বিষয়বস্তুতে চলুন

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/উনিশ শতকের মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্য

উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে ও বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়, বাংলার ইতিহাসে তা নবজাগরণ নামে পরিচিত। এই নবজাগরণের প্রথম উল্লেখযোগ্য ফসল ফলেছিল বাংলা কাব্যের ভূমিতে। বাঙালির মানসিক মুক্তি ঘটেছিল মহাকাব্য, আখ্যানকাব্য ও গীতিকাব্যে। কয়েকজন বিস্ময়কর প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে এই নবযুগের সূচনা ঘটে। অমৃতলাল বসু লিখেছেন, “জাহাজ মেরামত করার ডকের জন্য খিদিরপুর প্রসিদ্ধ, কিন্তু এখানে একসময়ে বড় বড় কয়েকখানি জাহাজ প্রস্তুত হইয়াছিল। তাহাদের প্রধান তিনখানির নাম রঙ্গলাল, মধুসূদন ও হেমচন্দ্র। ঐ তিনখানি জাহাজই যে ছোটবড় তরঙ্গ তুলিয়া চলিয়া গিয়াছে তাহার আন্দোলনের আজিও সমগ্র বঙ্গদেশ দুলিতেছে।” বাংলা কাব্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে উনিশ শতকে ছোটো বড়ো তরঙ্গ তুলেছিল আখ্যানকাব্য, গীতিকাব্য ও মহাকাব্য।

আখ্যানকাব্যের বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

সাহিত্য রচনার প্রচেষ্টার প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি Narrative poem-এর আদর্শে রচিত হয় আখ্যানকাব্য। এই ধরনের কাব্যে কোনও ঐতিহাসিক বা কাল্পনিক কাহিনি অবলম্বন করে হৃদয়াবেগ-প্রধান ভাবধারাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। দেশের জন্য আত্মত্যাগ, সতীত্ব রক্ষায় প্রাণবিসর্জন, প্রেমের জন্য দুঃখবরণ, স্বাধীনতার জন্য ত্যাগস্বীকার প্রভৃতি কোনও লৌকিক ভাব অবলম্বন করে বীর ও করুণ রসাত্মক কাহিনিকে ছন্দোবদ্ধ ভঙ্গিতে প্রকাশ করাই আখ্যানকাব্যের বৈশিষ্ট্য। হেমচন্দ্র, রঙ্গলাল প্রমুখ কবিরা আখ্যানকাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

এই যুগের মহাকাব্য সংস্কৃত মহাকাব্যের আদর্শে রচিত হয়নি, হয়েছে ইংরেজি Literary Epic বা Epic of Art-এর আদর্শে। যে যুগে আখ্যানকাব্য রচনার উপক্রম চলছিল, সেই যুগেই মহাকবি মধুসূদনের প্রতিভায় পাশ্চাত্য আদর্শে মহাকাব্য রচনার প্রেরণা জাগে। সাময়িক আবেগ মহাকাব্যের বিষয় নয়, প্রসিদ্ধ ইতিহাস বা পুরাণ অবলম্বনে একটি বিশাল কাহিনি এর উপজীব্য। একটি মহৎ শাশ্বত নীতির দ্বারা চালিত হয়ে মহাকবি জাতির জীবনবেদ রচনা করেন। মানুষের গগনচুম্বী আকাঙ্ক্ষার, জীবনপ্রয়াসের দুরন্ত অভীপ্সা, অপরাজেয় প্রাণশক্তির দুর্জয় ঐশ্বর্য মহাকাব্যের মধ্যে রূপায়িত হয়। কাহিনির বিশালতা, কল্পনার সমুন্নতি, বর্ণনার চমৎকারিত্ব, ছন্দ ও অলংকারের বৈচিত্র্য মহিমান্বিত মহাকাব্য রচনার মূল্যবান উপকরণ।

মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্য রচনার প্রয়াস

[সম্পাদনা]

