আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/আধুনিক যুগের সূত্রপাত
উনিশ শতকের ঊষালগ্নে যখন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত, তখনই বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূত্রপাত ঘটেছিল। ইউরোপীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি ও চিন্তাপ্রণালীর সাহায্যেই এই নতুন যুগের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে ইতালির রেনেসাঁ যেভাবে ইংরেজি সাহিত্যকে নতুন পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছিল, ঠিক সেভাবেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাঙালির রুদ্ধ মানসিকতার অর্গল উন্মোচিত করে আধুনিকতার সূর্যালোক নিয়ে এসেছিল বাংলা সাহিত্যে। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের প্রতিষ্ঠা, তার কিছুকাল পরে ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্টা প্রভৃতির ফলে শিক্ষিত বাঙালির মানসিকতায় যে পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে, তারই প্রতিফলনে বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের আবির্ভাব। মধ্যযুগের শেষ কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (১৭১২—১৭৬০) পলাশীর যুদ্ধের তিন বছর পর প্রয়াত হন। তারপর ইংরেজ বণিক-প্রভুদের শাসনের বাংলায় এক আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটেনি। ঐতিহাসিক আলোচনার সুবিধার্থে সাহিত্যের ইতিহাসকারেরা ১৮০০ সালটিকেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের কালসীমা হিসেবে নির্দেশ করেন। এই যুগটি ছিল খ্রিস্টান মিশনারি ও ‘কালেজী’ পণ্ডিত-মুন্সিদের গদ্যরচনার প্রথম প্রয়াসের যুগ; এই যুগেই বাংলা কাব্য কবিওয়ালাদের গান থেকে উত্তীর্ণ হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের অধিকতর গাম্ভীর্যপূর্ণ কবিতায়। আরও কিছুকাল পরে রাজা রামমোহন রায়ের বিস্ময়কর প্রতিভা একদিকে বাংলার সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম ও সাহিত্যকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দিল, অন্যদিকে হিন্দু কলেজের একদল প্রতিবাদী ছাত্র ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে বিদ্রোহ ঘোষণা করল যা কিছু পুরাতন, যা কিছু সনাতন সেই সব কিছুর বিরুদ্ধে। একদিকে রক্ষণশীল সমাজপতিদের গোঁড়ামি, অন্যদিকে মধ্যপন্থী ও চরমপন্থী আধুনিকতাবাদীদের বিদ্রোহ—এই দুইয়ের ভাবদ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটন উনিশ শতকের প্রথম পাদে আর সেই দ্বন্দ্বের পরম লগ্নেই বাংলা সাহিত্য দীক্ষিত হল আধুনিকতার নবধর্মে।
আধুনিকতার লক্ষণ
[সম্পাদনা]আধুনিক সাহিত্যের কয়েকটি বিশেষ লক্ষণ উনিশ শতকের প্রথম ভাগেই বাংলা সাহিত্যের মধ্যে দেখা দিয়েছিল। মধ্যযুগীয় দেববিশ্বাস ও ভক্তিবাদ, কুসংস্কার ও সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নিষ্ক্রিয় ঔদাসীন্য পরিহার করেই নবযুগের প্রাথমিক যাত্রার সূচনা। রাজা রামমোহন রায় পৌত্তলিক হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করে বৈদিক সাহিত্যের পুনর্বিচার ও নবতর ব্যাখ্যায় আত্মনিয়োগ করলেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রাচীনতা ও আধুনিকতার মধ্যে খানিক দোদুল্যমান থাকলেও সমাজ সংস্কার ও যুক্তিবাদের ভিত্তিতে চিন্তাশীল বাঙালিকে আত্মস্থ হওয়ার উপদেশ দিলেন এবং সেই সঙ্গে প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে করলেন সচেতন। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের প্রচেষ্টায় ও তাঁদের অনুসরণে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটল। সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রের মাধ্যমে প্রসার ঘটল যুক্তি ও বিচারমূলক গদ্যরুচনার এবং জাতীয়তাবাদের জ্বলন্ত অনুভূতিতে শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে সাহিত্যের নানা আঙ্গিকে তীব্র সংস্কার-কামিতা প্রকাশিত হল। কাব্যে, গদ্যরচনায়, নাটকে, নাট্যাভিনয়ে ও সংগীতের বৈচিত্র্যে বাংলা সাহিত্যে হঠাৎ যেন কোটালের বান ডাকল। এরই ফলে এই যুগের সাহিত্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ উঠল ফুটে।
মানবতাবোধ
[সম্পাদনা]মানুষের মহিমায় বিশ্বাস ও মানবতাবোধই আধুনিক যুগের প্রধান লক্ষণ। মানুষ দেবতার হাতের পুতুল নয়, তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মহিমাবোধ আছে—এইরকম একটি বিশ্বাসের বশে নবযুগের সাহিত্যে মানুষই প্রাধান্য পেল। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে এবং রোসাঙ্ রাজসভার সাহিত্যে মানুষকে মুখ্য স্থান দেওয়ার একটা সুপ্ত অভিপ্রায় লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু উনিশ শতকে এসেই মানুষের ঐহিক ও নৈতিক শক্তি আহরণের জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচিত করা হয়েছিল। তাই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের রচনা থেকে শুরু করে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা সর্বত্রই প্রধান হয়ে উঠেছিল মানুষের কাহিনি।
জাতীয়তাবোধ
[সম্পাদনা]এই যুগের দ্বিতীয় অথচ বিশেষ উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হল প্রখর জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম। বাঙালির মধ্যে স্বদেশচেতনা সঞ্চারিত হওয়ায় একদিকে যেমন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা স্পৃহা জেগে ওঠে, অপরদিকে তেমনই প্রাচীন ঐতিহ্যের গৌরবময় অধ্যায় বাঙালির কাছে তুলে ধরে জাতি হিসেবে বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আয়োজন করা হয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, রাজা রামমোহন রায়, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মনীষীরা জাতীয়তাবোধের উল্লেখযোগ্য পরিচয় তাঁদের রচনায় ফুটিয়ে তোলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু ও নবগোপাল মিত্র প্রমুখের প্রচেষ্টা ও ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকাও এক্ষেত্রে নিতান্ত কম ছিল না।
বৈজ্ঞানিক চেতনা ও যুক্তিবাদ
[সম্পাদনা]বৈজ্ঞানিক চেতনা ও যুক্তিনির্ভরতা এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। গদ্যসাহিত্যের সৃষ্টি ও ধর্মীয় বাদানুবাদ এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষ অন্ধবিশ্বাসে কিছুই মেনে নেবে না, বিজ্ঞান ও যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেবে—এই মনোভাব এই যুগেই গড়ে উঠেছিল। এরই ফলে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারমূলক বহু রচনায় বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। একদিকে যেমন বহু প্রবন্ধ রচিত হয়, অপর দিকে কাব্যসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য ও কথাসাহিত্যও আধুনিকতাকে সাদরে বরণ করে নেয়। অন্ধসংস্কারের যবনিকা উন্মোচিত হওয়ায় মানুষের মনে যে প্রবল জীবনজিজ্ঞাসা জাগে তারই চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছে এই যুগের সাহিত্যে।
আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ
[সম্পাদনা]ইংরেজ আগমনের পরেই বাংলা সাহিত্যে নবযুগের সূচনা। ইংরেজ শাসন-বিধির প্রত্যক্ষ প্রভাবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ঘটেনি, তা ঘটা সম্ভবও নয়; কিন্তু ইংরেজ শাসনের সঙ্গে সঙ্গে যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটে তা আমাদের এক নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং তারই ফলস্বরূপ বাংলায় গদ্যসাহিত্যের আবির্ভাব ত্বরান্বিত হয়, কাব্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় এবং রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাট্যসাহিত্যের গতি অবাধ হয়ে ওঠে। ১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের অবসান ঘটে। এরপর যে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি কলকাতা মহানগরীকে কেন্দ্র করে ক্রমবিকাশ লাভ করে, তা বাংলা সাহিত্য থেকে ভক্তিবাদ ও অলৌকিকতা-কেন্দ্রিক সাহিত্যরচনার অবসান ঘটায়। গদ্যসাহিত্যে তথা নবোদ্গত কথাসাহিত্যের অঙ্কুরে ধ্বনিত হয় মানুষের পদধ্বনি; ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কাব্যে শোনা যায় মানুষের জয়গাথা এবং কলকাতার সংস্কৃতিবান নাগরিকেরা পাশ্চাত্য আদর্শের আধুনিক নাট্যসাহিত্যের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। এইভাবেই গদ্যে, পদ্যে ও নাটকে বাংলা সাহিত্যে শুরু হয় সমৃদ্ধির নতুন পর্যায়।
গদ্যসাহিত্য
[সম্পাদনা]বাংলা গদ্যসাহিত্যকেই নতুন যুগের প্রথম অবদান বলা যায়। উনিশ শতকের আগেও চিঠিপথে ও দলিল-দস্তাবেজে কিছু বাংলা গদ্য ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু গদ্যের ব্যাপক চর্চা শুরু হয় এই যুগেই। খ্রিস্টান মিশনারিরা ধর্মপ্রচার ও জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যে গদ্যচর্চা করেছিলেন। ইংরেজ কর্মচারীদের বাংলা শেখানোর জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হলে অনেকগুলি গদ্যগ্রন্থ রচিত হয় পাঠ্যপুস্তক হিসেবে। এর ফলে এমন এক গদ্যরীতি গড়ে ওঠে, যার মধ্যে বাঙালি ভাবকল্পনা ও মননশীলতা প্রকাশের এক অভিনব মাধ্যম আবিষ্কার করে। জ্ঞানচর্চামূলক সাহিত্য রচনার প্রেরণাতেই গদ্যসাহিত্যের বিকাশ। এই সাহিত্যকে পরিপুষ্ট করার উপায় হিসেবে দেখা দেয় সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রপত্রিকাগুলি। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ লেখক জাতীয় ভাবের অনুপ্রেরণায় সমৃদ্ধ গদ্যসাহিত্য গড়ে তোলেন।
কথাসাহিত্য
[সম্পাদনা]গদ্যসাহিত্য শুধু মননশীল প্রবন্ধরচনার মধ্যেই সীমায়িত থাকেনি। হৃদয়ের সুকুমার ভাব ও কল্পনাসমৃদ্ধি প্রকাশের বাহন রূপে গদ্যভাষার প্রয়োজনীয়তা যখন অনুভূত হল, তখন বাংলা গদ্যরীতি সুনিয়ন্ত্রিত রূপ পরিগ্রহ করায় কল্পনামূলক কথাসাহিত্য সৃষ্টিরও অপূর্ব সুযোগ উপস্থিত হয়েছিল। প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র দত্ত, তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ কথাশিল্পী গল্প, উপন্যাস, নকশা-চিত্র ও রম্যরচনায় বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার পূর্ণ করতে লাগলেন। নতুন যুগ বাংলা গদ্যসাহিত্যের জন্য নতুন দিগন্তের স্বর্ণদ্বার খুলে দিল।
কাব্যসাহিত্য
