আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/আদি পর্বের অনুবাদ ও মৌলিক নাটক
রামনারায়ণ তর্করত্নের কুলীনকুলসর্বস্ব (১৮৫৪) নাটকটিকে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সার্থক সামাজিক নাটক বলা যেতে পারে, কিন্তু এটি প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক নয়। প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষায় অনূদিত ও মৌলিক নাটকের ধারার সূত্রপাত রামনারায়ণের বহু পূর্বেই ঘটেছিল। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ইংরেজি ও সংস্কৃত ভাষা থেকে বহু নাটক বাংলায় অনূদিত হয়। ইংরেজি নাটকের মধ্যে শেকসপিয়রের নাটক সেকালের ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালিকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীতে বাংলা নাটক রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন প্রথম যুগের বাঙালি নাট্যকারেরা। কিন্তু তাঁরা সংস্কৃত নাট্যশৈলীকেও সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে পারেননি। তাই সেকালের অনূদিত ও মৌলিক উভয় নাটকের মধ্যেই পাশ্চাত্য ও সংস্কৃত নাট্যশৈলীর প্রভাব সুস্পষ্ট।
ইংরেজি ও সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ
[সম্পাদনা]ইংরেজি নাটকের অনুবাদ
[সম্পাদনা]কলকাতায় নাট্যশালা স্থাপনের প্রথম পর্ব থেকেই সেখানে শেকসপিয়রের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছিল। শেকসপিয়রই তৎকালীন ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালিকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষিত করেছিলেন। এটি বাঙালির নাট্যরসবোধেরও পরিচায়ক। সেই সঙ্গে বাংলা ভাষাতেও শেকসপিয়রের নাটকের অনুবাদ বা অনুসরণ করা চলে কিনা সে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাই দেখা যায়, উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত যে-সব ইংরেজি নাটকের অনুবাদ বা অনুসরণ হয়েছে, শেকসপিয়রের নাটকই ছিল তার প্রধান অবলম্বন।
হরচন্দ্র ঘোষ মার্চেন্ট অফ ভেনিস অবলম্বনে ভানুমতী-চিত্তবিলাস (১৮৫৩) এবং রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট অবলম্বনে চারুমুখ-চিত্তহরা (১৮৬৪) রচনা করেন। প্যারীচাঁদ মুখোপাধ্যায় মার্চেন্ট অফ ভেনিস অবলম্বনে রচনা করেন সুরলতা নাটক (১৮৬৭)। চন্দ্রকালী ঘোষ সিম্বেলাইন অবলম্বনে রচনা করেন কুসুমকুমারী নাটক (১৮৬৮)। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দ্য টেম্পেস্ট অবলম্বনে রচনা করেন নলিনীবসন্ত নাটক (১৮৬৮)। বেণীমাধব ঘোষ দ্য কমেডি অফ এররস অবলম্বনে ভ্রমকৌতুক নাটক (১৮৭২) এবং তারিণীচরণ পাল ওথেলো অবলম্বনে ভীমসিংহ নাটক (১৮৭৪) রচনা করেন। হ্যামলেট অবলম্বনে প্রমথনাথ বসু অমরসিংহ নাটক (১৮৭৪) এবং হরলাল রায় রুদ্রপাল নাটক (১৮৭৪) রচনা করেন। পরবর্তীকালে হরিরাজ নামে হ্যামলেট-এর আর-একটি অনুবাদও প্রকাশিত হয়। এটির রচয়িতা হিসেবে অমরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম প্রচলিত, তবে গবেষকদের মধ্যে তা নিয়ে মতভেদ আছে। তারকনাথ মুখোপাধ্যায় ১৮৭৫ সালে এবং গিরিশচন্দ্র ঘোষ ১৮৯৩ সালে ম্যাকবেথ অনুবাদ করেন। অজ্ঞাতনামা লেখকের মদনমঞ্জরী নাটক (১৮৭৬) ও যোগেন্দ্রনাথ দাসঘোষের অজয়সিংহ-বিলাসবতী নাটক (১৮৭৮) যথাক্রমে দ্য উইন্টার’স টেল ও রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের অনুবাদ। নীলরতন মুখোপাধ্যায় আ মিডসামার নাইট’স ড্রিম অবলম্বনে রচনা করেন শরৎশশী নাটক (১৮৮২-৮৩)। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুবাদ করেন জুলিয়াস সিজার। এছাড়া নিকোলাস রো-এর দ্য ফেয়ার পেশেন্ট নাটক অবলম্বনে শ্যামাচরণ দাস দত্ত রচনা করেন অনুতাপিনী নবকামিনী নাটক।
সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ
[সম্পাদনা]উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে বিভিন্ন সংস্কৃত নাটকও বাংলায় অনূদিত হয়েছিল। ১৮৩৯-৪০ সালে বিশ্বনাথ ন্যায়রত্ন সর্বপ্রথম কৃষ্ণ মিশ্রের সংস্কৃত প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকটি অনুবাদ করেন। এছাড়া নন্দকুমার রায়ের অভিজ্ঞান-শকুন্তলা-নাটক (১৮৫৫) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রামনারায়ণ তর্করত্ন কয়েকটি সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ করেছিলেন। এগুলি হল ভট্টনারায়ণের বেণীসংহার (১৮৫৩), শ্রীহর্ষের রত্নাবলী (১৮৫৮), কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটক (১৮৬০) ও ভবভূতির মালতীমাধব নাটক (১৮৬৭)। কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুবাদ করেন বিক্রমোর্বশী (১৮৫৭) ও মালতীমাধব নাটক (১৮৫৯)। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সতেরোটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত নাটক অনুবাদ করেন। তার মধ্যে কালিদাসের অভিজ্ঞানশাকুন্তলম্, ভবভূতির মালতীমাধব ও শূদ্রকের মৃচ্ছকটিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মৌলিক নাটক
[সম্পাদনা]যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত
[সম্পাদনা]প্রথম বাংলা নাটক রচনার গৌরব যে দুজন নাট্যকারের প্রাপ্য, যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত তাঁদের অন্যতম। তিনি ১৮৫২ সালে ইংরেজি নাট্যাদর্শে কীর্তিবিলাস নামে একটি নাটক রচনা করেন। নাটকটি কোনও রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়নি, সুতরাং পাঠ্য নাটক হিসেবেই এটির পরিচয়। কিন্তু সাহিত্যবিচারে নাটকটির মূল্য নগন্য। নাটকটিতে শেকসপিয়রের হ্যামলেট নাটকের ছাপ থাকলেও মূলত এটি বাংলায় প্রচলিত বিজয়-বসন্ত কাহিনিরই অনুসরণ। তবে কীর্তিবিলাস নাটকটির মাধ্যমেই বাংলা নাট্যসাহিত্যে ট্র্যাজেডি রচনার প্রয়াস পরিস্ফুট, সেই হিসেবে নাটকটির কিছু ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। আমাদের দেশে ট্র্যাজেডির ঐতিহ্য ছিল না, যোগেন্দ্রচন্দ্র সেই ঐতিহ্যকে অতিক্রম করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। অবশ্য এই প্রয়াসে যে তিনি বিশেষ সফল হয়েছিলেন, তা বলা চলে না। যে কর্মসংঘাত বা action পাশ্চাত্য নাটকের প্রাণবস্তু, কীর্তিবিলাস-এ তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। চরিত্রচিত্রণেও নাট্যকার ব্যর্থ। নাটকটিতে পাশ্চাত্য নাট্যরীতির অনুসরণের প্রয়াস থাকলেও সংস্কৃত নাটকের অনুকরণে এতে নান্দী, প্রস্তাবনা প্রভৃতিও আছে।
তারাচরণ শিকদার
[সম্পাদনা]তারাচরণ শিকদারের ভদ্রার্জুন নাটকটিও ১৮৫২ সালেই প্রকাশিত হয়। মহাভারতের আদিপর্বে উল্লিখিত অর্জুন কর্তৃক সুভদ্রাহরণের উপাখ্যান এই নাটকের আখ্যানবস্তু হলেও এটির রচনাপ্রণালী বহুলাংশে মৌলিক। এই নাটকে ইংরেজি ও সংস্কৃত নাট্যাদর্শের মিশ্রণ ঘটেছে। এতে সংস্কৃত নাটকের নান্দী ও প্রস্তাবনা এবং বিদূষকের ভূমিকা পরিত্যক্তা হয়েছে, এবং ইংরেজি নাটকের মতো ঘটনা ও সংস্থান এবং অঙ্কের অন্তর্গত একাধিক দৃশ্য প্রযুক্ত হয়েছে। নাটকের ভূমিকায় তারাচরণ লিখেছেন, “এই নাটক ক্রিয়াদি ও ঘটনাবস্থানের নির্ণয় বিষয়ে ইউরোপীয় নাটক-প্রায় হইয়াছে।” কিন্তু বাস্তবে মহাভারতের আখ্যানটি কথোপকথনের মাধ্যমে প্রকাশের চেষ্টা ছাড়া এর নাট্যগুণ কিছুই নেই। নাটকটি অংশত গদ্যে এবং বেশিরভাগ পদ্যে রচিত। গদ্যাংশের ভাষা সরল। চিত্রগুলিতেও মাঝে মাঝে সজীবতার স্পর্শ অনুভূত হয়। ভদ্রার্জুন কোনও মঞ্চে অভিনীত হয়নি।
