আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/আধুনিক বাংলা নাটকের উদ্ভব
পূর্ববাহিনী গঙ্গা ও পশ্চিমবাহিনী নর্মদার যুক্তবেণী যদি সম্ভবপর হত, তবে তা আধুনিক বাংলা নাটকের উৎপত্তির একটি সুন্দর উপমা হতে পারত। বস্তুত আধুনিক নাটকের বহিরঙ্গে পাশ্চাত্য প্রভাব যেমন সুস্পষ্ট, অন্তরঙ্গে দেশীয় ঐতিহ্যের ভাবাবেগ-জনিত তরঙ্গোচ্ছ্বাসও তেমনই প্রবল। এর আঙ্গিক ইংরেজি নাটক থেকে গৃহীত, কিন্তু প্রাণবস্তু পূর্বপ্রবহমান যাত্রা বা গীতাভিনয় থেকে আহৃত। সুতরাং বাংলা নাটকের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রাচীন যাত্রা ও আধুনিক পাশ্চাত্য নাটকের প্রভাব উভয়ের আলোচনাই অপরিহার্য।
যাত্রার আদিরূপ
[সম্পাদনা]যাত্রার একটি আদিরূপ নিশ্চিতভাবেই বিদ্যমান ছিল, এমন ধারণা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সেই রূপ সংস্কৃত নাটকেরই অনুবর্তন কিনা এমন প্রশ্ন ওঠা সঙ্গত। প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে সংস্কৃত নাটকের প্রচলন ছিল। কিন্তু তা ছিল রাজদরবারের বস্তু, বিদগ্ধজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু যাত্রার পিছনে আছে লোকনাট্যের ঐতিহ্য, তার ক্ষেত্রও অনেকটাই বিস্তৃত। তাছাড়া বাংলা ভাষার উদ্ভবও হয়েছে অনেক পরে, এই ভাষার বয়স মোটামুটি এক হাজার বছর মাত্র। চর্যাপদে ‘নাটক’ শব্দটির একটি ক্ষীণ আভাস পাওয়া যায়। প্রাক্-চৈতন্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যেই সর্বপ্রথম ‘নাট’ শব্দটির পাওয়া যায়। কাব্যটিকে কয়েকটি পালার সমষ্টি বলা যায়। এর গানগুলির মধ্যেও সংলাপের প্রভাব লক্ষণীয়। কৃষ্ণ, রাধা, বড়ায়ির চরিত্রও গীতাভিনয়ের চরিত্রের ছাঁদেই গড়া হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, প্রাচীনকালে বাংলায় যাত্রার ধরনে নাটগীতের অভিনয় হত। দুই, তিন বা ততোধিক পাত্রপাত্রীর গীতের সাহায্যে অনুরূপ কথোপকথন বা অঙ্গভঙ্গি করে পৌরাণিক কাহিনি, বিশেষত কৃষ্ণকথার অভিনয় করত। এমন অভিনয়ের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় চৈতন্যযুগে অর্থাৎ ষোড়শ শতকের একেবারে গোড়ায়। চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর মেসোমশাই চন্দ্রশেখর আচার্যের গৃহে রুম্নিণীহরণ অভিনয় করেছিলেন। তাতে নৃত্য ও গীতেরই প্রাধান্য ছিল। অনুমান করা যায়, সংলাপ যা ছিল তা পদ্যেই ছিল, গদ্যে নয়। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে ‘কৃষ্ণযাত্রা’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই অভিনয়ের প্রভাবেই পরবর্তীকালে রচিত হয় রূপ গোস্বামীর বিদগ্ধমাধব ও ললিতমাধব এবং কবি কর্ণপূরের চৈতন্যচন্দ্রোদয় নামক সংস্কৃত নাটকগুলি।
মধ্যযুগে নাট্যরস পরিবেশনের প্রয়াস