[সম্পাদনা]বাংলা কাব্যসাহিত্যেও নতুন ধারা প্রবর্তিত হয় এই যুগে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মধ্যে আভাসে ও ইঙ্গিতে যার সূচনা, মহাকবি মধুসূদনের মধ্যে তার পূর্ণ প্রকাশ। পুরোনো কাব্যের দেবদেবীরা বিদায় না নিলেও নতুন যুগের কবির কল্পনায় তাঁদের চরিত্র গড়ে উঠল অন্য এক আদর্শে। খ্রিস্টধর্ম, পাশ্চাত্য দর্শন ও একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে পৌত্তলিক হিন্দুধর্মের প্রতি শিক্ষিত বাঙালির অনাস্থায় পুরাণের দেবদেবী ও চরিত্রেরা নতুন রূপ পরিগ্রহ করলেন। তাই মধুসূদনের রাবণ নরখাদক রাক্ষস নন, বীর্যবান সম্রাট ও কর্তব্যনিষ্ঠ প্রজাপালক। তাঁর কাব্যে দেবতারা ষড়যন্ত্রকারী এবং বিদেশি কর্তৃক আক্রান্ত রাজ্য রক্ষার জন্য স্বদেশপ্রেমিক রাক্ষসেরা প্রকাশ্য যুদ্ধে বীরের সদ্গতি লাভ করে। হেমচন্দ্রের দেবতাদের জন্মভূমি শত্রুকবলিত হওয়ায় তাঁরা পাতালে সংঘবদ্ধ হন এবং মাতৃভূমি উদ্ধারের জন্য সর্বস্ব পণ করেন। নবীনচন্দ্রের কৃষ্ণ গ্যারিবল্ডি, কাভুর, বিসমার্কের মতো এক ধর্ম, এক রাজ্য, এক সিংহাসন স্থাপন করতে উদ্যত। এইভাবে নতুন যুগ পৌরাণিক কালের নতুন তাৎপর্য উদ্ভাবন করেছিল। গীতিকাব্যের বিকাশেও আত্মনিষ্ঠ মন্ময়তা ও রোম্যান্টিক আবেগ প্রকাশ পেতে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত গীতিকাব্যের দ্বার উন্মোচিত করে দিলেন। গীতিকাব্যের বিষয়ব্যাপকতা সৃষ্টি হল। মানব, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, সামাজিক প্রথা প্রভৃতি বহু বিষয় গীতিকাব্যের অন্তর্ভুক্ত হল। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী আত্মনিষ্ঠ রোম্যান্টিক গীতিকবিতার মাধ্যমে কবিমনের সূক্ষ্ম সুকুমার অনুভূতিগুলি প্রকাশ করতে লাগলেন। গীতিকাব্যের ধারাও উচ্ছলিত হয়ে উঠল।
নাট্যসাহিত্য
[সম্পাদনা]নতুন যুগে বাংলা সাহিত্যে আরেকটি অভিনব সৃষ্টি হল নাটক। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে পয়ার ও ত্রিপদীর একটানা স্রোতে জীবনধর্মী নাট্যসাহিত্যের উন্মেষের সম্ভাবনা ছিল না। ইংরেজি প্রভাব বাংলা নাট্যসাহিত্যকেও ত্বরান্বিত করেছিল। হেরাসিম লেবেদফ নামে এক রুশ নাট্যকারের প্রচেষ্টায় কলকাতায় রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশীয় অভিনেতাদের সাহায্যে নাট্যাভিনয় শুরু হয়। তাতে উৎসাহিত হয়ে বাঙালি লেখকেরা প্রথমে ইংরেজি ও সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ করতে থাকেন। ইউরোপীয় নাট্যাদর্শে মৌলিক নাটক রচনার প্রয়াসও দেখা যায়। যোগেন্দ্র গুপ্তের কীর্তিবিলাস ও তারাচরণ শিকদারের ভদ্রার্জুন নাটক এই দিকের প্রথম প্রচেষ্টা। হরচন্দ্র ঘোষ উইলিয়াম শেকসপিয়রের নাটকগুলি অনুবাদ করতে থাকেন এবং রামনারায়ণ তর্করত্ন সখের থিয়েটারের চাহিদা অনুযায়ী সংস্কৃত নাটকের বঙ্গানুবাদ করেন। কালীপ্রসন্ন সিংহও ছিলেন এই বিষয়ে অন্যতম উৎসাহদাতা। এই সূত্রে বাংলায় বাস্তবধর্মী নাটকেরও সূত্রপাত হয়। বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ, কৌলীন্য প্রথা ইত্যাদি সামাজিক বিষয় অবলম্বন করে বাস্তবধর্মী নাটকের পদক্ষেপে বাংলা রঙ্গমঞ্চ সচকিত হয়ে ওঠে।
মূল্যায়ন
[সম্পাদনা]নবযুগের চেতনা এইভাবে কাব্যে, গদ্যশিল্পে, কথাসাহিত্যে, নাটকে নানা ভাবে ও ভঙ্গিতে প্রকাশ পেতে থাকে। চিন্তার ক্ষেত্রে যেমন বিপ্লব দেখা দেয়, আঙ্গিক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নানা অভিনবত্ব প্রকাশ পেতে থাকে।