বাঙালি জাতির মানসে মহাকাব্যের উপযুক্ত মহিমাবোধ না থাকায় উনিশ শতকের নবজাগরণে উন্নত মহাকাব্য রচিত হয়নি। মধুসূদন নবযুগের মহাকাব্য রচনার ভিত্তি রচনা করেছিলেন এবং হেমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্র তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। আরও কয়েকজন কবি মহাকাব্য রচনার সাজসজ্জা করে আসরে নেমেছিলেন, কিন্তু বিপুল বিশাল বাহিনীকে সুসংহত করে নিখুঁত বস্তুধর্মী করে তুলতে না পারায় তাঁদের মহাকাব্য রচনার প্রয়াস আখ্যানকাব্যেই পর্যবসিত হয়েছে। তাঁদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, জীবনচেতনা, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদি ঐতিহাসিক ও রোম্যান্টিক কাহিনির মধ্যে আবেগপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে, যাকে Epic Solidarity বলে, তা রক্ষিত হতে পারেনি। সুতরাং এই যুগে অধিকাংশ কবির রচনাই আখ্যানকাব্য বা গাথাকাব্যে পর্যবসিত হয়েছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাকাব্য

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষায় সার্থক মহাকাব্য রচনা করেছিলেন একমাত্র মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ১৮৬০ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকায় তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য-এর প্রথম দুটি সর্গ প্রকাশিত হওয়ার পর বাঙালি পাঠক মহলে সাড়া পড়ে যায়। অমিত্রাক্ষর ছন্দের অভিনবত্বে, অলংকার প্রয়োগের চাতুর্যে ও কল্পনার নতুনত্বে সমৃদ্ধ এই মহাকাব্যটি উনিশ শতকে বাংলা কাব্যসাহিত্যে মহাকাব্য রচনার সূত্রপাত ঘটায়। এর পরের বছরই হোমারের ইলিয়াড ও অন্যান্য অনেক মহাকাব্যকে স্মরণে রেখে রামায়ণের মেঘনাদ হত্যার কাহিনি অবলম্বনে নয় সর্গে সম্পূর্ণ মেঘনাদবধ কাব্য রচনা করেন মধুসূদন। এই কাব্যটি মহাকাব্য কল্পনার চরম অভিব্যক্তি। মধুসূদনের ব্যক্তিজীবনের দুঃখ-কষ্ট ও হাহাকার এর মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠলেও উন্নত স্তরের মহাকাব্যের প্রধান লক্ষণগুলিও এই কাব্যে পরিস্ফুট। এটিই বাংলা ভাষায় রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য।

হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্য

[সম্পাদনা]

মধুসূদনের অনুকরণে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন বৃত্রসংহার কাব্য। এই কাব্যে দানবদের স্বর্গজয়, স্বর্গ উদ্ধারের জন্য দধীচির অস্থি প্রদান, অধর্মের ফলে বৃত্রের সর্বনাশকে কেন্দ্র করে যে বিশাল ও মহিমান্বিত পৌরাণিক কাহিনিটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যথার্থ মহাকাব্যের উপযুক্ত বিষয় এবং কাব্যে বর্ণনার সংহতিও প্রশংসনীয়। কিন্তু মেঘনাদবধ কাব্য-এর তুলনায় এটি দুর্বল রচনা। কারও মতে এটি Heroic tale মাত্র, কেউ বা বলেছেন এর নাম বৃত্রসংহার না হয়ে ঐন্দ্রিলা পরাভব হলেই যথার্থ হত। অনেক মহৎ নীতিকথা, বড়ো বড়ো যুদ্ধ ও প্রকৃতির বর্ণনা উল্লেখযোগ্য হলেও হেমচন্দ্রের কবিপ্রতিভায় মহাকাব্য রচনার উপযোগী কবিত্বশক্তি ছিল না; মহাকাব্যের ভাষাভঙ্গি ও বাঙ্‌নির্মিতিও তিনি আয়ত্ত করতে পারেননি। তিনি ছিলেন মূলত আবেগপ্রধান গীতিকবি। গীতিকবিতা ও লঘু চালের বৈঠকী কবিতায় তাঁর পারদর্শিতার বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু আখ্যানকাব্য রচনায় তাঁর কবিত্বশক্তি কিছুটা প্রশংসনীয়। কাল্পনিক ইতিহাসের পটভূমিতে তিনি একটি দেশাত্মবোধক আখ্যানকাব্য রচনা করেন, নাম বীরবাহু কাব্য (১৮৬৪)। দান্তের Divina Commedia অনুসরণে তিনি ছায়াময়ী নামে একটি কাব্য লিখেছিলেন। কিন্তু রূপককাব্য রচনায় তিনি দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেননি। তাঁর দশমহাবিদ্যা রূপককাব্যটিতে পৌরাণিক কাহিনির যে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তা রীতিমতো হাস্যকর।