[সম্পাদনা]মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যগুলি ছিল প্রধানত আখ্যানকাব্য। এগুলি সাধারণত পাঠ করা হত না, বরং মন্দিরা, মৃদঙ্গ, নূপুর সহযোগে গীত হত। কাহিনির অন্তর্গত চরিত্রগুলির মধ্যে নাট্যগুণের অভাব ছিল না। অতএব অনুমান করা যায়, গাইবার সময় আঙ্গিক অভিব্যক্তির মাধ্যমেই কিছুটা নাট্যরস পরিবেশনের চেষ্টাও করা হত।
যাত্রা
[সম্পাদনা]এইভাবে পৌরাণিক কাহিনির ভিত্তিতে যে কৃষ্ণযাত্রার আরম্ভ হয়েছিল, উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত তার ধারা প্রায় অব্যাহত ছিল। অবশ্য যাত্রা যে কেবল কৃষ্ণ-বিষয়কই ছিল তা নয়, ‘চণ্ডীযাত্রা’, ‘শিবযাত্রা’, ‘মনসার ভাসান যাত্রা’ প্রভৃতির উল্লেখও পাওয়া যায়। গোড়ায় ‘যাত্রা’ বলতে দেবপূজা উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রা অথবা নাটগীতকেই বোঝাত। কৃষ্ণযাত্রার মধ্যে কালীয়দমন পালা অধিক জনপ্রিয় ছিল বলে কৃষ্ণযাত্রার নামান্তর হয় কালীয়দমন যাত্রা বা কালীয়দমন। কৃষ্ণযাত্রায় যাঁরা কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে আবির্ভূত বীরভূম জেলার পরমানন্দ অধিকারী, শ্রীদাম অধিকারী, সুদাম অধিকারী, লোচন অধিকারী, কাটোয়ার পীতাম্বর অধিকারী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ইতিমধ্যে বাঁধা যাত্রাপালার উদ্ভব ঘটে। বাঁধা যাত্রাপালায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন কৃষ্ণনগরের গোবিন্দ অধিকারী ও কৃষ্ণকমল গোস্বামী। তার আগেই ভারতচন্দ্রের প্রভাবে জনমানসে এক ধরনের রুচিবিকৃতি ঘটেছিল। মানুষের কাহিনি নিয়ে বিদ্যাসুন্দর যাত্রার উদ্ভব এরই ফলশ্রুতি। এই সময়ে গোপাল উড়ের যাত্রাই ছিল প্রসিদ্ধ। কৃষ্ণকমল এরই মধ্যে কৃষ্ণযাত্রাকে কিছুটা উঁচু সুরে বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে গানেরই প্রাধান্য ছিল। এইজন্য যাত্রাকে এখনও ‘যাত্রাগান’ নামে অভিহিত করা হয়।
নতুন যাত্রাপদ্ধতি ও গীতাভিনয়
[সম্পাদনা]ইতিমধ্যে এদেশে ইংরেজি শিক্ষার হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। ইংরেজি আদর্শে কলকাতায় থিয়েটার ও নাটকের অভিনয়ও প্রচলিত হয়েছিল ততদিনে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যাত্রাপদ্ধতির পরিবর্তনেরও প্রয়োজন দেখা দিল। মনোমোহন বসু, ব্রজমোহন রায়, মতিলাল রায়, নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সুকণ্ঠ গায়ক ও বাঁধনদারের প্রচেষ্টায় ইংরেজি আদর্শের নাটকের সঙ্গে কথকতা-ভঙ্গির বক্তৃতা এবং যাত্রা ও পাঁচালি-পদ্ধতির ভক্তিরসাত্মক গান জুড়ে দিয়ে নতুন যাত্রাপদ্ধতি উদ্ভূত হল। অবশ্য এগুলিতে বক্তৃতা থাকলেও গানের প্রাধান্য যথেষ্টই ছিল। এই কারণে এইরকম সংগীত-প্রধান পালাগানকে বলা হত ‘গীতাভিনয়’। আধুনিক কালেও যাত্রাপালার এই গীতাভিনয় নামটি বহুল প্রচলিত।
যাত্রাপালা এবং মির্যাকল প্লে ও মর্যালিটি প্লে
