রশংসনীয়। প্রকৃতির সৌন্দর্যরূপ অঙ্কনেও কবির দক্ষতা ছিল। শিখা (১৮৯৬) কাব্যগ্রন্থে ‘সন্ধ্যায়’ শীর্ষক কবিতায় তিনি সমাসোক্তি অলংকারে সন্ধ্যার একটি অপূর্ব নারীমূর্তি রচনা করেছেন:

উজ্জ্বল সীমন্তমণি শোভিত শিরসে,
ধীরে ধীরে মৃদুপদে সন্ধ্যা নেমে আসে;
নিবিড়-তিমির-কেশ-চুম্বিত-চরণা,
ধূসর-অম্বরাবৃতা আনত-নয়না।

গিরীন্দ্রমোহিনীর ভাষাভঙ্গি, কল্পনাশক্তি ও হৃদয়ানুভূতিতে উৎকৃষ্ট গীতিকবিতার মৌলিক লক্ষণগুলি পরিস্ফূট।

মানকুমারী বসু

[সম্পাদনা]

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভ্রাতুষ্পুত্রী মানকুমারী বসু (১৮৬৩—১৯৪৩) কবি হিসেবে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। প্রিয় প্রসঙ্গ (১৮৮৪) ও কাব্যকুসুমাঞ্জলি (১৮৯৩) তাঁর কবিতার শ্রেষ্ঠ সংকলন। গার্হস্থ্য জীবনকে কেন্দ্র করেই তাঁর অধিকাংশ রচনা। দাম্পত্য প্রেম, ভ্রাতৃপ্রীতি, বাৎসল্যবোধ প্রভৃতি পারিবারিক সম্পর্কের মধুময় রূপ তিনি কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা রূপে ‘শিরিষকুসুম’ ও ‘বৌ কথা কও’ উৎকৃষ্ট গীতিকবিতা। তাঁর অধিকাংশ কবিতায় ব্যক্তিজীবনের ছায়া পড়ায় রোম্যান্টিক কারুণ্য প্রকাশ পেয়েছে। মহাভারতে উল্লিখিত সপ্তরথী কর্তৃক অভিমন্যু বধের কাহিনি অবলম্বনে তিনি বীরকুমার বধ (১৯০৪) নামে একটি আখ্যানকাব্য রচনা করেন। তবে এই কাব্যটি জনপ্রিয় হয়নি।

কামিনী রায়

[সম্পাদনা]

মহিলা কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি লাভ করেছিলেন সুশিক্ষিতা কবি কামিনী রায় (১৮৬৪—১৯৩৩)। ইংরেজি লিরিকের আদর্শে নানা বিষয়ে গীতিকবিতা রচনা করে তাঁর কাব্যের পরিমণ্ডল বাড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য-সংকলন পৌরাণিকী (১৮৮৩), আলো ও ছায়া (১৮৮৯), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), অশোক সঙ্গীত (১৯১৪), দীপ ও ধূপ (১৯২৯)। কামিনী রায়ের অধিকাংশ কবিতায় তাঁর ব্যক্তিজীবনের বেদনানুভূতি কাব্যের ভাষায় অনুপ্রবেশ করে রোম্যান্টিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে। প্রেমের কবিতায় তিনি প্রেমকে মহিমান্বিত রূপ দান করেছেন, এর মধ্যে মরণজয়ী শক্তির সন্ধান পেয়েছেন। তিনি প্রেম সম্পর্কে বলেন, “আনন্দ সে, আসক্তি-বিহীন শুদ্ধ ঘন অনুরাগ।” তাঁর বিখ্যাত ‘চন্দ্রাপীড়ের জাগরণ’ নামক কবিতাটি প্রেমের প্রাণশক্তিকে অভিনন্দিত করে লেখা। প্রেমের এই শক্তি দ্বারাই তিনি দেশকে ভালোবেসেছেন, জীবনের আদর্শের সন্ধান পেয়েছেন। “পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি', এ জীবন মন সকলই দাও”—এই ছিল তাঁর নীতি। ‘মাতৃপূজা’ নামক কবিতায় তিনি জন্মভূমিকে “মা আমার, মা আমার” বলে দেশের সেবায় সর্বশক্তি নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিষয়ের বৈচিত্র্যে, ভাষার শ্রুতিমধুর সারল্যে, অনুভূতির অকৃত্রিমতায় বাংলা গীতিকাব্যের ইতিহাসে কবি কামিনী রায় বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী।

সরোজকুমারী দেবী

[সম্পাদনা]

সরোজকুমারী দেবী (১৮৭৫—১৯২৬) ছিলেন আশাবাদী কবি। তবু তিনি হাসি ও অশ্রু (১৮৯৪) নামক কাব্যগ্রন্থে প্রেমের দুঃখের বহু ছবি এঁকেছেন। তাঁর মূল বক্তব্য "দুরাকাঙ্ক্ষা" নামে সনেটে প্রকাশিত:

জীবনের দুরাশা শুধু, মিটিবে না হায়,
আশায় আপনাহারা প্রাণ তবু চায়!

তাঁর সনেটগুলিতে প্রখর জীবনবোধের বলিষ্ঠ প্রকাশ আছে। তিনি প্রেমের কবিতা রচনায় ব্রজবুলি ভাষারও ব্যবহার করেছেন। প্রেমের অতীন্দ্রিয় ব্যঞ্জনা ফোটাতে না পারলেও তিনি হৃদয়ের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলিকে সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করে গীতিকবিতার লাবণ্য সঞ্চারে সক্ষম হয়েছিলেন।

অন্যান্য মহিলা কবিগণ

[সম্পাদনা]

উনিশ শতকে আরও অনেক মহিলা কবি গীতিকাব্য রচনায় কুশলতা দেখিয়েছিলেন। ব্যাপক প্রচারের অভাবে সাধারণ্যে পঠিত ও আলোচিত না হলেও ইতিহাসের দৃষ্টিতে তাঁরা উপেক্ষণীয় নন। লজ্জাবতী বসু, প্রমীলা নাগ, বিনয়কুমারী ধর, নগেন্দ্রবালা মুস্তাফী, সরমাসুন্দরী ঘোষ, মৃণালিনী সেন, বিরাজমোহিনী দাসী প্রমুখ অনেক কবি আদর্শায়িত প্রেম, গার্হস্থ্য জীবনের ছবি, প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করে নিজেদের ব্যক্তিজীবনের আনন্দ-বেদনার অনুভূতি গভীর আন্তরিকতায় প্রকাশ করেছেন। রূপকর্মে বা কাব্যকলার প্রসাধনে তাঁরা হয়তো প্রথম শ্রেণির কবির দক্ষতা দেখাতে পারেননি, কিন্তু নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, অনুভূতির অকৃত্রিমতা ও প্রকাশের সারল্যে পুরুষের তুলনায় তাঁদের কাব্যপ্রচেষ্টা নিকৃষ্ট হয়নি।