আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস/অক্ষয়কুমার দত্ত
বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিকাশের ধারায় অক্ষয়কুমার দত্তের (১৮২০—১৮৮৬) দান অনস্বীকার্য। বাংলা গদ্যকে সংযত, গম্ভীর ও যুক্তিনিষ্ঠ করার উপযোগী উপকরণে সাজিয়ে তিনি সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী কীর্তি স্থাপন করেছেন। আবাল্য আবেগবর্জিত জ্ঞানপিপাসায় যুক্তিনিষ্ঠ অক্ষয়কুমার কেবল বুদ্ধিকেই আশ্রয় করেছিলেন। বিজ্ঞান ও দর্শনে ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। তরল ভক্তিবাদে তাঁর আস্থা ছিল না, বেদকে তিনি অপৌরুষেয় বা অভ্রান্ত জ্ঞান করতেন না, আবার ঈশ্বরের প্রতি প্রার্থনার কোনও উপযোগিতা আছে বলেও মনে করতেন না। তাই কেউ কেউ তাঁকে অজ্ঞেয়বাদী বা নিরীশ্বরবাদী বলতেন। প্রথম যৌবনে তিনি জেফ্রয় নামে এক জার্মান শিক্ষকের কাছে গণিত, বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য দর্শনের পাঠ নেন। পরে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে এসে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন।
অক্ষয়কুমার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে শিক্ষকতা করতেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সেই সময় তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন। একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে অক্ষয়কুমার ১৮৪৩ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তারপর দীর্ঘ বারো বছর তিনি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে সেই দায়িত্বও পালন করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট সকলেই তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রশংসা করতেন। পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা, চিন্তার স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবাদের প্রতিষ্ঠা দ্বারা অক্ষয়কুমার যুবসমাজের বিশেষ উপকার করেছিলেন এবং সাময়িকপত্র পরিচালনার একটি নিখুঁত আদর্শও স্থাপন করেছিলেন।
অক্ষয়কুমার রম্যরচনার লেখক ছিলেন না। তাঁর রচনা ছিল জ্ঞানপ্রচারের উদ্দেশ্যে লেখা শিক্ষামূলক রচনা। তিনি অনেকগুলি পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ভূগোল (১৮৪১) তাঁর লেখা প্রথম বই। এছাড়া চারুপাঠ (তিন খণ্ড, ১৮৫৩—৫৯) ও পদার্থবিদ্যা (১৮৫৬) তাঁর অপর দুই উল্লেখযোগ্য পাঠ্যপুস্তক। অক্ষয়কুমারের মনীষা, জ্ঞানপিপাসা ও ভাষাশিল্পের পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর পরবর্তী অনুবাদমূলক রচনাগুলিতে। জর্জ কম্বের কনস্টিটিউশন অফ ম্যান অবলম্বনে তিনি রচনা করেন বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার (প্রথম খণ্ড ১৮৫১, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৫৩)। কম্বেরই মর্যাল ফিলোজফি অবলম্বনে তিনি রচনা করেন ধর্মনীতি (১৮৫৬)। তারপর প্রকাশিত হয় অক্ষয়কুমারের বিখ্যাত গ্রন্থ ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় (প্রথম খণ্ড ১৮৭০, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৮৩)। এই গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এইচ. এইচ. উইলসনের দ্য রিলিজিয়াস সেক্টস অফ হিন্দুজ বইটিকে। উইলসন তাঁর বইতে ৪৫টি সম্প্রদায়ের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন; কিন্তু অক্ষয়কুমার শ্রমসাধ্য গবেষণা ও ঐকান্তিক চেষ্টায় ১৮২য়ি সম্প্রদায় ও উপসম্প্রদায়ের সাধনতত্ত্ব ও সাধনপ্রণালীর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন।
অক্ষয়কুমারের বহু উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-র পৃষ্ঠাতেই রয়ে গিয়েছিল। এমনকি তাঁর অনেক প্রবন্ধ অপ্রকাশিত অবস্থায় থেকে গিয়েছিল পাণ্ডুলিপি আকারে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রাচীন হিন্দুদের নৌযাত্রা নামে একটি বইতে কয়েকটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। প্রাচীন ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ব থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে হিন্দুদের বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিস্তারের অনেক তথ্য অক্ষয়কুমার এতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
অক্ষয়কুমারের রচনাবলি আয়তনে বিশাল নয়, বিশুদ্ধ সাহিত্যিক প্রেরণাতেও তা রচিত হয়নি। তাই তিনি ভাষাশিল্পে বাঞ্ছিত সাবলীলতা অর্জন করতে পারেননি। তাঁর ভাষা ছিল অতিরিক্ত সমাসবদ্ধ ও তৎসম-শব্দবহুল। যুক্তিনিষ্ঠার খাতিরে তিনি ভাষায় আবেগমূলক রসের সঞ্চার ঘটাতে পারেননি। ভাষাকে তিনি সরল, প্রাঞ্জল বা শ্রুতিমধুর করে তোলেননি, হয়তো সেই চেষ্টাও করেননি। অজিতকুমার চক্রবর্তী লিখেছেন, “অক্ষয়বাবু ‘বাহ্যবস্তু ও তাহার সহিত মানব-প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’ লিখিবার সময় ‘জিগীষা, জুগুপ্সা, জিজীবিষা’ প্রভৃতি বিভীষিকাপূর্ণ শব্দের সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তখন শুনা যায় যে কলিকাতার শিক্ষিত লোকের বাড়ীতে ঐ সব শব্দের সঙ্গে ‘চিড্ঢীমিষা’ প্রভৃতি শব্দ যোগ করিয়া হাসাহাসি হইত।” অক্ষয়কুমারের সংস্কৃত বাক্যভঙ্গি ও ব্যাকরণানুগ শব্দ প্রয়োগের প্রাবল্যে রচনার সৌন্দর্য ও সুষমার সৃষ্টি হয়নি ঠিকই, কিন্তু এ-কথাও স্বীকার করতে হয় যে, জ্ঞানগর্ভ রচনা প্রকাশের জন্য ভাষায় যে শক্তি প্রয়োজন অক্ষয়কুমার গদ্যভাষায় সেই শক্তি সঞ্চারিত করেছিলেন।