হরচন্দ্র ঘোষ
[সম্পাদনা]হরচন্দ্র ঘোষ (১৮১৭—১৮৮৫) ছিলেন পদস্থ সরকারি কর্মচারী। বাংলা ও সংস্কৃতের মতো ইংরেজিতেও তিনি পারদর্শী ছিলেন। তাই দেখা যায়, নাট্যরচনায় তিনি সংস্কৃত ও বাংলা ঐতিহ্যকে যেমন গ্রহণ করেছেন, ইংরেজি আদর্শকেও তেমনই বরণ করেছেন। কিন্তু প্রয়াস সাধু হলেও নাট্যরচনার প্রতিভা তাঁর ছিল না। তাঁর প্রথম নাটক ভানুমতী-চিত্তবিলাস (১৮৫৩) তার প্রমাণ। নাটকটি শেকসপিয়রের মার্চেন্ট অফ ভেনিস নাটকের অনুসরণ। শেকসপিয়র অবলম্বনে নাট্যরচনার ক্ষেত্রে হরচন্দ্রকেই পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। তবু নাটকটি যথাযথ নাটক হয়ে উঠতে পারেনি। তিনি ইচ্ছামতো মূল নাটকের অনেক পরিবর্তন করেছেন, যা নাট্যগুণসম্পন্ন হয়নি। কারণ পোর্শিয়াকে ভানুমতীতে এবং বেসানিওকে চিত্তবিলাসে নামান্তরিত করলেই নাটকের প্রাণবস্তু ভাবান্তরিত হয় না। তাছাড়া কৃত্রিম সাধুভাষাও এটির নাট্যরস সৃষ্টির পরিপন্থী হয়েছে। হরচন্দ্রের দ্বিতীয় নাটক কৌরব বিয়োগ (১৮৫৮)। এই পঞ্চাঙ্ক নাটকটির কাহিনি কাশীদাসী মহাভারত থেকে গৃহীত এবং এটি গদ্যে-পদ্যে রচিত। তাঁর তৃতীয় নাটক চারুমুখ-চিত্তহরা (১৮৬৪) শেকসপিয়রের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের অনুবাদ। কিন্তু সেই অনুবাদের ভাষা ও ভঙ্গি এমনই যে, এটিকে শেকসপিয়রের অনুবাদ মনে করা ধৃষ্টতা। এর আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটকগুলি এবং দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ ও নবীন তপস্বিনী প্রকাশিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে হরচন্দ্র ঘোষকে নাট্যকার হিসেবে ব্যর্থই বলতে হয়। তাঁর কৃতিত্ব এই যে, তিনিই সর্বপ্রথম শেকসপিয়র অবলম্বনে বাংলা নাটক রচনার চেষ্টা করেছিলেন। হরচন্দ্রের চতুর্থ নাটক রজতগিরিনন্দিনী (১৮৭৪) ব্রহ্মদেশীয় উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত।
কালীপ্রসন্ন সিংহ
[সম্পাদনা]কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০—১৮৭০) হুতোম প্যাঁচার নক্সা এবং সংস্কৃত মহাভারতের অনুবাদের জন্য বাংলা সাহিত্যে খ্যাতিমান। কিন্তু রঙ্গমঞ্চের পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও বাংলা নাট্যশালার ইতিহাসে তাঁর নাম স্মরণীয়। ১৮৫৬ সালে তিনি বিদ্যোৎসাহিনী থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রধানত সেই সূত্রেই নাট্যরচনায় মনোনিবেশ করেন। অবশ্য তাঁর প্রথম নাটক বাবু (১৮৫৪) মঞ্চস্থ হয়নি। তাঁর লেখা বিক্রমোর্বশী (১৮৫৭), সাবিত্রী-সত্যবান (১৮৫৮) ও মালতীমাধব নাটক (১৮৫৯) নাটক তিনটিই অভিনীত হয়েছিল। বিক্রমোর্বশী ও মালতীমাধব নাটক যথাক্রমে কালিদাস ও ভবভূতির নাটকের অনুবাদ। সাবিত্রী-সত্যবান তাঁর মৌলিক নাটক। তিনি সংস্কৃত আদর্শের অনুসরণেই নাটক রচনা করেছিলেন। তাঁর ভাষা ছিল চলিত, তবে তা তখনও কৃত্রিমতার গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। শেষ দুটি নাটকে কালীপ্রসন্ন প্রচুর গানের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে যাত্রার ঐতিহ্যের অনুবর্তন।