আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০—১৮৯১) নবজাগ্রত বাংলায় সমাজ সংস্কার ও শিক্ষাবিস্তারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি সাহিত্যিক খ্যাতি অর্জনের জন্য লেখনী ধারণ করেননি, তবু বাংলা গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অসাধারণ মেধা ও অপূর্ব কর্মনিষ্ঠা তাঁকে জাতির জীবনে অমরত্ব প্রদান করেছে। ব্রাহ্মণ পরিবারে জাত সংস্কৃতজ্ঞ এই পণ্ডিতেরা মনে রক্ষণশীলতার লেশমাত্র ছিল না। বরং সেকালের সব কটি প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সমাজ সংস্কার ও শিক্ষার প্রসারের অঙ্গ হিসেবেই তিনি বাংলা গদ্যের চর্চা করেছিলেন এবং সেই চর্চার মাধ্যমেই পরবর্তীকালে তিনি আখ্যাত হয়েছিলেন ‘বাংলা গদ্যের জনক’ হিসেবে।
অনুবাদ সাহিত্য
[সম্পাদনা]বিদ্যাসাগর অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই শিক্ষামূলক, শিশুপাঠ্য এবং সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষা থেকে অনূদিত। শোনা যায়, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপনা করার সময় ১৮৪৭ সালে ভাগবতপুরাণে কথিত কৃষ্ণলীলা অবলম্বনে তিনি রচনা করেন বাসুদেব চরিত। সেই বছরই হিন্দি বেতাল পচ্চিসি অবলম্বনে তিনি রচনা করেন বেতাল পঞ্চবিংশতি। নিজের হিন্দি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান যাচাই করতেই তিনি সংস্কৃত গ্রন্থের অনুসরণ করেননি এই রচনায়। ১৮৫৪ সালে কালিদাসের অভিজ্ঞানশাকুন্তলম্ অবলম্বনে তিনি রচনা করেন শকুন্তলা। ১৮৬০ সালে ভবভূতির নাটক উত্তররামচরিত ও বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ড অবলম্বনে তিনি রচনা করেন সীতার বনবাস। এরপর ১৮৬৯ সালে উইলিয়াম শেকসপিয়রের দ্য কমেডি অফ এররস অবলম্বনে বিদ্যাসাগর রচনা করেন ভ্রান্তিবিলাস। এই তিনটিই তাঁর শ্রেষ্ঠ অনুবাদমূলক রচনা।
১৮৪৮ সালে জন ক্লার্ক মার্শম্যান রচিত আউটলাইনস অফ দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল অবলম্বনে তিনি রচনা করেন বাঙ্গালার ইতিহাস। ১৮৪৯ সালে চেম্বারসের বায়োগ্রাফিজ অবলম্বনে বিদ্যাসাগর রচনা করেন জীবনচরিত। চেম্বারসেরই রুডিমেন্টস অফ নলেজ অবলম্বনে ১৮৫১ সালে তিনি রচনা করেন বোধোদয়। বিদ্যাসাগরের কথামালা (১৮৫৬) ইশপের রূপকথার গল্প অবলম্বনে লেখা।
সাহিত্যের ভিত্তি গঠনের জন্য এবং গদ্যভাষাকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য বিদ্যাসাগর অনুবাদকর্মকেই সেকালের পক্ষে হিতকর মনে করেছিলেন এবং এই কাজে তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয়ও দিয়েছিলেন।
মৌলিক রচনা
[সম্পাদনা]শিক্ষাবিস্তার ও সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনে বিদ্যাসাগর কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। এই রচনাগুলি প্রধানত প্রবন্ধ-জাতীয়। বাংলা সাধু গদ্যের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠার সূচনা এই গ্রন্থগুলির মাধ্যমেই ঘটেছিল বলা যায়।
১৮৫৩ সালে তিনি সাহিত্যের ইতিহাস রচনার সূত্রপাত ঘটান সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব গ্রন্থটি রচনা করে। ভারতীয় ভাষার সাহিত্যের ইতিহাস রচনার এটিই প্রথম প্রচেষ্টা। সংস্কার-বিরোধী পণ্ডিতদের প্রতিবাদের উত্তরে তিনি রচনা করেন বিধবা বিবাহ চলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (প্রথম পুস্তক জানুয়ারি, ১৮৫৫; দ্বিতীয় পুস্তক অক্টোবর, ১৮৫৫) এবং বহু বিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (প্রথম পুস্তক ১৮৭১, দ্বিতীয় পুস্তক ১৮৭৩)। গ্রন্থ দুটির দীর্ঘ শিরোনাম বক্তব্যকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়। দুটি গ্রন্থই তাঁর মনীষা, হৃদয়বত্তা ও যুক্তিবিন্যাসের ক্ষমতার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। প্রবন্ধসাহিত্যে ভাষার স্পষ্টতা যে কতটা প্রয়োজন বিদ্যাসাগরের এই দুই গ্রন্থই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