নবীনচন্দ্র সেনের মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্য

[সম্পাদনা]

উনিশ শতকে বাংলা মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্যের ইতিহাসে নবীনচন্দ্র সেন একটি স্মরণীয় নাম। সমকালীন মহাকাব্য রচনার প্রবণতার স্রোতে গা ভাসিয়ে মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে তিনি রচনা করলেন ত্রয়ী মহাকাব্য: রৈবতক (১৮৮৭), কুরুক্ষেত্র (১৮৯৩) ও প্রভাস (১৮৯৭)। রৈবতক-এ সুভদ্রা ও অর্জুনের বিবাহ, কুরুক্ষেত্র-এ অভিমন্যুবধ এবং প্রভাস-এ যদুবংশ ধ্বংস ও কৃষ্ণের দেহত্যাগ বর্ণিত হয়েছে। কৃষ্ণই এই ত্রয়ী মহাকাব্যের নায়ক। এর মধ্যে নানা উপকাহিনিও যুক্ত হয়েছে। জরুৎকারু, শৈলজা, দুর্বাসা, বাসুকি প্রভৃতি নানা চরিত্র ও ঘটনার মধ্যে দিয়ে কাহিনি শাখায়িত হয়ে বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু উনিশ শতকের নব্য মানবতাবোধ ও পাশ্চাত্য দর্শনের অভিনব চিন্তাধারাকে ভারতীয় সংস্কারের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে নবীনচন্দ্র মহাকাব্যোচিত রসনিষ্পত্তি করতে পারেননি। তাঁর মধ্যে সংযম ও সামঞ্জস্যবোধের অভাব ছিল। তাঁর তিনটি কাব্যই গীতিকাব্যের মনোভাব দ্বারা চালিত পৌরাণিক আখ্যানকাব্য হিসেবে এগুলি কিছুটা সার্থক হলেও মহাকাব্য হিসেবে একেবারেই ব্যর্থ।

হেমচন্দ্রের বীরবাহু কাব্য প্রকাশের পর কিছুকালের জন্য বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। নবীনচন্দ্রও সেইরকম রচনা করেছিলেন পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫), ক্লিয়োপেট্রা (১৮৭৭), রঙ্গমতী (১৮৮০) নামক বর্ণনামূলক আখ্যানকাব্যগুলি। পলাশীর যুদ্ধ ঐতিহাসিক কাহিনি অবলম্বনে দেশাত্মবোধক কাব্য। ক্লিয়োপেট্রা কাব্যে তিনি দ্বিচারিণী ক্লিওপেট্রাকে অসতী বলে শাস্তি দেননি, বরং ব্যর্থ প্রেমাকাঙ্ক্ষাকে করুণ রসে জারিত করে পাঠকহৃদয়ে সঞ্চারিত করেছেন। আবার চট্টগ্রামের রাঙামাটি অঞ্চলের একটি লৌকিক কাহিনিকে ইতিহাসের সঙ্গে মিশিয়ে প্রণয়মূলক আখ্যানকাব্য রচনা করেছেন রঙ্গমতী-তে। তাঁর অমিতাভ, খৃষ্ট, অমৃতাভ যথাক্রমা গৌতম বুদ্ধ, যিশু খ্রিস্ট ও চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনকথা হলেও আখ্যানরসের মাধুর্যে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