[সম্পাদনা]পূর্বেই বলা হয়েছে, যাত্রাগান প্রধানত দেবমাহাত্ম্য-বর্ণনাকারী নৃত্যগীত। মধ্যযুগীয় ইউরোপে মির্যাকল প্লে (Miracle Plays) ও মর্যালিটি প্লে (Morality Plays) নামে ধর্মীয় নাট্যাভিনয়ও ছিল ঈশ্বর-মাহাত্ম্যমূলক। অবশ্য যাত্রার সঙ্গে এগুলির কিছু পার্থক্যও আছে। যাত্রা গীতিপ্রধান এবং মির্যাকল ও মর্যালিটি প্লে সংলাপ ও অভিনয়-প্রধান। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে, আধুনিক পাশ্চাত্য নাটকের সঙ্গে যখন মির্যাকল ও মর্যালিটি প্লে-র সম্পর্ক বিশেষভাবে স্বীকৃত, সেক্ষেত্রে এদেশে শুধুমাত্র যাত্রা থেকেই কেন আধুনিক নাট্যকলার উদ্ভব হল না। এর উত্তরে বলতে হয়, নাটক সর্বদাই মঞ্চের অপেক্ষা রাখে এবং আধুনিক নাট্যমঞ্চ ইংরেজের আগমনের পূর্বে এদেশে অজানা ছিল। অধিকন্তু যে সামাজিক পরিবেশে আধুনিক নাটক সৃষ্টি সম্ভব, ইংরেজ আমলের পূর্বে বাংলায় সেই পরিবেশের অভাব ছিল। যে কর্মচঞ্চল ব্যক্তিচরিত্র নাট্যকলার মূল উপাদান, ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘাতেই এখানে তার স্ফূরণ ঘটেছিল।
ইংরেজি নাট্যশালার আদর্শ ও বাংলা নাটক
[সম্পাদনা]অষ্টাদশ শতকের শেষভাগেই এদেশে ইংরেজি নাট্যশালার স্থাপিত হয়। উনিশ শতকে যখন বাঙালির নবজাগরণ ঘটে, তখন তারা ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হয়। সেই সূত্রে শেকসপিয়র, মলিয়ের প্রমুখের সঙ্গেও তাদের পরিচয় ঘটে। তারপর পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীতে রচিত নাটকের অভিনয় দেখার পর কৃষ্ণযাত্রা বা গীতাভিনয় আর তাদের রসপিপাসা নিবৃত্ত করতে পারল না। শিক্ষিত বাঙালি তাই পাশ্চাত্য আদর্শে নাট্যরচনায় প্রবৃত্ত হল। রামনারায়ণ তর্করত্ন, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও দীনবন্ধু মিত্র সেই প্রয়াসেরই ফল। এইভাবে নাটক বলতে আমরা আজ যা বুঝি, পাশ্চাত্য প্রভাবের ফলেই তার উদ্ভব ঘটল। কিন্তু দীনবন্ধুকে বাদ দিলে অন্য দুজনের নাটকে ইংরেজি আদর্শের সঙ্গে সংস্কৃত নাট্যশৈলীর মিশ্রণও দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং আদি বাংলা নাটক যে অবিমিশ্র সাহিত্য নয়, তা স্পষ্টই বোঝা যায়। আবার কিছুকাল পরে গিরিশচন্দ্র ঘোষ এসে বাংলা নাটকের দিক পরিবর্তন করালেন। সেখানে দেখা যায় পুরোনো গীতাভিনয়েরই প্রাধান্য। চৈতন্যযুগ থেকে যে ভক্তিপ্রবাহ বাঙালির অন্তরে প্রবহমান, যার আধারে যাত্রা ও গীতাভিনয়ের উদ্ভব, গিরিশচন্দ্রের নাটকে মানবলীলা অপেক্ষা সেই দেবলীলার প্রতিই সমধিক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং নাটক রচনা করতে গিয়ে আমরা পাশ্চাত্য শৈলীকে গ্রহণ করলেও বাংলার নিজস্ব সংস্কারকে যে কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তা ঐতিহাসিক সত্য। তাই বলতে হয় আধুনিক যুগে বাংলা নাটকের উদ্ভবের মূলে পাশ্চাত্য নাটক ও দেশীয় যাত্রা দুইই ক্রিয়াশীল ছিল।