মননশীল প্রবন্ধ ছাড়াও আবেগপূর্ণ অথবা কৌতুকাবহ রচনাতেও বিদ্যাসাগর বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বন্ধুর বালিকা কন্যার মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে তিনি রচনা করেছিলেন প্রভাবতী সম্ভাষণ (সম্ভবত ১৮৬৩)। সামাজিক বিতর্কের ক্ষেত্রে তারানাথ তর্কবাচস্পতি প্রমুখ পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে তিনি ছদ্মনামে লেখনী ধারণ করেছিলেন। ১৮৭৩ সালে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে বিধবাবিবাহ-বিরোধী পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে তিনি রচনা করেন অতি অল্প হইল ও আবার অতি অল্প হইল। ১৮৮৪ সালে বিধবাবিবাহের বিরুদ্ধে ব্রজনাথ বিদ্যারত্নের রচনার প্রত্যুত্তরে ‘কবিকুলতিলকস্য কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামে রচনা করেন ব্রজবিলাস, যৎকিঞ্চিৎ অপূর্ব্ব মহাকাব্য। ১৮৮৬ সালে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য’ ছদ্মনামে রচনা করেন রত্নপরীক্ষা। এই ব্যঙ্গরচনাগুলি সম্পর্কে কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য বলেছেন, “এরূপ উচ্চ অঙ্গের রসিকতা বাংলা ভাষায় অতি অল্পই আছে।” শেষ জীবনে রচিত আত্মচরিত প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর।
বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতির বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]বিদ্যাসাগরের রচনারীতির সবচেয়ে বড়ো গুণ অন্বয়ের সৌন্দর্য ও প্রাঞ্জলতা। উচ্ছৃঙ্খল গদ্যভাষাকে সুসংহত করে সুষমাময় করে তোলার জন্য রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের ভূয়ষী প্রসংসা করেছেন। গদ্যের মধ্যেও যে ছন্দ থাকে, বাক্যাংশ বিন্যাসের কৌশলে এবং যথাস্থানে বিরামচিহ্ন দিয়ে পাঠ করলে বাংলা গদ্য যে ধ্বনিঝংকারে সুশ্রাব্য ও সহজবোধ্য হয়ে হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠতে পারে, বিদ্যাসাগরের রচনা তা প্রমাণ করে গিয়েছে। তাই তিনি গদ্যরচনাকে শুধু মননশীলতার ক্ষেত্রে আবদ্ধ না রেখে হৃদয়ের সুকুমার অনুভূতি প্রকাশেরও উপযোগী করে তুলেছিলেন। বাংলা কথাসাহিত্য ও রম্যরচনার বিকাশে বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতির অবদান তাই অনস্বীকার্য।
‘বাংলা গদ্যের জনক’
[সম্পাদনা]বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক মনে করা হয়। যদিও বাংলা গদ্য ভাষা উনিশ শতকের প্রারম্ভেই খ্রিস্টান মিশনারি, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকবৃন্দ ও রাজা রামমোহন রায়ের হাতে অঙ্কুরিত হয়ে উঠেছিল। সেই হিসেবে উক্ত শতকের মধ্যভাগের লেখক হিসেবে বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা যায় না। তবু বাংলা গদ্যের একটি বিশেষ রীতি তাঁরই উদ্ভাবিত। এই রীতিটিই পরবর্তীকালে সাধু গদ্যভাষার আদর্শ রূপে পরিণত হয় এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে তা অনুসরণ করেছিলেন। বিদ্যাসাগর সযত্নে বাংলা গদ্যের যে শৈলীটির মধ্যে যৌবনশক্তি সঞ্চারিত করেছিলেন তা পরবর্তীকালে বাংলা গদ্যরীতির একটি আদর্শ রূপে পরিণত হয়। তাঁর পূর্ববর্তী লেখকেরা বাংলা গদ্যের ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠা করলেও, বিদ্যাসাগরই প্রথম তার উপর সাহিত্যের অনিন্দ্যসুন্দর হর্ম্য নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই হিসেবে তাঁকে ‘বাংলা গদ্যের জনক’ বলা অযৌক্তিক নয়।