বাংলা মহাকাব্যের পরিণতি

[সম্পাদনা]

বস্তুত মহাকাব্য রচনার উদ্যম ও প্রয়াস এই যুগে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছিল। একমাত্র মধুসূদনের কলমেই মহাকাব্যের যথার্থ স্বরূপ ক্ষণিকের জন্য উজ্জ্বল হয়ে চিরকালের জন্য অস্তমিত হয়। মহাকাব্য রচনার অন্যান্য প্রয়াসগুলি বাঙালি সমাজে কোনও চিহ্নই রেখে যেতে পারেনি; বর্তমানে সেগুলি গবেষকদের অনুসন্ধানের বিষয় মাত্র। দীননাথ ধরের কংসবিনাশ, বলদেব পালিতের কর্ণার্জুন, মহেন্দ্র শর্মার নিবাতকবচ বধ, হরগোবিন্দের রাবণবধ, যোগীন বসুর পৃথ্বীরাজ অলংকারশাস্ত্রসম্মত মহাকাব্য রচনার প্রয়াস হলেও এগুলির সঙ্গে বাঙালি পাঠকের আর কোনও পরিচয়ই নেই। এতেই বোঝা যায় যে, মহাকাব্য রচনার শক্তির যেমন অভাব ছিল, তেমনই মহাকাব্য পাঠের আগ্রহও বিশেষ ছিল না। বরং উপন্যাস সাহিত্যের উত্থানের অব্যবহিত আগে রোম্যান্টিক আখ্যানকাব্যের জন্য বাঙালি পাঠকদের মধ্যে কিঞ্চিৎ আগ্রহ দেখা গিয়েছিল।

বাংলা আখ্যানকাব্যের পরিণতি

[সম্পাদনা]

বিশুদ্ধ আখ্যানকাব্য রচনা করে খ্যাতির অর্জন করেছিলেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী। তাঁর উদাসিনী কাব্য একদা জনপ্রিয় হয়েছিল। সরলা ও সুরেন্দ্র এই দুই তরুণ-তরুণীর প্রেমজীবনের ঘাতপ্রতিঘাতের বৈচিত্র্য কাব্যটিকে রোম্যান্টিক রসে অভিসিঞ্চিত করেছে। ঈশানচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যোগেশ কাব্য রচনা করে মনস্তত্ত্বমূলক একটি উপন্যাস-কাহিনিকে রোম্যান্টিক আখ্যানকাব্যের রূপ দিয়েছিলেন। বিবাহিত যুবক যোগেশ মন্দাকিনী নাম্নী এক বিবাহিতা তরুণীর প্রতি প্রচণ্ড কামাসক্ত হয়ে সমাজ-সংসার, ধর্ম, কর্তব্য সব বিস্মৃত হয় এবং আত্মদমনের প্রবল প্রয়াসে বিপর্যস্ত তরুণ শেষপর্যন্ত আত্মহত্যার করে মানসিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটায়। এই করুণ কাহিনিটি লেখকের জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফল বলে এতে অকৃত্রিম আবেগ সঞ্চারিত হয়েছে। করুণরসাত্মক আখ্যানকাব্য রূপে কল্পনাপ্রবণ পাঠকসমাজে এটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। কিন্তু আখ্যানকাব্যও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়িত্ব লাভ করেনি। গীতিকাব্যের আকর্ষণ ও উপন্যাস ধারার ক্রমোন্নতির ফলে মহাকাব্য ও আখ্যানকাব্যের ধারা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।